পিতা
ঐ ঐ ঐ নিচে দেখতে পাচ্ছি জিয়া সারকারখানার তালগাছের চেয়েও উঁচু আরো উঁচু স্তম্ভটি ধারালো আলোয় ঝকঝকে বর্শার মতো আমার দিকে তার তীক্ষ্ম ও একমাত্র দাঁতটি হ্যাঁ করে আছে বিকেল সাড়ে চারটার গোলাপি রোদে। আমরা হাজার মাইলবেগে তার উপর দিয়ে ছুটে গেলাম। মেঘ ফাটিয়ে বেরোনো গোলাপি আলোয় পৃথিবীটা ভাসছে সুবিশাল ও নীল আকাশের নিচে। পাইলটের পাশে বসে আছে মা, আমি পেছনের একটা সিটে, প্রাইভেট বিমান, সিক্স সিটেড, এম্ফিবাস এয়ারবাস।
এই ফাঁকে অন্যবিষয়ে বলে নি।
আমাদের বাড়ি থেকে নানা বাড়ি দক্ষিণ-ও- অল্প-পশ্চিম দিকে দিগন্তের অপর পাড়ে। পথ চলে গেছে আঁকাবাঁকা আলে আর গোপাটের উপর দিয়ে। আর আমরা যেখানে থাকি আশুগঞ্জ উত্তর-ও-অল্প-পশ্চিম দিকে । পথ চলে গেছে চলে গেছে সোজা উত্তর দিকে এগিয়ে তিনবার পশ্চিমে অল্প বাঁক নিয়ে। আর নদীটা যেনো দূর উত্তর পূর্ব দিগন্ত থেকে বয়ে এসে আমাদের বাসস্থান ছূঁয়ে ক্রমে বৃত্তাকারভাবে পশ্চিমে আবার একটু বাক নিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে এবং নানাবাড়ি ছুঁয়ে চলে গেছে আরো দূরে।
আকাশ থেকে দেখলে মনে হতে পারে নদীটা গাণ্ডিব আর তীর পশ্চাত প্রান্তটি ১৫০ ডিগ্রি করে টেনে ধরা ছিলার মাঝখানে আমাদের গ্রামের বাড়িটা। নদী পথে আমার অনেক স্মৃতি কিন্তু নানা বাড়ি থেকে আসার পথটা নদীর । আর প্রায় আমি সাধারণত নদীর তীর জুড়ে অনেক বড় বড় শিল্প কারখানার নীলচে সবুজ রঙে ছোপানো বহু উচু উচু বিশাল বিশাল ঘর জলের দিকে ঝুঁকে থাকতে দেখতাম। নানাবাড়ি থেকে আমি আসলে সবসময়েই উড়ে আসতাম দুটি হালকা কর্কশিটকে বগলে আকড়ে আমার ডানা বানিয়ে আর নিচে এসব কারখানাকে দেখতে পেতাম, আমার অদ্ভুত ভাল লাগতো। কিন্তু এসব কারখানা আমি ছাড়া আর কেউ কোনদিন দেখতে পায়নি যে এটা সত্যি।
কর্কশিট হালকা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে উড়তে প্রথম প্রথম আমাকে বেশ কষ্ট করতে হতো। হাঁপিয়ে ঘেমে নেয়ে উঠতাম। আমি নিজেও এসব এলাকায় অনেক ঘুরেছি হাঁটাহাঁটি করেছি খুজেছি কারখানগুলো কিন্তু তাদের দেখা পাইনি। দুইপার ঘেষে কেবলি গরীব মানুষ, মাঝি, আর অনেক ভাঙা খড়োঘর এখানে ওখানে নদীর তীর থেকে দুরে দূরে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি। ছেড়া আচল দিয়ে ঘোমটা দেয় এখানে ওখানে তীরে গোসল করছে দেখতে পেয়েছি আর দুরন্ত কিছু শিশু যাদেরকে বাস্তবতা এখনও আঘাত করতে পারছে মাবাবর ডানার নিচে খেলছে বলে, তাদেও নদীতে লাফিয়ে পড়তে দেখেছি।
