আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

সংবিধান সংশোধন কিংবা ’৭২ এর সংবিধান ঃ প্রসঙ্গত কিছু প্রশ্ন



সংবিধান সংশোধন কিংবা ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, পরস্পরের উপর কাদা ছোড়াছুড়ি, রাজনৈতিক ইসু হিসাবে ব্যবহারও একেবারে কম হয়নি বাংলাদেশে। আর সংবিধান সংশোধন কিংবা ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে গিয়েও যে কতটা লাভ হবে জনগনের তা নিয়ে আমি যথেষ্ট সন্দিহান। যদি প্রচলিত সংবিধানের কথাও বলি, তবে আমরা দেখতে পাই কিভাবে লজ্জাস্কর ভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে মুখে গাই দেশের কথা , সাংবিধানিক আইনের কথা। বরাবরই মানবাধিকারের সাফাই গেয়ে প্রকাশ্য মানবাধিকার লঙ্ঘন করি। সংবিধান কর্তৃক নির্ধারিত জনগনের মেীলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ সরকার।

সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা কে মেীলিক অধিকার বলা হয়েছে, যার একটিও পূরনে ব্যর্থ শুধু বর্তমান সরকাই নয় বরং স্বাধীণতা উত্তর কোন সরকারই তা পারেনি। এখনো মানুষ খাদ্যের অভাবে মানুষ উপবাস করে, ভিক্ষা করে (মুক্তি যোদ্ধারাও), বাসস্থানের অভাবে ফুটপাতে ঘুমায়, শিক্ষার অভাবে অতিদারিদ্র জীবন জাপন করে, চিকিৎসার অভাবে ঢলে পড়ে মৃত্যুমুখে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার পর জনগনের চেয়ে নিজের দলীয় উন্নয়নে ব্যস্ত হয়। উদাহরণ হিসাবে আমরা সামপ্রতিক একটি ঘটনা দেখতে পাই যে- বর্তমান ক্ষমতাশীন দল তার একটি অংঙ্গ সংগঠনের (ছাত্রলীগের) নেতা নির্বাচনের জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো। অথচ একই সময়ে শত শত হত্যা মামলার তদন্তের মধ্যে দেখতে পাই অলসতা ও উদাসীনতার নমুনা ( এস এই গেীতম সহ অন্যান্য)।

সরকারি অর্থে নিয়োগ দেওয়া ও বেতন ভূগি এসব গোয়েন্দা কি কোন দলের নেতা নির্বাচনের জন্য নাকি জনগনের কল্যানে অপরাধের তদন্তেও জন্য? প্রশ্ন আপনাদের কাছে। আরো বড় দুঃখ আমরা সাধারন জনগণ মনে করি আমাদের শুধু ভোট দেয়াই অধিকার এর বেশি কিছু নয়। একটা কথা মনে রাখবেন “বাচ্চা না কাঁদলে মাও দুধ দেয় না। ” সংবিধানে গনতন্ত্রের কথা থাকলেও বাস্তবে কি তা আছে ? দেশে এখন চলছে শুধু বিবোধিতার কারণে বিরোধিতা, সত্য বলতে গেলেই জীবননাশের কিংবা অঙ্গহানীর আতংকে কাটে প্রতি মূহুর্ত। নেই বাক স্বাধীণতা , রাজনৈতিক স্বাধীণতা তো নেইই ।

এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্শ্িববিদ্যালয়গুলোতে। এমন কোন বিশ্বাবদ্যালয় নেই যেখানে রাজনৈতিক অবস্থান আছে। এই কি গণতন্ত্র ? ক্ষমতা যার ক্যাম্পাস তার যেন এক অলিখিত সংবিধান। আইনের সমাধিকারের কথা কি সংবিধানে নেই ? যদি থাকে তবে সরকারি দলের সন্ত্রসীদের আর বিরোধীদলের সন্ত্রাসীদের জন্য কেন এই বৈষম্য আইনানুগ আচরন। একই অপরাধের জন্য বিরোধীদলের শত শত কর্মী গেরেপ্তার আর সরকারি দলের কেই নয় কেন? অনেক আগেই প্রসংঙ্গচুত হয়েছি, অবশ্য সামন্জস্যপূর্ণ।

