লিখতে ভাল লাগে, লিখে আনন্দ পাই, তাই লিখি। নতুন কিছু তৈরির আনন্দ পাই। কল্পনার আনন্দ। বিনয়ের অবতার
মোহাম্মদ ইসহাক খান
লোকটির শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে আছে, স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি মাত্রায়। মুখে বিগলিত হাসি।
সমস্ত শরীর বেয়ে বিনয় গলে গলে পড়ছে।
সে অত্যন্ত মিহি স্বরে বলতে শুরু করলো, হুজুর, আপনি আমাদের এই পচে যাওয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া সমাজে শুদ্ধতার প্রতিভূ। আপনার মতো ভাল মানুষ আমি বাপের জন্মে কোনদিন দেখি নি, কোনদিন দেখবও না। আমার গিন্নীকে তো প্রায়ই বলি আপনার কথা, আপনি কত ভাল, কত বড় মাপের মানুষ, অন্য কেউ আপনার ধারেকাছে আসতে পারবে না। কিন্তু মেয়েমানুষ তো, ঘাড় খুবই ত্যাড়া।
বিশ্বাসই করতে চায় না। ছেলেপুলেকেও আপনার কথা বলি, উনার মতো হও, জীবন ধন্য হবে। টাকাপয়সা না হয় না-ই হল, কিন্তু মানুষ তো হবে। আহা হা হা, ভেতরে বাইরে আপনি কত ভাল। আপনার কাছে কেউ কোনদিন কিছু চেয়ে খালি হাতে ফেরে নি।
আজকাল তো সবাই হাড়কেপ্পন হয়ে পড়েছে, হাতের মুঠোর ফাঁক গলে এক ফোঁটা পানিও পড়তে পারে না। অথচ আপনার দিকে চাইলে গায়ে কেমন একটা শীতল বাতাস এসে লাগে; মনে হয়, আমাদের মতো ছাপোষা মানুষদের ছায়া দেয়ার মতো একজন আছে, আপনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে নিরাশ হতে হয় না।
এটা শালা বেঈমানের দুনিয়া। রাগ করবেন না হুজুর, মুখ খারাপ করে ফেললাম। লোকজনের চরিত্র দিনে দিনে কোথায় গিয়ে যে দাঁড়াচ্ছে তা তো দেখতেই পাচ্ছেন।
একেকটা আবর্জনা! অথচ আপনি এর মধ্যেও নিজেকে বাঁচিয়ে চলেছেন, একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বটে! আমি তো আমি হুজুর, আমার মরা বাপও আপনার মতো সচ্চরিত্রবান ছিল না, দিব্যি করে বলতে পারি। এই কিরে কেটে বলছি হুজুর, এই কথা মিথ্যে হলে আমার মাথায় যেন বজ্রপাত হয়, অপঘাতে যেন আমি মারা যাই, আমার ভিটেয় যেন ঘুঘু চরে।
চলে যাবেন হুজুর? বেশ, যান, এই দুপুর রোদে বাইরে বাইরে ঘোরাঘুরি করলে আপনার শ্রী-অঙ্গে কালি পড়বে যে। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। আমার মতো গরুছাগল একশোটা মরলেও ক্ষতি নেই হুজুর, কিন্তু আপনার মতো মানুষদের যদি ভালোমন্দ কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে যে অপূরণীয় ক্ষতি।
যান হুজুর, আপনি বাড়িতে যান। যখনই এই অধমকে স্মরণ হয়, একটু ডেকে পাঠাবেন, আমি চোখের পলক পড়বার আগেই হাজির হয়ে যাবো'খন। ঐ ডাক্তারবাবুকে আমি না হয় বলে দেবো ওবেলা আপনার বাড়িতে একবার যাতে হয়ে আসেন। তাহলে যাই হুজুর? আপনার মতো একজন মানুষকে সাতসকালে চোখের দেখা দেখতে পাওয়াও বিরাট পুণ্যের ব্যাপার। আজকের দিনটিই সার্থক হয়ে গেল।
সালাম হুজুর।
***
রাস্তার একদিকে দাঁড়িয়ে লোকটি কোন রাখঢাক না করে বেশ উচ্চস্বরেই এতক্ষণ প্রশংসা করছিলো। যাকে সে প্রশংসা করে ভাসিয়ে দিচ্ছিল, লোকজনের সামনে সম্ভ্রান্ত পোশাকের সেই তিনি খানিকটা বিব্রতই হচ্ছিলেন। অন্দরমহলে এসব বলতে ক্ষতি নেই, কিন্তু দিনেদুপুরে সবার সামনে? পথচলতি মানুষ যারা, তারা সবাই কেমন করে যেন তাকাচ্ছিল, আবার মুখ টিপে হাসছিল। লোকটির মধ্যে যেন কিছু একটা ভর করেছিল, কিছুতেই থামছিল না, অবশেষে যখন প্রশংসার বাণীর ফাঁকে তিনি বলতে সক্ষম হলেন যে বাড়ি যাবেন, তখন নিস্তার পেলেন।
কাষ্ঠহাসি হেসে বিদায় নিয়ে তিনি যখন বাড়ির পথ ধরলেন, তখন মনে হচ্ছিল, এত বিনয় কোত্থেকে পেলো লোকটা? আজকাল তো এমন দেখাই যায় না। তাঁর মধ্যে যে এতসব গুণপনা আছে, নিজেই তো জানতেন না!
কিছুক্ষণ আগেও খুব লজ্জিত আর বিব্রত বোধ করা সত্ত্বেও তিনি এইবারে ভারী খুশি হয়ে ওঠেন, নিজের অজান্তেই তাঁর চলার গতি বেড়ে যায়। লোকটির কথাগুলো রেকর্ড করে রাখা উচিৎ ছিল, সময়ে সময়ে শোনা যেত। যেমন শব্দচয়ন, তেমনি প্রশংসার তীব্রতা। নিঃস্বার্থ প্রশংসা জিনিসটা আজকাল খাঁটি দুধের মতোই দুর্লভ হয়ে পড়েছে, লোকজনের পেটে বোমা মারলেও একটা ভাল কথা বেরুতে চায় না, শুধু অন্যের বদনাম করাটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।
আহা, অপরের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতেও তো সুখ! এই লোকটাকে আরেকবার ডেকে পাঠাতে হবে।
***
বিপুল প্রশংসাকারী সেই লোকটিও কুঁজো হয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে হেঁটে বাসায় ফিরছিল। বিড়বিড় করে বলছিল, "কঞ্জুস, লম্পট, শুঁটকো বেজন্মা বুড়ো কোথাকার!"
(৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩)
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।