আর নদীর দু তীর ধওে হালচষা ক্ষেতে বড়ো মাটির চাঙর পড়ে থাকতে দেখেছি আ ধান, তরমুজ বা বাদামের ক্ষেত ছড়িয়ে রয়েছে। যেবারই আমি কর্কশিটে ডানায় ভর করে নানাবাড়ি থেকে আমাদের বাসস্থানে উড়ে উড়ে ফিরে আসি দুপুর রোদে সেবারই এদের দেখা পাই। এবং প্রায়ই ভাবি আবার কারখানাগুলো আমি খুজতে যাবো। কিন্তু চাইলেই তো আমি যেতে পারি না। এই উড়ার উপর আমার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।
আমি কর্কশিট চিনি যখন আশুগনঞ্জ বিদুত কারখানা নির্মাণের জন্য বিশাল বিশাল যন্ত্রাংশ জাহাজে করে নদীঘাটে এসে ভীড়লো আর আশুগঞ্জের বাজারটি পেরিয়ে আরো পূর্বে তীরের কাছে একটি এলাকা কর্কশিট আর ইটের সুরকির মতো সাদা সাদা কর্কের স্পঞ্জের টুকরার ধবধবে সাদা আর সাদায় ছেয়ে গেলে দুপুরে রোদে দূর বরফ ছাওয়া তুন্দ্রা অঞ্চল যেনো রোদে চকচক করছে বলে মনে হতো আমার, সেদিন চিনলাম কর্কশিট, মনে পড়ে। তো আবার স্বপ্নের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। তার আগে এইটুকুই কেবল বলতে চাই আমি এই স্বপ্নের মানে আবিস্কার করে আঁতকে উঠেছিলাম যে স্বপ্নটির কথা বলবো বলেই কথা বলছি এবং বিষণœ হয়ে পড়েছিলাম। আমি ছাড়া আর কাউকে এ স্বপ্নের কথা বললাম না, আর নিজের কাছেই বলেছিলাম। বাবা আমি তোমাকে সহই আমি সবকিছু চাই, বাদ দিয়ে নই।
কেননা মা সবসময়েই আমাকে বলতো তুই দেখতে আমার মতো হলে কি হবে, তোর সব কাজকারবারই কেমন তোর বাবার মতো। আর আমার নিজের প্রতি এক ধরণের ঘেন্না চলে এলো। বাবার জন্য আমার দুঃখ অনুভব হলো আর আমার মনে হলো আমার সন্তানও কি এমনই হবে এবং মাকে একধরণের কৌশল করে থামিয়ে দিলাম যেনো আমাকে বিয়ে করার জন্য যেমেয়েটিকে পছন্দ করেছে তাকে বিপদে না ফেলে এবং তেত্রিশ বছর বয়েসে এই স্বপ্ন দেখা আর খাখা বেকার থাকা ভাল লাগে না। তা ছাড়া মা বলে তোর খরচ আমি চালাবো, এবং বাবা অবসর নিচ্ছেন তার বেসরকারি স্কুলের স্বল্পবেতনের চাকরি থেকে যখন । আমার আর কি করার থাকে।
বাবা আমাকে এবারই প্রথমবারেমতো গালি দিলো। শুয়রের বাচ্ছা, বউ দেখতে অস্বীকার করলাম বলে এবং মা শেষ পর্যন্ত হেরে গিয়ে ভীষণ কান্নাকাটি শুরু করলো। হেওে গিয়ে কোন সমাধান পেলো না। আমাকে গুরমা বললো, বললো হাসতে হাসতেই, যদিও কোনদিন আমাক গাল পারেননি, পালিযে যাওয়ার ভয় দেখানো ছাড়া। মা বলেন, আমার সব কাজকারবারই নাকি বাবার মতো।
আমি যখন আমার কাছে বাবা হয়ে স্বপ্নের কথাটি ভাবি আমার কেমন নিজেকে ঘেন্না লাগে। আমি এ ছাড়া কি করতে পারতাম? তো স্বপ্নেই যাওয়া যাক।
