mail.aronno@gmail.com
সম্ভবত, একবারই আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চিড়িয়াখানায়; কম করেও কুড়ি বছর আগে, আর দেড়যুগেরও বেশি একই পরিধির ভেতরে বেড়ে উঠতে উঠতে দেখি, আমার সামনের যে প্রিয় লেজাংশটুকু এতটা বছর আমাকে বাস্তবিক বানর প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে বারবার, তা খসে গেছে; আর এখন আমি হাতির খাচার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনেই ভাবতে পারি, সিংহের গর্জন, বাঘের নিষ্ঠুরতা কিংবা কুমিরের ভরপেট ঘুম, অথবা ভাল্লুকের মাখামাখি বমি, শুধু শীর্ণ হরিণ যখন সময়ে-অসময়ে চোখে চোখ রেখে করুণভাবে তাকিয়ে থাকে, তখন প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলি, আর ফিরে যাওয়া অথবা নতুন করে ফিরে আসা অগুনিত মানুষের ভীড়ের মধ্যে, হঠাৎ চোখে পড়ে যায় সেই ছোট্ট খাচাটা, যেটা কালো কাপড়ে ঢাকা, এবং যা অবশ্যই সরিয়ে নেয়া হবে কোনো না কোনোসময়। ক্রমশঃ সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করে, আমি কিছু দেখতে পাই না, আর কেউ যেন হঠাৎ ধমকে উঠে, কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে নিয়ে যেতে থাকে আরও গাঢ় অন্ধকারে। আমি তার মুখ দেখতে পাই, অথচ চিনতে পারি না। এতটা বছর নিয়ম করে সকাল-সন্ধ্যা যে মুখটা বারবার দেখেছি, সেটা ভুলে যেতে দেখে আমার কেন জানি আনন্দ হয়, কিন্তু ক্রমশঃ যখন আলোর ছটা এসে পড়তে শুরু করে চোখে-মুখে, তখন চমকে উঠতেই হয়, কেননা আমার বুঝতে বাকি থাকে না, রোজকার সেই একই খেলাটি শুরু হতে চলেছে আবার, আর হয়ত এভাবেই একটা গোটা জীবন আমার চিড়িয়াখানার এই পরিধিতে বিপুল বিস্ময়ে শুধু হাতি দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।
অনেক সন্তান আমারও ছিল, ছিল সাদা লেপ, মশার কামড়, কালো মাছি, নির্বিষ-সাপ, কাঁসার গ্লাস, পোড়া মাটি, মাগুর অথবা কৈ মাছ, এমনকী থালা ভর্তি পাতা শাক, শুধু ছিল না মশারী অথবা ছাতা, বছরের পর বছর।
যেবার সত্যি সত্যিই আমাকে নিয়ে আসা হলো চিড়িয়াখানায়, আমি প্রথম দেখেছিলাম একটা কথা বলা তোতা আর দুটি পেখম মেলা ময়ূর। দুই টাকা মূল্যমানের সেই হলুদ প্রবেশপত্রটি, যা আমাকে এইসব দেখার অনুমোদন দিয়েছিল, তার শত শত ঘুড়ি উড়িয়েই কাটিয়ে দিলাম এতগুলো বছর, আর বর্ষণমুখর যে কোনো সন্ধ্যায় খাচার দোড়গোড়ায় বসে বসে মেঘের ভারে নুয়ে আসা আকাশের কাদা চোখে মেখে জেনেছি; এই অস্তিত্বের কোনো দরজাই আজ আর খুলতে পারছে না কেউ, কেবল ভ্রান্ত বিস্ময়ে খাচার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অগুনিত মানুষ একে অপরের উপস্থিতি ও অবস্থান ভুলে গিয়ে, যে যার অবুঝ শিশুটিকে আঙুল উঁচিয়ে দেখিয়ে চলেছে লোহার মজবুত ঘের, বিচিত্র প্রাণীসম্ভার, যার এপার-ওপার বলে কিছু নেই।
হয়ত আমি খরার কথা ভাবতে ভাবতেই এইসব বোধে ঢুকে পড়লাম, এভাবে, অনায়াস; যখন মাথার উপরে সত্যি সত্যিই হেসে উঠেছে রোদ, আর একটু ছায়া অথবা শীতল বাতাসের আশায় কল্পনা করলাম পদ্মার পাড়। অথচ যতদিনে জেনেছি কল্পনা নয়, বরং পদ্মার ধার ঘেষেই এতসব ব্যর্থ চাষাবাদ, কোলাহল; ততদিনে পলিমাটি কেবল মাটির রূপেই মিলেমিশে একাকার হয়েছে মাটির পরতে, আর একেকটি শিশু তাদের নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছে সেইসব মাটি দিয়ে, অপরিপক্ক হাতে। আমি জানতাম, একদিন ঠিক হাতি দেখা হবেই হবে।
