আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অশ্রুজল

" সাহিত্যের কাজ হচ্ছে মানুষকে খেলাচ্ছলে শিক্ষা দেওয়া " - প্রমথ চৌধুরী গত কয়েকদিনের তুলনায় রিপন আজ একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছে। আজ তার স্কুলের বিদায়ী অনুষ্ঠান। বিশাল আয়োজন। স্যাররা বলে দিয়েছেন একটু আগে আগে যেতে। প্রধান শিক্ষক বেশ কড়া মানুষ।

সামান্য পান থেকে চুন খসলেই হম্বিতম্বি শুরু করে দেন। এজন্য স্যারদের এ বাড়তি সতর্কতা। রিপন অতটা ভাল ছাত্র না। টেস্ট পরীক্ষাতেও সে এ+ পায়নি। এজন্য বাসায় প্রচুর বকুনি শুনতে হয়েছে।

মনে মনে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, এস,এস,সি তে এ+ পেতেই হবে। এজন্য টেস্ট পরীক্ষার পর থেকে সে একদম উঠেপড়ে লেগেছে। হাজার হোক, সে বাবা-মার একমাত্র সন্তান; তার বাবা-মার স্বপ্নগুলো তো তাকেই পূরণ করতে হবে। তার বাবার ইচ্ছা সে ইঞ্জিনিয়ার হোক, কিন্তু মার ইচ্ছা ডাক্তার। রিপন নিজেও দ্বিধার মাঝে আছে, যে কার স্বপ্ন তার দ্বারা পূরণ হবে।

তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করে, তৈরি হয়ে রিপন যখন স্কুলে পৌছাল, তখন সাড়ে নয়টা বেজে গেছে। স্কুলে পৌঁছেই সে খুঁজে লাগল তার বন্ধু-বান্ধবীদের। দেখল, কয়েকজন ইতিমধ্যেই এসে গিয়েছে। সাব্বির, শামিম, নিতু, তন্ময়, জেরিন-এরাই রিপনের কাছের বন্ধু। তারা সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।

রিপনকে দেখতে পেয়ে সাব্বির আর নিতু হাত নাড়ল। রিপন প্রত্যুত্তরে মুচকি হাসল, আর তাদের সাথে আড্ডায় যোগ দিল। অন্যদিনের তুলনায় নিতুর চেহারা আজ একটু মলিন লাগছে। তাই রিপন তাকে জিজ্ঞেস করলো, “কিরে, তোকে বকাঝকা করল কে? এরকম লাগছে কেন তোকে?” - মন ভাল না রে। - কেন কেন? কি হল তোর আবার? নিতু কিছু বলার আগেই তন্ময় বলল, “তার বয়ফ্রেন্ড তাকে ছ্যাঁকা দিয়ে আরেক মেয়ের সাথে প্রেম করছে তো, তাই.........” সঙ্গে সঙ্গে তন্ময়ের পিঠে বেশ জোরেশোরেই কিল বসিয়ে দিল নিতু।

সবাই হাসতে লাগল নিতুর কাজ দেখে। হঠাত নিতু বলল, “না...দেখ, বিষয়টা আসলেই সিরিয়াস। শুধু শুধু মজা করিস না। ব্যাপারটা হল গিয়ে......মনে হয় তোদের সাথে আমি এক কলেজে পরতে পারব না......” একথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। নিতু বলতে লাগল, “বাবা আগামি মে-জুন মাসের দিকে বদলি হয়ে যাবে।

আজ সকালে বাবা আমাকে জানাল কথাটা। তখন থেকেই কেন জানি কিছুই ভাল লাগছেনা আমার। হয়ত তোদের জন্যই বেশী খারাপ লাগছে। এই পাঁচটা বছর তোদের সাথে খুব মজা করেছি......খারাপ লাগাটাই তো স্বাভাবিক......” জেরিন বলল,”তাই বলে তো একদম পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছিস না। যেখানে থাকিস পরে, তোর সাথে তো যোগাযোগ হবেই, তাই না?” - তা ভুল বলিসনি, কিন্তু এই মজার সময়গুলো তো খুব্বি মিস করব আমি......খুবই বেশী......” বলতে বলতে নিতুর চোখের কোনায় পানি টলমল করতে লাগল।

গত পাঁচ বছরে নিতুকে এই প্রথম কাঁদতে দেখল রিপন। কখনও নিতুকে ভালোমতো খেয়াল করেনি সে। আজ নিতুকে কাঁদতে দেখে নিজের বুকের কোথাও চাপা একটা ব্যথা অনুভব করে সে। অনেকক্ষন ধরে নিতুর দিকে তাকিয়ে রইল সে। কেন জানি নিতুকে বেশ অন্যরকম লাগছে দেখতে।

তারপর অনুষ্ঠান শুরু হল, অনুষ্ঠানের সকল কাজও শেষ হল.........কিন্তু সারাক্ষণ রিপনের মাথায় ঘুরতে থাকল নিতুর অশ্রুসজল চেহারার কথা। দিন শেষে সে সে বাসায় ফিরে এল এক অন্যরকম ঘোরের মাঝে। **************************** রিপনদের এস, এস, সি পরীক্ষার রেজাল্ট আগামি সপ্তাহে দিবে। যতই রেজাল্টের দিন ঘনিয়ে আসছে, ততই রিপনের টেনশন বাড়ছে। তার পরীক্ষা মোটেও ভাল হয়নি।

