আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা পাক

সত্য ও সুন্দরের পথের অভিযাত্রী আমি, কিছুতেই যেন এ যাত্রা শেষ না হয়... ১৯৭১, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে বাড়িঘর। মানুষ দিকবিদিক শুন্য হয়ে ছুটছে একটু আশ্রয়ের জন্য। কোথাও একটু ঠাই মিলছে না মানুষের। কোথায় যাবে? শহর থেকে মানুষগুলো গ্রামে ছুটছে, গ্রাম থকে ছুটছে উদ্ভ্রান্তের মত অজানার উদ্দেশ্যে।

খাদ্য নাই, পরনে কাপড় নাই। কি আশ্চর্য, নিজের দেশে থেকেও সব কিছু থেকে বঞ্চিত। মানুষগুলোর দোষ কি? তারা কেন ধুঁকে ধুঁকে মরছে। যে দিকে চোখ যাচ্ছে পচা-গলা লাশ দেখা যাচ্ছে, দুর্গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে আছে। যেন শেয়াল কুকুরের উৎসব বসেছে চারপাশে।

একটি ছোট গ্রাম, নাম কদমতলি। সেই গ্রামেরই মেয়ে দিলারা। কতই বা বয়স ৫ কিংবা ৬, সে যুদ্ধ কি জিনিস বোঝে না। শুধু শুনত তোরা বাড়ির বাইরে বের হবি না। শুনে ভারি মন খারাপ হত তার।

কেন বের হতে পারবে না, বন্ধুদের সাথে খেলতে পারবে না, বাগানে গিয়ে ফল পারতে পারবে না, পুকুরে লাফ-ঝাপ করতে পারবে না। আকাশে শাঁই শাঁই করে উড়ে যেত যুদ্ধ বিমান, কি বিকট আওয়াজ ওগুলোর, যেন টিনের চাল ভেঙ্গে যাবে। এমন অনেক দিনই হয়েছে, মাত্র তারা সবাই খেতে বসেছে, ভাত মুখে তুলছে, আর খবর এসেছে, গ্রামে মিলিটারি এসেছে এখন পালাতে হবে। সেই মুখের সামনে নেয়া ভাতটুকু মুখে না দিয়েই লুকোতে হয়েছে। প্রায় রাতেই তার বাবা যেন কোথায় যেত, কখনও গোয়ালের গরু নিয়ে, কখনও ভাতের চাল নিয়ে, দিলারা বাবাকে জিজ্ঞেস করত, "বাজান তুমি রাইতের বেলা কই যাও, আমাদের গরুটা যে কাইল রাইতে নিয়া গেলা আরতো ওইটা ফেরত আনলা না।

কই থুইয়া আইস গরুটারে?" বাবা বলতেন, মারে ওইটা মুক্তিবাহিনীর জন্য দিয়া আসছি, ওরা যুদ্ধ করতাসে, দেশ স্বাধীন করব। অগো খাওন লাগব না? না খাইলে যুদ্ধ করব ক্যামনে?" দিলারা- "বাজান যুদ্ধ কি? স্বাধীন কি?" বাবা- "আমাদের দেশে পশ্চিম পাকিস্তান থাইকা অনেক রাক্ষস আইসে, অগো মিলিটারি কয়, ওরা আমাগো দেশের মানুষ মারতাসে, বাড়িঘর পুড়াইয়া দিতাসে। অগো লগে মারামারি করতাসে আমাগো দেশের পোলাপাইন, এইডারে কয় যুদ্ধ। আর অগো যখন এই দেশ থাইকা বাইর কইরা দিব তখন দেশ হইব স্বাধীন। " দিলারা কি বুঝল কি জানি, একটু পর বলে, "বাজান, আমিও যুদ্ধ করমু।

" বাবা- "তুই পারবি নারে মা, তুই তো ছোট। " এভাবে চলতে লাগলো ওদের যুদ্ধকালীন জীবন। রফিক, কুসুমপুর গ্রামের এক কিশোর। বাবা নাই, মায়ের একমাত্র অবলম্বন সে। দুরন্তপনায় কেটে যেত তার দিন, বাবা না থাকায় কৃষি জমিগুলো তাকেই দেখাশোনা করতে হত।

মুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সে যুদ্ধে যাবে, মা কঠোর ভাবে নিষেধ করলেন। মায়ের আদেশ ফেলতেও পারছে না। কি করবে ভেবে পায় না। একদিন মাকে না বলেই মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গেল, সবাই দেশের জন্য লড়ছে, শুধু সে কিছু করতে পারছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের কথোপকথনে বুঝতে পারল এই ক্যাম্প থেকে পাশের ক্যাম্পে গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে হবে, কিন্তু কে যাবে? সেখানকার মুক্তিযোদ্ধারা আজ রাতে নদীর ওই পাড়ে যাবে মিলিটারি ক্যাম্পে আক্রমণ করতে, তখন রফিক বলল আমি যাব।