যে কোনো হাটবারে যেমন আমার স্বপ্ন ছিল জাদু দেখা কিংবা ভীড়ের মধ্যে, শব্দের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া, তেমন-ই যে কোনো ছুটির দিনেই মনে হতো, আজ বোধ করি চিড়িয়াখানা যাওয়া। আজব এই পৃথিবীতে অদ্ভুত যে ঘোর মানুষের অলীক সুতা চিরকাল অটুট রাখে, আমি দিনের পর দিন সেই সুতাগুলোকেই নিবিষ্ট মনে জড়িয়ে যেতাম মায়াবী নাটাইয়ে। হয়ত খুব কাছ থেকেই আমি শব্দ শুনতে শিখেছিলাম বাতাসের, ফলে ঘুড়ির ডানা চিরকাল খুব সহজেই পোষ মানত আমার বিপুল-বিস্তৃত আকাশে, আর যে কোনো গ্রহান্তর আমাকে বিশ্বাসী করে তুলত জিব্রাইলের ডানায়।
যেবার ‘দি নিউ সোনারবাংলা সার্কাস’ স্কুল মাঠে তার পর্বত সমান তাবু গেড়ে জেগে থাকল পুরো মাস, সেবার দুটি বাঘ ও একটি সিংহের সাথে দুটি হাতিও নাকি এসে তোলপাড় করে গেছে আশেপাশের গ্রাম। আমার গ্রামে প্রতিধ্বনি এসেছিল কেবল, আর একমাসের ঘোষিত ছুটি, স্কুলের প্রতি আমার যে ভয়ানক ক্রোধ তৈরী করেছিল, তা টের পেয়েছিলাম সেদিন, যেদিন স্কুল পুনরায় খুলল, আর আমি সদ্য ভেঙে পড়া প্র্রাসাদোপম বালাখানার ঠাঁট-বাটের মধ্যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বাঘ, সিংহ ও হাতির গু খুঁজে খুঁজে মরলাম।
সোনারবাংলা সার্কাস যেভাবে সেবার চলে গেল, সেভাবে যেন আর কিছুই চলে গেল না জীবনে; আর যেভাবে গোপন ক্ষোভ ফিরে এলো, তা এক জীবন চিড়িয়াখানায় কাটিয়ে, অসংখ্যবার হাতি দেখে দেখেও ফুরালো না আর। হয়ত তারা, যারা আমাকে বড় করতে চেয়েছিল বড়দের মতো, তারা বুঝতেই পারেনি, আজীবন তারা আমাকে কেবল ছোটই করে গেছে বড়দের মতো, আর তাই পরবর্তী জীবনে চিড়িয়াখানার বাইরে আর কোনোকিছুই দেখা হলো না, সেভাবে।
তোতাপাখিটি কথা বলেছিল, আর পাশেই ময়ূর পেখম মেলে দিলে আমি হাততালি দিলাম, যেনবা পরম বিস্ময় আমাকে উজ্জীবিত করল নতুন বোধে যে, এই পৃথিবীর প্রাণীরা অভিনয় জানে না, আর ফলতঃ তারা কখনোই মারা যায় না। অথচ বছরের পর বছর অগুনিত মানুষের বহুবিধ চোখের রং যখন নিত্য-নতুনভাবে বদলে দিতে থাকল তোতার ভাষা, ময়ূরের পাখনার রং, তখন জেনেছিলাম, প্রবেশমূল্য দিয়েই মানুষ ঘুড়ি ওড়ায়, আকাশের বুকে ফসল ফলায়; আবার প্রবল বন্যা অথবা ঝড়ে তারা শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়া তোতাটির মতই কাঁদে, যাকে সে প্রদশর্নীতে এনেছে দুই অথবা ততোধিক মূল্যমানে। আমার জন্মদাতার দাঁতগুলো হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলে, আমি বারবার নিজেকে শুধু এই জানাই, চিড়িয়াখানার বাস্তবিক আর দ্বিতীয় কোনো নাম নেই।
ছোট ভাইটা তখনও জন্মায়নি, অথবা হয়ত জন্মে ঘুমিয়েছিল, আর বড় বোনটি নাচতে নাচতেই দেখে সারলো গোটা চিড়িয়াখানা। তাকে ঈর্ষা করার কারণ আছে বৈকি, কেননা মা-এর ছায়ার পাশে পাশে আমি হাঁটতে হাঁটতে বেশ টের পাচ্ছিলাম, তিনিও যেমন আমিও তেমন, দু’জনেই বাদামের খোসা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে খুব সন্তর্পনে এগিয়ে চলেছি, পাছে শব্দ হয়, আর যে আসছে বা এসে গেছে, সে এমন অনাকাঙ্খিত সময়ে যেন না জেগে যায়, কেঁদে ওঠে; অথচ খুব হাস্যকর এই যে, সে আপনা-আপনিই জেগে উঠল, আর টালমাটাল পায়ে এগিয়ে গেল জিরাফের খাচায়। আমি, মা, এইসব দেখলাম, আর বড় বোন, জন্মদাতা হাসল, হাততালি দিল, যখন ছোট ভাইটির অদৃশ্য থেকে আরও খানিকটা বাকি ছিল চিড়িয়াখানায় সম্পূর্ণ নেমে আসা।
