আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

স্পেনের বার্সিলোনায় কয়েকদিন, পর্ব -২

ইদানিং কালে বাংলাদেশীরা আরো আসছেন, এর কারণ হলো, এখানে আসার পর বৈধতা পাবার সুযোগ রয়েছে বিদ্যমান। তাই কোন না কোন ভাবে স্পেন আসার সুযোগ সবাই খুঁজছেন। সুযোগ হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তাই ইংল্যান্ড থেকে নিয়ে আশে পাশের দেশ থেকে অবৈধ বাংলাদেশীরা আসেন। যদিও ব্যয় সাপেক্ষ তবুও বাংলাদেশীরা তাদের ধারণা স্পেনে এসে গেলে বৈধ হব। এ ছাড়াও এখানে বৈধ যারা, তারা তাদের পরিবার-পরিজন দেশ থেকে নিয়ে আসছেন, তাই ক্রমেই বাড়ছে সংখ্যা।

কাজ-কর্মেও কমতি নেই। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, চেষ্টা করলে কাজ জুটে যায়। বন্দর নগরী বার্সিলোনা বিশাল এরিয়া নিয়ে। এখানে কল-কারখানা প্রচুর। ক্ষেত খামারের সুযোগ আছে এবং মৌসুমও অনুকুলে।

যার বাসায় দাওয়াত রয়েছে, সেখানে ফিরতে হয়ে গেল রাত প্রায় ৮ঘটিকা। এসে দেখি পরিচিত, অপরিচিত বন্ধুরা সবাই উপস্থিত। স্থানটা হলো শান্তা কালামার এক বাসা। শিলামের সালাহ উদ্দিন ভাই, জাবেদ ভাইসহ আরো কয়েকজন সেখানে বসবাস করেন। তাদের আতিথেয়তায় মুগ্ধ এবং অভিভূত আমি।

বাহারি খাবার, এ যেন উৎসবের আমেজ। খাবার পর্ব শেষ হবার পর জমলো আড্ডা। তাদের কথা বার্তায় জানলাম এখানেও স্বদেশীরা অবসর নন। দলাদলি বাংলাদেশের অচল রাজনীতি, পরনিন্দা, পরচর্চায় তাদের অবসর সময় কাটান। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে আমার লজ্জা হয়।

আর দলাদলি, পরনিন্দা, পরচর্চা হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের বিপরীত। এই সব আজে বাজে ও আজগুবী স্বভাব মানুষ্য সমাজের হতে পারে না বলেই মনে করি। তা থেকে আমাদের আলাপ ভিন্নভাবে ঘুরিয়ে আনলাম শিক্ষা ও সংস্কৃতির দিকে। কারণ শিক্ষাই হচ্ছে উন্নতি উন্নয়নের একমাত্র চাবিকাটি। শিক্ষা ছাড়া হয়না সভ্যতা, সংস্কৃতি কিংবা সমাজনীতি।

আমেরিকার নির্বাচনে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শিক্ষা অর্জন করেছেন বলেই আজকের এই অবস্থানে যেতে পেরেছেন। ওবামা শুধু কেনিয়ার কালোদের জন্য গর্ব নয়, তিনি হচ্ছেন সব কালোদের জন্যই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। উপস্থিত সবাইকেই অনুরোধ করলাম স্পেনিশ ভাষা করায়ত্ত্ব করে এগিয়ে যেতে। ভাষা শিক্ষার আলাপে জনাব মাওলানা আব্দুল আহাদ সাহেব ও অংশ নিলেন। পূর্বের দিনের লোকদের ভাষার ওপর কতটুকুন খেয়াল ছিলো, তা বর্ননা করলেন।

তখন জানলাম তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন সৌদিআরবের পবিত্র মক্কা আল মুকাররমায়। উনার দুই ছেলেরও জন্ম সেখানে। মনে মনে ভাবলাম ভাগ্যবান তিনিই। তাহার কথা বলার ভঙ্গিমাও দারুণ। প্রায় সত্তরের কাছাকাছি বয়স,তাহার চলায়, বলায়, আমল ও আখলাকে আজো যেন তিনি তরুণ ও প্রাণবন্ত।