আমারা অনেকক্ষণ উড়ি আর বিদ্যুতকারখানা, পারমাণবিক চুল্লি, বিশাল সবুজমাঠ, বয়লারের, ইটমিলের অনেকগুলো ধোয়া উঠা চিমনি, বিদ্যুত কারখানার আকাশের দিকে করে রাখা পিঠ, যাদের মাথা অনেক কম মানুষ দেখার সুযোগ পেয়েছে, আমিও তাদের একজন, সবগুলো এখন চক্রাকারে আমাদের বিমানটি ঘিরে ঘুরছে, গোলাপি আলোর নিচে পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। মায়ের শরীরে অদ্ভুত সুন্দর একটা দামি শাড়ি তার কালারের সাথে মানিয়ে ব্লাউজ, কানের গহনা, জুতা। গোলাপি দুটি গালের সাথে কোমল চিবুক ঠোঁটে নীলচে সবুজ লিপস্টিক আমাকে দারুণ প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
নদীটা আকাশ থেকে দেখতে ভাললাগছে, বুমেড়াংয়ের মতো বাকা, রূপালি একটা টানা ফিতার মতো দুপাশে থামের মতো দাঁড়ানো কতকত ভবন, উপর থকে ভবনের গ্রাম দেখা বিস্মকর আনন্দ নিয়ে আসে, যা দেখার সুযোগ পায় যারা তারাই জানে। আমাদেও গ্রামের উপর দিয়ে গেলো বিমানটি, দেখতে পেলাম একপলক গ্রামের শিশুরা সব হাত উচিয়ে মাথা উপরের দিকে তুলে ভীড় করে উচু সড়কের উপর এসে দাঁড়িয়েছে আর হাত নেড়ে আমাকে আনন্দ জানাচ্ছে, তারা কাগজের প্লেন উড়াচ্ছে আর দেখলাম আমাদের বিশাল আমগাছটা, জামগাছটা, তালগাছটা আর দুচালা টিনের লম্বা এল-শেপ বাড়িটা। আর মনে হলো বাড়িটা ঘিরে কী আশ্চর্য সবুজ একটা বন গজিয়ে উঠেছ বাড়িটা তার কুলে একটা হাঁসের মতো। বিমানটা যখন এর কাছ দিয়ে ওড়ে গেলো সাথে সাথেই এর গা থেকে টিনগুলো ডানা মেলতে চাইলো যেনো বাতাসের ধাক্কায়। আর নদীর উপর দিয়ে নৌকাগুলো পাল তুলে বইছে ধীরে আমরা পলকেই গ্রাম পার হয়ে আবার মেঘনা আবার সারকারখানা আবার বিদুত কারখানা আবার আবার গ্রাম পেরিয়ে গেলাম, বসন্তেও বাতাস যেনো বইছে সবখানে।
একদল বক আমাদের নিচ দিয়ে উড়ছে, ধবধবে সাদা, আমাদের বিমানটির চেয়েও মনে হলো হাজারটা ছোট ছোট বিমান একসাথে উড়ছে, তাদের পিছে ফেলে আমারা একপলকে অনেক উপর দিয়ে ছুটে গেলাম, মনে হলো তার ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে আর পেছন ফিরে দেখতে দেখতে আমরা ছুটে এলাম কত কত দূরে আবার আমাদের বাড়িটার উপর আবার ছেলেরা হৈহৈ করে হাত উঁচালো বলে মনে হলো। আকাশের উপর থেকে দেখলে মাঠগুলোকে আর সমতল মনে হয় না, কেমন যেনো মাঠের মাঝখানটা একটু উঁচু হয়ে চারদিগন্তের দিকে ক্রমে ঢালূ হয়ে নেমে গেছে এবং মনে হলো একটা বলের পিঠের মতো, যার এখানে ওখানে সবুজ, ছোটছোট গ্রামের বাড়ি, কারখানা সবই যেনো কেমন বেটে বেটে লাগে। প্রচন্ড সবুজ মাঠের উপর দিয়ে অনেকগুলো সাদা ও হালকা কর্কশিট, কাগজের বড় বড় তা বাতাসের ঘূর্ণিতে এলামেলো উড়তে লাগলো গাছের সবুজ চুল ঝাঁকি খেলো নারকেল গাছগুলো প্লেনের বাতাসে বাড়ি লেগে কেমন মাথা ঝাঁকিয়ে আনন্দ জানালো। আমার পৃথিবীটাকে অনেক অনেক ভাল লাগলো। বিমানটা এবার একটা চক্কর দিয়ে নদীতে নেমে এলো।
