আপাতত ঘুরপাক খাচ্ছি!
রাত্রি দ্বিপ্রহর। চোখে নেই ঘুম। ঘুম সব চুরি হয়েছে রিনার ব্যাগে। রিনা আমার স্ত্রী। কাজে কামে বেশ চঞ্চলতা ভাব।
তবে অঘটনঘটনপটিয়সী। কথায় পরাস্ত করার মত কোন বিতার্তিক বোধয় জন্মায়নি এই পৃথিবীতে। চেহারা দেখে বুঝার জো নেই এই রমনী এত বাকপটু হতে পারে। এই কথাগুলো যখন লিখছি একটা কুনো ব্যাঙের বাচ্চা ডান পায়ের উপর আরামসে উঠে বসলো। রিনা থাকলে অর্ধচন্দ্র দিয়ে রুম থেকে বের করে দিতো।
আমি কিছুটা সহৃদয় ভাব নিয়ে নামিয়ে দিলাম। বললাম বেঁচে গেলি বাপধন। বড্ড সুসময়ে পদধূলি নিতে এলি। তেলাপোকা, ব্যাঙ, টিকটিকি যতসব নিশাচর ঘরকুনো প্রজাতির প্রাণীগুলো রিনার চক্ষুশুল। এই নিয়ে প্রতিদিন মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি চলে।
তার বাড়াবাড়িতে প্রতিমাসে গোটা কয়েক কাঁচের আর চীনামাটির তৈজসপত্র বিসর্জন দিতে হয়। ছাপোষা এই কেরানীর সংসারে যেখানে দুটো তেলাপোকাকে খাওয়ানোর উপায় নেই সেখানে প্রতি মাসে কিছু তৈজসপত্র কেনাটা নিশ্চয়ই গরীবের হাতির পা দর্শন।
মেস থেকে এই বাসায় আসার সময় সাথে করে একটা প্লাষ্টিকের ফ্রেমওয়ালা আয়না নিয়ে এসেছিলাম। সেটাই ঝুলতো শোবার খাটের মাথার দিকে। সারাদিন ঘর দোরের কাজ সেরে রিনা গুনগুন করে গান করতো।
আর এই আয়নায় রূপচর্চা করতো ঘন্টাব্যাপী। সাজলে তাকে রাজরানীর মত লাগতো। সে যেমন রাধতো তেমন চুল বাধতো। শুধু অতিরিক্ত কথা বলা আর এলোপাথারী ঝাড়ু ছোরাটা বাদে যাবতীয় সুকর্মের জন্য প্রশংসার দাবীদার। তার অনেক দিনের সখ একটা ড্রেসিং টেবিলের।
একদিন এরকমই সাজসজ্জার মুহূর্তে হাস্যচুমোচ্ছলে সে টেবিলের আবদার করে বসে। বিয়ের দু'বছর হয়ে গেছে। অথচ বউয়ের এই সামান্য দাবীটুকু মেনে নেয়া যেন পাহাড় সমান বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ কোন কিছু না ভেবেই অকাতরে দাবী মেনে নিলাম। কিন্তু মনের মধ্যে খুটখাট শব্দ টের পাচ্ছিলাম।
দু'মাস পর একটা উৎসব আসলো। সেই সাথে কিছু বোনাসও জুটে গেল। এই বোনাসটা একটা পারটেক্সের ড্রেসিং টেবিল কেনার জন্য পর্যাপ্ত। তেমনি অপর্যাপ্ত আমাদের গোছানো সামান্য কয়েকটা স্বপ্ন পূরণে। দুর্ভাবনা এবং জমে থাকা অন্যান্য স্বপ্নগুলো দূরে ঠেলে টেবিলটা নিয়ে আসলাম।
দেয়ালের প্লাস্টিকের আয়নাটা সরিয়ে সেখানে টেবিলের জায়গা করে দিলাম। রিনা টেবিলের আয়নায় ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখে। নিজেকে পরিপূর্ণরূপে প্রকাশ করার কাজে রিনা আরও পটু হয়ে উঠলো। আয়নাটা যেন তার সুখেরচাবি হিসেবে আগমন করলো। মানুষ অল্পতেই এত খুশী হতে পারে! হয়ত রিনাকে না দেখলে জানা হতো না।
ইদানীং বাসায় একজন নতুন অতিথি জুটেছে। একটা চড়ুই পাখি। আমাদের অগোচরে দিনের বেলা অনিমন্ত্রিতভাবে যখন তখন রুমে প্রবেশ করছে। টেবিলটার উপর লাফিয়ে ঝাপিয়ে খেলা করছে। এপাশ ওপাশ ঘুরে নিজের চেহারা মোবারক আয়নায় পিটপিট করে দর্শন করছে।
রুমে কেউ ঢুকে পড়লেই ফুরুত করে উড়ে পালাচ্ছে। কয়েক দিনের ভিতর দেখা গেল আরও একজন জুটে গেল। মাঝে মাঝে দেখা যায় তারা ঝগড়া ঝাটিতে পরস্পরকে আক্রমণ করছে। কখনোবা আয়নার প্রতিচ্ছবিকে আক্রমণ করছে। কখনোবা তারা আলিঙ্গন করছে।
পাখিপ্রীতির কারণে ব্যাপারটা আমি উপভোগ করলেও রিনা রাগে গজগজ শুরু করলো। রাগের অবশ্য যথেষ্ঠ কারণও আছে। প্রতিদিনই পাখিদ্বয় বিষ্ঠা ত্যাগ করে টেবিলের পাটাতন ময়লা করে রাখতো। সেগুলো পরিস্কার করতে করতে উড়ন্ত কিছু গালি ছুড়তো পাখিদের উদ্দেশ্যে। তাতে পাখি সম্প্রদায়ের কোন জাত উদ্ধার হতো কিনা জানিনা।