তাহার ভাষা সম্পর্কিত কথায় সবাই অট্টহাসিতে ফেটে উঠল। কথাটিও হাস্যকর। সৌদিতে এক বাংলাদেশী তাহার আরবী বসকে বলছে যে ;শুফ আবুইয়্যা আবুইয়্যা, আর বায়া কুত্ত্বা মারামারি কুল্লু খাজুর গাছ কাছির’। আসলে কথাটা হবে- আরবায়া কেলাব ইয়াতানাজ্জায়ু কুল্লু মাজারে তামার কাসারা। যাক, দীনের খেদমত কেমন চলছে জানতে চাইলে, উপস্থিত একজন বললেন, মাশাআল্লাহ খুব ভালোভাবেই চলছে।

তবে মেহনতের প্রয়োজন। তবে এই দাওয়াতের কাজে তবলীগ জামাত এগিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে ভাবলাম বাংলাদেশের যত আল্লামা এবং পীর ও হুজুরে কেবলা ইংল্যান্ড আসেন দ্বীনের খেদমত করতে, তাদের হয়তো এই রাস্তা এখনও মালুম নয়। একটি দেশসম বার্সিলোনা অথচ মসজিদ মাত্র হাতেগুনা কয়েকটি। অথচ এই সাধক মহাসাধক বুজুর্গ আলেম ওলামারা ইংল্যান্ডের কিছু কিছু শহরে অলিতে গলিতে মসজিদ মাদ্রাসা খুলে বসে একে অপরকে ই নয় সেই নয় বলে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মসজিদের প্রয়োজন অবশ্যই, কিন্তু তাহাতে জমাত আদায় করার মতো পর্যাপ্ত লোক হতে হবে তো! বার্মিংহামে এই রকম কিছু মসজিদ রয়েছে, যাতে নামাজ পড়তে গেলে দেখা যায় নামাজী শূন্য। হান্ডসওয়ার্থ এলাকাটি রয়েছে একটি মসজিদ কাম মাদ্রাসা। সেই মসজিদে ফজরের সময় নামাজ পড়তে গেলে দেখা যায় মসজিদ বন্ধ, আবার অনেক সময় দেখা যায় এশার নামাজেও মসজিদ বন্ধ থাকে বলে সমাজে বিশ্বস্ত বাদশা ভাই জানালেন। এই মসজিদে শুক্রবারে জুম্মার নামাজের সময় জামাতে ছিলাম আমরা মোটে ২২ জন। অথচ দুনিয়াজুড়ে এই মসজিদ মাদ্রাসার জন্য চাঁদা তোলা হয়েছে।

বিলেতের টিভি চ্যানেলের চাঁদাবাজী বাণিজ্যেও এই মসজিদ বিগত দিনে অংশ গ্রহণ করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। মাদ্রাসা নয় একে বলা যায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রাইভেট কোচিং সেন্টার। কিন্তু ধর্মপ্রাণ সরলমনা মুসলমানদের ধর্মীয় ভাবাবেগের ফায়দা লুঠা হচ্ছে, তাও আবার আল্লাহর মুজাহিদে কামেল ওলি, আউলিয়ার নাম ব্যবহার করে। আরো কিছু মসজিদ রয়েছে বিলেতে, যেখানে প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারী হবার জন্য রীতিমত প্রতিযোগীতা। আবার অনেক মসজিদে হয় বাংলাদেশের উদ্ভুট রাজনীতি চর্চা।

বাংলাদেশী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে হানাহানি তা আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানাবে। অথচ, সুষ্ট ব্যবস্থাপনার দেশে অবস্থান করার পরেও যাহারা এই সবে বিদেশে মূল্যবান সময় ও অর্থসহ প্রতিভার বিনাশ করছেন, তাদের ভেবে দেখার জন্য আরেকবার অনুরোধ জানাব। আরো বলব, দ্বীনপ্রিয় আলেম ওলামাদের মতো দেশে আসুন খেদমত করুণ প্রাণভরে দ্বীনের এবং নিজের। এক জায়গায় সবাই এক সাথে ভীড় করায় ফিৎনা ফাসাদ হয় বেশি বেশি। এবং ইসলাম ধর্মে ফিৎনা ও ফাসাদের কোন স্থান নেই।

আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি ধর্মেও মৌলিক ষিয়ে ফিৎনা ফাসাদ নেই। যা হয় একমাত্র নগদ নারায়নের জন্যই হয়। স্পেনে মুসলমানদের হারানো গৌরব ফিরে পেতে হলে দাওয়াতি কাজের বিকল্প নেই। সেই দাওয়াত বিনয়, নম্রতা, বিশ্বস্ততা, দৃঢ়তা, সহসশীলতা, ধৈর্য্য ও শিক্ষার প্রাধান্য দিতে হবে বলে মনে করি। আড্ডা জমেছে তুমুল রাত্রি, রাত পেরিয়ে ভোর হবার জন্য তৈরি হচ্ছে, মেহমান এসেছি দূর থেকে তাই সবাই বসে আছে।

নিজেকে ক্লান্ত মনে হচ্ছে ভেবে উঠব তখন মকবুল ভাই বললেন, ভাবী রান্নাঘরে বসে আছেন। তাহার কষ্ট হবে যদি না যাই, তা ভেবে রওয়ানা। ক্ষিদে নেই তবুও যেতে হল। উনার বাসা অনেক উঁচুতে, উপড়ে উঠতে উঠতে হাফিয়ে উঠলাম। খাবারের টেবিলে বসলাম ঝটপট।

আলাপে আলাপে জানালের ইংল্যান্ডে থেকে মুহিদুর রহমান এসেছেন শান্তা কালামায় রয়েছেন। মুহিদুর রহমানের নাম শুনে ফোন করলাম উনাকে, কিন্তু না পেয়ে শুধু কল করার জন্য অনুরোধ রাখলাম। তিনি একজন সজ্জ্বন ও ভদ্রলোক বলে জানি। মৌলভী বাজারে তাহাদের পরিবারে অনেক প্রভাবও সুনাম রয়েছে। তিনি বি, এন, পি দল করেন।

দীর্ঘদিন বিলেতে বি,এন,পি-র সভাপতি ছিলেন। এখন নাকি কেন্দ্রিয় কোন একটি পদে রয়েছেন। তবে আমি ঘনিষ্ট উনার সাথে আত্বীয়তার সূত্রে। মুহিদুর রহমানের মতো সজ্জন লোক যদি বি এন,পি দল না করে বিলেতে মূলধারার রাজনীতি ভূমিকা রাখতেন, তা হলে এতদিনে তিনি আরো বেশি প্রতিষ্টিত হতে পারতেন। তা ছাড়া তিনি যদি শুধু সমাজ সেবামুলক কাজে অংশ গ্রহণ করতেন তা হলে মানুষের হৃদয়ে স্থান পেতেন।

কিন্তু কিসের জন্য যে বি,এন,পি-র জন্য রাতদিন ব্যয় করছেন, তা তিনিই একমাত্র বলতে পারবেন। অবশ্য পরের দিন ভোরে তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন, আমাকে পেতে পেতে সন্ধ্যা ততক্ষনে তিনি এয়াপোর্টের দিকে রওয়ানা। কথা হতেই কন্ঠে মধূরতা নিয়েই সন্বোধন, তোমার সাথে শান্তা কলমায় দেখা হলো না বলে দুঃখিত। স্বভাব সূলভ ভঙ্গিতে কথা বলে বিদায় নিলাম তবে নানীর কথা জিজ্ঞাস করতে ভুলিনি। নারী আমার যেমন সুন্দরী তেমনি গুনি।

ঘুমাতে গেলাম হোটেলে, হোটেলটা মধ্যম মানের তবে বেশ পরিপাটি। তবে হোটেল না বলে বেড এন্ড ব্রেকফাষ্ট বললে ভাল হবে। জায়গার পরিবর্তন, গরমসহ কিছুতেই ভালো নিদ্রা হলো না। সকাল ৮ঘটিকায় ভাই সালেহ উদ্দিন এসে হাজির। নাস্তা করে সবাই তাহার বাসায় বেড়াতে গেলাম।

