অপারেশন সার্চ লাইটের নামে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ আরম্ভ করে তা ক্রমশ বিস্তৃত হয়ে সমগ্র ভূখন্ডে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করার পরও কোথাও কোথাও তা চলতে থাকে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য হানাদার বাহিনী হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগসহ সমগ্র বাংলাদেশে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে। এরই মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলেও জন্মদাগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি আমার প্রিয় স্বদেশ। অবশ্য চেষ্টা চলছিল, এবং এখন আবার চলছে। অপেক্ষা চিরকালের, কখন মুক্ত হবে কলংকের ওই অধ্যায় থেকে।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সরকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ, ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ জারি করে। ১৯৭২ সালের ২৯ আগষ্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ এ তিনটি সংশোধনী আনা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা বাংলাদেশ থেকে এ আদেশের অধীনে ৩৭ হাজার ৪৯১ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের লক্ষে তৎকালীন সরকার ৭৩টি বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে। যেসকল মামলা দায়ের করা হয়েছিল তার মধ্যে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৮৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল।
অভিযুক্তদের মধ্যে ৭৫২ জন দোষী প্রমাণিত হয়েছিলেন, ২০৯৬ জন ছাড়া পেয়েছিলেন।
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক যে সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই তাদের জন্য সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। তবে সাধারণ ক্ষমার প্রেসনোটে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ”ধর্ষণ, খুন, খুনের চেষ্টা, ঘরবাড়ি অথবা জাহাজ অগ্নিসংযোগের দায়ে দন্ডিত ও অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রদর্শন প্রযোজ্য হইবে না। ” সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও দালাল আইনে আটক ১১ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি এসকল অপরাধের দায়ে কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেন।
কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন বাতিল করেননি। এমনকি জামাতের সমর্থনে এবং পরবর্তীতে জামাতের অংশীদারিত্বেসহ যে সরকার ছিল তারা অনেক আইন বাতিল ও পরিবর্তন করলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইনটি বাতিল করেননি। তাতে খুব সহজেই মনে হতে পারে ঐতিহাসিকভাবেই ওই আইনটির প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে এবং তা দিয়ে বিচার করাই একমাত্র কাজ, এখর তারা আইনটির যে দুর্বলতার কথা বলছেন তা যদি আদৌ সত্য হতো তাহরে তারা এমন একটি দুর্বল বা অপ্রয়োজনীয় আইন বাতিল করতে পারতো, এবং এখনই মোক্ষম সময়। দালাল আইন বাতিল হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী গণহত্যার সাথে জড়িত পাকিস্তানিদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এর সদস্যদের বিচার এখনও করা সম্ভব। আমাদের দেশে ট্রাইবুনাল গঠন হয়েছে এক বছরের বেশি সময় ধরে।
কিন্তু এখনো তেমন কোন অগ্রগতি নাই। অথচ আমাদের সাধারণ নাগরিকরা আশাবাদী আমাদের ট্রাইবুনাল হাটবে নুরেমবার্গ ট্রাইবুনালের পথে। আমাদের ট্রাইবুনাল নিয়ে আবার যারা বিচার বিরোধী তারা এক রকম অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দেশে বিদেশে। অন্যদিকে, যারা নৈতিকভাবে বিচারের পক্ষে তারাও কেউ কেউ বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু আপত্তি তুলেছে। কেবল বুদ্ধিজীবী মহলে যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টি গন্ডীবদ্ধ ছিল দীর্ঘদিন যাবত।
বর্তমানে সাধারণ মানুষ বিষয়টি সম্পর্কে মোটামুটি অবগত। তবু অপপ্রচারের ঢোলে এইসব সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ পর্যন্ত যেসকল ট্রাইবুনালে যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে ওইসব ট্রাইবুনাল আমাদের নিকট মডেল স্বরূপ। তার মধ্যে নুরেমবার্গ ট্রায়াল পৃথিবীর বিখ্যাত এবং এটির গৃহিত সিদ্ধান্ত চার্টার হিসাবে স্বীকৃত। নুরেমবার্গ ট্রায়ালকে আমরা বুদ্ধিজীবীর সীমানা থেকে বের করে এনে অন্যান্য ট্রাইবুনালসহ একটি আলোচনা করলে রাজাকারের যে ভুত আমাদের মাথা ভারী করে তা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ: আন্তর্জাতিক অপরাধ বলতে সেসকল অপরাধ বুঝায় যা আন্তর্জাতিক সমাজের ভিত্তিমূল ধরে নাড়া দেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি ও ন্যায়পরতার বোধকে মারাত্মকভাবে আহত করে। গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালাকে এমন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে তা যুদ্ধ আইন ও যুদ্ধাপরাধীদের সংজ্ঞায়ন ও শাস্তির ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক আইন কমিশন ১৯৫০ সালে এর দ্বিতীয় অধিবেশনে আন্তর্জাতিক আইনের যেসকল নীতিমালা নুরেমবার্গ ট্রায়ালের রায়ে বিবৃত হয়েছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত ভাষ্য প্রদান করে। নুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল তিন ধরণের অপরাধকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য বলে চিহ্নিত করে সেগুলো হচ্ছে:১) শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ ২) যুদ্ধাপরাধ ৩) মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
নুরেমবার্গ ট্রায়ালে বিচারের মূলসূত্র গুলিকে চার্টার হিসাবে গণ্য করা হয়। ওই চার্টারের ৬ অনুচ্ছেদ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি লংঘন করে যুদ্ধ বা আগ্রাসনের জন্য যুদ্ধের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি বা উদ্যোগ গ্রহণ করলে তাকে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। নুরেমবার্গ চার্টার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, ১৯৭৩ এ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, বর্ণ বা গোত্রগত কারণে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর কোন সদস্যকে যুদ্ধের আগে বা যুদ্ধকালীন সময়ে হত্যা, নির্যাতন, বন্দী, অপহরণ, ধর্ষণ বা অন্য কোন অমানবিক উপায়ে নির্যাতন করা হলে তাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের রিপোর্টের ৪ নম্বর নীতি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন এর ৩ নম্বর ধারায় যুদ্ধাপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ বলতে যুদ্ধের আইন ও রীতিনীতি লংঘন করে বেসামরিক জনসাধারণকে হত্যা, নির্যাতন বা বাধ্যতামূলক শ্রমের জন্য নির্বাসনকে বুঝাবে।
এছাড়া অধিকৃত ভুখন্ডে অথবা সমুদ্রপথে যুদ্ধবন্দি অথবা বেসামরিক লোকজনকে হত্যা বা নির্যাতন, জিম্মি হত্যা, সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি লুন্ঠন, নগর বা গ্রামের মারাত্মক ক্ষতিসাধনকে যুদ্ধাপরাধ বলে গণ্য করা হবে।
১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত জেনোসাইড কনভেনশনের ২ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ এর ৩ ধারায় গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, বর্ণগত, ধর্মীয় অথবা রাজনৈতিক কোন সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণ বা আংশিক ভাবে নির্মূল করার জন্য ঐ সম্প্রদায়ের সদস্যদের হত্যা অথবা মারাত্মক শারীরিক বা মানসিক ক্ষতিসাধন, অথবা ঐ সম্প্রদায়ের মধ্যে জোরপূর্বক জন্মনিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ অথবা ঐ সম্প্রদায়ের শিশুদেরকে অন্য সম্প্রদায়ের কাছে হস্তান্তরকে গণহত্যা বলে বিবেচনা করা হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে সংঘটিত অপরাধ ও নুরেমবার্গ ট্রায়াল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ, শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হয়েছে তা ছিল মানবজাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন। জার্মানীর সেনাবাহিনী হাজার হাজার মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন করেছে যা ছিল মানবাধিকরের চরম লংঘন।
দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার জন্য মিত্রবাহিনীর সদস্যদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পরবর্তীতে নুরেমবার্গ ট্রায়াল ও টোকিও ট্রায়াল অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৩ সালের ৩০ অক্টোবর মস্কো সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণায় বলা হয় যে, মিত্রশক্তিভুক্ত সরকারগুলোর যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধী, যাদের অপরাধ কোন ভৌগলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তাদের দণ্ড দেয়া হবে। ১৯৪৫ সালের ২৬ জুন লন্ডনে ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বৃটেন ও আমেরিকা সরকারের প্রতিনিধিরা মিলিত হন ইউরোপের প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সাধারণ করণীয় নির্ধারণ করার জন্য। ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট তারা অক্ষশক্তির যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যেটির সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের চার্টার সহগামী হয়েছিল। ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছিল ৪ জন সদস্যকে নিয়ে যাদের প্রত্যেকেরই একজন করে বিকল্প ছিলেন।
