ভালোকে আমার ভয়,ভালো বেশীদিন থাকবেনা... মন্দকে আমার ভয়, কেননা আমি দুর্বল, আঘাত সইতে পারবোনা... সাফল্যকে আমার ভয়, ব্যর্থতাকেও ভয়... নিরন্তর ব্যস্ততার মহাকালে আমার করণীয় কিছুই নেই... যোগ্যের পৃথিবীতে আমি অযোগ্য, অধম...
ব্যাটা ভেবেছিল দেখতে পাইনি। কাঠের একটা ছোট্ট গেইট দিয়ে ঢুকে চুপ মেরে আছে। কাজটা খারাপ করেনি। প্রকাশ্যে কাজটা করার চাইতে যদি কোন জনমানবহীন জায়গায় এই রাক্ষসের চোখ দুটো উপড়ে নিতে পারি, সুবিধাটা আমারই। খেইল তুমি ভালো খেলতে পারনি বাছা, নিজেকে নিজেই চেক দিয়ে বসে আছো।
ক্লাসে বসে স্যারের বকবকানি শুনছিলাম। অনেক দিনের পুরনো শত্রু মাথাব্যাথা। সপ্তাহখানেক হল মাথাব্যাথাটার জন্যে একটা নতুন ড্রাগ নিতে শুরু করেছি। এটা খাবার পরপরই ব্যাথাটা প্রচণ্ড রকম বেড়ে যায়। তারপর কমে যেতে শুরু করে।
ব্রেনে কেমন একটা স্টোয়িক ভাব চলে আসে। এখানকার ক্লাসগুলোতে পারমিশন নিয়ে বের হবার মতো ভদ্রতার বালাই নেই। ভালো লাগে তো বসো। অর ইউ আর অলঅয়েজ ওয়েলকামড টু লিভ দ্যা প্লেস।
স্যারের সামনেই ড্রাগ নেয়া এবং গটমট করে বেরিয়ে যাওয়া।
ল্যাবের সামনে মাথায় হাত চেপে ধরে বসে ছিলাম। গ্রাউন্ডে পরিচিত একটা মুখ। জাভেদ। নাহ, এ আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবেনা। যে মানুষটাকে সবসময় ক্ষেপাই তার মেজাজ বলতে কিছু নেই তাই, সেও আজকাল বড্ড বাড়াবাড়িতে নাম লিখিয়েছে।
প্রতি মুহূর্ত ঝগড়া এবং বাক্য ছোড়াছুঁড়ির কথা আপাতত বাদ দিলাম।
ক্যাম্পাসে আসার পথেও ঝগড়া হয়েছিল। ব্যাগে করে কাঁচা মরিচ নিয়ে এসেছিল কোত্থেকে যেন। একটা একটা করে তুলে আমাকে দেখাচ্ছিল দূর থেকে, রাগানোর ফন্দী । ইচ্ছে করছিল নাকের উপর একটা ঘুষি বসিয়ে দেই।
এসব ড্রামা পছন্দ করিনা একদম।
গালি দিয়ে ঝাল ঝাড়ার জন্যে যেই হাত ধরে টেনে ওকে গেইটের বার করলাম, হারামিটার দেখা...!! আমার চাচা ইতরটা। এই শয়তানটার দলে মনে হয় মশামাছি কাজ করে। নইলে যেখানে যাই, খবর পেয়ে পৌঁছায় কি করে? এর জ্বালাতনে দেশ ছেড়ে সপরিবারে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে। তবু শান্তি নেই।
জাভেদের হাত ছেড়ে ওই বজ্জাতটার রক্তচক্ষুকে খুঁচিয়ে নষ্টরক্ত বের করার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়নি একটুও। সব ফেলে ঝাড়া দৌড় বদমাশটার দিকে। প্রথমে ভাব ধরে দাঁড়িয়েছিল। আমার হাতের মুঠোয় খুব শক্ত করে ধরে রাখা আমার অতি প্রিয় ফাউনটেন পেনের সুচালো মাথাটার দিকে চোখ পড়তেই কি ভেবে সেও পিছু ঘুরে দৌড়। সামনে একটা সাক্ষাৎ ইবলিশ, পেছনে আমি, মানুষ।
প্ল্যান যা করার এখনই করে নিতে হবে, হাতে সময় কম। পালিয়ে গেলে আর কবে পাই কি জানি। আমিও ভেতরে ঢুকে পড়েছি। সুযোগ হাতছাড়া করা যাবেনা, কিছুতেই না।
শেষ বিস্ময়টুকু মনে হয় এখানেই জমা ছিল।
এমন মনোমুগ্ধকর জায়গা আমি এর আগে কোথাও কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছে স্বর্গে এসে পড়েছি। পাশে একটা ঝর্না, পাথর কেটে বয়ে যাওয়া পানির স্রোতের পথটুকুর পাশে ফুটে আছে অসংখ্য বুনোফুল। নিজের উপরে খুব রাগ হচ্ছে। কারণ, শয়তানটাকে এখন আমার কিছুই করতে ইচ্ছে হচ্ছেনা।
মনে হচ্ছে আপন কেউ। ওকে মেরে লাভ কি। উফ, কি ভাবছি এসব? আঙ্গুলের ডগায় এই শয়তানটার রক্ত ছুঁয়ে দেখার কি প্রবল ইচ্ছে ছিল...! সব গেলো কোথায়??
