mail.aronno@gmail.com এ সে সময়ের কথা, যখন আমার আকার আমারই প্রতিপক্ষ হতে শুরু করেছে, আর নিজের সাথে যুদ্ধ শিখতে শিখতে হয়ে উঠছিলাম দক্ষ-সৈনিক, যে কিনা নিজেই নিজের প্রতিপক্ষ, নিজের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে, নিজেকে নির্মমভাবে হত্যা করে, আবার বাঁচিয়ে দেয়, জয়ী হয়ে উল্লাস করে, কিংবা পরাজিত হয়ে কাঁদে, নিরবে। এ তখনকার কথা, যখন আমি প্রচন্ড রকমের নির্দয়, আবার নিজেরই সীমাহীন আবেগের কাছে অসহায়। আমি যতটা বুঝতে শিখছিলাম, ততটাই অবুঝ হয়ে উঠছিলাম ভেতরে ভেতরে, আর মানুষের মুখোচ্ছবিগুলো এক এক করে হারিয়ে ফেলছিলাম, ক্রমাগত। এ সেই চরম সংকটাপন্ন সময় নিয়ে লিখিত ডায়েরীর কয়েকটি ধুসর পাতা, যার প্রাথমিক ও পরিবর্তিত রঙের মধ্যে পার্থক্য নেই কিছু, অথচ মধ্যবর্তীকালীন সময়ে রয়ে গেছে অসংখ্য বর্ণিল আলোকছটা, যা মাঝে মধ্যেই ছিটকে ঢুকে পড়ত টিনের চালের ফুটো দিয়ে, কিংবা খড়ের চালার পুরোনো ও হালকা হয়ে আসা ছাউনী ভেদ করে। আমার আকার, যা শরীরের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে সময়-অসময়ে মিলিয়ে যেত বাতাসে, সে সময়েই কীভাবে যেন প্রেমে পড়েছিলাম নিজের, আর ছোট্ট একটি আয়নার পরিসীমায় বেড়ে উঠতে শুরু করেছিল রোজকার বেঁচে থাকা।
মূলতঃ, এ হলো আয়নায় বাস করা এক বালকের গল্প, যে কিনা আয়না থেকে বেরিয়ে আসার পর হয়ে পড়েছিল অন্ধ।
একটি আয়না, প্লাস্টিকের হাতল, চারপাশে প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো, সামনের দিকে অস্বচ্ছ কাচ, আর পেছনে কোনো নায়িকার রঙিন মুখ, যা কখনোই সামনে আসতে পারত না, কিন্তু, প্রতিনিয়ত পেছনে চুপচাপ লুকিয়ে থাকা এই মুখটির ঠিক উপরেই প্রতিফলিত হত পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের মুখ। কেউ খেয়াল করত কিনা জানি না, তবে আমি প্রতিবারই সেই সুন্দর রঙিন মুখটা আগে দেখে নিতাম, তারপর আয়না সিধা করে মুখের সামনে ধরতাম। অস্বচ্ছ, ঢেউখেলানো যে প্রতিবিম্ব সেখানে তৈরী হত, তা থেকে তখনও এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে শিখিনি, প্রতিবিম্ব যে কাচেই প্রতিফলিত হোক না কেন, বস্তুত তা নির্বোধ। যতই সে আমার চোখ পাকানো, নাক-মুখ বাঁকানো, অথবা ভেংচি হুবহু নকল করুক না কেন, তাকে প্রশ্ন করলে কিছুতেই বলতে পারবে না, কেন সে নিজেকে লুকাতে পারে না, কখনও?