পুত্রের রেজাল্ট দেখে বাবা-মা যে কি করবেন, তা নিয়েই রিপনের চিন্তা বেশী। মোটামুটি নিশ্চিত সে, যে তার রেজাল্ট ভাল হচ্ছে না। বিদায়ী অনুষ্ঠানের সেই এক দিনই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। নিতুরা চলে যাচ্ছে এ মাস শেষেই, এটা চিন্তা করেই রিপনের আরো বেশী খারাপ লাগছে। ঐ দিনের পর থেকে নিতুর জন্য কেমন অজানা একটা অনুভুতি হয় তার।

হয়তবা এই অনুভুতির জন্ম পৃথিবীতে না, অন্য কোথাও। নিতুদের বাসা তার বাসা থেকে বেশি দূর না। প্রায় প্রতিটি বিকালেই সে চলে যেত নিতুদের বাসার সামনে......শুধু তাকে একনজর দেখার আশায়। তার এ আশা খুব কম দিনই পূর্ণ হয়েছে। নিতু তাকে প্রথম দিন দেখে একটু অবাক হয়েছে, কিন্তু এর পরের দিনগুলোতে যখন তাদের চোখাচোখি হয়েছে, প্রতিবারই নিতুর চোখে-মুখে হাল্কা হাসির আভা দেখতে পেয়েছে রিপন।

একদিন হঠাত সাব্বিরের সাথে দেখা রিপনের। বেশ কিছুক্ষণ কথা হল তাদের মাঝে। কথায় কথায় সাব্বির বলল নিতুর কথা। “নিতুরা যাচ্ছে কবে রে?” - মনে হয় এ মাসের শেষে। কেন, জানিস না? - জানতাম না।

অনেকদিন ধরে দেখা হয়না। খবর কি ওর? - জানি না কিছু......মনে হয় ভাল নেই। - তার জন্য আমিও ভাল নেই রে......মাঝে মাঝে কেন জানি তার কথা খুব মনে পরে। রিপনের বুকে ধক করে ধাক্কা লাগে। তবে কি সাব্বিরও......।

অনুভুতি চেপে রেখে সে বলে, “কেন কেন? তুই তাকে পছন্দ করিস নাকি?” - খুব বেশী। জানিস, এতদিন এ ব্যাপারটা আমি খেয়াল করিনি। কিন্তু স্কুল থেকে আসার পরে কিজন্য জানি খুব একা একা লাগত। প্রথমে ভেবেছিলাম তোদের সবার জন্যই আমার এ অনুভুতি। কিন্তু আরো পরে বুঝলাম, তোদের সবার জন্য না, শুধু একজনের জন্যই আমার এ খারাপ লাগা।

জানিস, আমি নিজেও............ এভাবে রিপনকে অনেক কিছুই বলল সাব্বির। কষ্ট পাওয়ার বদলে রিপনের কিছুটা হাসি পেতে লাগল। সাব্বির হয়ত কল্পনাও করতে পারবে না সে কার কাছে কি বলছে। পরদিন বিকাল। অভ্যস অনুযায়ী রিপন হাঁটছিল নিতুদের বাসার দিকে।

হঠাৎ নিতুর কণ্ঠে চমকে ওঠে সে। - কিরে, খবর কি তোর? ভাল আছিস? - এইতো আছি আর কি......তুই কেমন আছিস? - ভাল নাহ......তোদেরকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। যাই হোক......এতদিন আমাদের বাসার সামনে দিয়ে যাস, একদিনও তো আমাদের বাসায় আসলি না। রিপন চুপ করে রইল। কোন উত্তর না পেয়ে নিতুই বলল, “চল, বাসায় চল......কথা আছে তোর সাথে...।

” বাসায় এসে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করল তারা। কথায় কথায় নিতু বলল, “আচ্ছা, আমাকে কিছু ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবি?” - কিরকম? - আচ্ছা, সাব্বির ছেলেটা কেমন? রিপনের বুকে দ্বিতীয়বারের মত ধাক্কা লাগে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “কেন, তুই তাকে চিনিস না নাকি?” - চিনি......কিন্তু তোদের মত করে চিনি না। - ও আচ্ছা......ছেলে তো ভালই......কিন্তু কেন? - ও যে আমাকে পছন্দ করত, তা কি তুই জানিস? - না তো...... (মনে মনে রিপন বলছে, “ কপাল আমার!!”) - ব্যাপারটা বুঝলাম না......তোদের সবাই সাথেই আমার ভাল বন্ধুত্ব, কিন্তু শুধু তার জন্যই বেশি খারাপ লাগার কারনটা কি? - মানে? - তোদের সবার জন্যই খারাপ লাগছে, কিন্তু মনে হচ্ছে ওকে ছাড়া আমি থাকতেই পারব না......খুব কষ্ট হবে রে আমার......খুব কষ্ট...... সেদিনের মত আজও তার চোখে অশ্রুজল চিকচিক করতে লাগল। রিপন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।

নিতুকে সেই দিনের মতই স্নিগ্ধ পবিত্র লাগছে। কিন্তু নিতুকে যতই স্নিগ্ধ লাগুক না কেন......রিপন বুঝতে পারল, যে অশ্রুজলে তার ভালবাসার শুরু হয়েছিল, আজ সেই একই অশ্রুজলে তার ভালবাসার শেষ হল। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।