মাথাব্যাথাটা পালিয়েছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি চারপাশ। আমি মুগ্ধ, অভিভূত।
ওই শত্রুর চোখেও যা দেখছি, সেভাবে কোন অমানুষ প্রকৃতি দেখতে পারেনা। লোভের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে গিয়ে সেখানে নীরবে সৌন্দর্যের পুজা চলছে।
পাশে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরলো। কি আশ্চর্য! শত্রুর হাতের মতো লাগছেনা, ঠিক যেন বাবা তার মেয়ের হাত ধরে সামনে এগুতে চাচ্ছে। একটু একটু করে দেখছি।
হাঁটছি। আকাশে রংধনু। আমি এর আগে কোনদিন রংধনু দেখিনি। আমার দরজার সামনের সিঁড়িতেই আমার পৃথিবী ছিল। সেই পৃথিবীতে নীলাকাশ ছিলোনা।
সবুজ আকাশ দেখতে পেতাম। পাতার আকাশ। সেখানে মাটি ছিলোনা। পায়ে পায়ে জড়িয়ে ছিল ঝরা মেহগনি ফুলের স্পর্শ। এখানে আকাশ আছে।
রংধনু আছে। নরম কোমল মাটি আছে। শত্রুতা মরে গেছে। আছে মিত্রতার জন্মোৎসব, যেন হাজার বছর ঘুরে একবার আসে এই উৎসব।
কালো রঙের ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে একটা সুন্দর মেয়ে কি যেন বলছে।
চিবুকটা বুকের একদম কাছে। ফলকের নিচের দিকে একটা ঢাকনা, খুলছে ধীরে, ধীরে। ভয় পেয়ে দৌড়োতে যাবো, পারলাম না। হাতটা ধরা-ই আছে। বিপদ দেখে আমাকে ফেলে যায়নি কেউ।
ঃচলো আমার সাথে।
আমাদের অবাক করে দিয়ে মেয়েটি ওকে অনুসরণ করার ইশারা দেয়। আমি হাঁটতে শুরু করি, না , আমি নই, আমরা হাঁটতে শুরু করি।
একটা টেবিল।
গাড় নীল রঙ্গের তরল।
ছোট্ট একটা দানীতে রাজ্যের সব নীলের লুকায়িত উচ্ছলতা একসাথে ধরে রেখেছে , দেখার শেষ হচ্ছেনা, মনে হচ্ছে এর আগে আমি কোনদিন নীল রঙ দেখিনি।
ঃ এসো। এখানে তোমার আঙুল ডুবাও।
মিষ্টি তবু তীব্র আদেশ। অমান্য করতেও সংকোচ হয়।
ঃ এই খাতায় তোমার প্রিয় মানুষটির নাম লেখ।
ঃ কেন?? কিছুটা বিস্ময়ের সাথে আমার প্রশ্ন।
ঃ এটা এখানকার নিয়ম। এখানে যারা আসে, সবাই নাম লিখে যেতে হয়। এই যে দেখো।
একি?? এখানে আমার নাম কেন?? কে এসেছিল এখানে যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির জায়গায় আমার নাম লিখে গেছে!!! জানতেও পারলাম না...!!
বুকের ভেতর একটা অসীম শূন্যতা উন্মাদ নৃত্য জুড়ে বসলো। নামটা লিখে দিলাম দু'চোখ বুজে।
আমার পরম মিত্রটিও নাম লিখলো। আমারই নাম...!!! বিধাতা, আজ কি একটু বেশি বেশি খেলে ফেলছো না আমার সাথে??
