আমি একজন ভাল ছেলে । জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষার দ্বিতীয় দিনে গত পরশু আরো ৪৬ হাজার ৩৪০ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল। গতকাল ছিল সাধারণ ধারায় বাংলা দ্বিতীয়পত্র এবং মাদরাসায় আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা।
গত দুই দিনের পরীক্ষায় এক লাখ ১৪ হাজার ৪৯৫ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল বলে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে জানানো হয়। পরীক্ষার প্রথম দিন সব বোর্ডে ৬৮ হাজার ১৫৫ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।
বলার অপেক্ষা রাখেনা, জুনিয়র স্তরেই এত বিপুল পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতি গভীর শঙ্কার বিষয়। কারণ এ শিক্ষার্থীরা আর কখনও মাধ্যমিক স্তরই অতিক্রম করার সুযোগ পাবেনা। বলাবাহুল্য, বর্তমান জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা পদ্ধতি দেশে শিক্ষা বিস্তারে বড় বাধা। উদাহরণত উল্লেখ করতে হয়, ২০০৯ সালে দেশে প্রথমবারের মতো পঞ্চম শ্রেণী শেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু হয়। সেই পরীক্ষায় ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৮৯৫ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ১৬ লাখ ২০ হাজার ৫৪ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। ওই পরীক্ষার সময়ই চার লাখ ২৬ হাজার ৩২০ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়নি।
উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেশি থাকে দুর্গম এবং হাওরাঞ্চলে। বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে শিক্ষাবর্ষ অনুযায়ী বিদ্যালয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু ওই সময়ই হাওরাঞ্চলে বোরো ধান রোপণের কাজ শুরু হয়।
ফলে ওই এলাকার যেসব শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করত, তারা ওই সময় ধান রোপণের কাজে যোগ দেয়। এ কারণেও অনেকে পরীক্ষা দেয় না। এমনকি বিদ্যালয়েও আসে না। এ ছাড়া দেশের কিছু কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে বিদ্যালয়ের অবস্থান শিক্ষার্থীদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে। এসব এলাকায় শরৎ ও হেমন্তকালে নৌকাও চলে না, আবার হেঁটেও যাওয়া যায় না।
ফলে শিক্ষার্থীরা এই চার মাস স্কুলে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দেয়। এছাড়া অনেক সময় অনেক দুর্ঘটনার বা পারিবারিক সমস্যার কারণেও অনেকে পরীক্ষায় উপস্থিত হয়না। এখন জেএসসি ও জেডিসি সিস্টেম হওয়ায় তাদের পক্ষে পরবর্তী লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়। অথচ পূর্বে যখন এ পদ্ধতি ছিলনা তখন স্কুল কর্তৃপক্ষের অধীনে তারা পরবর্তী ক্লাসে উন্নীত হতে পারতো। কিন্তু এখন সে সুযোগ বন্ধ।
সঙ্গতকারণেই বলতে হয় বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নবিদ্ধ।
কারণ প্রতিবছর বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের একাংশ ঝরে পড়ছে, এটি দেশ ও জাতির জন্য বড় ক্ষতি। ঝরে পড়াদের অনেকেই জীবনের তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হয়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এবারে জেএসসি ও জুনিয়র দাখিল মাদ্রাসা সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী বেড়েছে বলে যে হিসাব দিয়েছে, তা সঠিক নয়।
এই সময়ে বিদ্যালয়বয়সী ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেড়েছে আরও অনেক বেশি। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার কমায় শিক্ষা বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা আত্মতৃপ্তি লাভ করলেও আমরা আশ্বস্ত হতে পারছি না। ছয় থেকে ১১ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির পাশাপাশি তাদের পাঠক্রম শেষ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকার পিছিয়ে পড়া এলাকায় উপবৃত্তি, পাইলট স্কিমের আওতায় দুপুরে শিক্ষার্থীদের নাশতা পরিবেশনের যে কর্মসূচি নিয়েছে, তা কিছুটা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু সেই সঙ্গে বিদ্যালয়ে পাঠদানের বিষয়টিও নিবিড় তদারকির আওতায় আনতে হবে।
গরিব অভিভাবকদের আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে তারা সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত হন। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ালে দেশ অনেক বেশি লাভবান হবে।
মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মত মৌলিক চাহিদার বন্দোবস্ত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কেবলমাত্র শিক্ষাঙ্গনে মৌলিক পরিবর্তন বাঞ্ছিত নয়।
প্রসঙ্গত আমরা মনে করি প্রচলিত সমাপনী পরীক্ষা পদ্ধতি অবশ্যই ত্রুটি যুক্ত এবং এদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সঙ্গত নয়।
প্রধানত যেসব পরীক্ষার্থী ফেল করে তাদের অনেকেই সমস্যাপীড়িত ও অর্থনৈতিক দৈন্যতাযুক্ত জীবন-যাপন করে। তাদের পক্ষে এ ঝরার নামে পুরো শিক্ষা জীবন থেকেই ঝরে যেতে হয়।
অপরদিকে রেজিস্ট্রেশন, গ্রেডিং এসব সিস্টেমও পঞ্চম শ্রেণীর কোমলমতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এসব কিছুর পেছনে দেশের শিক্ষা নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার এবং সঠিক ও সহজ শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন দরকার। ।
অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।