নদীর ঠান্ডা জলে মা আমি আর পাইলটটা বিমানের দরজা ঠেলে বিমানের পাখায় এসে দাড়ালাম। জলের ঢেউ এসে আমারে পা ছুয়ে গেলো পানি আহ কি শান্তি, কি ঠান্ডা আর প্রিয়। মা পাইলটটার দিকে তাকালেন, মুচকি হাসলেন, পাইলটটাও আর আমি লাফ দিয়ে জলে পড়লাম। তারাও জলে নামলো সাঁতার কাঁটলো আমার মা হাসলো লোকটাও হাসলো। আমার লোকটাকে ভালই লাগলো।
লোকটা সাঁতরে এসে আমার মাকে পাড়ে হাত ধরে তুললো। তারপর লোকটা আবার নদীতে ঝাপিয়ে পড়লো। এবং হাত উচিয়ে মাকে টাটা জানালো। মায়ের ভিজে শাড়ির স্বচ্চতা ভেদ করে তার পায়ের গোছার দিকে আমি তাকালাম। তার হাটুর নিচের গোছা দুটি আমার কাছে কেমন রুগ্ন আর দরিদ্র মনে হলো।
আমি করুন ভাবে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আর মায়ের পাশে পাইলটটাকে আমার ভালই লেগেছিলো, যদিও সে আমার বাবা নই, মায়েরও ভাল লেগেছিলো তাকে, তার তৃপ্ত মুখ বিমানের জানালায় দেখে তাই মনে হয়েছিলো আমার এবং তা ভেবে আমার কেমন ভাল লেগেছিলো। আমরা লঞ্চ ঘাটের ঝেটিতে উঠে এলাম আমার শাদা শার্ট থেকে. মায়ের শাড়ি থেকে টপটপ করে পানির ফোঁটা ঝরে পড়ছিলো আর কেমন একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে বসন্তের বিকেলকে ঘরে ফেরার পথে আমাদের হিম করে দিতে চাইছিলো।
আমি স্বপ্ন দেখার পরের দিন রাতে কাঁদলাম তিনবছর আগের এক ঘটনায়, হু হু করে, রাত চারটায়, কোনভাবেই আমার ঘুম আসছিলো না গতরাতের এই স্বপ্নটার কথা ভেবে আর ঐ ঘটনাটি আমার জন্য অনিশেষ দুঃখের আজও। ডাক্তার হতে পারার আনন্দে তার যেমন বাড়ি গাড়ি আছে তেমন এক ডাক্তারকে ভালবেসে ফেলেছে আর কাঁদলো আর আমাকে ক্ষমা করো বলে কাঁদলো অনেক্ষণ, ক্ষমা চাইলো তার যত ভুলত্র“টির জন্য।
আমি বললাম এক হাতে যখন তালি বাজে না তো কী আর করা, একদিন তোমরা আমার বাসায় এসে বেড়িয়ে যেয়ো। সে কথা দিলো দুদিন পরের শনিবারেই আসছে। কিন্তু আমার এক বন্ধু আমাকে বুঝালো সে আমাকে পরীক্ষা করছে। তাই আমিও তাকে বুঝাতে গেলাম আমি তাকে কতটা ভালভাসি। সে সবকিছু অস্বীকার তো করলোই, তদোপরি আমাকে ঘৃণা করে সে।
অনেকবার জানালো। সেদিন রাতের পর আবার কাঁদলাম আজ তার কাছে ক্ষমা চেয়ে, এই স্বপ্নটি দেখার পর, মনে মনে। মা বলতেন আমি নাকি একেবারেই বাবার মতোন, আর চামড়ার রংটাই কেবল মার মতো। আর বুঝতে পারছি নাÑ সে আসলেই আমাকে বদলে ফেলে ঠিকটি করেছে কিনা। আর আমি আসলে নিজের কাছেই বা কি চাই! দীর্ঘ একটা নিঃসঙ্গ রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম, একে পেরিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন বিকল্প খোলা নেই।