সময় কম কাজ বেশি, তাই একটি জায়গা দেখব সিদ্বান্ত হল। যেতে আসতে কথা হল অনেক স্পানিস ভাষা ২/১টি শেখার চেষ্টা করলাম। যে ভাষাগুলো তাদের থেকে শিখলাম তা হলো- লুকতরি (টেলিফোন), গ্রাসিয়াছ (ধন্যবাদ) সময় নেওয়া (চিতা) পানি (আগুয়া) মিরা (দেখা) ইত্যাদি। মেট্রোতে আসতে সময় কম লাগলো। মেট্রো দেখলাম বেশ উন্নত ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

আমরা যাচ্ছি মনজুইক নামে এক জায়গায়। খুবই উঁচু পাহাড়, তাহাতে উঠতে গেলে রয়েছে মেট্রোর মত সয়ংক্রিয় বাহন। প্রতি ৫মিনিট পরপর যায়, আমরা চড়ে বসলাম অনেক উঁচুতে উর্ধে। আবারো চড়লাম ছোট একটি বাগিতে তা আমাদের নিয়ে গেল এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। উচুঁ থেকে গোটা শহর ও সমুদ্র দেখে আমি মুগ্ধ, অপূর্ব এই দৃশ্যগুলো দেখে মন জুড়িয়ে গেল।

আরো যেতাম, আরো চড়তাম কিন্তু কাজের তাড়া এবং ভয় কাতুরে সালাহ উদ্দিন, পারভেজসহ অন্যান্য সফর সঙ্গীরা রাজি হলেন না। তাদের ভয় কাটাতে বললাম, ফুলসেরাতে তো আরো কঠিন তখন কি হবে? যাক, চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, সময় সল্পতায় বেশি কিছু দেখা হলো না। আবার আসব যেতে যেতে দেখলাম সমুদ্র পাড়ে ভিলা আলিম পিয়া, দূর থেকে দেখেছি বেশ সুন্দর ও দেখার মতো। আগামীতে দেখবো ভেবে সোজা রাস্তায় আবারো রওয়ানা দিলাম। অনুরোধ রাখলাম সাথী ভাই সালেহ উদ্দিনকে বাংলাদেশী এলাকা দেখিয়ে নিয়ে যাবার জন্য।

তিনি তাই করলেন। আসলাম রামলা গতালোনায়। রামলাদে-রাওয়াল, কাইয়্যে সালভাদরসহ বেশ বড় এলাকায় আমার স্ব-দেশী ভাইয়েরা থাকেন। রাস্তায় দেখলাম শাহজালাল মসজিদ ও সেন্টার। শখ ছিলো দেখবো ও সালাত আদায় করবো, কিন্তু আশা পূর্ণ হলো না কারণ মসজিদ বন্ধ ছিল।

আমি বুঝি না মসজিদ কেন শুধু সালাতের ওয়াক্তেই খুলবে! মসজিদ থাকবে দিনে রাতে চব্বিশ ঘন্টা খোলা। ইংল্যান্ড কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মসজিদ হতে পারে মুসলমানদের সব সময় আশ্রয় স্থল। সব সময় সেবা দিতে মসজিদ ভুমিকা রাখবে। এই যেমন আমাদের সালাত আদায় হলো না। এই সালাত কাযার যে পাপ হবে সে থেকে মসজিদ কর্তৃপক্ষও পার পাবে না।

আগামীতে সকল মসজিদ দিনে রাতে সব সময় খোলা থাকবে বলে প্রত্যাশা। রাস্তায় দেখলাম কিছু দোকান পাট বেশ গুছালো এ সবই পরিচিত সালাহ উদ্দিন ভাইয়ের। তাই কয়েকজনের সাথে পরিচিত হলাম। সবাই নেন বলে জানালেন। ইউরোতে মূল্য, তবে বেশ চড়া দাম দেশীয় মাছ, শুটকী জাতীয় দ্রব্যের।

শাক সবজীসহ অন্য অনেক কিছু কম মূল্যে পাওয়া যায়। যাবার বেলা সব সময় তাড়া থাকে, তাই চল চল ভার এইর মধ্যে কিছু বাজার হলো। আলাপে আলাপে পরিচিয় হল জনাব রিয়াদ আহাদ সাহেবের সাথে। কিছু সময়ের মধ্যেই উনার থেকে জানলাম অনেক তথ্য। রিয়াদ আহাদ সাহেব মনে হল খুব ভালো মানুষ, সংস্কৃতির সাথে জড়িত, সাংবাদিকতা করেন বললেন সাথের একজন।

