হুজুক কাল ভদ্রে এক বার কি দুই বার আমি মন্দিরে যাই। ভগবানে আমার বিশ্বাস নেই। পরিবারের মানুষদের চাপেই মাঝে মাঝে যেতে হয়। কালিপূজোয়, মাকে নিয়ে শ্বশান বাড়ির কালী মন্দিরে কতবার যাওয়া হয়েছে মনে নেই। আর পূজো শেষে পাঠা বলির মাংস নেয়ার সুযোগও হাত ছাড়া করিনি কখনো।
কেজি খানেক পাঠার মাংস পেলে পরদিন বেশ একটা ভোজন হয়।
বাড়ি থেকে ছয় মাইল দূড়ে শ্বশান বাড়ির কালী মন্দির। রাত ১২ টায় শুরু হবে তান্ডব লীলা। আমার মা মন্দিরের বাইরে বসে আছে। বাইরে ফুরফুরে হাওয়া ।
বিভিন্ন জায়গায় বসে আছে অপদার্থ লাল ভন্ড গেরুয়া ধারি সন্নাসির দল। বাতাসে সিদ্ধির টাটকা গন্ধ। আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে নিঃশ্বাস নিতে। বুঝতে পারছি আমার বেশ হয়েছে। মাথার ভেতরে নানা রকম চিন্তা চেতনা উঁকি দিচ্ছে।
পাঠা বলির ওখান থেকে ভেসে আসছে অসহায় পাঠাগুলোর ডাক, উলু ধ্বনি আর কাঁসা ঘন্টার ঢেং ঢেং শব্দ। হাজার হাজার মানুষ গুলো যেন দেবীর মন্ডপে মাথা ঠুকছে। তাদের মনের সব বাসনা পূর্ন করতে দেবী আজ নেমে আসবেন স্বর্গ থেকে মর্ত্যের উৎসবে। পুরোহিত মহাশয় মহা ব্যাস্ত দেবী আসলে কোথায় বসতে দেবেন তাঁকে। দেবীর আসন সাজানো হচ্ছে।
শব্দের তাল লয় ধীরে ধীরে বাড়ছে। এক দল ঢাঁকির ঢাঁকের আওয়াজে বাতাসও বুঝি পালাতে চাইছে। পুরুষরা দেবীকে কাঁধে করে নিয়ে আসছে আর মহিলারা জোঁকার দিতে দিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। দেবী আসন গ্রহন করবেন। বিভিন্ন রকমের বাদ্য, উলূ ধ্বনি আর মানুষের চিৎকারে দেবীর কোন মাথা ব্যাথা নেই।
মাথা ব্যাথা হচ্ছে আমার, আমি যেন আর ভাবতে পারছিনা। দেবী আসন গ্রহন করলেন।
আমার নিথর দেহ এখন মাটির দেবীর মতই। আমি যেন আর নড়তে পাচ্ছিনা। মাথাটা ভারি লাগছে, মনে হচ্ছে ওই দেবীর মত আমিও মাথায় ভারি মূকুট পরে আছি।
পিপাসায় গলা শুকিয়ে আছে আমি বলতে পারছি না। কানে পাঁঠাগুলোর শেষ আর্ত চিৎকার শুনতে পাচ্ছি, যাদের ধর থেকে মাথা এক কোপে নেমে যাচ্ছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, একদল লোভি মানুষের চোখ দাঁড়িয়ে মজা দেখছে, কেউ কেউ মাথা ঠুকছে, মাথার শিঁথি রক্ত দিয়ে লেপছে সদ্য বিবাহিত নারী। শংখ, কাশি, উলু ধ্বনি আমার কল্পনার দৃস্টি কে আর ভেতরে যেতে দিচ্ছেনা। আমি দেবীর ভেতরে যেতে চাইছি কিন্তু পারছিনা।
কি আছে ওই মাটির মুর্তিতে। সবাই যাকে এত বিশ্বাসে মাথা নত করে পূঁজো করছে।
আমার মা ভিষণ ধার্মিক। সারাজীবন সংসার আর ধর্ম কর্ম করে জীবনটা পার করেছে। প্রত্যেক পুঁজা পার্বনে ওই দেব দেবীদের জন্য উপোস থেকে থেকে দেহের শির্ন জির্ন অবস্থা।
মা আমার এক দৃস্টিতে তাকিয়ে আছেন ওই দেবীর দিকে। তার কপালের পাশের রগটা ফুলে ফুলে উঠছে। ওই দেব দেবীদের কথাই ভাবতে ভাবতেই মা আমার আজ স্রীজফ্রেনিয়ার রোগী।
অমাবস্যা রাতে মা কালীর পুজো শুরু হয়ে গেছে। পুরোহিত সামনে সব সাজিয়ে নিয়ে বসেছেন আর জুনিয়ররা তাকে এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছেন।
একটু পরেই অপারেশণ শুরু হল। দেবীর সামনে রাসি রাসি প্রসাদের স্তূপ। একজন বসে প্রসাদের টোকেন কাটছে। দেবীর করুণা লাভের আশায় হাজার মানুস বসে আছে। দেবী আসনে বসে মজা দেখছেন।
তার মাটির নিথর দেহকে এখানে হাজার মায়েরা মাতৃরূপী ভেবে অসহায়। পরিত্রাণ পাবার আশা, সংসারের সকলের মঙ্গল কামনা, মেয়ের জন্য ভাল বর, ছেলের একটা ভাল চাকরী, রোগের হাত থেকে পরিত্রাণ, সংসারের আয় উন্নতি। সবার চাহিদা আজ দেবী পূরণ করবেন। পূজারী মগ্ন হয়ে মন্ত্র পরছেন। সবাই মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে পুজা দেখছেন।
কেউ কেউ সাথে তাদের ছেলে মেয়ে নিয়ে বসে আছেন। ভয়ে তারা কেউ কিছু বলতে পারছে না আবার কেউ ভয়ে চিৎকার করে কান্না করছে। তাদের মায়েরা ভয় দেখাচ্ছে, কান্না থামানোর চেষ্টা করছে।
আগরবাতি আর ধুপের গন্ধে বাতাস বেশ ভারি। শ্বশান ঘাটে লাশটার আগুন নিভে যাচ্ছে।
পাশের আরেকটি লাশের মাথা টাস টাস শব্দে ফেটে গেল এইমাত্র। দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ গুলোর চোখের জল শুকিয়ে গেছে। ভেতরে তীব্র ভয়। এভাবেই মানুষ চলে যায়, এভাবেই শরীর পুড়ে পুড়ে ছাই হয়। শুধু থেকে যায় নাভির কিছু অংশ।
আমাদের যৌবনের হেডোম ওই ডোম বেটার লাঠির শত আঘাতেও নিশ্চুপ নিথর।
বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ, আগরবাতি আর ধুপের গন্ধের সাথে মিলে মিশে উৎসব চলছে। কাঠের পর কাঠ দিয়ে শব দেহের মাচা তৈরি হয়েছে। আমি চিৎকার করতে পারছিনা, আমি আমার মায়ের হাত ধরতে পারছিনা, আমি লাশ হয়ে পড়ে আছি। আমার দেহটা আরেকটু পরেই পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
পৃথিবী থেকে একটু পরেই ইতি ঘটবে এই আমিত্বের, আমার মর্ত্যে দেখা শেষ উৎসবের।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।