নৌকা ভ্রমণ
কেনই বা আমরা কেবল অতীতকে ব্যাখ্যা করতে পারি আর কেনই বা ভবিষ্যত আমাদের অনুমিত পথে চলে নাÑ তাহলে ভাবনা কোন কাজে লাগে, আমার, অতীতকে সমর্থন জানানো ছাড়া তো সে কিছুই তো পারে না। আমার বন্ধুটিকে বললাম, সে বলল, আবার বলতো, আমি বললাম। সে আর আমি হাটতে হাটতে এটা ওটা নিয়ে কথা বলছিলাম। আমাকে বন্ধুটি এমনি ডেকে নিয়ে যায়, আমি তার পিছু পিছু হাঁটি, হাঁটি এবং একসময় তার বাড়ি পৌঁছে যাই। তার বাচ্চা দুটি উদ্ভুত সুন্দর, তারা তাদের মায়ের চেহারা পেয়েছে, হৃষ্টপুষ্ট আর লাবণ্যে উপচানো।
আর আমি দেখি তাদের মুখে চোখে অদ্ভুত মাদকতাÑ যাদের দিকে তাকালে বোঝা যায় তাদের পৃথিবী আশ্চর্য সুন্দর, আর মনে হয় আমিও এমন একটা জগতের অধিকার সংরক্ষণ করি। দেখি, ঐ ভোরের আলো কখন তীব্র রূপালি হয়েছে যে, আর তাপ কেমন বাড়ছে আর বাড়ছে। আর আমি জানি, বিল ঝিল জুড়ে পানি আর পানি, শালুক-শাপলার আশ্চর্য মাদকতা নিয়ে ফুটে আছে, এখন। একটা মিনিয়েচারে দেখেছিলাম, সিতা ঝিলের শাপলা-শালুক-পদ্ম-ছাউয়া জলে পদ্মফুলের পাশে মুখ জাগিয়ে ভেসে আছে, আর সেই মুখের উপর আকাশে একটা চাঁদ, তাদের দেখছে, দেখছে রামের ব্যাকুলতা হারানোর অনুভুতি এই বনবাসে আশ্চর্য সুন্দর রূপ নিয়েছে। রাম কেমন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে পদ্মের দিকে, মুখের দিকে, মুখ আর পদ্মকে আলাদা করার ব্যর্থতা যেনো আশ্চর্য আনন্দের।
আমি বন্ধুর বউকে বলি, বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যাবে নাকি? বলতেই বন্ধুটি হাহাকার করলো যেনো, বহুদিন হলো, এদের নিয়ে বেরোনের সুযোগ পাই না, বেরোলে কিন্তু মন্দ হয় না। এই হাহাকারে তার বউ রাজি হলো, আর বাচ্চাদুটির তো কথাই নেই, আনন্দে আটখানা। তখন আমিও বন্ধুটিকে বলি, তাহলে রেডি হয়ে পড়। সে রেডি হলো বউ বাচ্চা নিয়ে, এবং পথে কী কাজে যেনো মত বদলালো, এদের নিয়ে তুই ঘুরতে যা, আমার একটা কাজ পড়ে আছে, জরুরি, এখনই না করলে নয়। আমি কী করবো বুঝতে পারলাম না।
তখন বন্ধুটি বললো, বাচ্চাগুলোর দিকে তাকা একবার, তাহলে তাদের তুই নিরাশ করতে পারবি না আর, আমি জানি। আমি তাদের দিকে তাকালাম, তোমরা কি বাবাকে ছাড়াই আমার সাথে যাবে? তারা বোবা হয়ে থাকলো এবং বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। বন্ধুর বউটি বললো, আমি তাহলে যাবো না। তখন বন্ধুটি বউকে বললো, আমার জন্য কিছু ভেবো না, বাচ্চাাগুলোকে মাঝপথে ফিরিয়ে নেবে, সেটা কেমন খারাপ লাগবে না, এদের মুখের দিকে তাকাও টের পাবে। বউ কেমন এক অচেনা ভঙি নিলো যেনো, খারাপ লাগলেও যাবো না।