তাহার স্বহাত্য জবাব সময় কাটানো আর কি। কি যেন কাগজ পড়ি কি না জানতে চাইলেন, মানা করলাম। কি যে পড়ব, আজকাল কাগজ পত্রের যে হাল। মান সম্মত তো দূরে থাক নুন্যতম পাঠক প্রিয়তাও নেই। এমন সব খবরাখবর কাগজে দেওয়া হয় যেখান থেকে বের হয় সেখানের কোন খবর বা ঘটনা নেই।

তবে এ সবে জড়িত থেকে অন্যকে বলা যায় আমি সম্পাদক বা আমি প্রকাশক। জনাব রিয়াদ আহাদ সাহেব তাহার কাছে থাকা একটি সাহিত্যের ছোট কাগজ যার মূল্য ৫ ইউরো, উপহার হিসাবে দিলেন। ধন্যবাদ জানালাম উনাকে, সত্যি বলতে কি রিয়াদ আহাদ সাহেবের সাহিত্যের ছোট কাগজ এবারের বার্সিলোনা সফরের মধ্যে সেরা উপহার, যা মনে থাকবে আজীবন। অনেক সময় অনেক উপহার ক্ষুদ্র ও সামান্য মনে হয় কিন্তু তা মনের মধ্যে স্থান পায় আজীবন। দুবাইতে এইভাবে একটি সিডি উপহার দিয়েছিলো চট্টগ্রামের মোহসীন।

আজ দীর্ঘ নয় বছর পরেও ঐ সিডিটি আমাকে হাসায় এবং কাঁদায়। এতে সবগুলো গানই ছিলো হারানো দিনের। যাই হোক নির্ধারিত কাজ, সময় মত না গেলে এতে দূরের যাত্রা বিফল হবে, তাই এক দৌড়ে চলে এলাম, খাবারের দাওয়াত ছিল পারিনি যেতে। ব্যস্ত সময় কাটল, একটু হাওয়া খেতে বেরুলাম। এবারের সাথী জাবেদ, বাড়ী গোলাপগঞ্জে।

খুবই মিশুক ও খোলামনের মানুষ সে। দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে বার্সিলোনায়। স্পেনের প্রশংসা পঞ্চমুখ, বিয়ে করেছে মৌলভী বাজারের মুন্সি বাজার এলাকায়। সে আমাকে আগামীতে দুই সপ্তাহের জন্য বেড়াতে যাবার জন্য বলল বার্সিলোনাতে। ফিরে এসে দেখি সালাহ উদ্দিন, শিপলু, জাবেরসহ সবাই অপেক্ষায় বসে আছেন, রাত হয়েছে অনেক সকালেই ফিরতে হবে তাই হোটেলে যাব।

একে একে বিদায় নিলাম, কিন্তু তাদের ও আমার মন ভারাক্রান্ত হল। তাদের জন্য আমি হয়তো কিছুই করতে পারব না, হয়তো আর কোনদিন দেখাও হবে না। কিন্তু তাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আমাকে চিরজিবন ঋণী রাখবে। আমি তাদের জন্য আজীবন সাফল্যের জন্য দোয়া করব। হোটেলে আসলাম তো ঠিক কিন্তু নিদ্রা কি হবে? আজ বেশ কিছুদিন থেকে এক অদৃশ্য ব্যাধিতে ভুগছি, তারমধ্যে প্রধান সমস্যা ঘুমের।

তাই বিছানায় আসলেই নিদ্রা না হওয়ার জন্য অশান্তি একটা আতংক আমার কাছে। এক মাত্র আল্লাহ জানেন তা কি? আমার এই ব্যাধির জন্য সবার কাছে দোয়া চাইছি। যা ভাবছিলাম হলও তাই। খুব সকালেই সালাত আদায় হল ফজরের, হোটেল থেকে বেরিয়ে আসব ঠিত তখনি মনে পড়ল যার কারণে আসা স্পেন আসা সেই কামাল ভাইয়ের কথা। হ্যাঁ তিনি পিটার বরাহ এর কামাল এম সি রহমান।