উল্লেখিত চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রত্যেকটি রাষ্ট্রকে ট্রাইবুনালে একজন বিচারক ও একজন বিকল্প বিচারক নিয়োগ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইবুলের চার্টার নুরেমবার্গ ট্রায়ালের এখতিয়ার সংজ্ঞায়িত করে দিয়েছিল। বলা হয়েছিল ট্রাইব্যুনাল সেই সকল ব্যক্তি যারা ব্যক্তিগতভাবে অথবা কোন সংগঠনের সদস্য হিসেবে ইউরোপীয় অক্ষশক্তির স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধাপরাধ ও শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাদের বিচার করতে পারবে।
জার্মান সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিচার হয়েছিল নুরেমবার্গে, সেজন্যে যুদ্ধাপরাধীদের এ বিচারটি নুরেমবার্গ ট্রায়াল বলে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। বিচার চলার সময় অভিযুক্তদের পক্ষে অনেক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে যে, অপরাধের সময়ে কার্যকর ছিল না এমন কোন আইনের অধীনে অভিযুক্তদের শাস্তি দেয়া যাবে না। এ যুক্তির ভিত্তি হচ্ছে সেই নীতিটি যেটি পরে প্রণীত কোন আইন দিয়ে পূর্বে কৃত কাজকে অপরাধ বলে গণ্য করে কোন ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদানকে বারণ করে। অভিযুক্তরা আত্মপক্ষ সমর্থনে সরকার ও উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের আদেশের কথা বলেন যেটিকে ট্রাইবনাুলের বিচারকরা গ্রহণ করেননি। ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্যগ্রহণ, শুনানী ও আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষ হয় ১৯৪৬ সালের ৩১ আগস্ট।
২২ জন ব্যক্তিকে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
বিচারিক কার্য শেষ হওয়ার পর রায় দেয়া হয় ১৯৪৬ সালের পহেলা অক্টোবর। ২২ জনের মধ্যে এক জনকে শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ এবং ২জনকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে শাস্তি প্রদান করা হয়। বাকীদের শাস্তি দেয়া হয় যুদ্ধাপরাধ ও চার্টার বর্ণিত অন্যান্য অপরাধ করার জন্য। নুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল এ ১২জনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৪জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করে। ৩জনকে মুক্তি প্রদান করা হয়।
রায়ে নুরেমবার্গ ট্রায়ালের বিচারকগণ অভিযুক্তদের পক্ষের যুক্তিতর্ক প্রত্যাখ্যান করে বলেন, নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যা, নির্যাতন, অঙ্গঁহানি, অপমান ইত্যাদি সকল সভ্য জাতির মূল্যবোধ দ্বারা নিন্দিত এবং জাতীয় আইন ব্যবস্থা দ্বারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিচারকগণ বলেন, যারা উল্লেখিত কর্মকান্ডগুলা করেছে তাদের জানা উচিত ছিল যে, তারা যা করেছে তা অন্যায় যা কখনোই শাস্তি কাঠামোর বাইরে থাকতে পারে না। মানব ইতিহাসের ভয়ংকরতম অপরাধ যারা করেছে তাদের যদি শাস্তি দেয়া না হয় তবে সেটি হবে অন্যায় ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। নুরেমবার্গ ট্রাইবুনালের রায়ে বিচারকগণ বলেন, ট্রাইবুনাল বিধি গ ুলো ছ সেগুলি এর পুর্বে কার্যকর আন্তর্জাতিক আইন না হলেও, সেগুলো সকল জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য কার্যকর নৈতিকতা বলে স্বীকৃত। ট্রাইবুনাল এর রায়ে বলে যে, ১৯২৮ সালের প্যারিস চুক্তি ভঙ্গ করে অন্যান্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য জার্মানী দায়ী।
এজন্য দায়ী ব্যক্তিদের ট্রাইবুনাল শাস্তি প্রদান করে। ঊর্ধŸতন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের আদেশ সম্পর্কে বলা হয় যে, সরকার বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ একজন ব্যক্তিকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়মুক্ত করে না।
টোকিও ট্রায়াল
যেসকল নীতিমালার ভিত্তিতে জার্মানীর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়েছিল ঐ একই নীতিমালার ভিত্তিতে জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য টোকিও ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভকারী রাষ্ট্রগুলো ১৯৪৫ সালের ২০ জুলাই পটসডামে গৃহীত ঘোষণা অনুযায়ী টোকিও ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ১৯৪৫ সালের ১৯ জানুয়ারি “ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দি ফার ইস্ট” এর চার্টার অনুমোদিত হয়।
