আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

দক্ষিণ চীন সাগর ও তেলক্ষেত্র বিরোধ !

খুব জানতে ইচ্ছে করে...তুমি কি সেই আগের মতনই আছো নাকি অনেকখানি বদলে গেছো... সম্প্রতি চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এ উত্তেজনার পিছনের কারণটি অবশ্য তেল সম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে। দুটি দেশই দক্ষিণ চীন সাগরের তেলসমৃদ্ধ স্হানগুলো নিজেদের করায়াত্বে নেয়ার কারসাজিতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। ফলশ্রুতিতে এ অঞ্চলজুড়ে সামরিক শক্তির উত্তরোত্তর বৃদ্ধি ঘটছে। মাত্র সপ্তাহ কয়েক আগে চীন ও ফিলিপাইনের বিরোধ চরম আকার ধারণ করলেও নিস্পত্তিতে চীনকেই উদ্যোগি হতে হয়েছে।

এ দুটি দেশের উত্তেজনার পিছনের কারণটাও ছিল scarborough shoal এর মালিকানা । মালিকানা পেতেইscarborough shoal এ ফিলিপাইন ও চীনের জাহাজ নোঙ্গর ফেলেছিল। যা বিশ্ববাসির মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠার সৃষ্টি করে। এই বিরোধে আমেরিকা ছুচ হয়ে ডুকতে চেয়েছিল। পরে অবশ্য চীনের উদ্যোগী মনোভাব scarborough shoal থেকে দুদেশকেই সরে যেতে সাহায্য করে।

চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্হা বিরাজমান বিরোধকে শেষ পর্যন্ত জিইয়ে রাখেনি বা সামনে বাড়তে দেয়নি। ফিলিপাইন ও চীন অবশ্য কৌশলী মনোভাবে জাহাজ সরিয়ে নেয়ার পিছনে খারাপ আবহাওয়াকে দায়ী করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে ফিলিপাইন সমস্যা সমাধানে চীন আঞ্চলিক নীতি বাস্তবায়নকেই প্রাধান্য দিয়েছে। যা থেকে আমেরিকাকে একটা ম্যাসেজ পৌছে দিয়েছে চীন আর তা হলো ভবিষ্যত বিশ্ব শাসনের চিন্তাতেই চীনের অগ্রসরতা। কেননা চীনকে যদি পৃথিবীর শীর্ষে পৌছাতে হয় তাহলে উদিয়মান শক্তি হিসেবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকে নিজেদের আধিপত্যের করিডোরে বন্দি করতেই হবে।

কারণটা যে স্পষ্ট, যদি চীনের ভুলের কারণে আমেরিকা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের পথ পরিক্রমা শুরু করে তবে তা চীনের জন্য সুখকর হবেনা। যার পরিণতি হবে মারাতœক। যা এ অঞ্চলে আবার কলোনিজম নামের দখল দারিত্বের ব্যবসা শুরু করতে সাহায্য করবে। গেল মাসের অর্থাৎ জুনের ২১ তারিখ মেরিটাইম ‘ল বা সমুদ্রসীমা বিল ভিয়েতনামের পার্লামেন্টে পাস হয়। এবং ভিয়েতনাম পার্লামেন্টে spratl ও paracel দ্বীপ দুটিতে মালিকানা দাবির পিছনে এক লম্বা ফিরিস্তি উপস্হাপন করে।

আর এতে চীন বেশ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। চীন মনে করে এতে করে তাদের সভারিজিনিটি বা সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। ঝামেলার সূত্রপাত মুলত সিএনওওসি চায়নীজ স্টেট বা রাষ্ট্রিয় তেল কোম্পানী দক্ষিণ চীন সাগরে ৯ টি ব্লকে তেল সম্পদ অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণ করা নিয়ে। ব্লকগুলোর অবস্হান ভিয়েতনাম উপকুল থেকে মাত্র ৩৭ নটিকেল মাইল বা ৬৮ কিমি দুরে । পেট্রোভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম স্টেট তেল কোম্পানী চাইনীজ কোম্পানীর অযাচিত হস্তক্ষেপকে রাজনৈতিক শক্তির মহড়া হিসেবে দেখছে।

কারণ পেট্রোভিয়েতনাম মনে করে সম্প্রতি ভিয়েতনাম সরকার যে মেরিটাইম ল‘ সংসদে অনুমোদন করিয়েছে তারই জের হিসেবে চায়না ভিয়েতনামের উপকুলে নিজেদের তেল কোম্পানী দিয়ে তেল সম্পদ অনুসন্ধানের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চাচ্ছে। উভয় দেশের শক্ত অবস্হানের কারণে দক্ষিণ চীন সাগরে অস্হিতিশীল এক অবস্হার সৃষ্টি হয়েছে। যা চাইনীজ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ২৮শে জুনের ঘোষনায় আরো স্পষ্ট হয়। চাইনীজ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভিয়েতনামকে সতর্ক করে দেয় যে ‘চাইনীজ প্রতিরক্ষা ব্যুহ দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রন নিতে সব সময়ই সবরকমের প্রস্তুতি রাখে । ভিয়েতনাম যদি পার্লামেন্টের আইনকে তোয়াক্কা করে ঝঢ়ৎধঃষু এ ঢোকার চেষ্টা করে তবে চীন তা শক্তহাতেই প্রতিরোধ করবে।

