আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

একুশে ফেব্রুয়ারীর দিনে বই মেলা : চরম অব্যবস্থাপনা, বিশৃংখলতা

অনেকের মাঝেও একা থাকা যায়, নি:সঙ্গতায় কারো অনুভব ছুঁয়ে যায় ...

একুশে ফেব্রুয়ারীর দিনে বই মেলাতে কি পরিমান ভীড় হতে পারে সেটা খুব সহজেই অনুমেয়। তাই আব্বা-আম্মা প্রথমেই একটু বাধ সাধলেন এই দিনে বই মেলা যাওয়ার পরিকল্পনার করতেই। -ভীড়ই তো ভালো; মেলা যদি খালি খালি থাকে তাহলে মেলায় যেয়ে কি লাভ ! আমি আসলে মানুষের ঢল দেখতে চাইছিলাম প্রবলভাবে কেন জানি! দেখতে চাইছিলাম স্বত:স্ফূর্ত উচ্ছ্বাস, তারুন্য। নিজেকে যখন চরম হতাশ কিনবা অসহায় মনে হয়, তখন এরকম অসংখ্য প্রাণের জোয়ারের মাঝে একবার দাঁড়িয়ে গেলে আর সবকিছু ক্ষণিকের জন্য হলেও তুচ্ছ মনে হয়, নতুন করে মনের জোর ফিরে আসে। জাতীয় জাদুঘর পার হয়ে শুধু শুধু জ্যামে বসে না থেকে আমরা স্কুটার থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলাম।

বেশ খানিকটা হাঁটার পর মনে হলো ডান দিকে অসংখ্য মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এবার উল্টো হাঁটা শুরু করলাম আমরা লাইনের শেষ প্রান্ত খুঁজতে এবং হেঁটেই চললাম; মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম ট্রেনের শেষ কমপার্টমেন্টটা খুঁজছি । এরমাঝে জানলাম "উদাসী স্বপ্ন" ও নাকি লাইনের কোন একখানে। ফোনে বলল, "আমার হাত দেখা যায় ?" ; দেখা গেল; ওর সাথে আরেক নবীনা ব্লগার "যেমন ইকনোমিক্স" , পরিচয় পর্ব শেষ হলো। আমি বললাম, " লাইনের মাঝখানে দাঁড়ানো যাবে নাকি পাবলিক মাইর দিবে ?" , "উদাসী স্বপ্ন" খানিকটা ইত:স্তত করল ।

কিন্তু আমি লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। মানুষজন মাঝে মাঝে খুব দ্রুত সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল আবার মাঝে মাঝে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। যতই সামনে এগুনো হচ্ছিল, লাইনের বিশৃঙ্খলা ততই বাড়ছিল ; ঠেলাঠেলি, ধাক্কা-ধাক্কি । মহিলা আর বাচ্চাদের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল। চাপাচাপি এতো বেশী হচ্ছিল যে মানুষজন পড়ে যাচ্ছিল ; কারো মোবাইল একদিকে ছিটকে গেল, কারো হাতের ব্রেসলেট আরেকজনের পায়ের কাছে পড়ে থাকল।

মাঝে একজন মহিলাকে দেখলাম এক লোককে মারতে উদ্দ্যত হতে। আরো অনেক মহিলারা কাউকে কাউকে গালাগালি করল । কারণ কেউ কেউ "সুযোগ" পেলে তার "সদ্বব্যবহার" করতে ছাড়ছিলনা। কারো কারো মাঝে তর্কাতর্কি লেগে গেল । আমাদের বডি বিল্ডার "উদাসী স্বপ্ন" আবার খুব বীরত্ব সহকারে ভীড়ের সাথে যুঝলো; মেয়েদের ঠিকমত যাওয়ার রাস্তা করে দিল।