১৯৪৬ সালের ৪ জুন টোকিওতে জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ আরম্ভ হয়। ১১জন বিচারক নিয়ে গঠিত টোকিও ট্রাইবুনালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার স্যার ইউলিয়াম ওয়েব। এ ট্রায়ালে ২৮জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল যাদের মধ্যে দুইজন মামলা চলাকালে মারা যায় এবং একজনকে মানসিক ভারসাম্য হারানোর ফলে ছেড়ে দেয়া হয়। অভিযুক্তদের যেসকল অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, সেগুলো হচ্ছে: যুদ্ধাপরাধ, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ।
বিচার চলার সময়ে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে ট্রাইবুনালের গঠন সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করে বলা হয় যে, যেসকল বিচারক এ ট্রাইবুনালের সদস্য হিসেবে বিচারিক দায়িত্ব পালন করছেন তারা নিরপেক্ষ নন, কেননা তাদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে জয়লাভকারী রাষ্ট্রগুলোর বিচারক ও আইনজ্ঞদের মধ্য থেকে।
বিচারকগণ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটা সত্য যে তারা জয়লাভকারী বিভিন্ন রাষ্ট্রের সদস্য, তবে তারা ট্রাইবুনালের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন ব্যক্তিগত যোগ্যতায়। ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে ট্রাইবুনাল এর রায় ঘোষণা করেন এবং যারা যুদ্ধ সংঘটিত ও পরিচালিত করেছিলেন তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন এবং যারা যুদ্ধাপরাধ, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিলেন তাদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
নুরেমবার্গ ট্রাইবুনাল ও টোকিও ট্রাইবুনালের গঠন, কার্যপদ্ধতি ও রায় নিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য সমালোচনা রয়েছে। বাংলাদেশে অভিযুক্তের পক্ষের রাজনৈতিক দল একই রকম অভিযোগ করেছে। বিশেষ করে বিজয়ী শক্তি নিজেই বিচারক সেজে পরাজিতদের শাস্তি দেয়ার অভিযোগটি গুরুতর।
ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও এ দুটি ট্রাইব্যুনালের অর্জন মানবজাতির ইতিহাসে তুলনারহিত। কেননা ট্রাইবুনালের বিচারকগণ সকল জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য কিছু আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যারা হত্যা, নির্যাতন, অত্যাচার ও ব্যাপক ধবংসযজ্ঞ চালিয়েছিল তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছিলেন। ভবিষ্যতের যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে এটি একটি শক্ত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এছাড়া যেসকল নীতিমালার ভিত্তিতে ট্রাইবুনালগুলো তাদের রায় প্রদান করে পরবর্তীতে সেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিধানে পরিণত হয়।
আইকম্যানের মামলা
জার্মানীর শাসক হিটলারের শাসনামলে আইকম্যান শত শত ইহুদীকে হত্যা করেন এবং তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আইকম্যান একদেশ থেকে আরেক দেশে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। অবশেষে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আর্জেন্টিনায় আইকম্যানকে ধরে ফেলে এবং সেখান থেকে তাকে অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে আসে, কেননা তাদের আশংকা ছিল আর্জেন্টিনার সরকার আইকম্যানকে ইসরাইলের কাছে হস্তান্তর করতে সম্মত নাও হতে পারে। ইসরাইলের ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব জেরুজালেম বিচারের পর আইকম্যানকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে আইকম্যান ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টে একটি আপীল দায়ের করেন। ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টে আইকম্যানের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তার কৃত কর্মকান্ডের বিচার করার এখতিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব জেরুজালেমের নেই, কেননা সেই সময়ে ইসরাইল রাষ্ট্র ও বিচারিক আদালতের কোন অস্তিত্ত্ব ছিল না।
আইকম্যান আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেন তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যা করেছেন সেটি রাষ্ট্র ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে করেছেন। তিনি আরও বলেন যে, তাকে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করে ইসরাইলে আনা হয়েছে। তিনি বিচারিক আদালতের এখতিয়ার ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট আইকম্যানের যুক্তিতর্ক প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আইকম্যান যে অপরাধগুলো করেছেন সেগুলো বিশ্ববিবেক কর্তৃক নিন্দিত এবং সকল রাষ্ট্রের আইন ব্যবস্থা কর্তৃক অপরাধ বলে স্বীকৃত। আদালত বলেন যে, যারা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অপরাধ করেছে বিশ্বের যে কোন দেশের যে কোন আদালত তাদের অপরাধের বিচার করতে পারে।
