ইতিহাস, নেই অমরত্বের লোভ/ আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ... আম্মুর চিরদিনের শখ বাসায় এক চিলতে বাগান থাকবে; সেখানে তিনি নিজ হাতে বেলি ফুলের গাছ লাগাবেন, পেয়ারা গাছ লাগাবেন, শাক সবজিও চাষ করবেন। বলা বাহুল্য ঢাকায় জমির যে দাম তাতে বাড়ির সামনে পেছনে এমন এক টুকরো জমি অপচয় করার বিলাসিতা বেশিরভাগ মধ্যবিত্তেরই পোষায়না। আমাদের যখন বাড়ি হল যথারীতি বাড়ির পাইলিংয়ের সময় ফাউন্ডেশনের টুকরো খোয়ার সাথে সাথে সাথে আম্মুর বাগানের শখটিও চাপা পড়ে গেল। কষ্টের পয়সায় দু'তলা কোন মতে কোমড় সোজা করে দাঁড়ানোর পর থেকেই বাড়ির বড় ছেলের মতো ওই দু'টো ফ্লোরের ওপরই ভর করল ভাড়ার টাকায় বাকি চারটি তলাকে দাঁড় করানোর। এভাবে উঠতে উঠতে শেষ পর্যন্ত ঠিক হল বাড়ি বানানো শেষ হলে ছাদের কাছাকাছি ষষ্ঠতলাতেই আমরা উঠব।
এতদূর সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে ভেবে যখন আব্বুকে ইনিয়ে বিনিয়ে অভিযোগ করছি, আব্বু এক গাল হেসে জবাব দিল, "তোমার আম্মুর বাগানের শখটা পূরণ করতেই ছয় তলায় থাকার সিদ্ধান্ত। আর ছাদের ওপর ছোট্ট ঘরটাতে হবে তোমার লাইব্রেরি। " আব্বুর অযাচিত এই ঘুষের সুবাদে আমরা দুই মা-পুতে মিলে ছয় তলা সিঁড়ি বেয়ে ওঠার কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিলাম। বাড়িতে ওঠার আগেই অবশ্য আম্মুর বাগানের খসড়া লিপিবদ্ধ হতে লাগল পরীক্ষামূলক নানা ফলফুলের গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে। মরিচ, পেয়ারা, আর আম্রপালির গাছ যখন বেশ খানিকটা ছায়া ছড়াতে শিখেছে এমন সময়ে আমরা ১৮ বছরের ফ্ল্যাট ছেড়ে উঠে এলাম নিজেদের বাড়িতে।
বাড়িতে ওঠার প্রথম দু'তিন দিন ভালই কাটল; কেবল পুরনো বাড়িটার জন্য গোপন কয়েকটা দীর্ঘশ্বাসের পরিবেদনাটুকু ছাড়া। অথবা হয়ত নতুন বাড়িতো ওঠার উত্তেজনায় উপেক্ষিত থেকে গিয়েছিল কিছু ক্ষুদ্র প্রাণের দংশনমুখর উপস্থিতির অনুভূতি। যেখানেই শরীর এলিয়ে দিই, কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা হাজির হয়ে শরীরের গম্য অগম্য নানা অলিগলিতে নির্বিকার বিষোদগিরণ করে দিয়ে যায়। অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসে রিমোট হাতে নিয়েছি তো পিঁপড়ার কামড়। রাতে বিছানায় সুখনিদ্রা দিচ্ছি তো বেরসিক পিঁপড়াদের আসঙ্গলিপ্সা।
বিয়ের দাওয়াতে যাবার জন্য যত্ন করে করে তুলে রাখা পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে মাত্র বেড়িয়েছি তো তাদের অত্যাচারে কাবু হয়ে ফিরে আসা। পিঁপড়াদের এই অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠল কয়েকদিনের মাথায়।
আমার আম্মু ধার্মিক মুসলমান; তাই তাঁকে উষ্কে দিতেই মাঝে মাঝে বলতাম আমরা বাঙ্গালিরাতো জাতে বৌদ্ধ। জাত ধর্ম বৌদ্ধ হওয়ায় প্রাণীহত্যা মহাপাপ এ আপ্তবাক্য মেনে চলা কর্তব্য। সেই আমাকে ক্ষিপ্র হাতে পিপিলিকাহত্যা করতে দেখে আম্মুর আমোদ দেখে কে? আমার ধর্মচ্যুতিতে তিনি আহ্লাদিত।
আর আমিও এই বলে আত্ম সান্ত্বনার প্রলেপ বুলাচ্ছি যে- আত্মরক্ষার্থে ক্ষতিকর প্রাণীহত্যায় পাপ নেই, ধর্মনাশও হয়না। কিন্তু পিঁপড়ার অত্যাচার যেভাবে বাড়তে লাগল তার সাথে পাল্লা দিয়ে পিঁপড়া নিধনযজ্ঞও চলতে লাগল সমান তালে। এভাবে চলতে চলতে কী এক নেশা পেয়ে বসল যে একটা দু'টো পিঁপড়া মেরে আর শান্তি হচ্ছিলনা, অস্বাভাবিক এক বিকৃত জিঘাংসায় আপাদমস্তক অনুভূতিশূণ্য হয়ে আমি হত্যা করতে লাগলাম বিল্ডিংময় পিপিলিকার সুদীর্ঘ সারি। হত্যার এই মহোৎসব এক পর্যায়ে কেবল ক্ষতিকর প্রাণীনিবারণের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলনা; হয়ে উঠল জিঘাংসা নিবৃত্তির দুর্নিবার বিপথগামিতা।
বাড়িময় ছড়ানো পিঁপড়ানিধনের পাউডার দেখে একদিন একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো আমাদের রাজমিস্ত্রি থেকে বাড়ির কেয়ারটেকারে প্রমোশন পাওয়া ইদ্রিস।
পান্যরস জর্জরিত আমোদিত কণ্ঠে সে জানান দিল, "পিঁপড়া গুলা খালাম্মার লাগানো পেয়ারা গাছের গুঁড়িতে বহুদিন ধইরাই বাসা বান্ধছে। ছাদে আপনার লাইব্রেরির সামনে স্যারে যেই বেসিনটা লাগাইছে ওইটার নিচে যেই কলটা আছে ওইটা দিয়া দিনরাত খালি পানি পড়ে, ওই কলে ডিফেক্ট। হেই পানি দিয়া ছাদের যেইখানটায় পিঁপড়াগুলান হাঁটাচলা করে সেই যায়গাটা গ্যাছে ভাইস্যা। " ইদ্রিস তার পানের চর্বিত রসে আরেকবার জিভটা ভিজিয়ে নেয়। হাসিতে আরেক প্রস্থ শান দিয়ে বলে, "বেজন্মাগুলা আর যাইব কৈ, ছাদের কাছে পাইছে ছয় তলা, আর হেইখানেই বাইয়া বাইয়া নামছে।
এখন বোঝ ঠ্যালা। আমগোরে কামরাইছে, গরিব মানুষ কিছু করবার পারি নাই, এইবার পড়ছে জায়গামতো। এই হারামিগুলারে মাইরা শ্যাষ কইরা নির্বংশ করণের কাম। বেশি কইরা পাউডার মারেন ভাইয়া। আরো লাগলে বইলেন আমি নিচে থেইকা আইন্যা দিমু; হে হে হে।
" ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।