বাক স্বাধীনতা মানে সত্য বলার অধিকার। প্রায় সাড়ে তিন যুগ চলে গেছে মুক্তিযুদ্ধের পর। কিন্তু তাদের কখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে মনে করা হয়নি, স্বীকৃতি দেয়া হয়নি এতদিন পর তাদের দিকে ফিরে তাকাল বাংলাদেশ? তারা, আমাদের সেই যুদ্ধবন্ধু বিদেশিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দুর্দিনে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, নীতিনির্ধারণী মহলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, নিজেদের দেশে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তারাও মুক্তির আস্বাদ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের বিজয়ের মধ্যে। অথচ কখনো তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ মনে করেনি! তাহলে এতদিনের ওই বাংলাদেশকে কোন বাংলাদেশ মনে করব আমরা?
সে বাংলাদেশও আমাদেরই বটে- কিন্তু এই যে এতদিন ধরে অপেক্ষা করতে হলো তাকে যুদ্ধবন্ধুদের একসঙ্গে ডেকে পাঠানোর জন্য, তা থেকেই বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি- আমাদের শত্রুরা আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক দিক থেকে পরাজিত হয়েছে, ভৌগোলিকভাবে পরাজিত হয়েছে- কিন্তু নানাভাবে রয়ে গেছে তারা আমাদের সংস্কৃতিতে, নানাভাবে বার বার ফিরে আসছে তারা রাষ্ট্রক্ষমতায়।
এসব অপশক্তির দাপট এড়িয়ে এতদিন পর যুদ্ধবন্ধুদের সম্মাননা দেয়ার এ আয়োজনকে বরং কলঙ্কমোচন বলাই ভালো। কিন্তু বিষয়টিকে কি ঠিক এভাবেই দেখা হচ্ছে? মনে হয় না। কোনো কোনো পত্রিকার শিরোনামে আতিশয্য এত বেশি যে, চোখ বুলাতে লজ্জা লাগে। ‘কালের কণ্ঠ’ তাদের সংবাদ শিরোনামে লিখেছে ‘শোধ হলো হৃদয়ের দায়’, দৈনিক আমাদের সময় লিখেছে, ‘ঋণশোধ করল জাতি’। কিন্তু ঋণশোধ করা, হৃদয়ের দায় মেটানো কি এতই সহজ?
কোনো কোনো ঋণ সারা জীবনেও শোধ করা যায় না, কোনো কোনো দায় আজীবনই বহন করতে হয়।
যুদ্ধবন্ধুদের কাছে বাংলাদেশের, আমাদের ঋণ কখনো শোধ হবে না।
যুদ্ধবন্ধু বিদেশিদের স্বীকৃতি, অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করেছে, স্বাধীন বাংলাদেশকে এগিয়ে চলতে সাহায্য করেছে। কিন্তু তাদের পাশাপাশি এমন কেউ কেউও ছিলেন, এমনকি এখনো আছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের পথে যেমন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিলেন, ঠিক তেমনি প্রতিবন্ধক রচনা করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশেও। মিথ্যাবাদী রাখাল হয়ে তারা বাংলাদেশের জন্য নানা ফাঁদ পেতেছেন- যেমন পেতেছিলেন ওরিয়ানা ফালাচি।
মুক্তিযুদ্ধের পর শুধু ওরিয়ানা ফালাচিই নন, বিশ্বের অনেক বিখ্যাত সাংবাদিকই শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সাক্ষাৎ পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকারের কথা উঠলেই কেউ কেউ আগবাড়িয়ে স্মরণ করেন ওরিয়ানা ফালাচিকে। অথচ ওরিয়ানা ফালাচি কৃতিত্বের সঙ্গে সুকৌশলে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ‘খুনি’ হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালিয়েছিলেন, সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি রাষ্ট্রের স্থপতিকে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। ওরিয়ানা ফালাচি জুলফিকার আলি ভুট্টোর সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন। ভুট্টো ফালাচিকে অভ্যর্থনা জানাতে জানাতে বলেছিলেন, ‘ইউ আর দ্য অনলি জার্নালিস্ট হু রোট দ্য ট্রুথ অ্যাবাউট মুজিবুর রহমান’। এ থেকেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ফালাচির ভ‚মিকা।