যাহাকে নাম দিয়েছি সিলেটের লম্বা মহাথির, বাংলাদেশে এই প্রথম তাহার নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার মত অনুকরণে ২টা টাওয়ার বিশিস্ট প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। যার নাম দিয়েছেন ওয়ান সিটি। শত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ওয়ান সিটি এখন সাফল্য হবার দ্বার প্রান্তে। সেই কামাল ভাই স্পেনে বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা করে অনেক সাফল্য লাভ করেছেন। তাহার কাজ দেখে বললাম কামাল ভাই আপনি কামাল।

উনার সাথে আমার অনেক স্মৃতি। বিবিসি মিডিয়া ফোরামের আন্দোলনে আমরা ছিলাম সহযাত্রী। এবারেও টিপাই মুখ বাঁধ নির্মানের প্রতিবাদি আন্দোলনের সহযাত্রী। তাহার সব কাজে যেন বরকত হয় দোয়া করি, যদিও তিনি আমার উপর অভিমান করেছেন এক সাথে স্পেনে না যাওয়ার কারণে। হোটেল ছেড়ে নাস্তা করবার জন্য বের হলাম সালাহ উদ্দিন ভাইয়ের সাথে পারভেজ আসলো তবে শেবুল ভাই আসেন নাই, তাই উনার সাথে আর দেখা হলো না।

নাশতার সাথে সাথে আবারো আলাপ শুরু হলো শুধুই জানার পালা। তাও স্পেনের ইতিহাস সম্পর্কিত জিজ্ঞাসা। স্পেন যে শুধু একটি মুসলিম দেশ ছিল তা নয়, স্পেন ছিল আরব্য সমাজের আমার প্রতিক। তাই তো না কি এখনো অনেকের নামের পেছনে মকী, মাদানী, আনছারি লেখা থাকে। আসলে হবে মেক্কী, মাদানী এবং আনসারী।

তাদের খাবার থেকে নিয়ে চলায় এবং বলায় এখনো আরবীয়দের অনেক কিছু অবশিষ্ট রয়েছে। তাদের আগেকার বাসা, বাড়ীগুলো সেই আরবীয় ধাঁচে তৈরি। দু কামরা বিশিষ্ট ছোট ছোট ঘর, দু একজন থাকার মত। আরব থেকে মুসলমানরা কোন রক্তপাত ছাড়াই স্পেনে শান্তির পতাকা প্রতিষ্টা করেছিলো। কথিত আছে স্পেন এসে মুসলমানরা যখন ঢুকেছিলো তখন স্পেনের ধর্মীয় নেতারা হযরত ঈসা (আঃ) পেশাব পাক না নাপাক তা নিয়ে বিতর্ক করছিল।

এবং বাড়াবাড়ি করে সময় ও জান মানের ক্ষতি করছিল। জনগন ছিল তাদের দাপটে দিশেহারা। ভয়ে সমস্ত জনগন সত্যিই চাইছিল পরিবর্তন ও শান্তি। সেই সুযোগ সৎ ব্যবহার করে মুসলমানা তাদের মন জয় করেছিল এবং অত্যন্ত সূনিপূণ ভাবে শাষন কাজ পরিচালনা করছিল। কিন্তু হিংসা ও লোভের কারণে শুধুমাত্র অধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইয়াগুদী ও খৃষ্ট স¤প্রদায় রক্তপাত ঘটিয়ে নিষ্ঠুর ভাবে স্পেন দখল করেছিল।

মেডিটেরিয়ান সমুদ্রের পানি অনেকদিন পর্যন্ত মুসলমানদের রক্তের জন্য লাল ছিল। এ সব আলাপে মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। বার্সিলোনায় মোটামোটি সব দেশের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। উপমহাদেশের ইন্ডিয়ান ও পাকিস্তানিদের সরব উপস্থিতি এখানেও পেলাম। বাংলাদেশীরাও কম নয়, মরক্কোর লোকই বেশি, সবাই যেমন বলছিল তেমনি দেখলামও।

