আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ম্যাচ মেকিং

একটি বানানভুলসর্বস্ব ব্লগ মায়ের নিরন্তর চাপাচাপিতে অতিষ্ট হয়ে অবশেষে মানিক তার বায়োডাটা পাঠাতে বাধ্য হলো। তার বায়োডাটা তৈরির আয়োজন দেখে মনে হতে পারে সেটা কোনো ছয় অংকের চাকুরীর আবেদন পত্র- শিক্ষাগত যোগ্যতা, আগ্রহ এবং তার অন্যান্য দক্ষতার বিশদ তালিকার কাছে ছয় সদস্যের পরিবারের মাসিক বাজারের তালিকাও লজ্জায় মুখ লুকাতে বাধ্য। মুকিত, রাজু ও উল্লাসের কর্পোরেট পিষ্ট ক্লান্তির মুখে ছাই ঢেলে বায়োডাটার প্রতিটি অংশ তাদের দিয়ে বারবার মৌখিকভাবে সত্যায়িত করিয়ে মানিক তার মায়ের উপর প্রতিশোধটা নিয়েই নিলো। বায়োডাটা পাঠানোর পর মানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, আগামী কয়েক মাস আর কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু বাড়ি যে সরকারি দফতর নয় তা টের পেতে মানিকের ছয় দিনও লাগেনা।

সেই সপ্তাহের শেষে মানিকের মা’র জরুরী তলব- EMERGENCY STOP COME SHARP STOP, অন্তত মানিক আমাদের এভাবেই বলেছে (সঙ্গে টেলিগ্রাম সম্পর্কিত মানিকের বক্তৃতার বিশদ বর্ণনা দিয়ে পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাইনা), রাতের পাখি মানিকের তাড়াহুড়ো করে ভোর ছয়টার ট্রেন ধরার কারণটা হালকা পরিষ্কার করে ; কিন্তু নিন্দুকেরা সবসময় অন্য অর্থ করতে পছন্দ করে, সঠিক কারণটা আমরাও তখনো জানতাম না। মানিকের সহযাত্রী ছিলো আমার পুর্বপরিচিত। কারণ না দর্শিয়ে মানিকের তাড়াহুড়ো করে বাড়ি যাওয়া নিন্দুকের মত আমাদেরও ভাবিয়ে তুলে। মানিকের যাত্রাকালিন ভালোমন্দের খোজখবর নেয়ার জন্য তার সাথে যোগাযোগ করি। আমাদের মানিক হচ্ছে ইংরেজীতে যাকে বলে like an open book, সমস্যা যেটা ছিলো সেটা হলো বইটা হিব্রু ভাষায় লেখা, ল্যাটিন বা গ্রীকও হতে পারে, আমরা ঠিকভাবে বুঝতাম না, সোজা বাংলা ভাষায় যেটা বুঝতাম সেটা হলো দ্যুর্বোধ্য।

মানিক কি ভাবছে বা ওর মনে কি চলছে তা বোঝা আমাদের মত অপাড় মূর্খদের পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিলোনা। সুতরাং তার সহযাত্রীর কাছে আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম সারা রাস্তা সে কি করেছে। আমাদের কান যা শুনলো মস্তিষ্ক তা প্রক্রিয়াজাত করে ঠোঁট তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলো- ধন্য ব্রহ্ম্যগুপ্ত! ধন্য তোমার শুন্যের আবিষ্কার! পুরো ছয় ঘন্টার রাস্তা মানিক শুন্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিলো। পাঠক ভুল বোঝার আগেই মানিক সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি। আমাদের বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে মানিক একমাত্র ইন্টেলেকচুয়াল ( ইন্টেলেকচুয়াল মানে সব সময় আঁতেল নয়, এই দুয়ের পার্থক্য টানতে মানিক সর্বদাই ঘন্টাখানেকের একটা লেকচার তৈরি রাখে, অনেক দিন সহ্য করার পর আমরা ওর কথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি)।

