সাগর সরওয়ার
শক্তির একটি কবিতা আমি মাঝে মাঝেই পড়ি৷ আজও পড়ছিলাম৷ ঠিক সেই সময়ই দরজায় কড়া নড়ার শব্দ৷ এই ঘন বৃষ্টির রাতে আমার কাছে কেউ আসতে পারে না৷ এটাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু যখন চলেই এল... তখন দরজা তো খুলতেই হয়৷
সবুজ পাহাড়ে একটা ঘর বানানোর শখ ছিল অনেক দিন ধরে৷ সেই শখ মেটাতে বান্দরবান শহরের একটু দুরে একটা জমি লীজ নিয়ে তাতে একটা ঘর বানিয়েছি৷ তিন মাস পরপর দিন চারেকের জন্য আসি৷ আসতে হয়৷ শহরে আমার কেউ নেই৷ মানে এখন নেই৷ নিশিতা চলে যাবার পর আমার আর কেউ থাকলো না৷ ...... এই কথাটি মিথ্যে আমার একটি ছেলে আছে৷ নীল৷ সাত আট বছর বয়স৷ থাকে আমার বোনের কাছে৷ বোনই ওকে মানুষ করছে৷ নীল এখন মা বলতে জানে তাকেই৷ আর আমাকে.....নীল কী... আমাকে ভালোবাসে? এই উত্তর খুজতে আমায় হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে৷ ঐ যে যেদিন নিশিতার সঙ্গে আমার বেশ কথা কাটাকাটি হলো.... সেদিন আমি একটু রেগে গিয়েছিলাম... তখন নীলের বয়স চার৷ পুচকে এই ছেলে বেশ বুঝতে পারে৷ মাথা ভালো৷ আমি নিশিতাকে শুধু বলেছিলাম..
: দেখ আমার মনে হয় অফিসের আরিফ সাহেবের সঙ্গে তুমি একটু বেশী মেলা মেশা করছো৷
: মেলা মেশা মানে কি...?
: মানে মেলা মেশা৷
: তুমি কি বলতে চাইছো আমি তার সঙ্গে ফস্টিনষ্টি করছি...
: আমার মুখ এতটা খারাপ নয়৷
: তোমার মনটা খারাপ৷
: তুমি বাজে বকছো৷ আমি কেবল তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি৷
: তুমি আমাকে সাবধান করার কে...আমি তোমার খাই না পরি... নিজের আয়ে চলি৷ তুমি তো কেবল আমার সাথে আছো শরীরের জন্য৷ শরীরটা পেরেই তোমার চলে৷ অসভ্য, জানোয়ার৷ আমাকে বুঝেছো কখনো৷ আর আরিফ আমার বস৷
: আরিফ! ভালো, এভাবেই ডাকো নাকি ? আর ডাকবেই না কেন ? ডাকতে হয়! না হলে এক সঙ্গে রিকশায় লেপ্টে যাওয়ার মানে কি৷ বৃহস্পতিবার৷ সন্ধ্যা সাতটা৷ গোপিবাগ ফাষ্ট লেন৷ মনে পড়ে নিশিতা..... তুমি বাসায় ফিরলে অনেক রাতে৷ ক্লান্ত৷ বললে অফিসের বেশ কাজ৷ কি কাজ নিশিতা? অফিসের ফোন নো রিপ্লাই৷ সেল বন্ধ৷ কি কাজ নিশিতা?
: বুঝেই যখন ফেলেছো তখন ...
: তখন আর কি
: একটা সিরিয়াস কথা তোমাকে বলতে চাই৷ আমি তোমার সঙ্গে ঘর করতে চাই না৷ খুব ঠান্ডা মাথায় বলছি৷ আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়াই ভালো৷
: আর নীল?
: নীল আমার ছেলে, আমার কাছে থাকবে৷
: নীল আমারও ছেলে৷ আমার কাছেই থাকবে৷ তুমি চলে যেতে পারো৷
: আমি চলে যাবো? তুমি হয়তো ভুলে গেছো এই বাড়িটা আমার ভাড়া করা৷ আমি এই বাড়ি ভাড়া দিই৷ তাছাড়া .....
: আমিই যাচ্ছি৷
: একা যাবে৷ নীলকে নেবে না৷
নীল কয়েকদিন ছিল নিশিতার সঙ্গে৷ তারপর এক সকালে আমার অফিসে নিশিতার ড্রাইভার পৌছে দিল নীল কে৷ আর সঙ্গে একটা চিঠি৷
" নীল তোমার কাছেই থাকুক"৷
আমি চাদ পেলাম... পেলাম সূর্য, মাটি, জল আরও অনেক কিছু৷ বেশী দিন অপেক্ষা করতে পারেনি নিশিতা৷ মাস ছয়েক পর বিয়ে করেছে৷ সে এখন মিসেস আরিফ৷
:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
একবার অফিস থেকে বলা হলো হাউজ বিল্ডিং লোনের একটা ব্যবস্থা করা হচ্ছে৷ কম সুদে ঋণ৷ ভালো৷ আমি ভালোই পাবো৷ পেয়েও গেলাম৷ বান্দরবানে একটা জমি লীজ নিয়ে সেখানে বাড়ি বানালাম৷ এক তলা৷ লাল রঙ্গের টালির ছাদ৷ আশেপাশের পাহাড়গুলোর চেয়ে আমারটি একটু বড়৷ এরই একটি ঢালে এই বাড়ি বানালাম৷ যখন আসি নিজেই খাবার তৈরী করি৷ আর ভাবি৷ আমার ভাবতে ভালো লাগে৷ আমি যখন থাকি না তখন এটি খালি থাকে৷ পরিচিত এক লোক থাকে বান্দরবান শহরে৷ সে সপ্তাহে এসে একটু গোছগাছ করে দেয়৷ পাহাড়ে চুরি হয় না৷ আমার বাড়িতেও হয় না৷
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে৷ আমার বাড়ির টালিতে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে৷ কড়া নড়ার শব্দ বাড়ছে৷ হাতে দোচোয়ানির গ্লাস৷ টেবিলে ছড়ানো চিপস আর কাজু বাদাম৷
জানালায় বাতাস আঘাত করছে৷ আমার শীত লাগছে৷ দরজায় শব্দ বাড়ছে৷ দরজাটা খুলতে হবে৷
:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
: কে?
না কোন শব্দ নেই৷ মানে আমার কোন কথা সে শুনতে পারছে না৷ দরজা খুলে দিলাম
: কে
: বাবা আমাকে চিনতে পারছো না৷
নীল৷ সাথে কে? রেইন কোটে জড়ানো শরীর!
নিশিতা!
:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
শক্তির কবিতাটি আমি মাঝে মাঝে পড়ি.........
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো৷
এতো কালো মেখেছি দু হাতে
এতোকাল ধরে!
কখনো তোমার করে, তোমাকে ভাবিনি৷
এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে
চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয়
এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়
যেতে পারি
যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?
সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো
যাবো
কিন্তু, এখনি যাবো না
একাকী যাবো না অসময়ে৷
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।