আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ভালোবাসা দু'প্রকার

লিখতে ভাল লাগে, লিখে আনন্দ পাই, তাই লিখি। নতুন কিছু তৈরির আনন্দ পাই। কল্পনার আনন্দ। ভালোবাসা দু'প্রকার মোহাম্মদ ইসহাক খান ফিরোজের নিজের কথা বলতে বলতে কাঁদোকাঁদো অবস্থা। আমার ব্যাপারটা একটু ভেবে দ্যাখ্‌, দোস্ত।

ঘরে শান্তি নেই, এর চেয়ে আর দুঃখের কী হতে পারে? উঠতে বসতে বউয়ের খোঁটা, আজেবাজে কথা। রাগ করে বাসার সব কাঁচের জিনিসপত্র ভেঙে ফেলেছে। এখন আমি তো ভয়ে ভয়ে আছি। গায়ে হাত বুলিয়ে শান্ত করতে গেলাম, উল্টো আরেকদফা ঝাড়লো। আমি তো ভেবেই পাই না, এই মেয়ের সাথেই টানা পাঁচ বছর ধরে চুটিয়ে প্রেম করেছি? কতই না ভাল সময় কেটেছিল, কত আনন্দের স্মৃতি! আমাকে দেখলেই মুখে হাসি ফুটত জেসমিনের, বিয়ের আগে একটিবারও আমার সাথে রাগ করেনি, উঁচু গলায় কথা বলে নি।

শুনেছি মেয়েরা বিয়ের পরে একদম বদলে যায়, তাই বলে এত? এখন আমার চেহারা দেখলেই ভ্রূ কোঁচকায়, আমার ছায়াও মাড়াতে চায় না, বাড়িটা আমার বলে হয়তো আমাকে বের করে দিতে পারছে না, কিন্তু একদিন ঠিক ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে বের করে দেবে। বিশ্বাস কর্‌, এমন চলতে থাকলে আমি ঠিক একদিন দেশান্তরী হবো, কিংবা আরিচা রোডে ট্রাকের নিচে আত্মাহুতি দেবো। সংসার থেকে মন উঠে গেছে, কিচ্ছু ভাল লাগে না। কত আশা ছিল, বিয়ের পর প্রতি রাতে গুটুরগুটুর করে গল্প করবো, কত মজা করবো, কিন্তু তার আর উপায় আছে? আমাকে তো এক বিছানায় শুতেই দিতে চায় না, প্রায় রাতেই ঝগড়া করে আমাকে বালিশ নিয়ে ফ্লোরে শুয়ে থাকতে হয়। আমি একটু গলা উঁচু করলেই শুরু করে থালাবাটি ছোঁড়াছুঁড়ি।

সেদিন তো পাশের বাসার ভাবীকে দেখলাম, বারান্দা থেকে বড় বড় চোখ করে আমাদের ঝগড়া দেখছেন। জেসমিন আমার দিকে কাঁথাবালিশ ছুঁড়ে মারছে, আর আমি আত্মরক্ষার চেষ্টা করছি। লজ্জায় মাথা কাটা গেলো, পুরুষসমাজে আর মুখ দেখানোর যো নেই, বুঝলি? আমার লাগোয়া ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক, নিজের চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছেন, তবুও তারা কত "হ্যাপি", দেখে হিংসেই লাগে। বিয়ের আগে নাকি আবার সেই মেয়েকে দেখেনও নি, বাবা-মা ধরে বিয়ে করিয়ে দিয়েছেন বলে বিয়ে করেছেন। সেদিন আবার দেখলাম হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে।

আর আমি? জেসমিনের দশ হাতের মধ্যে এলেই ক্ষেপে ওঠে, কারণে বা অকারণে, হাত ধরা তো দূরে থাকুক, অথচ আগে নিজেই কত ছুটে এসে আমার হাত ধরতো। আর পারছি না দোস্ত। সেদিন মশারি টানানো নিয়ে ঝগড়া হয়েছে, টানা এক ঘণ্টা, ভাবতে পারিস? সবসময় ভাবতাম, স্ত্রী মানে অর্ধাঙ্গিনী, সে সব সুখ-দুঃখ আমার সাথে ভাগ করে নেবে। এখন দেখি তিক্তাঙ্গিনী। হাসান চুপচাপ বসে থাকে।