ইতিপূর্বে ভিয়েতনাম সরকারও তাদের অনঢ় অবস্হান স্পষ্ট করে ঘোষণা দেয় ভিয়েতনাম আকাশ বাহিনী spratl দ্বীপে তাদের পূর্ব নির্ধারিত রুটিন ওয়ার্ক চালিয়ে যাবে। ঝঢ়ৎধঃষু দ্বীপ নিয়ে ১৯৮৮ সালেও চীন ও ভিয়েতনামকে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তখনকার বিরোধে প্রায় ৭৮ জন ভিয়েতনাম সৈনিকের মৃত্যু হয়। রাজনৈতিকভাবেই ভিয়েতনাম সোভিয়েত অ্যালাইয়ের বা জোটভুক্ত দেশ। ইদানিং বিশ্বরাজনীতির এই টার্নিং মহুর্তে চীন কেন্দ্রিক বলয় গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় আমেরিকা বিভিন্নভাবেই এ অঞ্চলকে অশান্ত করার ইন্ধন যুগাচ্ছে।

জুলাই আগস্টের মাঝামাঝি কোন এক সময় কম্বোডিয়ার রাজধানিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বসার কথা রয়েছে। যেখানে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনের উপস্হিতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে । হয়তো এ সম্মেলনে সাম্প্রতিক অসন্তোষ ভালোভাবেই উঠে আসবে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ গেল দুই বছর আগেই স্পষ্ট হয়। বিশেষ করে ২০১০ সালে চায়নার তেল সম্পদ অনুসন্ধান নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় আমেরিকা এ অঞ্চলে তাদের আগ্রহের কথা পরিস্কার করে।

সেবার চীন ছেড়ে দিলেও এবার যে একই ঘটনার পুণরাবৃত্তি হবেনা তা অবশ্য চীনের কৌশলী মনোভাব থেকেই বুঝা যায়। কারণ চীন এবার আঞ্চলিক সমর্থন কিভাবে বৃদ্ধি করা যায় সেই নিয়েই বেশি চিন্তিত। সম্প্রতি ভিয়েতনামের হানোই ও হো চি মিন শহরে spratl দ্বীপে চায়নার আধিপত্য কায়েমের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। যদিও চীনের ন্যায় ভিয়েতনামেও পাবলিক সমাবেশ নিষিদ্ধ। এবং দেশ দুটি এ ধরনের সমাবেশ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে।

কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে শহর দুটিতে ঘটে যাওয়া জনসমাবেশ বা বিক্ষোভ নিয়ে ভিয়েতনাম সরকার কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেনি। যা থেকে বুঝা যায় এ বিক্ষোভের পিছনে সরকারের পরোক্ষ মদদ রয়েছে। চায়নার গ্লোবাল টাইম ৪ জুলাই ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন সমস্যা নিয়ে তাদের এডিটরিয়ালে লিখেছে বিদ্যমান সমস্যা নিয়ে চায়নাকে বুঝে শুনেই এগোতে হবে। কারণ ডিসপিউট অঞ্চল দিয়েই হয়তো আমেরিকার স্পাই বা গোয়েন্দা বিমান প্রবেশের পথ সুগম করে দিতে পারে। তবে দেশ দুটি ইতোমধ্যেই যা করেছে তাতে তাদের জন্য শাস্তিমুলক ব্যবস্হা নেয়া অনীবার্য হয়ে দাড়িয়েছে।

তারপরও চীনকে ঠান্ডা মাথায় ধীরে চলার পথ অনুসরন করতে হবে। তবে সম্পাদকীয়তে সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে ও এ মর্মে সতর্কও করা হয়েছে যদি দেশ দুটি একস্ট্রিম লিমিট বা মাত্রা অতিক্রম করে তাহলে বিদ্যমান সমস্যায় চায়নাকে সামরিক হস্তক্ষেপ নিতে পিছ পা হলে চলবেনা। এবং তা খুব দ্রুতই নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে চায়নার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রাখা উচিত বলেও পত্রিকাটি মত দেয়। মুলত ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সহিত বিরোধের মুল নিয়ামক তেলভান্ডার দখলে নেয়া।

যা পেট্রোডলারের রাজনীতিরই বহি:প্রকাশ। কারণ ট্রান্সবাউন্ডারি বা সীমান্তবর্তী দক্ষিণ চীন সাগরের দ্বীপাঞ্চল নিয়ে বহু আগ থেকেই ধারণাগত মতবিরোধ রয়েছে। আর এই মতবিরোধকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে আমেরিকা। আমেরিকা যে করেই হোক এ অঞ্চলে অস্হিরতা সৃষ্টি করতে চায় তাদের ঘাটি বানানোর পথ সুগম করার জন্য । একবার যদি আমেরিকার রণতরী দক্ষিণ চীন সাগরে নোঙ্গর ফেলতে পারে তবেই চীনকে কোন্ঠাসায় রাখার মোক্ষম হাতিয়ার পেয়ে যাবে।

তবে সম্প্রতি চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি আমেরিকাকে ভাবিয়ে তুলছে। কারণ চীনের সামরিক শক্তিতে একে একে যোগ হচ্ছে নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল। সামনে শীত মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই চায়না সামরিক ও সিভিল ব্যবস্হায় আমুল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে সুস্পষ্ট ইঙ্গিতও দিয়েছে গ্লোবাল টাইমস। দক্ষিণ চীন সাগরে চলমান উদ্বেগ সমাধানের মধ্যেই রয়েছে চায়নার আঞ্চলিক সহযোগীতা বৃদ্ধির মানসিকতা। এখন দেখার পালা চায়না উ™ভুত পরিস্হিতি কিভাবে সামাল দেয়।

সে পর্যন্ত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে বিশ্বজুড়েই রাজনীতি বিশ্লেষকদের গভীর মনোযোগ থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। হাসান কামরুল: ভূতত্ত্ববিদ ও কলামিস্ট। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.