আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মহাত্মা গান্ধী

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী অন্যতম প্রধান ভারতীয় রাজনীতিবিদ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তিদের একজন এবং প্রভাভশালী আধ্যাত্মিক নেতা। মহাত্মা গান্ধী বক্তৃতার নয়, কর্মের রাজনীতি করতেন। বর্তমান সন্ত্রাস, হানাহানির পৃথিবীতে তাঁর মতো রাজনীতিক দরকার। বাংলাদেশের বেলায় তো আরও বেশি দরকার। নবীন ব্যারিস্টার মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধী ভারত ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন দু’পয়সা কামাই করার জন্য কিন্তু তা আর হলো না।

জাতিসংঘ তাঁর জন্ম দিবস ২ অক্টোবরকে অহিংস দিবস ঘোষণা দিয়েছে। তিনি কোরআন, বাইবেল, গীতা, বড় বড় ধর্মের সব গ্রন্থ প্রায় মুখস্থই করে ফেলেছিলেন। ভারত সরকারীভাবে তাঁর সম্মানার্থে তাকে ভারতের জাতির জনক হিসেবে ঘোষণা করেছে । ১৯৩৪ সালের গ্রীষ্মে তাকে হত্যার জন্য তিনটি ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

সে সময় তিনি নতুন দিল্লীর বিরলা ভবন (বিরলা হাউস) মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। তার হত্যাকারী নাথুরাম গডসে ছিলেন একজন হিন্দু মৌলবাদী যার সাথে চরমপন্থী হিন্দু মহাসভার যোগাযোগ ছিল। ভারতের বহু সম্প্রদায়ের অনৈক্যের মাঝে তিনি ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন সর্বজনপ্রিয় নমস্য ব্যক্তিত্বে। ভারত জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সত্যাগ্রহ, লবণ সত্যাগ্রহ, নানা আন্দোলন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে শেষে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেন।

তিনি কখনো ভারত বিভক্তি চাননি। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা দশ বছর পিছিয়ে যাক তবু ভারত বিভক্তি মানব না। কিন্তু বাস্তব সত্য গান্ধীকে ভারত বিভক্তি মানতে হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের মতো তিনি ভোগবিলাসী ছিলেন না। ভারত স্বাধীনতা লাভের পর কংগ্রেসের নেতারা যখন ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে ওঠেন, তিনি তখন ক্ষোভে কংগ্রেস ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন।

তিনি প্রতিনিয়ত লেখালেখি করতেন। অজপাড়াগাঁ নোয়াখালীতে যখন চার মাস অবস্থান করেন তখনও পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেটি ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। গান্ধীর ষোল বছর বয়সে তার বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। গান্ধী তার বাবার অসুস্থতার পুরো সময় তার সাথে থাকেন।

একরাতে গান্ধীর চাচা এসে তাকে বিশ্রাম নেবার সুযোগ করে দেন। তিনি তার বেডরুমে ফিরে যান এবং কামনার বশবর্তী হয়ে তার স্ত্রীর সাথে প্রণয়ে লিপ্ত হন। এর সামান্য পরেই একজন কর্মচারি এসে তার পিতার মৃত্যুসংবাদ জানায়। তিনি এ ঘটনাটিকে দ্বিগুণ লজ্জা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই ঘটনাটি গান্ধীকে ৩৬ বছর বয়সে বিবাহিত থাকা অবস্থায় একজন ব্রহ্মচারী হতে বাধ্য করে।

তিনি উপমহাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিলেন। তিনি সমতার বাণী প্রচারে পুরো ভারতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান। তিনি মনে করতেন, মানুষকে না জানলে, দেশকে জানা না হলে স্বাধীনতা ফলপ্রসূ হবে না। মানবতাই ছিল তাঁর প্রধান দর্শন। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের গান্ধীর সেই আদর্শ অনুসরণ করতে হবে।

অন্যথায় সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোথাও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। পূর্ব বাংলার প্রতি তাঁর একটি আলাদা টান ছিল। বর্তমান বিশ্বে গান্ধী এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা হোসেনও গান্ধী অন্তঃপ্রাণ। তাঁর পথ ধরেই এগিয়ে যেতে তাঁর বহু বক্তৃতায় মহাত্মা গান্ধীর কথা এসেছে।

আমাদের অনেক নেতা-নেত্রী তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে হিংসার না অসহযোগের পথ বেছে নিয়েছেন। সফল হয়েছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে, নতুন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছে দিতে হবে। তিনি তার মায়ের কাছে শপথ করেছিলেন যে তিনি মাংস, মদ এবং উচ্ছৃঙ্খলতা ত্যাগ করার হিন্দু নৈতিক উপদেশ পালন করবেন। যদিও তিনি ইংরেজ আদব কায়দা পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ করেছিলেন; যেমন নাচের শিক্ষা, কিন্তু তিনি তার বাড়িওয়ালীর দেওয়া ভেড়ার মাংস এবং বাঁধাকপি খেতেন না।

ভারতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে আগতদের মল-মূত্র পরিষ্কার করতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। গান্ধীর ঝাড়ু নিয়ে নিজ হাতে ময়লা পরিষ্কারের ঘটনাটি ছিল প্রতীকী অর্থে। তাঁর এই কাজ মানুষের মনের আবর্জনা ও সমাজের কুটিলতা পরিষ্কারে ভূমিকা রেখেছিল। তিনি ছিলেন নিরামিষ ভোজী। ছাগীর দুধ, কিছু কিশমিশ ফল আহার করতেন।

গান্ধীর পরিচিত পোশাক এক টুকরো লেংটি আর এক টুকরো উত্তরীয় হাতে একটা লাঠি। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে…’ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ১৯৩০ সালে গান্ধী ভারতীয়দের লবণ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ৪০০ কিলোমিটার (২৪৮ মাইল) দীর্ঘ ডান্ডি লবণ কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন, যা ১৯৪২ সালে ইংরেজ শাসকদের প্রতি সরাসরি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে বেশ কয়েকবার দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতে কারাবরণ করেন। ধার্মিক মায়ের সাথে এবং গুজরাটের জৈন প্রভাবিত পরিবেশে থেকে গান্ধী ছোটবেলা থেকেই জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষ ভোজন, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাসে থাকা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহিষ্ণুতা ইত্যাদি বিষয় শিখতে শুরু করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গান্ধীর ভিতরে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা স্বত্ত্বেও তাঁরা একাধিকবার নিজেদের মধ্যে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এই বিতর্কগুলি সে সময়কার জনপ্রিয়তম দুই ভারতীয়ের ভিতরে দার্শনিক মতভেদকে প্রমাণ করে। পিটার ম্যারিজবার্গের একটি ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর কামড়া থেকে তৃতীয় শ্রেণীর কামড়ায় যেতে বাধ্য করা হয়, প্রথম শ্রেণীর বৈধ টিকিট থাকা স্বত্ত্বেও। স্টেজকোচে ভ্রমণের সময় একজন চালক তাকে প্রহার করে কারণ তিনি এক ইউরোপীয় যাত্রীকে জায়গা করে দেয়ার জন্য ফুট বোর্ডে চড়তে রাজি হননি। ১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এক সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ফিরে আসার পর এক শ্বেতাঙ্গ মব তাকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করে।

গান্ধী এই মব সদস্যদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেননি। কারণ তার মতে, কারও ব্যক্তিগত ভুলের জন্য পুরো দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়াকে তিনি সমর্থন করেন না। গ্রামবাসীদের কাছে বিশ্বস্ত হবার পর, তিনি গ্রামকে পরিষ্কার করার পাশাপাশি স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং গ্রামের নেতৃস্থানীয় লোকদের সামাজিক নির্যাতন এবং কুসংস্কার মুক্ত হবার আহ্বান জানান। গান্ধী ছিলেন বহুমূখী লেখক, সম্পাদক। দশক ধরে তিনি সম্পাদনা করেছেন গুজরাটী, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা হরিজন।

গান্ধী পত্র-পত্রিকায় প্রচুর চিঠি লিখতেন। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন পত্রিকায় তার চিঠি প্রকাশিত হতো। গান্ধীর বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সম্প্রীতি রক্ষার জন্য পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম বাংলা, বিহার; বিহার থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার নোয়াখালী, বিক্রমপুরের ফুরশাইল, লৌহজং ছুটে এসেছেন। নোয়াখালীতে তিনি একবার চার মাস অবস্থান করেন।

তিনি সব ধর্মের, উঁচু-নিচু সব সম্প্রদায়ের লোক নিয়ে নীরব প্রার্থনায় মগ্ন হতেন। সবার মন জয় করার মানসে তিনি বাংলা শিখতে আরম্ভ করেন। আর বাংলার শিক্ষক নিযুক্ত হন তখন সাংবাদিক শৈলেন চট্টোপাধ্যায়। পৃথিবীর দেশে দেশে হিংসার আগুন যেখানেই জ্বলে ওঠে সেখানেই মহাত্মা গান্ধীর নাম উচ্চারিত হয়। আত্মশুদ্ধি এবং প্রতিবাদের কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য উপবাস থাকতেন।

বেশ কয়েকজন জীবনীকার গান্ধীর জীবনী রচনার কাজ করেছেন। ১৯৩১ সালে পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন গান্ধীর সঙ্গে পত্রালাপ করেন। গান্ধীর কাছে লেখা এক চিঠিতে আইনস্টাইন গান্ধীকে “আগামী প্রজন্মের জন্য আদর্শ” (a role model for the generations to come) হিসাবে বর্ণনা করেন। মহাত্মা গান্ধী ইংল্যান্ডের রাজার সাথে চা খেয়েছিলেন খালিগায়ে শুধুমাত্র ধুতি পরে। চা খেয়ে ফিরে এলে তাকে ব্রিটিশ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন “রাজার সামনে বসে আপনার কি মনে হয়নি আপনার পোষাকের ঘাটতি ছিল”? মহাত্মা গান্ধী উত্তর দিয়েছিলেন “ আপনাদের রাজা একাইতো আমাদের দুজনকে ঢাকার মত যথেষ্ট পোষাক পরেছিলেন” ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে ৬১ বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.