অন্তর্বিরোধে ক্ষতবিক্ষত আওয়ামী লীগ
রফিকুল ইসলাম রনি
জেলায় জেলায় দলীয় কোন্দলে ক্ষতবিক্ষত আওয়ামী লীগ। অন্তর্বিরোধে ক্ষতবিক্ষত আওয়ামী লীগ কোন্দলের কারণে প্রাক-নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে পারছে না দলটি। জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলেও কর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিদের দূরত্ব যোজন যোজন। নেতাদের মধ্যে বিদ্যমান গ্রুপিং, দ্বন্দ্বের কারণে তৃণমূল আওয়ামী লীগ এখন বিপর্যস্ত। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলকে চাঙ্গা করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও ঝিমিয়ে পড়া হতাশ নেতা-কর্মীদের ঘুম ভাঙছে না।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক স্থবিরতা দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের টেনশনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল কর্মীদের মান ভাঙাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিধি সম্মেলন ডাকা হলেও সুফল আসছে না। সম্প্রতি রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে কর্মীদের তোপের মুখে দলীয় এমপিরা ক্ষমা চেয়েও পার পাননি। কর্মীদের দাবি, হাইব্রিড নেতা-এমপিদের নিয়ে আগামী নির্বাচন নয়। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রস্তুতি রীতিমতো ঝুঁকির মধ্যে।
সরকারবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলার বদলে সাংগঠনিকভাবেই ঝিমিয়ে পড়ছে দলটি। দলীয় সভানেত্রীর নির্দেশে কেন্দ্রীয় নেতারা কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেও অধিকাংশ নেতা-কর্মী অলস সময় কাটাচ্ছেন। সাংগঠনিক কাজ না থাকায় কিছু নেতা বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের আলোচনায় অংশ নিয়ে হাজিরা অব্যাহত রেখেছেন। দলের সাংগঠনিক সম্পাদকরাও তৃণমূলে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। সিনিয়র নেতারাও নিজ নিজ এলাকায় কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন।
তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মন্ত্রী ও এমপিদের দূরত্ব বাড়ছে দিন দিন। এ দূরত্ব কোথাও কোথাও বিরোধে রূপ নিয়েছে। ক্ষমতার সাড়ে চার বছরে আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা বঞ্চিত নেতা-কর্মীদের সঙ্গেই মূলত এ দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনতোষণ, গ্রুপিং ও জনবিচ্ছিন্নতার কারণে দলে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী।
অভিযোগ উঠেছে, অনেক মন্ত্রী ও এমপি কর্মীদের উপেক্ষা ও সুযোগসন্ধানী চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকায় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
তাদের এ দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে চান ত্যাগী ও পুরনো নেতারা। এসব নেতার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বিক্ষুব্ধ কর্মীরাও। ফলে বিভিন্ন আসনে দলের মনোনয়ন নিয়ে আগাম লড়াই শুরু হয়ে গেছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলছেন, দলীয় নেতাদের মুখোমুখি অবস্থানসহ বহুমুখী সংকট আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। কর্মীদের অভিযোগ, দলের হাইব্রিড নেতা-কর্মীদের আগ্রাসী আচরণের কারণে পরীক্ষিত নেতারা ছিঁটকে পড়ছেন দলের কার্যক্রম থেকে।
এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে চরম মতবিরোধ। বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক গ্রুপের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া জেলা ও থানা কমিটির মধ্যে সমন্বয় না থাকায় দলে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। নিজ দলের নেতারাই পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাঁচ সিটি করপোরেশনে পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে ওঠে আসে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী নিজেই সরাসরি দলীয় নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছেন। ঈদের সময় দলের বর্ধিত সভায় কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের উপস্থিতিতে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বরিশাল সিটি মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণ তার পরাজয়ের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকেই দায়ী করেছেন। গত বুধবার রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি সভায় তোপের মুখে পড়েন জেলার নেতা, মন্ত্রী ও এমপিরা। এ সময় এমপি-মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও নেতা-কর্মীরা ক্ষোভ ঝাড়েন।
