বাড্ডা, রামপুরা ও ভাটারা এলাকায় চাঁদাবাজি, খুন ও ভূমি দখল ছাড়া কোনো উন্নয়ন নেই। চার ইউনিয়নবাসীর একদিকে দিন কাটে ভূমিদস্যুর আতঙ্কে, অন্যদিকে রাতের ঘুম হারাম হয় ডাকাত আতঙ্কে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীরব ভূমিকায় প্রায় প্রতি মাসেই এলাকায় ঘটছে হত্যাকাণ্ড। এলাকাগুলোতে প্রতি রাতেই কোনো না কোনো বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এসব এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য যেমন নেই পুলিশেল টহল, তেমনি চুরি-ডাকাতির মামলাও নিচ্ছে না থানাগুলো বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
ঢাকা-১০ আসন সাঁতারকুল, ভাটারা, বেরাইদ ও বাড্ডা ইউনিয়নসহ ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২১, ২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রায় ১২ লাখ অধ্যুষিত জনসংখ্যার মধ্যে ভোটার রয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার প্রায়।
ঢাকা সিটি-১০ আসনের এ চারটি ইউনিয়ন নগরের প্রান্ত ঘেঁষে থাকলেও সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এলাকাবাসী। এসব ইউনিয়নে নেই সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নেই ওয়াসার পানি, গ্যাস সংযোগ, খেলার মাঠ, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা বাজার এবং পর্যাপ্ত রাস্তাঘাটও নেই। যেসব রাস্তা রয়েছে, সেগুলো ভেঙেচুরে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে আছে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড্ডা প্রগতি সরণি থেকে সাঁতারকুল পর্যন্ত ড্রেনেজ সিস্টেম ও স্যুয়ারেজ লাইনের কাজ হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এলাকাবাসী জানান, বাড্ডা থেকে সাঁতারকুলে সংযোগ সড়ক হলে গত চার বছরেও ওয়াসার পানির সুবিধা পাননি তারা। এমনকি কোনো পানির পাম্প বসানোর ব্যবস্থাও করেননি স্থানীয় এমপি। নেই তিতাস গ্যাসের সুবিধা। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সাঁতারকুল ব্রিজ পর্যন্ত অধিকাংশ ছোট-বড় কারখানাতে তিতাস গ্যাস অবৈধ সংযোগ দিয়েছে।
অথচ এলাকাবাসীর দাবি থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ রয়েছে বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিসহ তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারাও।
সাঁতারকুল-বেরাইদ ও ভাটারা ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার বাসিন্দার বিদ্যুত্ সংযোগের আবেদন বারিধারা ডেসকোতে জমা পড়ে রয়েছে, কিন্তু সংযোগ দিচ্ছে না। সংযোগ দেয়া বন্ধ বললেও অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি বলে জানান এসব এলাকার বাসিন্দারা। সাঁতারকুলের জহিরুল ইসলাম, নাজিম উদ্দিনসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, গত দেড় বছর ধরে তাদের কেবল নেটওয়ার্কের লাইন কেটে নেয়া হয়েছে। প্রতি মাসে কেবল সংযোগের সেট ভাড়া ৯২/৯৩ টাকা নিয়ে নিচ্ছে অথচ সংযোগ দিচ্ছে না।
সাঁতারকুলের ৯ নং ওয়ার্ডে প্রায় ৩৫ হাজার জনবসতি অধ্যুষিত এলাকার ওয়ার্ডগুলো এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। রাস্তাঘাট না থাকায় নিদারুণ কষ্টে চলতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। পাঁচখোলা, মেরুল, মগারদিয়া, ইসলামবাগ ও তালতলা এলাকায় নতুন রাস্তা দরকার। শুকনো মৌসুমে জমির আইল দিয়ে, বর্ষায় নৌকা দিয়ে চলতে হয় এলাকাবাসীকে। এলাকাবাসী জানান, প্রায় প্রতি রাতেই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।
এলাকার আজমত আলী, আনোয়ার হোসেন ও খলিলুর রহমান জানান, বাড্ডা থানা পুলিশকে একাধিকবার বলা হয়েছে। রাতে একবার পুলিশের টহলের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে, কিন্তু থানা পুলিশ এলাকাবাসী কিংবা চেয়ারম্যানের কথায় কান দিচ্ছে না। গত ১১ ফ্রেব্রুয়ারি পুকুরপাড় বড়বাড়িতে এক রাতে দু’বার ডাকাতি হয়েছে বলে জানান তারা। এক মাসের মধ্যে ওই এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষা উপ-সচিবের বাসায়ও ডাকাতি হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী।
বেরাইদ ইউনিয়নের বাসিন্দারা রয়েছেন সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
মহানগরী থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এ এলাকায় পানির সরবরাহ ও নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ইউনিয়নবাসী। এলাকাবাসী জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইউনিয়নের উন্নয়নে কোনো কাজ করা হয়নি। বাড্ডা থেকে সাঁতারকুল হয়ে বেরাইদ পর্যন্ত রাস্তাটি হলে দুর্ভোগ কমে যাবে। এছাড়াও বেরাইদ গুদারাঘাট থেকে দক্ষিণ দিক দিয়ে বাইপাস সড়কের প্রয়োজন অথচ কোনো উদ্যোগই নেই স্থানীয় এমপির।