কেননা এক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার বিশ্বজনীন।
সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল: ১৯৯২ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ভুখন্ডে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করে। কমিশন এর রিপোর্টে ১৯৯১ সাল থেকে সাবেক যুগোশ্লাভিয়াতে যারা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লংঘন করেছে তাদের বিচারের জন্য ট্রাইবুনাল গঠন করতে বলে। কমিশন উল্লেখ করে তাদের কাছে হাজার হাজার পাতার তথ্য প্রমাণ রয়েছে কিভাবে জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লংঘিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৯৩ সালের ২২ ফের্রুয়ারী একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য একটি ট্রাইবুনাল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ প্রস্তাবে নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের মহাসচিবকে পরিষদের সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তার মতামত প্রদানের অনুরোধ জানায়। পরবর্তীতে নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৯৩ সালের ২৫ মে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল গঠন করার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ সিদ্ধান্তে ট্রাইবুনালের ৩৪টি অনুচ্ছেদ সম্বলিত সংবিধিটি অনুমোদিত হয়। সংবিধিতে বলা হয় যে, ট্রাইবুনাল নিরাপত্তা পরিষদের একটি সহায়ক সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। কোন রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই ট্রাইবুনাল তার কর্মকান্ড পরিচালনা করবে এবং নিরাপত্তা পরিষদ কোনভাবেই ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ কর্তৃক “ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল” গঠন এটাই প্রথম। এ ট্রাইবুনালকে সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ভুখন্ডে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল তাদেরকে বিচারের এখতিয়ার দেয়া হয়। গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে ট্রাইবুনাল বসনিয়ার সার্ব নেতৃবৃন্দ ও সামরিক কমান্ডারদের অভিযুক্ত করে। বিদ্রোহী সার্বদের নেতৃবৃন্দ যারা যাগনাব ও ক্রোয়েশিয়ায় ক্লাস্টার বোমা নিক্ষেপ করেছিল তাদেরও অভিযুক্ত করা হয়। বসনিয়া ও বোসানস্কি সানাকের বন্দী ক্যাম্পগুলোতে যারা অপরাধ করেছিল তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।
১১ সদস্য বিশিষ্ট সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল ১৯৯৩ সালের ১৭ নবেম্বর নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে উদ্বোধন করা হয়। উল্লেখ্য, এ ট্রাইবুনালটি দুটি ট্রায়াল চেম্বার, একটি আপীল চেম্বার, প্রসিকিউটর ও রেজিস্ট্রি নিয়ে গঠিত হয়েছিল। ইতালীর বিচারক এ্যান্টোনিয়া ক্যাসেসি আন্তর্জাতিক এ ট্রাইবুনালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ভেনেজুয়েলার রোমান এস্কভার সালাম ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সালের ১৭ থেকে ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত দু’সপ্তাহ ধরে এ ট্রাইবুনালের প্রথম অধিবেশন চলে। ১৯৯৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীদের প্রথম বহিঃ সমর্পণ করা হয়।
১৩ ফেব্রুয়ারী বসনিয়ার একজন সার্ব জেনারেল ও কর্ণেলকে নেদারল্যান্ডসের কারাগারে নিয়ে আসা হয়।
রুয়ান্ডা ও কম্বোডিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার: ১৯৮০ এর দশকের শেষদিকে রুয়ান্ডাতে হুতুদের সঙ্গে তুতসিদের জাতিগত বিরোধে তুতসিরা প্রায় ১লাখ হুতুকে হত্যা করে। ১৯৯৪ সালের ৮ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদ একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়, যার উদ্দেশ্য ছিল রুয়ান্ডা ও আশপাশের রাষ্ট্রে যারা জেনেভা কনভেনশন ও অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের শাস্তি প্রদান করা। নিরাপত্তা পরিষদ ট্রাইবুনালের জন্য জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে একটি সংবিধি অনুমোদন করে। সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর রুয়ান্ডার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় সেটি ইতিহাসে দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত।
১৯৯৮ সালে ট্রাইবুনাল তার রায় প্রদান করে যাতে রুয়ান্ডার সাবেক প্রধানমন্ত্রি জ্যা কামবানন্দ ও টাবার সাবেক মেয়র জ্যা পল আকায়েশুকে গণহত্যা ও মানতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