তারা বলেন, এমপি-মন্ত্রীরা এতদিন হাইব্রিড নেতাদের নিয়ে চলেছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে চট্টগ্রাম-৯ আসনের এমপি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমিন, নুরুল ইসলাম বিএসসি এমপি, আবদুল লতিফ এমপি ও আজম নাছির উদ্দিন এর বিরোধ চলছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি সারাহ বেগম কবরী ও সাবেক এমপি শামীম ওসমানের দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পরও এ দ্বন্দ্ব মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে সাবেক এমপি ইমদাদুল হক ভুঁইয়ার বিরোধে স্থানীয় তৃণমূল নেতা-কর্মীরা জড়িয়ে পড়েছেন।
ফরিদপুর জেলায় আওয়ামী লীগ অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ। সরকারের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশারফ হোসেনের সঙ্গে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শামসুল আলম ভোলা মাস্টারের দ্বন্দ্বে ফরিদপুর জেলার নেতা-কর্মীরা রয়েছেন দুই মেরুতে। গত কয়েক বছরে উভয় পক্ষের কর্মী সমর্থকরা আগাম ঘোষণা দিয়ে সংর্ঘেষর প্রস্তুতি নেয় কয়েকবার। গত ২০ জুলাই আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হন মেজর (অব.) হালিম।
অন্যদিকে সদর আসনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন এফবিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ। চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগও দুই ভাগে বিভক্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর ও পরাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি দুই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। ফলে জেলার সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির। মহিউদ্দিন খান আলমগীরের পক্ষে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুল হক ভুইয়া, সাধারণ সম্পাদক আবু নঈম পাটোয়ারি।
আর ডা. দীপু মনির পক্ষে রয়েছেন জেলা সহসভাপতি ওসমান গনি পাটোয়ারি। পুরো জেলার তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাও বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
ঝালকাঠি-১ সংসদীয় আসনে কোন্দল তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ আসনের এমপি বজলুল হক হারুনের সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরোধ চরমে। এমপির আপনজন হয়ে উঠেছেন সুযোগসন্ধানী ও বিতর্কিত কিছু উপজেলা ও ইউপি চেয়ারম্যান।
ফলে এই আসনে আওয়ামী লীগে নতুন-পুরাতনে দ্বন্দ্ব্ব চরম আকার ধারণ করেছে।
হবিগঞ্জ জেলাতেও মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদের সঙ্গে জেলা সভাপতি ড. মুশফিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আবদুল জাহির এমপির দ্বন্দ্ব চরমে। মৌলভীবাজার জেলায় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ জেলায় একক আধিপত্য বিস্তার করায় নেতা-কর্মীরা এখন বিভক্ত। তার লোকজনের জুলুমের প্রতিবাদে কর্মীরা আশ্রয় নেন সদর আসনের এমপি সৈয়দ মহসীন আলীর কাছে।
সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এমপি মতিউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা মুকুটের দ্বন্দ্ব চরমে। দলের দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছায়া এখন এমপির দিকে। কোন্দলে জর্জরিত সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ তিন ভাগে বিভক্ত। অর্থমন্ত্রী আবুল আল আবদুল মুহিত নিজে এক গ্রুপ, সাবেক সিটি মেয়র বদরউদ্দিন কামরানের এক গ্রুপ ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাউদ্দিন সিরাজের এক গ্রুপ। সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগও তিন ভাগে বিভক্ত।
সিরাজগঞ্জ সদর আসন নিয়ে দ্বন্দ্ব ডা. হাবিবে এ মিল্লাত মুন্নার সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক জান্নাত আরা তালুকদার হেনরির। জেলার ৬টি আসনের মধ্যে সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর) আসন বাদে বাকিগুলোতেই কোন্দল। এমপিদের স্বেচ্ছাচারিতায় দূরে সরে আছেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীরা। তার মধ্যে ৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) আসনের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। ইসহাক হোসেন তালুকদার নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সুবিধাবাদীদের নিয়ে আলাদা বলয় গড়ে তোলেন।
তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী ম ম আমজাদ হোসেন মিলন বলেন, এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বাদ দিয়ে একটি বিশেষ শ্রেণীর লোকদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আসছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ চার ভাগে বিভক্ত। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক একটি গ্রুপে, জেলা সাধারণ সম্পাদক মইনউদ্দিন মণ্ডল এক গ্রুপের নেতা। সদর আসনের এমপি আবদুল ওয়াদুদের এক গ্রুপ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিনের নেতৃত্বে আরেকটা গ্রুপ। সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই সাঈদীর রায়ের পর জামায়াত-শিবির বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়ে দিলেও প্রতিরোধ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ।
অপরদিকে নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে জনবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক এলাকায় যেতে পারছেন না। নাটোর-৪ আসনের এমপি আবদুল কুদ্দুসের নিজ উপজেলা গুরুদাসপুরে দলীয় কোন্দল চরমে। উপজেলা চেয়ারম্যান সরকার মোহাম্মদ এমদাদ ও পৌর মেয়র শাহেনেওয়াজ এক গ্রুপ ও এমপি আরেক গ্রুপে নেতৃত্ব দেন। দলীয় কোন্দলে নিজ এলাকায় যেতে পারেন না এমপি আবদুল কুদ্দুস। বরিশাল-২ (বানারীপাড়া-উজিরপুর) আসনের এমপি মনিরুল ইসলাম মণি ও বানারীপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম ফারুকের বিরোধে বিভক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ।
যশোর-৩ আসনের সাবেক এমপি আলী রেজা রাজু, বর্তমান এমপি খালেদুর রহমান টিটো ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মধ্যে ত্রিমুখী দ্বন্দ্ব রয়েছে। কঙ্বাজার-৪ আসনের এমপি আবদুর রহমান বদির সঙ্গে উখিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি আদিল উদ্দিন চৌধুরীর বিরোধ এখন প্রকাশ্যে। পিরোজপুর-১ আসনে একেএম আওয়ালের সঙ্গে বিরোধ চলছে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি সাধনা হালদারের। এখানে জেলা যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠনেও প্রকাশ্যে একাধিক গ্রুপিং রয়েছে। খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনের এমপি ননী গোপাল মণ্ডলের সঙ্গে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ ও তার অনুসারীদের কোন্দল দীর্ঘদিন ধরে।
এ ছাড়াও ননী গোপালের সঙ্গে এমপি পঞ্চানন বিশ্বাসের কোন্দলও প্রকাশ্যে। খুলনা-৩ আসনে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ানের সঙ্গে তার আসনের তিন থানা কমিটির নেতা-কর্মীদের বিরোধও চরমে। খুলনা-৪ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি এমপি মোল্লা জালাল উদ্দিনের সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক হুইপ এসএম মোস্তফা রশিদী সুজার দ্বন্দ্ব তীব্র। তাদের দুজনের মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে। খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে এমপি নারায়ণ চন্দ্র চন্দর সঙ্গে থানা পর্যায়ের নেতাদের বিরোধ চলছে।
খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে এমপি অ্যাডভোকেট সোহরাব আলী সানার সঙ্গে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট নুরুল হকের কোন্দল চরমে। নেত্রকোনা-১ আসনের এমপি মোশতাক আহমদ রুহীর সঙ্গে সাবেক এমপি জালালউদ্দীন তালুকদারের বিরোধও এলাকায় বহুল আলোচিত।
তৃণমূলে গৃহদাহে পুড়ছে বিএনপি
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপির মাঠের কোন্দল থামছে না। তৃণমূলে গৃহদাহে পুড়ছে বিএনপি মাঠে-ময়দানে বিএনপি গৃহদাহে পুড়ছে। এতে না পারছে শক্তি নিয়ে আন্দোলন বা নির্বাচনে নামতে।
দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলের পর ৭৫টি সাংগঠনিক জেলায় কমিটি গঠন করা হলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করার অভিযোগে তৃণমূল বিএনপিতে হতাশা বিরাজ করছে। কেন্দ্র অনুমোদিত কমিটিকে তারা 'পকেট কমিটি' বলেও আখ্যা দিয়েছে। এ কারণেই সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করা যাচ্ছে না। এদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হওয়া নিয়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা কয়েক ভাগে বিভক্ত।
সাবেক এমপিরা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় না থাকলেও নির্বাচনের দৌড়ে এখন তারাই এগিয়ে। নিজেরা কোনো কারণে নির্বাচন করতে না পারলে পরিবারের সদস্যদের থেকে নির্বাচন করাতে মরিয়া অনেক সাবেক এমপি। এক্ষেত্রে আবারও মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন যোগ্য, দক্ষ ও ত্যাগী নেতারা। এ নিয়ে ত্যাগী নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে হাইব্রিড ও আর্থিক সুবিধাভোগী নেতাদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। কেন্দ্র থেকে নানা দিকনির্দেশনা দিলেও তারা পাত্তা দিচ্ছে না।