অবশ্য এমনই হওয়ারই কথা। মুজিব তো আর ভুট্টোর মতো কোনো অভিজাত সামন্ততান্ত্রিক পরিবারের ছেলে ছিলেন না যে, সন্ধ্যালোকে পানাহার করতে করতে ফালাচিকে সাক্ষাৎকার দেবেন। হাসান ফেরদৌস তার কলামে কিছুদিন আগে এক দৈনিকে আক্ষেপ করেছেন যে, ওরিয়ানা ফালাচির ‘নোংরা, কুৎসিত’ মিথ্যাচার নিয়ে কোথাও নাকি প্রতিবাদ হয়নি। আবার এক পর্যায়ে এ-ও লিখেছেন, ‘আমার ইতিহাসের এক হারানো অধ্যায় তিনি ফিরিয়ে দিলেন, ধন্যবাদ এ কারণেই। ’ তার ইতিহাসের সেই হারানো অধ্যায়টি অবশ্য তত স্পষ্ট নয়- কেননা মুজিব পরিবারের কিছু ছবির প্রসঙ্গ তিনি তুললেও সেসবের সঙ্গে তার ইতিহাসের যোগসূত্র কোথায়, তা ততটা স্পষ্ট নয়।
তা ছাড়া মুজিব পরিবারের এ রকম অনেক ছবিই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন স্থানে এবং এ জন্য ওরিয়ানা ফালাচির কাছে কৃতজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। আর তিনি যদি লিখতেন, ওরিয়ানা ফালাচির এ প্রতিবেদনের কোনো প্রতিবাদ তার চোখে পড়েনি, তাহলে সেটি বরং অনেক বিশ্বস্ত ভাষ্য হতো। কারণ ফালাচির ওই প্রতিবেদন নিয়ে বিশেষত অনলাইন ব্লগে একাধিক ব্যক্তিই সমালোচনা লিখেছেন। আমাকেও কোনো এক সময় এ সাক্ষাৎকার নিয়ে মন্তব্য করতে হয়েছিল।
ওরিয়ানা ফালাচি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের যোদ্ধা ছিলেন।
যুদ্ধের নৃশংসতা ও তার অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তার ভালো করেই জানা আছে। অথচ তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী অবস্থা নিয়ে নোংরা উন্নাসিকতা দেখিয়েছেন। রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিযোদ্ধারা কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কয়েকজনের প্রকাশ্য বিচার করেছিল- তিনি তা সহজে মেনে নিতে পারেননি। তার সেই ক্ষোভের আগুনে তিনি পোড়াতে চেয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমানকেও। অথচ ওরিয়ানা ফালাচি নিজে মুসোলিনীর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই যুদ্ধের পর তার রাষ্ট্র ইতালিতে কী হয়েছিল, তিনি তখন তা ভুলে বসেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী প্রকাশ্য বিচার নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিকৃত বিবরণ দিতে গিয়ে ফালাচির একবারও মনে হয়নি, তার নিজের দেশ ইতালিতে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনীকে প্রকাশ্যে হত্যা করে তিন দিন খোলা স্থানে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল এবং তারপর সেই লাশকে চিরদিনের জন্য গায়েব করে ফেলা হয়েছে। মুসোলিনীকে কবর দেয়া হয়েছে কি না কেউ জানে না। মুসোলিনীর লাশ পোড়ানো হয়েছে কি না কেউ জানে না। মুসোলিনীর লাশ কোথাও পচতে পচতে কীটপতঙ্গের খাদ্য হয়েছে কি না কেউ জানে না। ১৯৪৩ সালে মুসোলিনী বন্দি হয়েছিল এবং মিলানের প্রাণকেন্দ্রে ১৫ জন সাঙ্গোপাঙ্গোসহ মুসোলিনীর লাশ উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখার খবরে কি ফালাচির একই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, যেমন হয়েছিল রেসকোর্স ময়দানের ঘটনায়? শুধু এই ১৫ জনকেই নয়, অসংখ্য মুসোলিনী সমর্থককে তখন ইতালিতে ধাওয়া করে মারা হয়েছে, রেসকোর্স ময়দানের মতো প্রকাশ্যে বিচারের জন্যও ফালাচির যুদ্ধবন্ধুদের কেউ অপেক্ষা করেনি।