একসময় সে বিমর্ষ বন্ধুর কাঁধে হাত রাখে। বোঝাই যায় যে বন্ধুর কষ্টে সে নিজেও বেশ ব্যথিত। বন্ধুর দাম্পত্য জীবনে অশান্তি কে আশা করে? হঠাৎ ফিরোজ গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, ছেড়ে দে আমার কথা, এই কাসুন্দি ঘাঁটতে গেলে জিন্দেগী পার হয়ে যাবে। তুই আমার আপনজন, তাই পেট থেকে সব বেরিয়ে গেলো। ঘরে কথা বলার তো কোন উপায় নেই, তাই বাইরে প্রচুর কথা বলি, কিছু মনে করিস না।

হাসান বলে ওঠে, না না, মনে করার কী আছে? কিছুক্ষণ আবার নীরবতা। তারপর ফিরোজ প্রশ্ন করে, ভাবীকে না দেখাবি বলেছিলি? কোথায় ভাবী? বাসায় নেই? আছে। রান্নাঘরে খুটখাট করছে। দাঁড়া, আমি ডেকে নিয়ে আসি। আগেই বলে রাখি, তোর ভাবীকে দেখলে কিঞ্চিৎ ধাক্কা খেতে পারিস।

কেন, খুব সুন্দর বুঝি? সুন্দর তো বটেই। কিন্তু সে কারণে নয়, অন্য আরেকটা ব্যাপার আছে। দেখলেই বুঝবি। হাসান স্ত্রীকে ডেকে আনতে যায়। ফিরোজ ভাবে, একসময় জেসমিনকেও খুব সুন্দর লাগতো তার কাছে।

এখনো সে একইরকম দেখতে, কিন্তু ফিরোজের কেন যেন ওকে দেখলে রূপকথার গল্পের ডাইনি বুড়ির কথা মনে পড়ে যায়। জেসমিন ওকে দেখলে ডাইনি বুড়ির মতোই দাঁত খিঁচোয়। ভালোবাসার কথা না হয় দূরে থাকুক, কিন্তু স্বামীর প্রতি একটা ন্যূনতম শ্রদ্ধা থাকবে না? মনে হয় জেসমিনকে বিয়ে না করে একটা বোবা আর অন্ধ মেয়েকে বিয়ে করলেই ভাল হতো, অন্তত সবসময় বউয়ের নথ নাড়া দেখতে হতো না। ফিরোজের ভাবনার তার কেটে যায়, যখন হাসান ওর স্ত্রীর হাত ধরে এসে হাজির হয়। নতুন ভাবীকে দেখে আক্কেলগুড়ুম হয়ে যায় ফিরোজের, লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় সোফা থেকে।

হাসানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে একজন চীনা কিংবা জাপানী তরুণী। এ কী ভেলকি রে হাসান? ঢোক গেলে ফিরোজ। হাসান হাসিমুখে বলল, ওর নাম হু চেং। চীনের মেয়ে। ফিরোজ অবাক হয়।

আজ পর্যন্ত এমন কোন বাঙালী যুবকের সাথে তার দেখা হয়নি, যে তাকে হাসতে হাসতে বলেছে যে আমার স্ত্রীর নাম হু চেং। মেয়েটি দেখতে ভারী মিষ্টি, চোখ দুটো ছোট ছোট হলেও মায়াকাড়া চেহারা। সবার আগে যেটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেটা হল ঢেউ খেলানো কোমর পর্যন্ত নেমে আসা রেশমি, কুচকুচে কালো মসৃণ চুল। আর মেয়েটার হাসিটা একদম শিশুর মতো। মেয়েটি, যার নাম হু চেং, সে চীনা কায়দায় মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো ফিরোজকে।

ফিরোজ বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে, কারণ এসব পরিস্থিতিতে কী করতে হয়, তার জানা নেই। মেয়েটি লজ্জা পেয়ে গেলো। হাসানকে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কী যেন বলল। হাসান বলল, হু জিজ্ঞেস করছে, তোমার বন্ধু এত অপ্রতিভ হচ্ছে কেন? ফিরোজের সম্বিৎ ফিরে আসে। সে-ও মেয়েটির মতো মাথা ঝোঁকানোর একটা ভঙ্গি করলো।

ভালোমতো হল না, বেশ হাস্যকর দেখাল, কিন্তু হু চেং তাতেই ভারী খুশি হয়ে উঠলো। ব্যস্তসমস্ত হয়ে আবার অন্য ঘরে চলে গেলো হু চেং, বোধহয় রান্নাবান্নার যোগাড় দেখতে। যাবার আগে হাসানকে কী যেন বলে গেলো। হাসান আবার এসে বসলো সোফায়। তোকে রাতে খেয়ে যেতে বলেছে।