তখন সে বউকে বললো, বাচ্চাগুলোকে নিয়ে একটু ঘুরে আসো, আমি গেলাম। আমাকে একটু তফাতে ডেকে নিলো, নে, এটাকাগুলো রাখ। মুঠো খুলে দেখি, পাঁচশো টাকার একটা নোট, এই দুমূর্ল্যরে দিনে একটা চকচকে পাঁচশো টাকার নোট দেখি না অনেকদিন, খরচ করা তো দূরের। ১০ কেজি চালের দাম। সে তার বউকে চারপাঁচটা নোট ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো সে।
আমি বললাম, এখন? সে বললো, এই তোরা কি ঘুরতে যেতে চাস? তখন, তারা বাবার অনুপস্থিতিতে বেশ আহ্লাদেই বললো, আমরা ঘুরতে যাবো। আমরা, কি আর করা, বাসের টিকেট কেটে ছুটলাম, শহর থেকে একটু দূরে, ঘন্টাখানেকের পথ, একটা ঝিলের দিকে। একটা নৌকার ব্যবস্থা করি, বলে তীরের দিকে এগিয়ে যাই, এবং তাদের বলি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকো, আসছি। একঘন্টার জন্য নৌকাটা দিতে ভাড়া কত চায়, নৌকা ওলার কাছে জানতে চাইলে, সে একশ টাকা দাবী করলো। আমি বললাম, আমরা এসেছি ঢাকা থেকে, পানিতে ঘুরতে, শাপলা পদ্ম ফুলের স্পর্শে বাচ্চাদের হাত সিক্ত করতে, কতদিন তারা এসব প্রকৃতিক কোমল বস্তুর স্পর্শ পায় না, অথচ আমরা একসময়ে বনে বনে এসবের সংস্পর্শে অনেক সজীব বেঁচে থাকতাম, আর মরতাম অজ্ঞতার রোগের আঘাতে, ভাবতে পারেন! সে তা বুঝতেই পারলা না, তার মুখের ভঙি এমনই একটা অর্থ তৈরি করলো, লোকটির জিভের অজ্ঞাতেই।
আপনাকে প্রয়োজন নেই, কেবল নৌকাটাই নেবো, নিজেই বাইবো। মাঝি প্রথমে রাজি হতে চাইলো না, বরং জানালো, আপনি কি চালাইতে পারবেন, একটু পরেই ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, অভ্যাস নাই তো। আমি বললাম, কি যে বলেন না, পারবো, পারবো। তখন, যান, ঘুরেন, বললো সে। আমি তাদেরকে নৌকায় উঠে বসতে হাত বাড়িয়ে ডাকলাম, তারা নৌকায় উঠে কি যে নাচানাচি শুরু করলো।
আমি তাদের নিয়ে ভেসে পড়লাম, জলে নয়, যেনো সমুদ্রে, এবং আমি যেনো সেই রাম, যার ভেতর হারানো সিতার পিপাসা, অংকুরিত হচ্ছে পদ্মের ফাঁকে চাঁদের মতো যে মুখ জেগে আছে, সে। সে আমার পাশে বসলো, আপনি কি বিয়ে করবেন না। আমি জানালাম, আমাকে বিয়ে করবে না কেউই। সে জানালো, ধূর, আপনি আসলে খুবই সুন্দর, আপনাকে কতজন যে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে আছে, আপনি কেবল তা জানতে পারেছেন না, এই যা। তোমাদের গল্প চিরকাল গল্পই থাকে, বললাম তাকে।
