আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট—এই চারটি সিটি করপোরেশনে ১৫ জুন ভোট হবে। ওই সব শহরের ভোটাররা আগামী পাঁচ বছরের জন্য মেয়র ও কাউন্সিলর বাছাই করবেন। ইতিমধ্যেই প্রচারণা তুঙ্গে রয়েছে। প্রার্থীরা দিন-রাত দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন। নাগরিক সংগঠন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রার্থীদের নিয়ে জবাবদিহিমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে।

এখন সবাই নির্বাচনের পরিবেশ এবং ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন। একাধিক কারণে চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের জন্য তো বটেই। বৃহৎ পরিসরে তাদের প্রথম পরীক্ষা। আগের নির্বাচনগুলো একতরফা ছিল।

যে কারণে কমিশনকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি।
ভিন্ন আঙ্গিকে ও পরিবেশে ২০০৮ সালের ৪ আগস্ট এই চারটি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আরও নয়টি পৌরসভার নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচন ছিল তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এবং তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ। দেশে তখন চলছিল জরুরি অবস্থা। নির্বাচনী আইন, আচরণবিধি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অভূত পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যা এখন পরিবর্তিত নির্বাচনী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।


ওই সময়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রস্তুতকৃত প্রথমবারের মতো ছবিসহ ভোটার তালিকার ব্যবহার। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমগ্র দেশে এই ভোটার তালিকা ব্যবহারের আগে এর গ্রহণযোগ্যতা, কার্যকারিতা এবং গুণগত মান পরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল পরিবর্তিত আইন ও আচরণবিধি প্রয়োগে নির্বাচনী পরিবেশের উন্নতির বাস্তব চিত্র নিরূপণ করা। ওই নির্বাচনের আগে কমিশন একাধিকবার জনসংযোগের মাধ্যমে জনগণকে এসব পরিবর্তনের সঙ্গে পরিচিত করেছিল। প্রথমবারের মতো সব প্রার্থীকে এক মঞ্চে এনে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়, যা সরাসরি বেতার ও টিভিতে প্রচার করা হয়েছিল।

ওই সম্প্রচার দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে প্রার্থীদের কিছুটা জবাবদিহির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
২০০৮ সালের এই চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইন, আচরণবিধি এবং অন্যান্য সংস্কারের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে সফল নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়েছিল। এই নির্বাচনই পথ প্রশস্ত করেছিল পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের।
২০০৮-এর স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনগুলোকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা গিয়েছিল; যদিও দলীয় নেতারাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। নতুন আইন ও আচরণবিধির শক্ত প্রয়োগ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহ জোগায়।

গড়ে ৮৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। পরিবর্তন সূচিত হয় বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কৃতিতে।

দুই
এবারও চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সংসদ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে সরাসরি ভোটযুদ্ধ হবে বড় দুই জোটের সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন সদ্য বিদায়ী চার মেয়র। তাঁরা প্রত্যেকেই সরকারি দলের।

গত ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রতিটি নির্বাচনী শহরে মেয়র পদপ্রার্থীর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। তবে কাউন্সিলর পদে উল্লেখযোগ্য প্রার্থী রয়েছেন। এর কারণ হতে পারে দলের বাইরে কেউই যেতে পারেননি। এ নির্বাচন দলীয় না হলেও একধরনের দলীয় আবরণ আছে, যা আইনের অভিপ্রায়ের সঙ্গে বেমানান।
দলীয় প্রভাবের কারণে দলের সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারী ক্যাডাররা মাঠে রয়েছে।

প্রশাসন অসহায়। সিলেটে দুই মেয়র ও একাধিক কাউন্সিলর পদপ্রার্থী সন্ত্রাসীদের নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা করেছেন বলে পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসন অথবা পুলিশের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর জানা যায়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনও শক্ত হতে পারছে না। একজন প্রার্থী অপর প্রার্থীকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।

কারণ দর্শানোর মধ্যেই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দৌড় শেষ। অথচ এসব পর্যবেক্ষণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত রয়েছেন। এখানেও নির্বাচন কমিশনের অসহায়ত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই বলেই অনেকে মনে করছেন। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেহেতু দলের আধিপত্য খর্ব করা যায়নি, সেহেতু প্রার্থীদের কাছ থেকে সাম্প্রদায়িক উসকানির অভিযোগও উত্থাপিত হচ্ছে।

হেফাজতে ইসলামসহ কিছু ধর্মীয় সংগঠনও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। প্রার্থীদের ‘আস্তিক’ ও ‘নাস্তিক’ হিসেবে চিহ্নিত করাও নির্বাচনী আইনের লঙ্ঘন।

তিন
গত নির্বাচন কমিশনের ধারাবাহিকতায় চার সিটি করপোরেশনে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে। এবারই এই চারজন রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রথমবারের মতো এ দায়িত্ব পেয়েছেন। পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে।

