জ্ঞানের সাগরের এক ফোঁটা জল এখনো গ্রহণ করতে পারিনি। তবুও নিজেকে সবজান্তা বলি। সকলকে কিছু জানাতে পারার জন্যই লিখে থাকি।
ফেসবুক: সম্ভাবনা ও শঙ্কা
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ডরমেটরির এক অংশে বসে ২০০৪ সালে মার্ক জাকারবার্গ একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন। তিনি ওই ওয়েবসাইটটির নাম দিয়েছিলেন ‘ফেসবুক’।
সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক আট বছর পূর্ণ করল শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১২-তে। শুধু কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা এই সাইটটি ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে সাড়ে ৮৪ কোটি জন। বিশ্বে ৭০টিরও বেশি ভাষায় ফেসবুক ব্যবহার করা হয়। গুগলের পরই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা ওয়েবসাইট হচ্ছে ফেসবুক। চলতি বছরের আগস্টে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
শেয়ারবাজারে আইপিও ছেড়ে সিলিকন ভ্যালির অন্যতম পাবলিক কোম্পানি হিসেবে নাম লেখাতে চলেছে ফেসবুক। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ৪০ হাজার কোটির টাকার আইপিও আবেদন করেছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ফেসবুকের মূল্য ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে এমনটাই ধারণা করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। এ আবেদনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে পাবলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু হলো ফেসবুকের। আইপিও ছাড়ার পর পৃথিবীর সেরা ১০টি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক পাবলিক কোম্পানির একটিতে পরিণত হচ্ছে বলেই বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন।
মার্ক জাকারবার্গকেও পরবর্তী সময়ের বিল গেটস এবং স্টিভ জবস ভাবছেন তাঁরা।
মাত্র আট বছরে বিশাল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফেসবুকের বেড়ে ওঠায় প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যত্ নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন দাঁড়িয়ে গেছে। ফেসবুকের ভবিষ্যত্ কি? লন্ডনের বিখ্যাত সাময়িকী ইকোনমিস্ট সম্প্রতি ফেসবুক বিষয়ে একটি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করেছে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাবনা, আশঙ্কা আর ভবিষ্যত্ বিষয়ে। লাভের অঙ্কে ফেসবুক এখনো খুব বেশিদূর যেতে পারেনি। তাই প্রশ্নটা আরও ঘুরে ফিরে আসছে।
তবে ফেসবুকের মূল উদ্দেশ্য যে অর্থ উপার্জন নয়, সেটি খোলসা করেছেন জাকারবার্গ। তাঁর মতে, ফেসবুকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সামাজিক করে তোলা। মানুষ যোগাযোগ করতে চায় আর ফেসবুক তা সহজ করে দেয়। সব ধরনের মানুষকে অন্তর্জালে একসঙ্গে গেঁথে রাখে এই সাইটটি। ফেসবুকের ব্যবহারকারী বাড়ছে, এর অর্থ এর আবেদন আরও বাড়ছে।
উন্নত দেশে এর বৃদ্ধি ধীরে হলেও ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে সাইটটি। বর্তমান বিশ্বে অনলাইনের প্রতি সাত মিনিটের এক মিনিট ব্যয় হচ্ছে ফেসবুকে।
আইপিওর পর ফেসবুকের মূল্য দাঁড়াচ্ছে হাজার কোটি ডলার। অর্থের হিসেবে মোটেও কম নয়। কিন্তু তা শীর্ষস্থানীয় অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে এখনো পিছিয়ে।
ফেসবুকের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল। গুগলের বাজার মূলধন এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। মাইক্রোসফটের আড়াই হাজার কোটি ডলার আর অ্যাপলের চার হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।
মাত্র হাজার কোটির প্রতিষ্ঠান হলেও ফেসবুকের ব্যবসা বা অর্থ বাড়িয়ে নেওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। ফেসবুকের হাতে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের ভান্ডার।
এটিই এগিয়ে রেখেছে ফেসবুককে। এ ছাড়া সম্প্রতি টাইমলাইন নামে একটি ফিচার চালু করেছে ফেসবুক। যার মাধ্যমে মানুষের জীবনভিত্তিক একটি অনলাইন আর্কাইভ গড়ে তোলা যায়। প্রতিষ্ঠানটি নিজের ইচ্ছা মত তথ্য ব্যবহার করতে পারে এবং বিজ্ঞাপন বসিয়ে দিতে পারে। সামাজিক ব্যবসার অন্যতম প্লাটফর্মও হচ্ছে ফেসবুক।
ফেসবুককে বিশ্লেষকেরা বলছেন বিশ্বের অনলাইন পাসপোর্ট। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন তথ্য ব্যক্তিগত তথ্য পেতে ফেসবুকের সঙ্গে চুক্তি করতে হবে। ফেসবুকে যত বেশি প্রতিষ্ঠান তত বেশি অর্থ।
সম্ভাবনার ক্ষেত্র বিশাল হলেও রয়েছে আশঙ্কাও। ফেসবুকের সমস্যা এখন দুই ধরনের।