গত ২১ তারিখে বর্তমান সংবিধান সংশোধনের জন্য সৈয়দা সাজেদা চেীধুরীকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। ( যদিও এতে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির অংশগ্রহন এখন পর্যন্ত নেই)। এর প্রস্তাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন- “আর যেন কোন অবৈধ সামরিক শক্তি জনগনের উপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসতে না পারে , আর যেন কোন অপশক্তি গনতন্ত্র নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এবং নির্বাচনে কারচুপির সুযোগ না পায় , সে জন্যই সংবিধান সংশোধন একান্ত প্রয়োজন। ”(২২.০৭.২০১০,কালেরকন্ঠ)। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় বুঝা যাচ্ছে যে বাংলাদেশ ’৭২ এর সংবিধানে ফিরছে না বরং সংবিধানের পূর্ববর্তী চতুর্দশ সংশোধনীর মত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী হতে যাচ্ছে।

অথচ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল ’৭২ এর সংবিধানে প্রত্যাবর্তন। তবে এই কি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন ? নাকি ‘দুধের সাধ ঘোলে মেটানো’? বিষয়টি জনগনের সামনে পরিষ্কার হওয় দরকার। এই সংশোধনীর জন্য যে ১৫ সদস্যের সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে তার কো-চেয়ারম্যান প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, যিনি সদ্য স্বাধীণ হওয়া বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে সই করেননি। তবে কিভাবে তার নেতৃত্বে ’৭২ এর সংবিধানে ফিরে যাবো আর তিনিই বা কোন যুক্তিতে সেই সংবিধান আবার নিয়ে আসবেন ? অবশ্য তিনি কেন ’৭২র সংবিধানে সই করেননি তা তিনি নিজেই বলেছেন-“ রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির একটি বিষয়ে আপত্তি থাকার কারণে তিনি (সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত)সেই সংবিধানে সই করেন নি। ” (০৫.১১.২০০৯, সমকাল, পৃষ্ঠা-১৯,শিরোনাম ‘যে কারণে সুরঞ্জিত ’৭২র সংাবধানে সই করেননি’)।

আমরা জানি, ১৯৭২ সালের সংবিধানে যে চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ছিল তা হলো- (১) ধর্ম নিরপেক্ষতা (২) জাতীয়তাবাদ (৩) গনতন্ত্র ও (৪) সমাজতন্ত্র । তবে তিনি সেখানে স্পষ্ট করেননি যে কোন মূলণীতিতে তার আপত্তি ছিল। এখন কথা হলো যদি আমরা আবার ’৭২র সংবিধানে ফিরে যাই তবে কি এই মূলনীতি ঠিক থাকবে ? যদি থাকে তবে কিভাবে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত এতে সই করবেন ? কেননা তিনি এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান, এবং কমিটি সূত্র মতে ‘সৈয়দা সাজেদা চেীধুরীকে চেয়ারম্যান করা হলেও মূল কাজ ও mgš^q করবেন কো-চেয়ারম্যান’ (২২.০৭.২০১০,কালেরকন্ঠ)। আর যদি সেই মূলনীতি ঠিক না থাকলে ’৭২র সংবিধানে যাওয়ার কি কারণ? আর সংশোধনীই বা কেন ? এছাড়াও আরো প্রশ্ন থেকে যায় । তিনি (সুরঞ্জিত) বলেন “আদালতের রায় অনুসরণ করে সংবিধান সংশোধন করা হলে পচাত্তর পূর্ববর্তী সাংবিধানিক রাজনীতির পূনর্জাগরণ ঘটবে, কবর রচিত হবে পচাত্তর পরবর্তী অসাংবিধানিক রাজনীতির।

”(২২.০৭.২০১০,কালেরকন্ঠ)। প্রশ্ন হলো যদি ’৭৫ পূর্ববর্তী রাজনীতির সবকিছু সাংবিধানিক হয় তবে কি ’৭৪ সালের বাকশাল ই অগণতান্ত্রিক রাজনীতিও কি সাংবিধানিক স্মীকৃতি পচ্ছে ? আর একটি কথা হলো - এখন বলা হচ্ছে , ৫ম সংশোধনী বাতিল হওয়ায় বা চলমান সংশোধনী হলে বিএনপি তার রাজনৈতিক অধিকার হারাবে। তবে আমার মনে হয় কে বা কারা বা কোন দল হারালো না জিতলো; তা না দেখে আমাদের দেখতে হবে কিসে জনগনের ও দেশের কল্যান এবং দেশের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষন হয়। এবং ‘‘জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক ’ এর প্রতিফলন হয়। অন্তত এবার আমাদের রাজনীতিবিদদের বোধোদয় ঘটুক যে শূধু বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা নয় বরং সবাই দেশ ও জনগনের জন্য কাজ করুক ।

এই প্রত্যাশা শুধু আমার নয় বাংলার সকল তরুণদের। লেখকঃ মাহমুদুল হাসান কলি ছাত্র, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য, জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার কোষাধ্যক্ষ, জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.