একজন বলে উঠল তুই যাবি? চাচী কিছু বলবে নাতো? রফিক বলে, মাতো যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছে, আমি তো আর যুদ্ধ করছি না। যেই কথা সেই কাজ, সে চলে গেল। পথেই দেখা মিলল এক রাজাকার সহ কিছু মিলিটারির। তখন ওরা বলল কোথায় যাচ্ছিস, তোর মাথায় ওগুলো কি? রফিকও কম চালাক না, সে নিচে গোলাবারুদ নিয়ে উপরে তুলেছে ধান। রফিক বলল আমি কৃষক, হাটে যাচ্ছি ধান বিক্রি করতে।

এক রাজাকার বলে উঠল, স্যার উসকো ছোড় দিজিয়ে, ও মুক্তি নেহিহে। কৃষক হে। স্যার ওতো বাচ্চা পোলা হে, মুক্তি হইলে হাতমে বন্দুক হোতা। উসকে পাসতো ধানকে বস্তা হে। মিলিটারি বলল, ঠিক হে টু যা, আগার কই মুক্তি দেখা তো হামকো বাতানা।

রফিক বলল আচ্ছা ঠিক আছে। রফিক এভাবে মায়ের অগচরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে থাকল, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগপর্যন্ত। এটা কোন বানিয়ে বলা গল্প না, গ্রামের নাম ও চরিত্রগুলোর নাম কাল্পনিক হলেও সত্যিকারের ঘটনা বললাম এতক্ষন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কমবেশি সব পরিবারই অবদান রেখেছে দেশ স্বাধীন করতে। অথচ আজ তারা কোন সুবিধা পাচ্ছে না, আসল মুক্তিযোদ্ধারা না খেয়ে, ভিক্ষা করে, রিকশা চালিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে।

জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সাথে তীব্র লড়াই করে যাচ্ছে, ওরাই তো লড়বে কারন ওদের জন্ম হয়েছে লড়াই করার জন্য। একবার ৭১ এ লড়াই করেছে দেশের জন্য আর এখন লড়ছে বেঁচে থাকার জন্য। আজ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে সুবিধা ভোগ করছে, দেশপ্রেমিক হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বড় বড় কথা বলছে। আর সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য রাস্তা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে আনছে, বলছে আজ তোমার ভিক্ষা করতে হবে না, অনুষ্ঠানে থাকলে ফ্রি খাবার আর জন প্রতি ১৫০ টাকা করে পাবে। সেইসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ভাষণ শুনে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

আজ ক্ষমতার গদিতে আসীন ক্ষমতাধর লোকগুলো দেশের নামে বড় বড় কথা বলে নিজের পকেট পূর্ণ করছে। আর দুর্নীতির বেড়াজালে দেশকে বন্দী করে রেখেছে। কিছুতেই সেখান থেকে বেরুতে পারছে না দেশ। বাংলাদেশের সমপর্যায়ে থেকেও আজ মালয়শিয়া উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনও দারিদ্রতার করাঘাতে পৃষ্ট হচ্ছে সর্বদা। এর একটা অবশান হতেই হবে, আরেকটা বার আমাদের লড়তে হবে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

তাই তো আমি বলতে চাই, আর একটা বার স্বাধীন হতে চাই আর একটা বার বিজয় উল্লাসে মেতে উঠতে চাই আমি চিৎকার করে বলতে চাই সেই স্বাধীনতার কথা আমি সত্যি স্বাধীনতা চাই আমি দারিদ্রতার বেড়াজাল থেকে স্বাধীনতা চাই আমি অন্যায় অবিচারের করাল গ্রাস থেকে স্বাধীনতা চাই কালো টাকা, আর দুর্নীতির কালো থাবা থেকে স্বাধীনতা চাই আমি ধনীক শ্রেণীর বর্বরতা, শোষণ, নিপীড়ন থেকে স্বাধীনতা চাই আমি দেশের নষ্ট, দুষিত রাজনীতি থেকে স্বাধীনতা চাই আমি কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের গোঁড়ামি থেকে স্বাধীনতা চাই আমি যত নোংরা, কুলষিত, অসত্য, অসুন্দর থেকে স্বাধীনতা চাই আমি স্বাধীনতা চাই, স্বাধীনতা চাই আমি আর একটা বার স্বাধীন হতে চাই আর একটা বার বিজয় উল্লাসে মেতে উঠতে চাই আমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই আমি স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়তে চাই আমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হয়ে নির্ভয়ে মরতে চাই আমি আর একটা বার স্বাধীনতা চাই... ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ২২ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.