প্রথমটি হচ্ছে ছোট থেকে বড় আকারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে ফেসবুক। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানকে সামলানোর দায়িত্ব। এখন ফেসবুকে তিন হাজার ২০০-র বেশি কর্মী রয়েছে। এঁদের অনেকেই এখন কোটিপতি। ভিআইপি এমন কর্মীদের উত্সাহ দেওয়ার প্রশ্নটাও আসছে।
ফেসবুকের লাভ-লোকসানের হিসাবে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে। এ প্রশ্ন প্রাইভেসি বিষয়ে। ফেসবুক ভবিষ্যতে কতটা ভালো করবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে প্রাইভেসি নীতির ওপর। ফেসবুক বিশ্বাস ভঙ্গ করলেই ব্যবহারকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে। বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি চিঠিতে জাকারবার্গ ফেসবুক তৈরির উদ্দেশ্য, সম্ভাবনা ও করণীয় বিষয়ে বিশদ লিখেছেন।
তাঁর চিঠির মূল বক্তব্য হচ্ছে, তিনি একটি সামাজিক উদ্দেশ্য নিয়ে নেমেছেন, যাতে বিশ্বকে আরও বেশি মুক্ত ও যুক্ত রাখা যায়।
ফেসবুক এত দিন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট হিসেবে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। কারণ, এত দিন ফেসবুকের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়েবসাইট ছিল না। গুগলের ওয়েবসাইট ‘গুগল প্লাস’ সম্প্রতি উঠে আসছে। সে অর্থে গুগল প্লাসের সঙ্গে ফেসবুকের যুদ্ধের সবে শুরু।
একচেটিয়াত্বের এ দখল ফেসবুক কত দিন ধরে রাখতে পারবে তার ওপরেও অনেক বিষয় নির্ভর করছে। যদি কোনো ওয়েবসাইট ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে নতুন কিছু নিয়ে হাজির হয়, সেদিকে মানুষ ঝুঁকতেই পারে। বিকল্প হিসেবে ভালো কিছু পেলে তবে ব্যবহারকারী সেদিকে ঝুঁকবে।
বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়েই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে ফেসবুক। প্রাইভেসি নিয়ে সমালোচিত হলেও এই আট বছরে ফিচারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তন এনেছে ফেসবুক।
সর্বশেষ পরিবর্তন হিসেবে টাইমলাইন ফিচারটি শিগগিরই বাধ্যতামূলক করার ঘোষণা দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ।
সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র হিসেবে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে ফেসবুক। মিসর, সিরিয়া, তিউনিসিয়ার মতো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ফেসবুক ‘আরব বসন্ত’-খ্যাত গণজোয়ার সৃষ্টিতে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রেখেছে, যা সরকার উত্খাতের মতো বিপ্লবের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতে কতটা ভূমিকা রাখবে?
ইতিমধ্যে ফেসবুক নিয়ে ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ নামে একটি চলচ্চিত্র চিত্রায়ণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, ফেসবুকের গল্প আরও এগোবে বলেই মনে হচ্ছে।
জাকারবার্গের হাতছাড়া হতে পারে ফেসবুক!
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের হাতছাড়া হতে পারে ফেসবুক! এতে জাকারবার্গ শীর্ষ পদ হারানোর পাশাপাশি চাকরিচ্যুতও হতে পারেন! আর এ কাজটি করতে পারবে ফেসবুক কার্যনির্বাহী পরিষদ। ব্যবহারকারীর সংখ্যা আর জনপ্রিয়তা বাড়ার পাশাপাশি অনেক দিন ধরেই ফেসবুকের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে নানা ধরনের আলোচনা। অতিসম্প্রতি ফেসবুকের ইনিশিয়াল পাবলিক অফার (আইপিও) নিবন্ধ নিয়ে তৈরি হয়েছে আরেক জটিলতা। আইপিওর মাধ্যমে ফেসবুক ৫০০ কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠান হিসেবে করতে চাইছেন জাকারবার্গ। খুব শিগগির ফেসবুক আইপিওর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনভুক্ত হতে যাচ্ছে।
এ নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী ফেসবুক থেকে চলে গেলে কিংবা চাকরিচ্যুত হলেও জাকারবার্গ ফেসবুকের মতো আর কোনো সামাজিক যোগাযোগের সাইট তৈরি করতে পারবেন না।
এমন সব জটিলতায় ফেসবুকের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের শঙ্কা। আর এসব সমস্যার কারণে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যেও চলছে নানা ধরনের আলোচনা। তবে যেকোনো ধরনের পরিবর্তনই হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে যা-ই হোক না কেন সেটা ইতিবাচকও হতে পারে আবার নেতিবাচকও হতে পারে—এমনই আশা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের।
—টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে কাজী আশফাক আলম
প্রথম-আলো থেকে সংগ্রহীত !
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।