এখানে প্রয়োজন সরাসরি কমিশনের সদস্যদের নজরদারি ও সময়ে সময়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া। তেমনটি হচ্ছে বলে মনে হয় না।
বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে প্রতীয়মান, জেলা প্রশাসন, জেলা হাকিম, পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তার কোনো সমন্বয় নেই। (প্রথম আলো, জুন ৪, ২০০৮ দ্রষ্টব্য)। যেসব ম্যাজিস্ট্রেটের আচরণবিধি পর্যবেক্ষণে রাখা এবং ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের কর্মকাণ্ড রিটার্নিং কর্মকর্তার জানা নেই।

একই সঙ্গে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও এবার তেমন হয়েছে বলে মনে হয় না। রিটার্নিং কর্মকর্তার কোনো মতামত নেই। বরিশালের রিটার্নিং কর্মকর্তার বক্তব্য থেকেই এ বিষয়ের সত্যতা প্রতীয়মান। অথচ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ওই এলাকার সব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা রিটার্নিং কর্মকর্তার সমন্বয়ের মাধ্যমে। এমনটা কোথাও হতে দেখা যায়নি।

এমনটা হলে খুলনায় একজন প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচারণায় যোগদান রিটার্নিং কর্মকর্তার অগোচরে থাকার কথা নয়। এক কথায়, এ সমন্বয় সাধনের দায়দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।
এমন সমন্বয়হীনতার উদাহরণ প্রতিনিয়তই পত্রপত্রিকার পাতায় প্রকাশিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের জন্য এসবই বিড়ম্বনার বিষয়।

চার
সন্দেহ নেই যে নির্বাচন কমিশনের জন্য এবারের এই নির্বাচন এবং এর নিয়ন্ত্রণ বেশ চ্যালেঞ্জের।

প্রথম থেকে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ না করাতে ক্রমেই এই নির্বাচন দলীয় আকার ধারণ করেছে। যুক্ত হচ্ছে আরও নানা দল ও সংগঠন। ধর্মপন্থী দল এবং সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। ক্রমেই রাজনৈতিক ইস্যু, বিশেষ করে জাতীয় ইস্যুগুলো যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে। যদিও এসব নির্বাচনে প্রার্থীর নিজস্ব ভাবমূর্তি, অতীত কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় সমস্যার ওপর ভোটাররা বেশি প্রভাবিত হলেও রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার কারণে জাতীয় ইস্যুও চর্চিত হচ্ছে।


সংক্ষেপে বলতে হয় যে ২০০৮ সালে এ চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন যে পরিবেশে হয়েছিল, তার চেয়ে ভিন্নতর পরিবেশে এই কয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বলতে গেলে দুই জোটের প্রত্যক্ষ প্রভাবে। কাজেই নির্বাচন কমিশনকে, বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ পাঁচজন নির্বাচন কমিশনারের ওপরই দায়িত্ব বর্তায়—কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর নয়। সে কারণেই কমিশনের এই পাঁচজনকে আরও শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। ছোটখাটো বিচ্যুতির পেছনে না গিয়ে বড় ধরনের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তাঁদের ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, যেকোনো নির্বাচনে সবচেয়ে নাজুক সময় হলো ভোট গণনা এবং ফল প্রকাশ।

এখানে বিচ্যুতির অবকাশ রয়েছে। কাজেই নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর এ সময়ে মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে যেমন ধৈর্য, সাহস আর প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে, তেমনি নির্বাচন কমিশনারদের যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে। তাঁদের ধৈর্য, সাহস আর তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার মনমানসিকতা রাখতে হবে। এর কারণ, এখনই জাতীয় রাজনীতিতে দুই বিবদমান দলের মধ্যে যে বিশাল বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, এই নির্বাচনকে উভয় পক্ষই টেস্ট কেস হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। আমার মনে হয়, এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে ঢাকার দুই করপোরেশনের নির্বাচন।


ওপরে কিছু বড় ধরনের বিচ্যুতির কথা বলেছি। এগুলোর দায় শুধু নির্বাচন কমিশনের নয়। আমাদের দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণেও এমনটি হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রী যেভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, তার নজির অতীতে দেখা যায়নি। এমন ঘটনা অন্যত্রও ঘটেছে।

নির্বাচনী আইন সবার সম্মতিক্রমেই তৈরি করা হয়েছিল। কাজেই এর প্রয়োগ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলেও রাজনৈতিক দল ও জনগণের সহযোগিতা ছাড়া প্রতিপালন করা কঠিন।
এ পর্যন্ত অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নির্বাচন কমিশন আগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একটি পরিচ্ছন্ন নির্বাচন উপহার দিতে চেষ্টা করছে। আমরা সবাই এ প্রচেষ্টার সফলতা কামনা করি।
আশা করব, নির্বাচন কমিশন সমতল ক্ষেত্র তৈরিতে প্রয়োজনে আরও শক্ত অবস্থানে থাকবে।


এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com।

সোর্স: http://www.prothom-alo.com

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.