বেরাইদের বাসিন্দারা জানান, সবচেয়ে জরুরি এলাকার এমপিসহ রাজনৈতিক নেতা ও ঘনিষ্ঠজনদের ভূমি আগ্রাসন বন্ধ করা। অনেক আশা ছিল নির্বাচিত এমপি এসব বন্ধ করবেন, কিন্তু তা করেননি।
ভাটারা ইউনিয়নের প্রবেশ পথের রাস্তার বেহাল দশা। বারিধারা হয়ে ভাটারা ইউনিয়নে ঢোকার প্রবেশ পথেই যানবাহনের যাত্রীদের পড়তে হয় প্রচণ্ড ঝাঁকুনির মুখে। রাস্তাটির উভয় পাশেই ভবন নির্মাণের রাবিশ ফেলে রাখা হয়েছে।
ভাটারা ইউনিয়নের ভেতরের রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। নুরেরচালা স্কুল সড়ক, নুরেরচালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি রাস্তা প্রশস্তকরণ ও সংস্কার করা জরুরি। বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা জমে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় অবর্ণনীয় দুর্ভোগে।
এলাকাবাসী জানান, তাদের এলাকায় ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, নেই স্বাস্থ্যসেবা। অধিকাংশ এলাকায় গ্যাস সংযোগ এবং ওয়াসার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে না।
এলাকাবাসী সবসময় আতঙ্কে থাকেন ভূমিদস্যুদের ভয়ে।
ভাটারা এলাকার অধিকাংশ লোকজন জানান, ধানি জমিগুলো রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো আবাসন প্রকল্প করতে গিয়ে জমি কিনে নিয়েছে। যারা জমি বিক্রি করতে চান না, তাদের বিভিন্নভাবে জিম্মি করে জমি নিয়ে যায়।
আবাসন প্রকল্পগুলো ও স্থানীয় অনেক বিএনপি-আওয়ামী লীগ নেতা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনরা খাল-বিল ভরাট করে ফেলেছেন।
সম্প্রতি ভাটারা এবং নুরেরচালার দুটি এলাকায় খাল ভরাট করে প্লট হিসেবে বিক্রি করছেন রামপুরার আবু সাইদ হাজী।
এলাকাবাসী জানান, ওয়াসার খাল ভরাট করে এভাবে প্লট বিক্রি করার মতো স্পর্ধা তিনি কোথায় পেলেন। স্থানীয় এমপির মদতে ভাটারা খাল ভরাট করে তিনি প্লট করে বাড়ি তৈরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক বীর প্রতীক জানান, পূর্বাঞ্চল ও ভাটারা খালে মাটি-বালু ফিলিং করে খাল বন্ধ করে যে স্থাপনা করা হয়েছে সে ব্যাপারে রাজউকসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় তিনি নোটিশ দিয়েছেন। ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। এর মধ্যে যদি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না হয়, তাহলে তিনি ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে না গিয়ে এসব অবৈধ স্থাপনার উচ্ছেদ কাজ করবেন বলে জানান দৈনিক আমার দেশকে।
এলাকাবাসী জানান, রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোসহ অবৈধ দখলদাররা অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। এসব বাড়িঘর উঁচু জায়গাতে করায় নিম্নাঞ্চল এলাকার সাধারণ বাসিন্দারা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন জলাবদ্ধতায়। এছাড়াও বাড্ডা ইউনিয়নসহ ২১ নম্বর ওয়ার্ড বাড্ডা ও মধ্য বাড্ডা এলাকায় রয়েছে জলাবদ্ধতার সমস্যা। রামপুরা ২৩ নম্বর ওয়ার্ডে নেই খেলার মাঠ, বাজার বা কমিউনিটি সেন্টার। এসব ওয়ার্ডের রাস্তাঘাটেরও বেহাল দশা।
সালামবাগে ড্রেনেজ সিস্টেমের কাজ গত দু’বছরেও শেষ হয়নি। পূর্ব রামপুরা মোল্লাবাড়ি রাস্তা, মীরবাগ রাস্তা, পশ্চিম মালিবাগের রাস্তার বেহাল দশা।
২২ ও ২৩ নম্বর ওয়ার্ড রামপুরায় গার্মেন্ট এবং বাঁশের পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট মালিক ফোনে জানান, শুধু চাঁদাবাজির জন্যই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে।
বাড্ডা এলাকা ও ইউনিয়নে চাঁদাবাজি, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার জন্য রিকশাও ঢুকতে চায় না বাড্ডা ইউনিয়নে।
প্রায় প্রতি মাসেই ঘটছে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী খুনের ঘটনা। বছরের শুরুতেই এক মাসের মধ্যে দুইজন খুন। ২৯ জানুয়ারি পূর্ব রামপুরায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে ব্যবসায়ী মো. শহীদুল্লাহ খুন হয়েছেন। গত সপ্তাহে বাড্ডায় খুন হয়েছেন আরও এক ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীরা জানান, সন্ত্রাসীরা কখনও প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে, আবার কখনও টেলিফোনে হুমকি দিচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, চাঁদা না দিলে খুন হয়, অন্যদিকে খুন হলেও মামলা নেয় না থানা পুলিশ। এলাকাবাসী জানান, তারা উন্নয়ন চান না, তারা আগে সরকার তাদের জীবনের সামান্য নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা করুক।
এসব ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে একেএম রহমত উল্লাহর রাজনৈতিক সচিব জানান, স্থানীয় এমপি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। তাই এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না।
দৈনিক পত্রিকা অবলম্বনে..
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।