কম্বোডিয়াতে সাবেক খেমাররুজ সরকার ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ব্যাপক গণহত্যা চালায়। গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দেয়ার জন্য কম্বোডিয়া সরকার জাতিসংঘের পরামর্শ ও সহযোগিতায় একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। ২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল সাবেক খেমারুরজ প্রেসিডেন্ট খিউ সাম্পানকে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করে। এছাড়া, স্পেনের অনুরোধে চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট অগাস্টো পিনোচেটকে লন্ডনে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
কিন্তু পরে তাকে স্বাস্থ্যগত কারণে মুক্তি দেয়া হয়।
আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার: বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা মরণপণ লড়াই করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশের সহযোগীদের পরাজিত করে। পর্যুদস্ত ও বিধ্বস্ত পাকিস্তানী বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু ৯২ হাজারের অধিক পাকিস্তান সেনাবাাহনীর কর্মকর্তা ও সেপাইদের তত্ত্বাবধান করার ক্ষমতা যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের না থাকায়, তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। বাংলাদেশ যদি ওই বাহিনীকে হত্যা করে ফেলতো তাহলে কি আর্ন্তজাতিক গোষ্ঠী বাংলাদেশকে ছাড় দিত? ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ফিরে আসার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের যারা যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের বিচারের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সময়ে সময়ে যে তালিকা করা হয়েছিল তাকে কাটছাট করে চূড়ান্তভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জনের একটি তালিকা করা হয় যাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস এর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করে। ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সভা হয় যেখানে সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ উল্লেখিত ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবে না যাদেরকে পরে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রি ও বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ডঃ কামাল হোসেন সম্প্রতি এব্যাপারে বলেছেন, ঐ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে পাকিস্তান উদ্যোগ নেবে এ প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে তাদেরকে তখন পাকিস্তানে যেতে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে পাকিস্তান তাদের বিচার করেনি।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যেসকল সদস্য ১৯৭১ সালে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচারের ব্যাপারে বার বার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার পরও বঙ্গবন্ধু সরকার নানারকম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ ও বাস্তবতার কারণে তাদের বিচার করতে পারেনি। তবে বঙ্গবন্ধু সরকার পাকিস্তানী বাহিনীর এদেশীয় দোসরদের বিচারের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজাকার, আল বদর, ও আল শামস বাহিনীর যেসকল সদস্য পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও বিভিন্ন ধরণের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিচার করার জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনালস) আদেশ, ১৯৭২ জারি করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ৩৭ হাজার ৪শ’৭১ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। বিশেষ ট্রাইবুনালে বিচারের পর ৭৫২ জন দালালকে শাস্তি দেয়া হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ, ১৯৭২ বাতিল করে দেয়া হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনীর নেতৃত্বদানকারী গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মত যুদ্ধাপরাধীরা পলাতক থাকায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সরকার তাদের বিচার করতে পারেনি। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পাওয়ার সাথে সাথে এসকল যুদ্ধাপরাধীরা আবার রাজনীতির মাঠে ফিরে আসে। বিশেষ করে জামাতে ইসলামী ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিতে থাকে। ক্রমাগত এদের বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য, হিংস্র ও বর্বর কর্মকান্ড সাধারণ মানুষকে এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার করে তোলে।