গুহার উপরে নিচে জোনাকির মতো অজস্র আলো। মিটিমিটি।
যেন শান্তির অস্থির রুপ। স্নিগ্ধ জীবনবোধ। যেন বেঁচে থাকার আনন্দের সামনে দাঁড়িয়ে বাঁধাই করা আয়না। সবগুলো ঘড়ি এখানে থেমে আছে। এদিকে অদিকে আমার মতই অনেকগুলো অবাক হওয়া হৃদয় ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
থরে থরে সাজানো সুরা। চারদিকে প্রাণ আর প্রাণের বসন্ত।
একদল মানুষ হাত ধরাধরি করে নাচছে। একজন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ, একজন অন্ধ ভিখারিনী, ফুটফুটে একটি শিশু, পীঠের মাঝ বরাবর বেণী ঝোলানো এক কিশোরী, সদ্য ক্ষুর কামানো মুখ নিয়ে এক তরুণ। কোন ভেদাভেদ নেই।
পড়ন্ত বিকেলে মায়ের ঘরে ফেরার ডাকে বিরক্ত হয়ে খেলায় ব্যস্ত শিশুরা ক্ষান্ত দেবার আগে যেভাবে চরম আনন্দটুকু নিংড়ে নিয়ে নিতে চায়, ঠিক তেমন।
আমার মিত্রও হাসছে, গাইছে। ইয়া বড় একটা থালায় ভরপেট খানা খেয়ে থালার উপরেই গুটিয়ে ঘুমোচ্ছে। নাকের ভেতর কাঁচি ঢুকিয়ে লোম কাটার জন্যে দূর থেকে কতো মজা করেছি তাকে নিয়ে, তার সেই থ্যাবড়া নাকটা এক ফোঁটাও বাজে লাগছেনা দেখতে।
ভালো লাগা।
ভুলে গেছি জীবনের সব কষ্ট মাখা অতীত। কাছে ঘনিয়ে আসা দিনগুলো নিয়ে ভাবনা হচ্ছেনা। যেমন স্বপ্ন দেখতাম, তার চেয়েও বেশী কিছু চোখের সামনে। অভাব নেই, কারো অভিযোগ নেই, নেই কান্নার নোনাজল। তবু শুন্যতা মনের ভেতর, আমার কি যেন নেই...!!
একটা শব্দ।
একবার... দুইবার... তিনবার... ঢং...! ঢং...!! ঢং...!!!
মানুষগুলো এরকম করছে কেন? এমন হাঁপাচ্ছে দেখে মনে হয় কেউ যেন একটানে শরীর থেকে বের করে নিয়েছে সমস্ত অক্সিজেন।
বৃদ্ধ মানুষটার দাড়ি খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে।
ভিখারিনীর অন্ধ চোখ বেয়ে নেমে এলো দুটো ব্ল্যাক মাম্বা।
নাদুস নুদুস বাচ্চাটার চামড়া শুকিয়ে টেনে হাড়ের সাথে লেপটে যাচ্ছে।
কিশোরীর পিঠে দোলা বেণীর জায়গায় একে একে বিঁধে যাচ্ছে অসংখ্য তীরের ফলা।
যুবকের ক্ষুর কামানো মুখটা নিয়ে মাথাটা বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।
আমার মিত্র থালার উপরে চিত হয়ে পড়ে আছে। তার পাশেই একটা নালা তৈরি হয়েছে। গলগল করে তার বুকের পাঁজর পিশে চুয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রমিথিয়ামের মতো তীব্র জ্বলজ্বলে পদার্থ।
আমি মারা যাচ্ছি।
ওদের মতো আমার কিছু হচ্ছেনা। শুধু বুকের বামপাশটায় উজ্জল থেকে উজ্জলতর হচ্ছে একটা ছোট লাল বাতি। আর হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছে শূন্যতা। আমার কি নেই?? কি নেই???
ঘড়ির কাটাগুলো প্রবল বেগে ঘুরতে শুরু করছে। ওগুলোর শব্দে কানে আঙ্গুল চেপে পালাচ্ছি।
মিত্রকে সঙ্গে নেবার সময় নেই আমার। হৃদপিণ্ডের উপর বাতিটা এখন স্পষ্ট। কিসের সংকেত দিয়ে যাচ্ছে ওটা?? আমার কিসের শূন্যতা? কি নেই???
সময় ফুরিয়ে আসছে। শেষ চেষ্টা করলাম। দুর্বল শরীরের সর্বশেষ শক্তি দিয়ে গেইটটা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে এলাম, যেটা নিজ হাতেই বন্ধ করে দিয়েছিলাম শত্রু বোধের আকাঙ্ক্ষায়
শ্বাস নিতে পারছি এখন।
গেইটের বাইরে প্রবল ধাক্কা খেলাম কারো সাথে। ক্ষীণ চোখ মেলে দেখতে পাই মাথার সবগুলো চুল সাদা। একজন বৃদ্ধা কিছু একটা হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। ওই খাতাটায় প্রিয় মানুষের জায়গায় ওনার নামটাই তো লিখে এসেছি। আমার মা...!! এতো বৃদ্ধ হলেন কি করে?? আমার জন্যে হলেও কি একটু ভালো থাকা যেত না??
..................
জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
গত কয়েকদিন হল ঝগড়া করে কথা কম বলছিলাম সবার সাথে, মায়ের সাথেও। এই স্বপ্নের মানে কিছুই বুঝিনি। শুধু বুঝতে পেরেছি আমার বুকে জ্বলতে থাকা লাল আলোটি ছিল বিবেক, যা আমাকে ক্ষমা না চেয়ে মরতেও দেয়নি। মনে করিয়ে দিয়েছে আমার শূন্যতা।
কান্না শুনে আম্মু ঘুম থেকে উঠে আসে।
মাথায় হাত রেখে বলে
ঃকি স্বপ্নে দেখছিস ?? কাঁদিস কেন??
আমি বলিঃ
ঃকিছু না মা... ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।