ফিরোজ এখনো তবদা মেরে আছে। হাসান শেষ পর্যন্ত একটা চীনা মেয়েকে বিয়ে করেছে? আর রাতে কী খাওয়াবে? ব্যাঙ ভাজা, সাপের ঝোল? চাইনিজরা তো নাকি সাপ-বিচ্ছু, তেলাপোকা কিছুই বাদ দেয় না। হাসান ব্যাপারটা খোলাসা করে। চায়নায় যে প্রোজেক্টটা নিয়ে গিয়েছিলাম, তার ফাঁকে ফাঁকে একটা রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। সেখানেই ওর সাথে পরিচয়।

তারপর একসময় ভাল লেগে গেলো, বলে ফেললাম, তোমাকে ভালোবাসি। সে-ও দেখি একপায়ে খাড়া। তারপর টুক করে বিয়ে করে ফেললাম, নিয়ে এলাম এখানে। বটে? তা প্রপোজ করলি কীভাবে? চীনা ভাষায়? "চ্যাং প্যাং" করে? আরে না, মাথা খারাপ, চাইনিজ বলতে গেলে আর উপায় ছিল? ইংরেজিতে বললাম, আই লাভ ইউ। আমি চাইনিজ বুঝি না, সে-ও বাংলা বোঝে না, শুধু অল্পসল্প ইংরেজি বলতে পারে।

ভালো লাগার ওপর আর কোন কথা চলে, তুই-ই বল। ফিরোজ জবাব দেয় না। বিয়ের আগে সে-ও ঠিক এই কথাটিই ভাবতো। তোদের কোন সমস্যা হয় না? সংসার করতে তো একশো একটা কথা বলতে হয়। ইশারা ইংগিতে যা বলার বলে নিই।

সেটাও একটা মজার ব্যাপার, না করলে বুঝবি না। তাছাড়া এই সমস্যা কিছুদিন পরে তো আর থাকবে না, হু-এর নাকি বাংলা খুব পছন্দ হয়েছে, আমি বাংলা আর ইংরেজি শেখাচ্ছি। বিনিময়ে নিজেও ওর কাছ থেকে চাইনিজটা মোটামুটি শিখে নিচ্ছি। গিভ অ্যান্ড টেক, হা হা হা। ইশারা-ইঙ্গিতে নাহয় ছোটখাটো ব্যাপার চালানো গেল, কিন্তু স্বামী-স্ত্রী একটু গল্পসল্প করবে না? হু, তা তো করিই।

আমি নিজের মতো বাংলায় বলে যাই, হু চেং নিজের মতো চাইনিজে বলে যায়, আমরা যা বোঝার বুঝে নিই। কোন অসুবিধে হয় না। খুব অসুবিধে হলে ইংরেজি তো আছেই। ফিরোজের অবিশ্বাস্য বলে মনে হয় ব্যাপারটা। কথার মাঝখানে ট্রে-তে খাবার সাজিয়ে হু চেং সলজ্জ ভঙ্গিতে প্রবেশ করলো।

ভয়ে ভয়ে খাবারে উঁকি দিলো ফিরোজ। না, কোন ব্যাঙয়ের পা কিংবা সাপের লেজ দেখা যাচ্ছে না, চকলেটে তৈরি পেস্ট্রি কেক দেখা যাচ্ছে। হাসান বলল, বাংলা রান্নাও কিন্তু হু খুব ভাল পারে। রাতে বিরিয়ানি হচ্ছে। আমি শিখিয়েছি।

হাসান কেকটা মুখে পুরে চিবান দিলো, কিছু বলল না। রাতে খেয়েদেয়ে যখন বন্ধুবরের কাছে বিদায় নিয়ে রাস্তায় নামলো ফিরোজ, তখন সে বুঝতে পারলো যে হাসান আর ওর নিজের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। ভাগ্য দুজনকে দুটো বিপরীত মেরুতে পাঠিয়ে দিয়েছে। যে ফিরোজ পাঁচ বছর ভাব-ভালোবাসা করে প্রেমিকার নাড়িনক্ষত্র জেনে তারপর তাকে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ করেছে, তার সাথে মোটেই মিল হয়নি তার। আর হাসান? সে দূর দেশ থেকে এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে, যার গায়ের রং আলাদা, চিন্তাভাবনা আলাদা, এমনকি ভাষাটাও বুঝতে পারা যায় না।

অথচ দুজন মনের মিল থাকাতে কি সুন্দর সুখে ঘরকন্না করে যাচ্ছে। বন্ধুকে হিংসে করতে নেই। কিন্তু সত্যি বলতে কি, যখন হাসান আর হু চেং হাত ধরাধরি করে একে অপরের দিকে "প্রেমনয়নে" তাকিয়ে ছিল, তখন বুকের বাম পাশে একটা চিনচিনে ব্যথা টের পেয়েছিল ফিরোজ। ।


এর পর.....

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.