আমার দিকে তাকালেই খেয়াল করলাম, তার চোখের পাতা অবনত হয়ে আসে, মুখও। আর এ কোন ভাষা যা আমার চোখের ভেতর হামলে পড়ে কেবলই অনুদিত হতে চায় বাঘের ডাকে। আমার ভেতর একটা বাঘ বন জুড়ে ছুটে বেড়ায় আর গর্জে চলে, আর গর্জনে সারা বন হেলে ওঠে, দুুলে ওঠে, এবং রঙিন হয়ে পড়ে। আমার দেহ, চোখ, কে জানে, কিভাবে দুলে ওঠে আর নাচে। আমার জিভ সে ভাষা তো শিখে নি, কিন্তু শরীর জানে এবং নিজ থেকেই এভাবে অনুদূদিত করে আমার মন, শরীরই ভাষা হয়ে ওঠে তখন, একে অপরের কাছে।
আমি হাত তুলি আকাশের দিকে, এবং এমনভাবেই নড়ে উঠি যে, তার ভাষা কেবল সেই বোঝে, এবং সে নৌকার পাঠাতনে হামাগুড়ি দিতে থাকে, তাকে কেমন হরিণের মতোই দেখায়, দেখায় না? আমার করতল থাবার মতো হয়ে ওঠে, সে এসে ঘাড় পেতে দেয়। আমি হাত বাড়িয়ে জলের দিকে তাকিয়ে থাকি, আমার বাড়ানো হাত অনুসরণ করে সে এমনভাবেই তাকায়, যেনো সবটা পদ্মবন সে আমার কাছে উপহার চায়। আমি অনেকগুলো শাপলা সাদা, অনেকগুলো পদ্ম নীল, অনেকগুলো শাপলা রক্তিম, ঝিল তছনছ করে জলের নাড়ি ছিন্ন করে নৌকায় তুলে আনি। তার দিকে উপচানো হাত বাড়িয়ে দিই। তাকে রামের গল্পটি বলি, আমি যা একটি মিনিয়েচারের ছবিতে দেখেছিলাম, পদ্মের ফাঁকে ফাঁকে মুখ জাগিয়ে ভেসে চলেছে সিতা, এবং রাম জ্যোস্নারাতে বুঝতে পারছে না, কোনটা সিতা, কোনটা পদ্ম, ঐ চকচকে চাঁদের আলোয়, ফলে অবাক হয়ে দেখছে এবং যখনই তার মুখের দিকে হাত বাড়ায়, সিতা নয়, হাত ছুঁয়ে কেঁপে উঠে পদ্ম, এবং এ খেলা চলতেই থাকে রাতভর, এবং একসময়, সিতা যখন হেসে উঠলো প্রথমা চাঁদের মতো, তখন কেবল রাম ছুঁতে পারলো তার মুখ।
ছবিতে গল্পটা ছিলো না, গল্পটার জন্ম হয়েছিলা আমার মনে, পাল তুলে দিলো সেটা এই ঝিলোর হাওয়ায়, আজ। তাকে বললাম গল্পটা কি ভালো না? সে, কেবল হু বললো। আমি বললাম, এ গল্প আমার ভাল লাগে না, কারণ রামের গল্প শেষ পযন্ত সীতা বিসর্জনে সমাপ্ত হয়, মেনে নিতে পারি না। সে মুখ খুললো, এ বিষয়টা আমারও ভাললাগে না জানো। আমি বললাম তাই হওয়া দরকার।
সে হাতবাড়িয়ে শাপলা ফুলগুলো নিতে যাবে কি হুড়মুড় করে শিশু দুটি ছুটে এলো নৌকার ও-মাথা থেকে এ-মাথায়, আর শাপলাগুলো মায়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলো। এর এক ফাঁকে শাপলা ফুলগুলোতে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিলো সে, একপলকের এ দৃশ্য আমার রক্তে জোয়ার আনলো। নৌকা থেকে এই মাঝ বিলে হাঁস হয়ে গেলো শিশু দুটি আর সাঁতরে অনেক দূর চলে গেলো, শাপলা পাতা, ফুলের, জলজ লতাতন্তুর ফাঁকে ফাঁকে এবং আমাদের রক্তের ভেতর ঠোঁট দিয়ে ঠোকরাতে ঠোকরাতে, খেলতে খেলতে এদিক ওদিক ছুটলো, হাওয়া তাদের শরীরের ঘাম মুছে দিলো নরোম আদরে। আমি তার দিকে হাত বাড়ালাম, সে তার মুখ আমার করতলে তুলে দিলো, আমার হাত কি নিবিড় আপন করে নিলো সে তার মুখে, আমি তার গালে চোখে নাকে