রিনার রাগ কিছুটা হলেও প্রশমিত হতো।
একদিন সন্ধ্যেবেলার ঘটনা। অফিস থেকে ফিরে দরজা খুলতেই দেখলাম রিনা মুখ ভার করে বসে আছে। ব্যাপার কি জিজ্ঞেস করলাম। সে কিছু বলেনা।
তার মুখের অভিব্যক্তি পড়ে বুঝলাম কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে। রুমের দিকে এগোলাম। রুমে ঢুকেই দেখি ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা কয়েক টুকরো হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আয়নার টুকরো গুলো দেখেই মনে হলো যেন অভাবের সংসারটার কিছু স্বপ্ন এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো, আকাঙ্খাগুলো জলাঞ্জলী দিয়ে এই টেবিলটা কিনেছিলাম।
সেই স্বপ্নগুলো প্রতিফলিত হয়ে যেন আমাকে নিয়ে রসিকতা করছে। হাসছে বজ্রনিনাদ কন্ঠে। নিজেকে সংযত করতে পারলাম না। কি এমন ভূমিকম্প ঘটেছিল যে আয়নাটা এরকম ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হলো? রিনার রিনরিনে কন্ঠে উত্তর, ''সেই মরার চড়ুই পাখি দুটি। তাদেরকে তাড়া করতে ঝাড়ু ছুড়েছিলাম।
'' তাই বলে আয়নাটাও খেয়াল করবা না? রাগের মাথায় কিচ্ছু খেয়াল করিনি গো। একটা পাখির ডানা ভেঙ্গে গেছে। উড়তে পারছে না। কোথায় রাখছো তাকে? বারান্দার কোনায়। দেখলাম পাখিটার ডানায় কিছুটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।
দেখে মনে হলো কিছুদিন সেবা শুশ্রূষায় সুস্থ হয়ে উঠবে।
রিনা বিয়ের পর অনেক দিন বাবার বাড়িতে যায়না। রাতে ভাবলাম তাকে কিছুদিনের জন্য গ্রামে পাঠানো যাক। রিনা গ্রামের মেয়ে। শহরের বিষাক্ত বাতাসে মনটা হয়ত ভারী হয়ে উঠেছে।
হয়ে উঠেছে কিছুটা নিষ্ঠুর। পরের দিন সকালেই কিছুদিনের জন্য তার বাবার বাড়িতে পাঠালাম। একটা প্রত্যন্ত গ্রামে তার বাবার বাড়ি। গ্রামীণ পরিবেশে অনেক গাছপালা এবং পশুপাখি থাকে। গৃহপালিত কিছু প্রাণীও থাকে।
মানুষের সাথে না হোক পশুপাখিদের সাথে আলাপন সেরে আসুক। বৃক্ষের সাথে, প্রকৃতির সাথে মিশে কিছুটা প্রকৃতিমনা হোক। মায়া, ভালোবাসা সৃষ্টি হোক সকল জীবের উপর। যেখানে এই প্রাণীগুলো কোন পুষ্টিকর উপাদান ছাড়াই কিছু খড়কুটো দিয়েই জীবন অতিবাহিত করে, সংসার বাধে। সেখানে প্রকৃতির তাবৎ উপাদেয় উপাদান পেয়েও মানুষ সুখী হতে পারেনা।
প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়েও সবচেয়ে অসুখী প্রাণী যেন।
ডানাভাঙ্গা চড়ুইটা পুরুষ। তার স্ত্রী অদূরেই ঘুরাফিরা করছে। তার প্রিয়র এরকম দুর্দশায় বেশ উৎকন্ঠায় এদিক সেদিক উড়াউড়ি করছে। কিচিরমিচির করে জানান দিচ্ছে তার কষ্টানুভূতির কথাগুলো, ধূলিসাৎ হওয়া স্বপ্নের কথা।
কাল রাতেই বেশ খানিকটা সেবা শুশ্রষা করেছি। আজকে রিনাকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়ার পর এসে দেখি ডানাটা নাড়াতে পারছে। আর কয়েকদিন সেবা যত্ন করলে হয়ত উড়তে পারবে।
দু'মাস পরঃ
কিছুদিন হলো চড়ুই দম্পতি একজোড়া ফুটফুটে বাচ্চা ফুটিয়েছে। আজ সকালে চড়ুইদের কিচিরমিচিরে ঘুম ভাঙ্গলো।
চোখ মেলে দেখি টেবিলে নতুন লাগানো আয়নার সামনে চড়ুই দম্পতি তাদের বাচ্চাদের নিয়ে খেলছে।
---------------------------------------------------------------------
রিনাকে বাসায় নিয়ে আসবো আসবো করে সময়াভাবে নিয়ে আসা হচ্ছেনা। সন্তান সম্ভবা রিনাকে দেখার জন্য করে আঙ্গুলে দিন গুনছি। সামনের সাপ্তাহিক ছুটিতে গ্রামে যেতে হবে।
ছবিঃ নিজস্ব এ্যালবাম।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।