একটা গোটাদিন এইভাবেই কেটে গেল, কিংবা একটা গোটা শতাব্দী অথবা শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যেতে থাকল এভাবেই, আর বিকট সব সাপ তাদের কুন্ডলী ছাড়িয়ে আলসেমীর শরীরের বাঁক সোজা করতে করতে জিভ ছুঁইয়ে দিল ঠোঁটে, চোখে, মুখে। কী আনন্দ আমাদের, কী পুলক, যেনবা কাচ নয়, এমন ঘোর বিস্ময়-ই আমাদের বাঁচিয়ে দিল চরমভাবে, অথচ বিষের সহজাত গমন কখন যে তার সরল পথ খুঁজে নিয়ে ঢুকে পড়ল প্রিয় নিদ্রায়, টেরও পেলাম না।
মা আমাকে কাছেই টানল আরেকবার, বারবার, বহুবার; যেনবা তিনি খুব ভালো করেই জানেন, জাদুকর জাদু নয় খেলা-ই দেখায় বেশি। একটা বীণের আক্ষেপ আমার সেই থেকে, একটা প্রকান্ড হান্টারের লোভ যেন আমার আপ্রাণ। যে তেজী ঘোড়া এখনও রোজ স্বপ্নে এসে তার বেপরোয়া খুরের শব্দে কাঁপিয়ে যায় চরাচর, তার পিঠে ক’ঘা মারব বলে যেই তুলে নিই হাতে, অমন-ই একদল কবুতর ডানার ফটফট শব্দে মুখরিত করে তোলে খাঁচা। স্বপ্ন থেকে তখন আমার শরীর অর্ধেক বেরিয়ে ঝুলে থাকে শূন্যে, আর অর্ধেক ঢুকে থাকে সেই অজগরের মুখের ভেতর, যা দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল; যা নাকি শুধু আস্ত মানুষ নয়, পৃথিবীও গিলে খায়।
ভয় আমি কোনোদিনই পাইনি, শুধু যে মৃত পাখিটি পড়েছিল রাস্তার ধারে, ঘাসের মধ্যে, আর অসংখ্য পিঁপড়ের দল সার বেঁধে এসে খুবলে খুবলে নিয়ে যাচ্ছিল পচে আসা মাংস, সেই পাখিটির উপড়ে ফেলা চোখ মনে হলেই ঘুম ভেঙে যায়।
এতসব শব্দ, হাত-পা, চোখ-মুখ, মাথা সব শস্যদানা হয়ে মেঝেয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে পালক ওঠা বিদঘুটে শকুনের খাচায়। আমি আর মা দাঁড়িয়ে থাকি ময়না পাখির সীমাহীন মায়ায়, আর শত শত শিশু হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে কাগজের মেলায়। রং-বেরং-এর কাগজ, লাল-নীল-সাদা-বেগুনী, সব একাকার হয়ে পৃথিবীর এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে ঘিরে থাকে আকাশের সীমারেখা।
কোনো এক বোবা ভাষায় আমাদের কথা হয়, কথা হয় গর্ভের গভীরে আমি বা আমাদের পরম বেঁচে থাকার, আর ঠিক তখনই সেই কালো পর্দাটা হুট করে তুলে দেয়া হয়। লোহার বড় বড় গরাদ আর সিমেন্টের বাঁধানো ঘেরাটোপের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে থাকি নির্বাক, আর আমার সামনে অসংখ্য মানুষ ও একজন খাঁচা-রক্ষক ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে থাকে যুদ্ধ, হত্যা, মানুষের হাড়, পাখির পালক, বর্ষার মেঘ, কাল-বৈশাখী ঝড়, ভয়াল বন্যা, ভিক্ষার থালা, দুভির্ক্ষের হাহাকার, মহামারী রোগ, নিষিদ্ধ স্বপ্নাচার, কাকের ডাক, কাফনের কাপড়, আর শত-সহস্র শিশুর হৃদয় বিদারী চিৎকার, যার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি ও আমার জন্মদাতা, দু’জনেই মুখোমুখি হেসে উঠলাম প্রথম ও শেষবার!
অরণ্য
ঢাকা, বাংলাদেশ
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।