যুদ্ধফেরতা ফালাচি কি কখনও তাদের আদালতে নিয়ে বিচারের দাবি করেছিলেন? আমার জানা মতে, কখনো করেননি। তাদের ওইভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে তিনি কি তার সারা জীবনে একটি বাক্যও লিখেছেন? আমার জানা মতে, কখনো লেখেননি।
সেখানে আমরা, বাংলাদেশের মানুষরা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে যথেষ্ট আইনসঙ্গত ব্যবহার করেছি- প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ রকম যুদ্ধাপরাধীদের প্রথম দফাতেই কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে তারা গণরোষের শিকার না হয়। কোনো যুদ্ধাপরাধীকে
আমরা হত্যা করে মুসোলিনীদের মতো ঝুলিয়ে রাখিনি, লাশ চিরদিনের জন্য গায়েব করে দিইনি, কোনো যুদ্ধাপরাধীকে এখানে হিটলারের মতো আত্মহত্যাও করতে হয়নি। ফ্রান্সে ১০ হাজার যুদ্ধাপরাধী ও দালালকে কোনো রকম বিচার ছাড়াই হত্যার পর চার্লস দ্য গল আইন করে ওইসব হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিয়েছিলেন।
তারপর অবশিষ্ট যুদ্ধাপরাধী দালালদের বিচার করার জন্য ১৯৪৪ সালে নতুন করে অধ্যাদেশ
জারি করেছিলেন। আর বাংলাদেশে?
যুদ্ধাপরাধীদের আইনসঙ্গতভাবে বিচার করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল বাংলাদেশে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মাত্র এক বছর পরেই। আইন করা হয়েছিল বটে, কিন্তু জিয়াউর রহমান এ রকম একটি আইন বাতিল করেছেন, আর তার উত্তরসূরি স্ত্রী এখন আরেকটি আইনকে কার্যত অকার্যকর করে ফেলার জন্য রোডমার্চ করে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি করেছেন এবং এসব যুদ্ধাপরাধীর আইনজীবীদের একজন আবদুর রাজ্জাক এখন বলছেন, ট্রাইব্যুনালের আইন দিয়ে নাকি কারো বিচার করা সম্ভব নয়!
দুর্জনেরা বিএনপিকে এখন তামাশা করে বলেন, ‘বৃহত্তর জামায়াতে ইসলামীর বিএনপি শাখা!’ এই তামাশায় হয়তো অতিশয়োক্তি আছে, কিন্তু বিএনপি ক্রমশ যে পথে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে ওই অতিশয়োক্তি নিয়ে মানুষের সংশয়ও দিনে দিনে কমছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবন্ধু বিদেশিদের সম্মাননা প্রদানের ঘটনার কথাই ধরা যাক। সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব থাকতে পারে।
কিন্তু তার মানে কি এই যে, বিএনপি যুদ্ধবন্ধুদের উপেক্ষা করবে? বিএনপির
বিভিন্ন নেতার কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট, যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব একটি সংজ্ঞা আছে- যে কারণে তারা অহরহ বলে থাকেন, ‘আমরাও বিচার চাই, তবে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে’, যে কারণে তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া সারাদেশে চরকির মতো ঘুরে ঘুরে রোডমার্চ করেছেন এবং গোলাম আযমদের মুক্তি দাবি করেছেন, কেননা তাদের সংজ্ঞানুযায়ী, এরা হয়তো যুদ্ধাপরাধী নন। তাহলে যুদ্ধবন্ধুদের ব্যাপারেও কি তাদের নিজস্ব কোনো সংজ্ঞা আছে? সরকারি উদ্যোগে যাদের স্বীকৃতি জানানো হলো, তারা তাহলে সেই সংজ্ঞার মধ্যে পড়েন না?