পড়ুয়া বললেও মানিককে অনেক বেশী ছোট করা হবে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও মানব জীবনের এমন কোনো দিক নেই যা সম্পর্কে মানিক জানেনা- গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, এমনকি মেডিকেল সায়েন্স সম্পর্কেও সে মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশী জ্ঞান রাখে। মাঝে মাঝেই তাকে বিভিন্ন পেশার দক্ষ মানুষের সাথে তাদের বিষয়গুলো নিয়ে টেক্কা দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করে যেতে দেখতাম। আমাদের সাধারণ মানুষের মত সেও তার নিজের মতামতগুলোকে বেশী প্রাধান্য দিত, সমস্যা শুধু এটা ছিলো যে সে জানেনা বা কোনো কিছু সম্পর্কে তার কোনো মতামত নেই এমন কিছুর অস্তিত্ব খুজে পাওয়া দুষ্কর। আমরা কখনো তার সাথে তর্ক করতে যেতাম না, আর কেউ করলে তার দায়-দায়িত্বও কখনো নেয়ার চেষ্টা করিনি।

মানিকের সবচেয়ে নজরকাড়া বৈশিষ্ট্য হলো তার কেতাবী দুনিয়া। বাংলা, ইংরেজী, জর্মান ও ফরাসী সাহিত্যের জাঁকজমক দুনিয়া ছিলো তার বিচরণক্ষেত্র। নারি-পুরুষ সম্পর্ক নিয়ে তার ধারণা ছিলো মধ্যযুগের নাইটদের মত। বিপরীত লিঙ্গের সাথে কথা বলার সময় শিষ্ঠাচারের ধারালো তরবারি মাঝখানে রেখে বিপরীত লিঙ্গকে সীমানা অতিক্রম করা থেকে বিরত রাখত; তাই বলে তাকে অন্য রকম ভাবার কিছু নেই, সে যথেষ্ট সুস্থ ও স্বাভাবিক একজন যুবক। বিপরীত লিঙ্গের কাছে তার প্রতাপ মারাত্মক রকমের।

কথায় কথায় বিভিন্ন কবিতার উদ্ধৃতি, কাব্যিক ভাষায় যে কোনো মেয়ের সামনে তার রুপের গুণকীর্তন, অফিসের নারী সহকর্মীদের দফতর ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন তাকে মেয়েদের কাছে ঈর্ষনীয়ভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। এখন পর্যন্ত সে চারটি চাকুরি ছেড়েছে; নাকি তাকে ছাড়ানো হয়েছে তা আমরা পরিষ্কার করে জানিনা। এতগুলো মেয়ের মধ্যে কাউকে বিশেষভাবে ভালো লাগে কিনা জানতে চাইলে মানিকের বাঁকা নাক কুঁচকে যায়। সামাজিক ও আত্মিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে ভালো লাগার ক্ষেত্রে আত্মিক সমঝোতার গুরুত্বকে উপরে রেখে মানিকের তুলনায় নিম্ন বুদ্ধিমত্তার মেয়েগুলোকে সে খারিজ করে দেয়। তার সঙ্গিনী হতে হবে তার মতো, তাকে যে কোনো সময় মানিকের বুদ্ধিবৃত্তিক কামনা পূরণে সক্ষম হতে হবে।

পূর্ণিমার রাতে চাঁদের সাথে প্রিয়ার সস্তা তুলনার চেয়ে প্রিয়ার সাথে সৌরজগৎ সম্পর্কিত আলোচনা মানিককে বেশী অভিলাষী করে তোলে। সিড়ি দিয়ে উঠার সময় মানিক খেয়াল করে তার বাসা থেকে খাবারের সুগন্ধ ষাট কি.মি. বেগে ছুটে আসছে। নিজের ঘরে ঢুকে দেখে তার ছোটভাই তার খাটে শুয়ে তাকে ভেংচি কাটছে। দু’জনের মধ্যে বাকবিতন্ডা শুরু হলে তার মা তাকে তার নতুন ঘরে নিয়ে যান। সারাজীবন হোস্টেলে ও মেসে থাকা মানিকের ছুটির আবাস ছিলো তাদের বাড়ির স্টোররুম।