আমি সেই আয়নাটির গল্প বলছি, যা প্রায় কুড়ি বছর আগে দাদীর ঘরে মাটির তাকে রাখা থাকত, পাশেই থাকত ময়লা চিরুনী আর সরিষার তেলের খুরি।
মাঝে মাঝে পিতলের সুরমাদানটাও রাখা হত, তবে আতরের শিশি দাদী সব সময়-ই রেখে দিত তালা ঝোলানো বাক্সে, কেন না যে কোনো প্রকারের তুলাখন্ড আমার হাতে আসুক না কেন, তা ভিজিয়ে নিতে দেরী হত না। আমার এই উদরতাই দাদীকে হতে শিখিয়েছিল কৃপণ, পক্ষান্তরে দাদীর বাড়তে থাকা কৃপণতা আমাকে করেছিল বাঁধাহীন, দুরন্ত। মাটির তাকটা বেশ উপরেই ছিল, যার নাগাল পেতে নিজেকে পায়ের ডগা অব্দি উঁচু করতে হত, বেশ কিছুবার লাফাতে হত, এবং এই প্রক্রিয়ায় যখন তার নাগাল পেতাম, তখন একছুটে বাড়ির পাশের আমবাগানের নির্জনতম জায়গায় পৌঁছে যেতাম। প্রথমে আয়না উল্টো করে দেখতাম। একটা গোলগাল নারীমুখ, সম্ভবত ভারতীয়, দারুণ সুন্দরী, দেখতে ভালই লাগত, কিন্তু আমি তার দিকে বেশিক্ষণ মনোযোগ দিতে পারতাম না।
আমার সম্পূর্ণ মনোযোগ একত্রিত হতো যখন আয়নাটি সিধে করতাম, এবং নিজের মুখটা সেখানে ভেসে উঠত। এ যেন আমার জীবনের সবচেয়ে তৎপর্যপূর্ণ সময়, যখন মানুষ তার গভীর আবেগের সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে শুরু করছে, এবং নিজের আকারপ্রিয়তা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে নিজেকে চিনতে শিখছে। যেহেতু এক জীবনে মানুষ যতবার গভীরভাবে নিজের মুখ দেখে, ততবার আর কিছুই দেখে না, ফলতঃ চাক বা না চাক, মানুষ নিজের অজান্তে নিজেকেই সর্বপ্রথম নিজের বলে চিনতে ও বুঝতে শেখে, আর নিজের প্রতি অজানা এক প্রেমে আবিষ্ট হয়, যা থেকে সে আজীবন মুক্তি পায় না, এবং সারাজীবন ধরে অজান্তে বাড়তে থাকা এই প্রেমের রেশ তাকে নতুনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার মানসে অন্য কারও প্রেমে আকৃষ্ট করে, যখন আমরা ভুলে যাই, অপর ব্যক্তিটিও অনুরূপ প্রেমের রেশে আবিষ্ট, এবং সেও চায় নিজেকে নুতনভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে, যা কিনা দুটি মানুষের সম্পূর্ণ বিপরীতার্থক মানবিক প্রয়াস, যেখানে দু'জনেই নুতন করে কেবল নিজকেই ভালবাসতে চাইছে।
এতসব তখন বোধে ছিল না, আর সত্যি বলতে, সেটাই ছিল আমার প্রথম প্রেম, আর নিজের মুখ প্রেমসমেত এত-শতবার দেখেছি যে, ছোট্ট আয়নাটি হয়ে উঠেছিল পরম প্রিয় বস্তু, যা কিনা আমাকে আমার বাধ্যানুগত অবয়বব দেখাত, আত্মবিশ্বাসী করে তুলত, এবং নিজ আকারের প্রেমে রাখত বিমুগ্ধ। হয়ত সেই শুদ্ধতম সময়েই হৃদয়ের নির্মল অনুরাগে দেখা নিজের প্রকৃত অবয়ব আমার মর্মমূলের গভীরে চিরকালীন অবয়বের এমন এক প্রতিফলন রেখে গেছে যে, আজ এত বছর পরও নিজের সম্পর্কে যে কথাটি বলতে পারি নির্দ্বিধায়, তা হলো, "একটি বালক যে কখনও বেড়ে ওঠেনি।
