আট বছরের শিশু ফাহিম ভর্তি হয়েছিল ১ম শ্রেনীতে। সে অন্য শিশুদের মতো নয়। সমাজ এবং রাষ্ট্রের কাছে অন্যন্য শিশুদেও তুলনায় তার চাহিদা একুট বেশী। তাকে একটি বেশী যতœ নিতে হয়। তার বোধ এবং বুদ্ধি অন্যন্য শিশুদেও মতো বেড়ে উঠেনি।
কিন্তু স্কুল তার উপযোগী নয়। সহপাঠীদের অনেকেরই অভিভাবক মানা করে দিয়েছে ফাহিমের সঙ্গে না মিশতে। কথাগুলো বলতে বলতে কেদে দিলেন, ফাহিমের মা ফারহানা বেগম। অনেক সময় শিক্ষক এসে ফারহানাকে বলতেন ফাহিমকে বিশেষ কোন স্কুলে ভর্তি করাতে অন্যথায় এ স্কুল থেকে নিয়ে যেতে। এভাবেই মুলধারার শিক্ষা থেকে ছিটঁকে পড়ল ফাহিম।
ফাহিমের মতোই মূলধারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রয়েছে দেশের প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু শি¶ার্থীরা। সংবিধানের ২য় অধ্যায়ের ১৭ নং অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের জন্যে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার কথা বলা হলেও রাষ্ট্র ও সমাজকে সে দ্বায়িত্ব নিতে দেখা যাচ্ছে না। এসব শিশুদেও জন্যে বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনুপযুক্ত ও বিদ্যালয় কর্তৃপ¶ের ভর্তি করার ¶েত্রে থাকে অনীহা। আবার পরিবার থেকেও শিশুটিকে স্কুলে পাঠাতে বাবা মা ভয় পায় এবং শিশুটিকে ঘিরে কোন ধরনের আশা তারা করতে পারনে না। এরফলে দেশের বিপুল সংখ্যক প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা রয়েছে মূলধারার শিক্ষার বাইরে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এবং প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করা সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের উপযোগী কারিকুলামের অভাব রয়েছে এবং স্কুলভবন বা ক্লাসরুম প্রতিবন্ধীদের জন্য উপযোগী নয়। এছাড়াও রয়েছে প্রশি¶িত শি¶ক¯^ল্পতা। পরিবার এবং সমাজের মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, বিদ্যালয়ে শি¶কদের শ্রেণীক¶ে প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীর অবস্থানকে অহেতুক বোঝা মনে করার কারণেও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী মূলধারার শি¶া থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ সনদ ও প্রতিবন্ধীকল্যাণ আইন ২০০১-এ এই বিষয়গুলোর স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের শি¶ার বিষয়টি পরিচালনা করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদফতর।
প্রচলিত আইন ও বিভিন্ন ধরনের নীতিমালার ভিত্তিতে তারা এসব শিশুর শি¶ার বিষয়টি পরিচালনা করছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের শি¶ার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন রকম শি¶াপ্রতিষ্ঠান আছে। প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের সহায়তার জন্য শি¶া উপবৃত্তি কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০০৮ অনুযায়ী উপবৃত্তি দেয়ার কর্মসূচি প্রবর্তন করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু শি¶া মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত কোনো ধরনের শি¶া কর্মসূচিতে এসব শিশু অংশ নিতে পারে না। তবে সরকারের দ্বিতীয় প্রাথমিক শি¶া উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর শি¶ার বিষয়ে কিছু পদ¶েপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারিভাবে যে বিশেষ স্কুলগুলো বর্তমানে চলছে, সাধারণ শি¶াপ্রতিষ্ঠান থেকে এসব শি¶াপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সম্পূর্ণ পৃথক ও অনগ্রসর। অন্যদিকে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য কয়েকটি শি¶াপ্রতিষ্ঠান থাকলেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং আসনসংখ্যা সীমিত। এতে গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা পড়াশোনা করতে পারে না। ফলে প্রতিবন্ধীরা প্রকৃত শি¶ালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছেই সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় এদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করাও সম্ভব হচ্ছে না।
সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের ২০০৩ সালের একটি সমী¶া অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৫ লাখ প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪ ভাগ প্রতিবন্ধী শিশু বিদ্যালয়ে শি¶ার সুযোগ পায়। বাকি ৯৬ ভাগ অর্থাৎ ৩৪ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু আনুষ্ঠানিক শি¶ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রণীত ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন’-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শি¶ার সুযোগের বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, সাধারণ শি¶ার্থীদের সঙ্গে একই শ্রেণীক¶ে প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি, বিশেষ পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং ¶েত্রবিশেষে বিশেষ পরী¶া পদ্ধতি চালু করতে হবে। অনধিক ১৮ বছর বয়স্ক প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের জন্য বিনা বেতনে শি¶ালাভের সুযোগ সৃষ্টিসহ তাদের বিনামূল্যে ও ¯^ল্পমূল্যে শি¶া উপকরণ সরবরাহ, বৃত্তিমূলক প্রশি¶ণের কর্মসূচি গ্রহণ, শি¶ক ও অন্যান্য কর্মীকে প্রশি¶ণদানের কর্মসূচি গ্রহণ এবং শি¶াপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের জন্য সহায়ক ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষনা ইনস্টিটিউটের বিশেষ শিক্ষা বিভাগের এক গবেষনায় জানা যায় বর্তমানে প্রতিবন্ধী শিশু শি¶ার্থীদের শেখার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, যেমন, ব্রেইল পদ্ধতি, ব্রেইল মুদ্রিত বই, টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট, রাইটিং ফ্রেম ও অন্যান্য শি¶া-সহায়ক উপকরণ অপরিহার্য। কিন্তু এসব উপকরণের অধিকাংশই আমাদের দেশে পাওয়া যায় না। যেসব উপকরণ পাওয়া যায়, তাও ব্যবহার অনুপযোগী এবং শি¶ার্থীদের ক্রয়¶মতার বাইরে।
গবেষনায় আরো বলা হয়, প্রতিকুল পরিবেশে বেড়ে ওঠা প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব পরিল¶িত হয়। জীবনে কিছু করতে পারবে না, সমাজের এমন নেতিবাচক আচরণে তারা হীনমন্যতায় ভোগে।
এই আত্মবিশ্বাসের অভাবে তারা শি¶াগ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রাখে।
বাংলাদেশ প্রতিবন্ধীকল্যাণ সমিতির (প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন শাখা) সমš^য়কারী আশরাফুন নাহার মিষ্টি ভোরের কাগজকে বলেন, বাসস্থানের পর একজন শি¶ার্থী সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুবিধা একজন প্রতিবন্ধুুুী শি¶ার্থীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ আমাদের সব বিদ্যালয়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শি¶ার্থীর জন্য উপযোগী ঢালু সিড়ির ব্যবস্থা নেই। টয়লেটগুলোতে তাদের উপযোগী ব্যবস্থা নেই।
এজন্য হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শি¶ার্থীরা সমস্যার সম্মুখীন হয়। সাধারণ শি¶াপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের জন্য ইশারা ভাষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের মহাসচিব জওয়াহুরুল আলম বলেন, সম্প্রতি সরকার প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের সাধারণ শি¶াপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের শি¶া দেয়ার মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং প্রশি¶ণপ্রাপ্ত শি¶কের ব্যবস্থা করা হয়নি। এসব সমস্যা সমাধান না করে শুধু স্কুলে ভর্তির নির্দেশ দিলেই সেটা কার্যকর করা সম্ভব হবে না।
এখনও শ্রেণীক¶ে অন্যান্য শি¶ার্থীর সঙ্গে প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীর শিখন সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের সাধারণ শ্রেণীক¶ে সামনের সারিতে বসা, ব্রেইল লেখা ও রেকর্ড করার সুযোগ এবং বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শি¶ার্থীদের জন্য ছবি ও ইশারা ভাষা ব্যবহার প্রচলিত শি¶াব্যবস্থায় নেই।
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।