ছোট সেই ঘরে একটি খাট, একটি আলনা ও একটি টেবিল দিয়ে মানিক তার দিন পার করে দিত, যদিও এক খাট ছাড়া আর কোনো কিছুই তার কোনো কাজে আসেনি। হঠাৎ এই পরিবর্তনে মানিক একটু অবাক হয়। আরো অবাক হয় তার নতুন ঘরে আসবাবের সমাহার দেখে। নতুন খাট, টেবিল, চেয়ার, কাপড় রাখার কাবার্ড- কি নেই সেখানে। এমনকি একটা ড্রেসিং টেবিলও জ্বলজ্বল করে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

সব কিছুই নতুন, এই নতুনদের ভীড়ে মানিকের নিজেকে পুরনো ও জীর্ণ মনে হতে থাকে। হাজার প্রশ্ন মনে নিয়ে সে তার মার দিকে তাকালে তিনি হেসে বলেন, “তোমার জন্য তিনটা মেয়ে ঠিক করেছি, যে কোনো একটাকে পছন্দ করে বিয়ে করতে হবে”। মায়ের কথা শুনে মানিক আঁতকে উঠে। মানিকের সংগ্রামী মন চনমনিয়ে ওঠে, কিন্তু সব সময়ের মত মা তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে তার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকান; মানিক কখনোই তার মায়ের অবাধ্য হয়নি। দুপুরে খাবার টেবিলে নতুন মুখ অস্বাস্থ্যকরভাবে মানিকের রুচিসম্মত আহারে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে।

তার বামদিকে তার মা বসলেও ডানদিকে বসে আছে তার সম্ভাব্য শ্যালক, সামনে সম্ভাব্য শ্বাশুড়ী ও তার পাশে বসা মানিকের সম্ভাব্য অদৃষ্ট। মানিকের বাবার বিপরীতে টেবিলের অন্য মাথায় বসা তার হবু শ্বশুর। অবিরাম কথা বলে যাওয়া লোকটাকে মানিকের ভালোই লাগে। এই পরিবারের নিবাস মানিকদের থেকে দুই বাসা পর। মানিক বিবাহযোগ্য শোনার পর ঘনিষ্ট এই প্রতিবেশী মানিকের মায়ের কাছে ধর্ণা দেয় তাদের মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।

মানিক কলেজে পড়ার সময় ছুটিতে বাসায় আসলে বিকালে গলির মাথায় তাদের সাথে দেখা হতো। মেয়েটা তখন ফ্রক পরে মায়ের পাশে দাড়িয়ে থাকতো, আর ছোট ভাইটা তার তিন চাকার সাইকেলে। মানিক যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তখনও তাদের সাথে বিকালে দেখ হতো- মেয়েটা সালোয়ার কামিজ পড়ে মায়ের পাশে আর ছোটটা বাকি বাচ্চাদের সাথে ক্রিকেট খেলা নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত থাকতো। দেখা হলেই তাদের সাথে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি মানিক বিশেষভাবে মেয়েটাকে পড়াশোনা করা নিয়ে উপদেশ দিত। ভাসা ভাসা শুনেছি, মেয়েটাকে পড়া দেখাতে তাদের বাসায় মানিকের বেশ ঘনঘন যাতায়াত ছিল।

কথাটা কতখানি সত্য জানিনা, লোকমুখে শোনা। কথার ব্যাপারে আমাদের মানিক পার্সিয়ান উপসাগরের নর্থ ডোম গ্যাসফিল্ডের মত অফুরন্ত, আল জাজিরার মতো ২৪ ঘন্টা চালু থাকতেও মানিকের কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু শ্রোতা যদি একের অধিক না হয় তাহলে সেই একক শ্রোতার নার্ভাস ব্রেকডাউনের সম্ভাবনা শতকরা ৯৮ এরও বেশী। কিন্তু এই বিশেষ মূহুর্তে মানিকের কাছে কথা যেনো যীশুর পবিত্র পান পাত্র। উপযুক্ত আলোচনার বিষয় খুঁজে বের করা তার কাছে এখন হারকিউলিয়ান চ্যালেঞ্জ।