মুক্তিযুদ্ধ যে সত্যিই আমাদের আপ্লুত করে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সত্যিই যে আমাদের কোনো আত্মিক সম্পর্ক আছে, তার কিছু প্রকাশভঙ্গি আছে। যতদূর বুঝি, যুদ্ধবন্ধুদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সেই প্রকাশভঙ্গির মধ্যে পড়ে। বিএনপি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সরকারি অনুষ্ঠান বর্জন করতেই পারে। কিন্তু তারা তো সংবাদপত্রে কিংবা দূতাবাসে বিবৃতি প্রচারের মাধ্যমেও ৪০ বছর পর সম্মাননা নিতে আসা আমাদের এই যুদ্ধবন্ধুদের অভিনন্দন জানাতে পারতেন, তাদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাতে পারতেন।
নাকি তারা বলবেন, আমাদের এই যুদ্ধবন্ধুরাও প্রকৃত বন্ধু নন, তাদের ভাড়া করে আনা হয়েছে? বলবেন, ওরা সংবর্ধনা নিতে এসে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে, ওরা আসলে আওয়ামী লীগের দালাল? সম্মাননা নেয়ার পর ভারতের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেআরএফ জ্যাকব প্রাণের আবেগে ‘জয়বাংলা’ বলেছেন, তার মানে কি ভারত আমাদের করদরাজ্য হয়ে গেছে? যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের সাবেক সদস্য মাইকেল বার্নও ‘জয়বাংলা’ বলেছেন, তার মানে কি যুক্তরাজ্য আমাদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে? ১৯৭২-এ শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট আবেগে সাক্ষাৎকারের মধ্যে ‘জয়বাংলা’ বলে উঠেছিলেন। তার মানে কি তিনি বাংলাদেশের চর ছিলেন? ১৯৭১-এ ‘জয়বাংলা’ এ দেশের সাধারণ মানুষের স্লোগান ছিল। সে স্লোগান যদি এখন কেবল আওয়ামী লীগের স্লোগানে পরিণত হয়ে থাকে, তার দায় সাধারণ মানুষের নয়- সে দায় রাজনৈতিক দলগুলোর (এবং বিএনপিও সে দায়ের বাইরে নয়), যারা ‘জয়বাংলা’ ¯স্লোগান বর্জনের মধ্য দিয়ে তা আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগানে পরিণত করেছে এবং এভাবে মূলত সাধারণ মানুষের আবেগকেই বর্জন করেছে।
বিএনপি ‘প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী’র আইনি নয়, ইতিহাসভিত্তিক নয়, বরং নিজস্ব রাজনৈতিক একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছে। যারা এবং যেসব বুদ্ধিজীবী ওই সংজ্ঞার প্রতি সহানুভূতিশীল, তারা সবাই ওরিয়ানা ফালাচির বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, এসব প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা এমনকি বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ছে, দিন যত যাবে আরও কঠিন হয়ে পড়বে। যেমন, মির্জা ফখরুল ইসলাম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, এটা ধ্রুবতারার মতো সত্য’ (প্রথম আলো, ১১ চৈত্র ১৪১৮)? কিন্তু তিনি এ কথা বলার ঠিক পরদিনই দৈনিক সমকাল একটি এক্সক্লুসিভ সংবাদে জানিয়েছে, ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার খবরটি মেজর জিয়াকে দিয়েছিলেন তার সহযোগী অলি আহমদ’ (সমকাল, ১১ চৈত্র ১৪১৮)। দৈনিক সমকালের এ সংবাদের উৎস সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অলি আহমদের বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন। ১৯৭৪ সালের আগস্টে অলি আহমদের এসিআর-এ তার ব্রিগেড কমান্ডার মীর শওকত আলী মন্তব্য করেছিলেন, ‘তিনি (অলি) প্রথম সামরিক কর্মকর্তা যিনি স্বাধীনতার ঘোষণার কথা জিয়াউর রহমানের কাছে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ’ এমনকি এই এসিআর-এ সামরিক বাহিনীর উপ-প্রধান সেনাপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানেরও স্বাক্ষর রয়েছে।