ঠোঁটে চুমো খেলাম, সে খেলো আর কী যে হলো, সে নৌকার অপর প্রান্তে গিয়ে বসে পড়লো আর শিশু দুটিকে দুপাশে রেখে আমার দিকে তাকিয়েই না তাকানোর ভান করতে লাগলো এবং তার শিশু দুটিকে পাখি, এবং নানা ধরণের শাপলা, পদ্ম, নাম না জানা জলজ উদ্ভিদের শোভা দেখাতে লাগলো, এবং আকাশের পেজা তুলার মতো একপোচ মেঘ দেখাতে লাগলো, এবং যে অনেকগুলো শাপলা দিয়েছিলাম তাকে, সেগুলোর কিছু এখানো পড়ে আছে, আমি যেখানে বসা তার নিচে নৌকার খোলে, আর শাপলার পাপড়িগুলো এতো অপূর্বভাবে ফুটে আছে, পদ্মগুলো এতো অপূর্বভাবে ফুটে আছে, আমার লিঙ্গ বেয়ে আমার ঘন গর্জনগুলো ছিটকে পড়তে লাগলো ফুলগুলোর গায়ে, পাপড়িতে, আর তাকে দেখতে লাগলাম, তখনও সে উদাসিন, এবং তার শিশু দুটিকে ঝিলের বাতাসে দুলে উঠা ঢেউয়ে শাপলা পদ্মের দোলে উঠা দেখাতে লাগলো। টের পেলাম আমার গায়ে শার্ট থাকলেও আমার কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত নগ্ন, প্যান্টটা কিভাবে যে হারিয়ে গেলো টের পেলাম না।
আমার দিকে না তাকানোর ভান করে চলেছে সে। বাতাসে গায়ের বোতামখোলা শার্টটা ফরফর করছে। শিশু দুটির চোখমুখ মনে হলো আমার রক্ত থেকেই জন্ম নিয়েছে, আর এত আপন লাগলো যে, নিস্তব্দতা তাকে অনুদিত করলো ঝিলের এই মায়াবি জলের জগতে যেখানে চিরকাল আকাশ উপুর হয়ে থাকে, এবং একে অপরের বুক ছুঁতে পারে না, অথচ এভাবেই আবহমানকাল তাদের মাঝ দিয়ে নষ্ট হতে হতে কোথায় যে দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ছে সময়। সে দেখতে লাগলো, আমার রক্তের বিষাদ কিভাবে নগ্ন শরীর হয়ে আলোবাতাসের নিচে দৃশ্যমান হয়ে বসে আছে, সে দেখছে, তবু দেখছে না কিছু, আমি তার চোখের বিমূঢ় বিষাদ এখন নাচছে দেখতে পেলাম। আমি নিজেকে কেমন অসুস্থ অনুভব করলাম, যে অসুস্থতা দীর্ঘ ক্ষুধার ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে, আর একটু একটু করে আমাকে কখন গ্রাস করেছে, টেরও পাইনি।
শিশু দুটি তাদের ডানা মেলে দিলো আকাশের দিকে আর তাদের মা বিষণœ চেহারা নিয়ে তাদের গলা আকড়ে উড়ে গেলো তীরের দিকে আমাকে ফেলে, আমারই দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে, আর শূন্য নৌকায় আমি, বৈঠা পাটাতনে ফেলে রেখে, একা ভাসতে থাকলাম। ঝিল জুড়ে তারার মতো ফুটে আছে শাপলা, পদ্ম, শালুক, আরও নাম না জানা জলজ উদ্ভিদ, দূরে বসে অপেক্ষা করছে মাঝি, কিন্তু মনে হচ্ছে, আমি আর কোনদিন এ ঝিল থেকে ফিরে যাবো না। জল আর জল, স্থির, নীরব, বাতাসের আঘাত ছাড়া কোনদিন কেন তাদের ঘুম ভাঙে না!
০২-০৩.০৩.২০০৯
।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।