মেয়েটা চেয়ারে বসে আঙ্গুল দিয়ে কিছু একটা আঁকার চেষ্টা করছে। মেয়েটা বয়সে আর একটু হলে ছোট মানিক হয়তো একটা কাগজ ও রংপেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে তাকে স্বচ্ছন্দে তার আকাআকি করতে দিয়ে এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে পারতো। অথবা তার স্কুল-কলেজের গল্প শুনে নানাবিধ উপদেশ দিয়ে বরাদ্দ সময় পার করতে পারতো। এর কোনোটাই করা সম্ভব হচ্ছেনা। “তুমি যেন কিসে পড়ো?” “ফিজিক্স”।

“তোমাদের কোয়ান্টাম মেকানিক্স পড়ায়?” পাঠকদের কল্যাণের জন্যই বলছি তারা যেন আর কিছু জানতে না চান। আমরাও জানতে চাইনি, কিন্তু অধিক আগ্রহের পীড়া এড়ানো বড়ই দায়। দ্বিতীয় সম্বন্ধ এসেছে মানিকের বাবার সহকর্মীর কাছ থেকে। এবার আর দুপুরের খাবার নয়। আধুনিক বাবা-মা মেয়েকে মানিকের সাথে ঘুরতে যেতে দিতে সম্মত হয়।

কোথায় নিয়ে যাওয়া যায় মাথা কুটে তা চিন্তা করার পর মানিক তাকে নিয়ে যায় পদ্মার ধারে। দুইজনই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর মানিকের দ্বিতীয় পাত্রী উসখুস করতে শুরু করে। মানিক সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করলে মেয়েটি তার মুঠোফোন বের করে তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মানিককে মেয়েটির অসভ্য ও রুক্ষ মনে হতে পারে, মানিক কিন্তু তা নয়। আসল ব্যাপারটা হলো নদী দেখলেই মানিক আনমনা হয়ে যায়।

আড্ডা দেয়ার সময় মানিকের জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় তিষ্ট হয়ে গেলে স্বস্তির জন্য আমরা নদীর পাড়ে এসে হাজির হই। মানিক সেটা বুঝতে পারেনা, যেরকম এখনো মানিক বুঝতে পারছে না যে যা আমাদের জন্য আশীর্বাদ মেয়েটির জন্য তা চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বেশীক্ষণ সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি বললো, “এখানে খুব রোদ”। মানিক খুব বেশী কথা বাড়াতে চায়না। পূর্ব অভিজ্ঞতা তাকে সতর্ক করছে এমন কিছু না করতে যা তার ছোটবোনকে তাকে ব্যঙ্গ করার খোরাক যোগান দিবে।

নদীর পাড় থেকে উঠে তারা এক রেস্টুরেন্টে যেয়ে ঢোকে। তার পরের কাহিনী আমাদের জানা নেই। মানিকের বিগত দুই সফলতাকে মাথায় রেখে এবার তার পরিবার তাকে সঙ্গ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তৃতীয় পাত্রীর বাসায় যেয়ে পাত্রীর চুল, হাটা, রন্ধনশৈলী, সঙ্গীতচর্চাসহ আরো নানাবিধ গুণ, দক্ষতা ও পটুতা যাচাই করে মানিকের বাবা-মা এযাত্রা সম্পন্ন করেন। মানিককে কিছুই করতে হয়নি, সে শুধু মেয়ের চুলের দিকেই মনোনিবেশ করে ছিলো।

লম্বা, কালো, মেঘের ঘনঘটা সদৃশ চুল মানিকের অন্তরে নন্দকাননে কৃষ্ণের বাঁশির সুর তোলে। মানিকের অপলক দৃষ্টির অর্থ মেয়েপক্ষ কি করেছে তা জানিনা, কিন্তু তাতে যে খারাপ কোনো ইঙ্গিত ছিলোনা তা নিঃসন্দেহে বলতে পারি। আজ মানিকের বিয়ে। বিয়ের মঞ্চে বসে আজও মানিক শুন্যের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.