জানা গেছে, দলীয় কোন্দল নিরসন করে মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের আন্দোলনমুখী করতেই কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে ৫৬টি সাংগঠনিক টিম গঠন করে জেলা সফর চূড়ান্ত করা হয়েছে। অবশ্য ইতোমধ্যে একাধিকবার সাংগঠনিক সম্পাদক ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলে সফর করেছেন। কিন্তু তাদের এসব সফর অনেকটা লোক দেখানো হওয়ায় মাঠের কোন্দল অটুট রয়ে গেছে। এবারের সফরও অনেকটাই 'নামকাওয়াস্তা' বলে মনে করছেন মাঠের নেতা-কর্মীরা। এ জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের মূল কারণ না খুঁজে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন দেওয়াকে দায়ী করছেন মাঠের নেতারা।
আবার ঢাকায় বসেও কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফর করায় মাঠের কোন্দল নিরসনে তেমন কোনো কাজে আসছে না বলে মনে করা হচ্ছে।
অবশ্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্থানীয় পর্যায়ের দ্বন্দ্বকে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের প্রার্থী হওয়া নিয়ে কিছুটা বিবাদের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বড় দলে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। এটা এক ধরনের প্রতিযোগিতা।
প্রতিটি জেলায় সাংগঠনিক কমিটি সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপি এখন নির্বাচন ও আন্দোলনমুখী। সুতরাং এটাকে নেতিবাচকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির কর্মিসভায় ?জেলা ?বিএনপির সভাপতি এম নাসের রহমান ও সাধারণ সম্পাদক বেগম খালেদা রব্বানী গ্রুপের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। দাওয়াত পাওয়া না পাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এর মধ্যে গুরুতর কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা সেখানে উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের বেগ পেতে হয়। গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন উদযাপন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় একপক্ষ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেনের গাড়িতে আগুন দেওয়ার চেষ্টা করে। মহানগর ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সভাপতি গাজী সিরাজ উল্লাহকেও লাঞ্ছিত করা হয়।
এছাড়া দলীয় কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে মহানগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ডা. শাহাদাত হোসেনের অনুসারীদের মধ্যে এ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়। সুনামগঞ্জে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান সফরে গিয়ে ত্রিধাবিভক্ত গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ঘাম ঝরছে কোন্দল থামাতে।
একাংশের নেতৃত্বে সাবেক হুইপ ফজলুল হক আশপিয়া, আরেক অংশের সাবেক এমপি নাসির চৌধুরী, উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন এবং তৃতীয় গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়াকিবুর রহমান গিলমান ও নাদের আহমদরা। জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিএনপি বহুমুখী কোন্দলে বিপর্যস্ত। নেতাদের প্রত্যেকের আলাদা গ্রুপ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, এম মোরশেদ খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাছির হোসেন, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গোলাম আকবর খন্দকার, ডা. শাহাদাত হোসেন পৃথক গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে কয়েক দিন পরপরই সেখানে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
রাজবাড়ী জেলা বিএনপির কোন্দল কমিটি গঠনের পর থেকেই। আন্তঃকোন্দলের কারণে দলের বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী খুনের ঘটনাও ঘটেছে সেখানে। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দ্বন্দ্বের কারণেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একাধিকবার সময় দিয়েও রাজবাড়ী সফর স্থগিত করেছেন। সর্বশেষ গত রবিবার ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কর্মিসভা পণ্ড হয়ে যায়। জেলা সভাপতি আলী নেওয়াজ খৈয়ামের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশীদ ও সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আসলামের দ্বন্দ্ব বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে রূপ নিতে দেখা যায়।
দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ফরহাদ হোসেন আজাদের সঙ্গে জেলা সভাপতি মজাহার হোসেন ও সহসভাপতি তহিদুল ইসলামের কোন্দল চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মারা যাওয়ার পরও দ্বন্দ্বের কারণে এখনো ওই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। কোন্দলে জর্জরিত পুরো বরিশাল বিভাগ। যদিও সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ার ও নবনির্বাচিত মেয়র আহসান হাবিব কামালের মধ্যে ঐক্য লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে চলে আসা দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এখনো শেষ হয়নি বলে জানা গেছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল সমর্থিত এমপি প্রার্থীসহ নানা কারণে পুরো বরিশাল বিভাগে নেতা-কর্মী-সমর্থকরা কয়েক ভাগে বিভক্ত। পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি আলতাফ হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে কুর্তি সরকার ও মোস্তাক আহমেদ পিনুর সঙ্গে কোন্দল চলছে অনেক দিন ধরে। ঝালকাঠিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের সঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহবুবুল হক নান্নু ও ডা. পি আহমদের দ্বন্দ্ব চলে আসছে কমিটি গঠনের পর থেকেই। একইভাবে পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল জেলা উত্তর ও দক্ষিণসহ পুরো বিভাগেই কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু ও দলের বিশেষ সম্পাদক নাদিম মোস্তফার দ্বন্দ্ব পার্টির বহুল আলোচিত বিষয়।
রাজশাহী সিটি নির্বাচনে তাদের একমঞ্চে দেখা গেলেও পরবর্তীতে তাদের স্বরূপ বেরিয়ে পড়েছে। আগামী নির্বাচনে রাজশাহীতে দলীয় প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মিনু-নাদিমের দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া রংপুরের আহ্বায়ক মোজাফফর আহমেদের সঙ্গে রহিম উদ্দিন ভরসা, গাইবান্ধায় জেলা সভাপতি আনিসুল হক বাবুর সঙ্গে হামিদুল হক সানার, টাঙ্গাইলে জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খানের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম তোফার, গাজীপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আ স ম হান্নান শাহর সঙ্গে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনের, চুয়াডাঙ্গায় সাবেক সভাপতি অহিদুল বিশ্বাসের সঙ্গে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদুর, ঝিনাইদহে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমানের সঙ্গে সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টু, শহিদুল মাস্টার ও আবদুল ওয়াহাবের, মাগুরায় জেলা সভাপতি কবির মুরাদের সঙ্গে সাবেক সভাপতি কাজী সলিমুল হক কামালের, ফরিদপুরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের সঙ্গে জেলা সভাপতি শাহজাদা মিয়ার দ্বন্দ্ব দলীয় কর্মীদের বিভক্ত করে রেখেছে। কোনো কোনো এলাকায় কোন্দলের কারণে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে। ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ দুই জেলাতেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকে দ্বন্দ্ব ও সিলেট মহানগরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী সমর্থকদের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপি : আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা মহানগর বিএনপির দুই প্রভাবশালী নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার দ্বন্দ্ব নতুন নয়। খোকা ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক হলেও থানা কমিটি গঠন নিয়ে আব্বাস সমর্থকদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই বিবাদে জড়িয়ে পড়ছেন। যার কারণে অধিকাংশ থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ঢাকায় বিএনপির এমপি প্রার্থীদের সঙ্গেও বনিবনা না হওয়ায় কমিটি গঠন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। এদিকে ঢাকা জেলার বিভিন্ন ইউনিটে ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
ঢাকা জেলায় বর্তমান সভাপতি এমএ মান্নান ও সাধারণ সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান। কিন্তু জেলার সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার সমর্থকদের সঙ্গে মান্নান গ্রুপের সমর্থকদের মাঝেমধ্যেই বিবাদ লক্ষ্য করা যায়।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান জানান, একটি বড় দলে নানা মত ও পথের লোক থাকে। তাই দল পরিচালনায় কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। এ জন্যই কেন্দ্রীয় নেতাদের জেলা সফর কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।
আশা করি, নির্বাচনের আগ মুহূর্তের এই সফরে সব ধরনের কোন্দল নিরসন করে নেতা-কর্মীদের আন্দোলনমুখী করে তোলা সম্ভব হবে।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।