অলি আহমদও এখন চেষ্টা করছেন ‘ঘরে ফেরার। ’ ঘরে ফেরার জন্য তাকে বলতে হচ্ছে, ‘মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার তথ্যটি ঠিক নয়। ’ বলতে হচ্ছে, ‘মুক্তিযুদ্ধে যারা সরাসরি অংশগ্রহণ করে মারা গেছে, তারাই প্রকৃত শহীদ। ’
নিশ্চয়ই অলি আহমদের এসব কথার উত্তর দেয়া যায়। কিন্তু তার কি প্রয়োজন আছে? যিনি নিজে এক সময় স্বাধীনতা ঘোষণার খবর জিয়ার কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তিনি যখন বর্তমানে অহরহ বলে বেড়ান, ‘জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক’, বলেন, ‘৩০ লাখ শহীদ হওয়ার তথ্যটি ঠিক নয়’ তখন আমাদের এ-ও জানা হয়ে যায়, সে সত্য তারা মানবে না।
অলি আহমদ দাবি করতে পারেন, তার ওই এসিআর মিথ্যা, মীর শওকত আলী মিথ্যা এসিআর দিয়েছেন। কিন্তু শুধু মীর শওকত আলী তো নন, তাহলে ওই মিথ্যা এসিআর-এর জন্য দায়ী করতে হবে তখনকার উপ-প্রধান সেনাপতি জিয়াউর রহমানকেও। এবং এ প্রশ্নও উঠবে, কোন ‘মহৎ’ উদ্দেশ্যে তারা এসিআর-এ ‘মিথ্যা’কে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালে?
এর মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, আগামী দিনগুলোতে বিএনপি আন্দোলনমুখর হবে। সংসদীয় আসন, মাসিক বেতন ও সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলো রক্ষার জন্য কয়েকদিনের জন্য জাতীয় সংসদের অধিবেশনে গেলেও ইতিমধ্যেই তারা অধিবেশন বর্জন করতে শুরু করেছে। স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথে বাধা দেয়া হয়েছে খালেদা জিয়াকে, পরদিন আবার বাতিল করা হয়েছে রূপসী বাংলা হোটেলে একটি প্রকাশনা উৎসবের বুকিং, যেখানে যাওয়ার কথা ছিল তার।
এ রকম ঘটনা না ঘটলেও অবশ্য বিএনপি সংসদ বর্জনের উপলক্ষ খুঁজে নিতে পারত। কারণ সংসদে যাওয়ার উদ্দেশ্যই যেখানে সেখান থেকে আবার বেরিয়ে আসা, সে ক্ষেত্রে উপলক্ষ খুঁজে পাওয়া তো তেমন কঠিন নয়। সরকার তার বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ক্রমশ রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে- কিন্তু বিরোধী দল বিএনপিকে এটি হিসেবে নিতে হবে, আওয়ামী লীগ এ দেশের তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিল যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে। বিএনপি যুদ্ধাপরাধী বিচারের প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে, ‘প্রকৃত যুদ্ধাপরাধী বিচারের’ হাস্যকর অপপ্রচার চালিয়ে এমনকি আগামী নির্বাচনেও তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবে না। একদিকে সংসদে যোগ দেয়ার এবং পুনরায় বর্জন করার মিথ্যা অজুহাত তৈরি করে, অন্যদিকে যুদ্ধবন্ধুদের সম্মাননা প্রদানের আয়োজনকে উপেক্ষা করে বিএনপি পরিণত হয়েছে সেই ‘মিথ্যাবাদী রাখালে’, যার ওপর বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়লেও কেউ তার দিকে সাড়া দিতে এগিয়ে আসবে না।
সুত্রঃ সাপ্তাহিক ২০০০ ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।