১৯৯১ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সারাদেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ধর্মভিত্তিক সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার দাবি জানায়। শহীদ জননীর নেতৃত্বে জনতার আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, কোন সরকারই গণ আদালতের রায় কার্যকর করেনি।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উত্থাপিত হওয়ায় জামাতে ইসলামী ও তাদের প্রতি যাদের সহানুভূতি রয়েছে তাদের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া সুশীল সমাজের মধ্যে অবস্থান নিয়ে একশ্রেণীর বর্ণচোরা বুদ্ধিজীবী জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন।
তারা বলছেন ১) বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই ২) বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোন প্রশ্নই উঠতে পারে না ৩) মুক্তিযুদ্ধের ৩৬ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শুধুমাত্র পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর যেসকল সদস্য গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজের সঙ্গে জড়িত ছিল তারাই শুধু যুদ্ধাপরাধী বিষয়টি কিন্তু এমন নয়। বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ, ১৯৭২ এর ২ নম্বর ধারায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহযোগী কারা তা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ এর ৩ ধারায় গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এ দুটো আইনকে এক সঙ্গে পড়লে এবং শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্য কারা ছিলেন তার সরকারি নথি দেখলেই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে, জামাতে ইসলামীর এখনকার নেতৃত্বের অনেকেই যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
দ্বিতীয় যে কথাটি জামাতী নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধজীবীরা বঙ্গবন্ধুর উদ্বৃতি দিয়ে বলতে চান সেটি হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সরকার পাকিস্তানী বাহিনীর এদেশীয় দোসরদের বিচারের জন্য বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ, ১৯৭২ জারি করেছিলেন। এ ব্যাপারে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল তাদের ক্ষমা করা হয়নি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য সাবেক সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ, ১৯৭২ বাতিল করে দেন।
তৃতীয় যে কথাটি জামাতীরা বলতে চান সেটি হচ্ছে, আদর্শিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তারা কোন ভুল করেননি।
মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের কথা বলে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা এমন এক দুর্ভাগা জাতি যে, যে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা জামাতে ইসলামী নেতৃবৃন্দ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বসেই তারা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে মূল বিষয় হচ্ছে ৪০ বছরের দোহাই দিয়ে তারা বিচারের দায় এড়াতে চান, যদিও এ বিষয়ে আইন তাদের সহযোগিতা করবে না। কেননা দণ্ড আইনের সাধারণ নীতি হচ্ছে কোন ব্যক্তি অপরাধ করলে তার বিচার সময় দ্বারা তামাদি হয়ে যায় না। উপরন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শাস্তির ব্যাপারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন আরও কঠোর।
৪০ বছর কেন, আরও পরেও বাংলাদেশ বা বিশ্বের যে কোন দেশের আদালত অথবা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে।
বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইবুনাল) আদেশ, ১৯৭২ বাতিল হয়ে গেলেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনাল) আইন, ১৯৭৩ এখনও বলবৎ রয়েছে। এ আইনের অধীনে বর্তমান সরকার অফিসিয়াল গেজেটে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে একাধিক বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে অনতিবিলম্বে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ আরম্ভ করতে পারেন।
আন্তর্জাতিক আইনে এবং সকল সভ্য গণতান্ত্রিক দেশের জাতীয় আইনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকে বর্বরতম অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকে এ পর্যন্ত গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছে।
অনেক দেশের আদালত জাতীয় বা আন্তর্জাতিক অথবা উভয় আইন প্রয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে শাস্তি দিয়েছে।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।