আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সংবিধান ও আমাদের জাতীয় পরিচয়

একটি টিভি চ্যানেলে আলাপচারিতা অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন ড. কামাল হোসেন। ১৯৭২ সালে তিনি ছিলেন 'আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলী এবং সংবিধান-প্রণয়ন' মন্ত্রী। জাতীয়তা বিষয়ে তিনি বললেন পুনরায় সংবিধান প্রণয়ন করা হলে তাতে বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল জাতিসত্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কথাটা শুনার পর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর, মঙ্গলবার বেলা ১০.২০ মিনিটের সময় অনুষ্ঠিত 'বাংলাদেশ গণপরিষদের বিতর্ক' সরকারি বিবরণীর ৪৪৩ পৃষ্ঠাঙ্কর প্রতি দৃষ্টি আরোপ করলাম। তার প্রাসঙ্গিক অংশ নিম্নরূপ : জনাব স্পিকার : ...এখন জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া আপনার প্রস্তাব পেশ করুন।

জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া (এন.ই. ১১৫ : ঢাকা-১২) : মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে, 'সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সনি্নবেশ করা হোক : '৬। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন। ' এই বিষয়ে জনাব স্পিকার পরিষদে আলোচনার আহ্বান জানান । ড. কামাল হোসেন (আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলী এবং সংবিধান-প্রণয়ন-মন্ত্রী) : মাননীয় স্পিকার সাহেব, এই সংশোধনী গ্রহণযোগ্য বলে আমি মনে করি এবং এটা গ্রহণ করা যেতে পারে। শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (পি.ই.-২৯৯ : পার্বত্য চট্টগ্রাম-১) : ....মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল, সংবিধান-বিলে আছে, 'বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।

' এর সঙ্গে সুস্পষ্ট করে বাংলাদেশের নাগরিকগণকে 'বাঙালি' বলে পরিচিত করবার জন্য জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে, যে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যে সংজ্ঞা, তাতেকরে ভালোভাবে বিবেচনা করে তা যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি। আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখা পড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সবদিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি; কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ_ কেউ বলেন নাই, আমি বাঙালি। আমার সদস্য সদস্যা ভাই বোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায় ... জনাব স্পিকার : আপনি কি বাঙালি হতে চান না? শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা : মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমাদেরকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় নাই। আমরা কোনোদিনই নিজেদেরকে বাঙালি বলে মনে করি নাই। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে।

আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি: কিন্তু বাঙালি বলে নয়। জনাব স্পিকার : আপনি বসুন। Please resume your seat. শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যাপারে আমার বক্তব্য হল, জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূইয়া সাহেব যে সংশোধনী এনেছেন, তাতে মনে এই প্রশ্ন জাগে যে, বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়া ভারতের কেউ বাস করছে। আমি শুধু বলতে চাই যে, বাঙালি বলতে এইটুকু বোঝায় যে, যারা বাংলা ভাষা বলে তাদেরকে আমরা বাঙালি বলি।

জনাব স্পিকার : Please resume your seat .. আপনি বসুন, আপনি বসুন। এর পরই মাননীয় স্পিকার বিষয়টি ভোটে দেন। কণ্ঠ ভোটে পরিষদের মতামত গ্রহণের পর মাননীয় স্পিকার বলেন : 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হয়েছে , 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হয়েছে , 'হ্যাঁ' জয়যুক্ত হয়েছে। অতএব, সংশোধিত আকারে ৬ নম্বর অনুচ্ছেদটি সংবিধান বিলের অংশে পরিণত হল। শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (পি.ই.-২৯৯ : পার্বত্য চট্টগ্রাম-১) : মাননীয় স্পিকার, আমাদের অধিকার সম্পূর্ণ খর্ব করে এই ৬-নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধিত আকারে গৃহীত হল।

আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং প্রতিবাদস্বরূপ আমি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণপরিষদের বৈঠক বর্জন করছি। [অতঃপর মাননীয় সদস্য পরিষদ-কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান। ] (উদ্ধৃত বিবরণী এসিসটেন্ট কন্ট্রোলার-ইন-চার্জ, বাংলাদেশ ফরমস এবং পাবলিকেশন্স অফিস, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত। ) এরপরের ইতিহাস সকলেরই জানা। এখানে একটি কথা বলা দরকার যে সংবিধান ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে আবেগের চাইতে প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার প্রয়োজন অনেক বেশি।

পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১ সনের ১৪ নং আইন) বলে ৬নং অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের পর সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদের পাঠ নিম্নরূপ : (১) বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে। (২) বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন। সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম ক-ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্যকোন পন্থায় সংশোধন অযোগ্য হইবে। ' আলোচ্য ৬ অনুচ্ছেদটি সংবিধানের প্রথম ভাগের অন্তর্ভুক্ত। অতএব তা সাংবিধানিক পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য।

এই বিধান অনন্তকাল ধরে বলবৎ থাকবে। সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, '(১) কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায়_ (ক) এই সংবিধান বা ইহার কোন অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে ; কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে_ তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে। (২) কোনো ব্যক্তি (১) দফায় বর্ণিত_(ক) কোন কার্য করিতে সহায়তা সহযোগিতা বা উস্কানি প্রদান করিলে; কিংবা (খ) কার্য অনুমোদন, মার্জনা, সমর্থন বা অনুসমর্থন করিলে_ তাহার এই কার্যও অপরাধ হইবে। (৩) এই অনুচ্ছেদে বর্ণিত অপরাধে দোষী ব্যক্তি প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দন্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দন্ডে দন্ডিত হইবে। ' তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সংবিধান বর্তমান অবস্থায় পুনঃ প্রণয়নের সুযোগ নাই, এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা বা মতামত প্রকাশেরও সুযোগ নাই।

অতএব নাগরিকত্ব সম্পর্কিত বর্তমান বিধান অনন্তকাল ধরেই বহাল থাকবে। লেখক : সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.