" এ আমার নিজের সম্পর্কে বলা সেই সত্য কথা, যা কিনা আয়নার মুখ থেকে শুরু হয়ে নিজের বাস্তবিক মুখ অব্দি গড়াতে পারেনি আজও, ফলে সেই সময়ের বালকটিকে আমি দোষ দিতে পারি না, যে কিনা নিজেকে মুখ ভেংচিয়ে ভেংচিয়ে জেনেছিল, "আমি যা কেবল তাতেই সন্তুষ্ট হতে পারি, আর যে আমির সাথে সবচেয়ে গভীর পরিচয়, অসম্ভব তার থেকে দূরে যাওয়া। " ফলতঃ একটি বালকের মধ্যেই যেন রয়ে গেল এ যাবতকালের বেঁচে থাকা।
এ আমার জীবনের এমনই এক বাস্তবতা, যা নিজের সাথে নিজের অজান্তেই ঘটে গ্যাছে, যা মায়ের এমন শান্ত অথচ গভীর উৎকন্ঠামিশ্রিত প্রশ্নের সমুখে এসে চমকে উঠে, "কবে বড় হবি তুই, বাবা?" আমি নিরব হয়ে যাই, আর নিজেকে নিয়ে শংকিত হয়ে উঠি, যা অনাকঙ্খিত আত্ম-প্রতীজ্ঞার চরম দায়ভার প্রতিবারের মতই নিজের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মুক্তি পেতে চাই। অথচ প্রতিবারই কীভাবে যেন আমি বার বার ফিরে এসেছি নির্জন সেই আমবাগানে, ছোট্ট আয়নায় প্রতিফলিত একটি বালকের মুখের কাছে, যার সামনে বসে আমার সমস্ত কথোপকথন, আর নিজেকেই নিজেকে চিনিয়ে দেয়া। নিজের মুখের সামনে বসে থাকার আনন্দ ও তীব্র ইচ্ছে সত্যিকার অর্থেই আমাকে বেরিয়ে আসতে দেয়নি সেই আয়নার পরিসীমা থেকে।
আমার থেকে উঁচুতে বাস করা আমারই প্রতিবিম্বের আবাস, সেই মাটির তাক, যাকে নাগাল পাবার তীব্র মানসিক ইচ্ছে, যা কিনা কোনোরূপ দ্বিধা বা সংকোচ ছাড়াই ফিরিয়ে দিত বরাবরের সেই মুখ, হাসি, কান্না, কথা অথবা নিজস্ব অভিমানের রঙ, যেখানে কখনও কখনও আমি নিজেও হয়ে উঠতাম নিজের মা, আর নিজেকে খুব সন্তপর্ণে প্রশ্ন করে বসতাম, "এই ছেলে, তুমি বড় হবে কবে?"
হয়ত নিজেকে নিজের করা জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটিই শেষ অব্দি সব টানাপোড়ের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, এবং আমারই অজান্তে আমার শৈশবকে ঠিক যেন আয়নার প্রতিবিম্বিত রূপসমেত বাঁচিয়ে রখেছে আজও, যেখানে আমি নিজেই নিজের পিতা-মাতা, যে তার সন্তানকে দিনের পর দিন এমন আড়লে বাঁচিয়ে রেখেছে, অবিকল। কিন্তু, এ তো এক বন্দী দশা, যখন আত্মা, হৃদয়, বুদ্ধি, বিচার যাবতীয় কখনও না কখনও নিজস্ব স্বভাবে জেগে ওঠে, জানান দেয়, এখন ২০১২, ঘড়িতে এ্যালার্ম বাজছে, অফিসের বাস মিস হবে, সকালের নাস্তা খাওয়া হয়নি, জামা-কাপড় ময়লা, দাড়ি কাটতে হবে, টাইয়ের নব আরেকটু সুন্দর হওয়া চায়, আর সময় মতো পৌঁছে যেতে হবে কাজে। আমাকে জানিয়ে দেয়া হয়, যত অন্ধই হও না কেন, কোনো না কোনোভাবে তোমার অবয়ব হারিয়ে ফেলেছ তুমি নিজেই। আমার কষ্ট বেড়ে যায়, অস্থির হয়ে উঠি, সময় থেকে বেরিয়ে আসার নিরন্তর প্রচেষ্টায় আমি বরং কোনো এক সকালে চুপচাপ বসে থাকি বাড়ির পাশের বিশাল দীঘিটার পাড়ে, নিরব ও শংকিত, আর দূরে তাকিয়ে থাকি সেই কেন্দ্রবিন্দুতে, ভেঙে যাওয়া আয়না খন্ডগুলো যেখানে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, এবং ক্রমশঃ ধাববান ঢেউয়ের বৃত্ত এগিয়ে আসছে আমাকে পরিধির মধ্যে টেনে নিতে।
অরণ্য
২৫.১০.১২
ঢাকা, বাংলাদেশ ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।