কিন্তু অবস্থা বড্ড বেশী বেগতিক ছিল। অনেকেই বলছিল এর পরের অবস্থাটা ভয়াবহ এবং অসহনীয়। "বুদ্ধিমান হউন, ঠিক কাজটি করুন" - তাই বই মেলার প্রধান ফটকের খুব কাছাকাছি এসেও শেষ পর্যন্ত আমরা হাল ছেড়ে দিলাম । বছর দু'য়েক আমার বইমেলা যাওয়া হয়নি । আর গত বছর দু'য়েক থেকেই বোধহয় এরকম লাইন ধরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তবে ব্যাপারটা এরকম অব্যবস্থাপনাময় হবে সেটা না গেলে বুঝতামই না। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে সময়ের কি বিশাল এবং বিরক্তিকর অপচয়!!! নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই তো বোধহয় এখন এই ভাবে চেকিং করে মেলায় প্রবেশ অনুমুতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো মানুষগুলো কতটুকু নিরাপদ, ঝুঁকিহীন ছিলো !!! খুবই প্রয়োজন একটি সুশৃংখল লাইনের ; কিছু ভলানটিয়ার নিয়োজিত করা উচিত; বিশেষত ছুটির দিনগুলোতে মেলায় দর্শনার্থীদের চাপ বেশী থাকবে একথা মেলা কর্তৃপক্ষের মাথায় রাখা উচিত । আমার কাছে এতো বিরক্তির মাঝেও আশেপাশের মানুষদের লক্ষ্য করতে বেশ লাগছিল; মেয়েদের একুশের সাদা-কালো শাড়ী, কারো শাড়ীর জমিনে বর্ণমালার ছড়াছড়ি, ছেলেদের ফতুয়া- চমতৎকার কম্বিনেশন ছিল। তবে এবার বিশেষ কোন শাড়ী-জামা নেইনি বলে নিজের পোষাকের জন্য কেমন বেমানান লাগছিল সবার মাঝে।

তরুণ-তরুণী এমনকি অনেক শিশুদের কপালে, গালে, বাহুতে রঙিন তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠেছিল শহীদ মিনার, লাল-সবুজ পতাকা। চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরাই জায়গায় জায়গায় দাঁড়িয়ে এঁকে দিচ্ছিল। আমি কয়েক বছর আগের বই মেলাতে এরকম নকশা এঁকে নিয়েছিলাম। এরকম মুখে-হাতে রং মেখে একুশের চেতনা কিনবা পহেলা বৈশাখের উদ্দামতা ধারন করে ঘুরাঘুরির মাঝে একটা হালকা বেপরোয়া অনুভূতি আছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকা থেকে চটপটি-ফুচকা না খেয়ে আসব - সেটা হবার নয়।

তাছাড়া সচরাচর যাওয়া হয়ে ওঠে না। তাই ক্লান্ত-শ্রান্ত আমরা একটু বসে জিরিয়ে নেয়ার ফাঁকে ফুচকা-চটপটি সাবড়ে দিলাম। "উদাসী স্বপ্ন" আবার "জয়িতা" -কে ফোন দিয়ে টি.এস.সির দিকে আসতে বলল। কিছুক্ষণ পর আমার মনে হলো পরিস্থতি যেরকম তাতে "জয়িতা" -র আসতে অযথাই ঝামেলা হবে তাই আবার পাল্টা ফোনে ওকে মানা করে দেয়া হলো। আমি জানতাম বইমেলার বাইরের চত্বরে চুড়ির পসরা বসে।

ফেরার পথে চুড়ির ডালি দেখতেই তাই বসে পড়লাম রং বাছতে। খুব দামা-দামির করা লাগল না - তিন ডজেন নিয়ে ফেললাম। আমার মনে তখনও বইমেলার ভেতরে না যাওয়ার ক্ষোভ ও আক্ষেপ পুরোদমে ! ভগ্ন হৃদয়ে ফিরতি পথে রাস্তায় চটি বইয়ের পসরা দেখে আমি আর "যেমন ইকনমিকস" চিতকার দিয়ে ডাকলাম "উদাসী স্বপ্ন" -কে । - কি ? (পেছন ফিরে তাকিয়ে) আমি হাত তুলে দেখালাম - - এই তো বই মেলা !!!! [পুনশ্চ : এই ছবিটা মেলায় তোলা । লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পাশের লাইনের ছোট ছেলে দুটিকে খেয়াল করছিলাম।

মুলত তাদের মাথার ব্যান্ডটাই আকর্ষণ করছিল বেশী । ওদের কে বললাম ছবির জন্য পোজ দিতে... মোবাইল ক্যামেরার বাটনে আলতো চাপ ...ব্যাস....]

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.