ইন্ডিয়ান ফিল্ম এর ছড়াছড়ি ও দেখলাম প্রচুর। কি বাংলাদেশী, কি পাকিস্তানি সবার কাছেই হিন্দি চ্যানেল। এই ইন্ডিয়ানদের সংস্কৃতি যে কি তা আমি এখনো বুছে উঠতে পারিনি। হিন্দি ফিল্ম, নাটক ইত্যাদি অঅমার কাছে মনে হয় অপসংস্কৃতি। ’মেরা চাল হে সেক্সি, মেরা বাল হো সেক্সি’ এই সব গান কোন ধরণের সংস্কৃতির আওতায় পড়ে খুঁজে পাই না।

ইন্ডিয়ানরা কিন্তু সেই সব সংস্কৃতির ধারও ধারে না। ওরা যেখানে যায় সেখানের সাথেই মিশে যায়। যার জন্য সহজ হয়ে যায় মূল ধারার সাথে সম্পৃক্ত হবার পথ। বিলেতেও দেখেছি ওরা মুলধারার সাথে মিশে অবস্থানকে শক্ত করছে। বৃটিশ পার্লামেন্টে ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানি এম পি রয়েছে, নাই শুধু বাংলাদেশী এম পি।

আগামীতে হবে কি না তাও হলফ করে বলা মুশকিল। তবে ইংল্যান্ডে যে সুযোগ সুবিধা আমরা ভোগ করছি তার সিকি ভাগও স্পেনে নেই। এরপরেও শুধু মাত্র নিজ উদ্যেগে ও উদ্দ্যেমে আমার স্বদেশীরা যতটুকুন এগিয়ে গেছেন তার জন্য সবাইকে জানাতে হয় সাধুবাদ। রাণীর মুখপাত্র থেকে নিয়ে অনেক উচ্চ পদে রয়েছেন আমাদের বাংলাদেশী। স্পেন মূলত ভ্রমণ পিপাসুদের চরণ ভূমি।

তাদের রাজস্বের সিংহভাগ আসে পর্যটকদের কাছ থেকে। পর্যটকদের সব রকম সুযোগ সুবিধা রয়েছে বিদ্যমান। সেখানে ব্যবসা করারও ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়ি কিনে ভাড়া দিয়ে অনেকেই লাভবান হচ্ছেন। যাহাদের সামর্থ আছে তাদের ভলব এখানে বাড়ি কেনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে।

চাইলে যে কেউ কিনতে পারবেন। বার্সিলোনার অপরূপ দৃশ্য দেখে আমারও আকাঙ্খা রয়েছে বাড়ি করার, যদি কোনদিন সামর্থ হয় অবশ্যই কিনব ইনশাআল্লাহ। আমরা যদি সেখানে না যাই তা হলে যাবে কে? আমরা আবারও করব জয় স্পেন আমাদের মতো করে। আমাদের ভয় নেই, মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমীন থাকতে কাউকে ভয় পাবার জাতি মোরা নই। আল্লামা ইকবাল যথার্থই বলেছেন- দাশতওদাশত হ্যে দরিয়া ভি হামে না ছোড়ে, বাহরে গোলমাত প্যে ঘোড়া দৌড়ায়ে হ্যামনে’।

জঙ্গলের জানোয়ার পর্যন্ত আমাদের স্পর্শ করেনা কারণ আমাদের রয়েছে ঈমান। সেই ঈমানী দৃঢ়তা নিয়েই বলছি স্পেন কেন গোটা ইউরোপই আমরা ইসলামের পতাকা উড়াতে পারব। যদি আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করি। আমি এ পযর্ন্ত অনেক দেশে দেখেছি এরমধ্যে স্পেন সবার শীর্ষে স্থান পাবে। আমি যাব, আরো যাব, আরো আছে অনেক বাকি দেখার।

আরো আছে জীবনে অনেক শেখার। বার্মিংহাম দারুল উলুম আল ইসলামীয়ার প্রিন্সিপাল আমার সফর সঙ্গী এবং যার বদন্যতায় আমি আমার এই ঐতিহাসিক সফর, উনার কাছে আমি এমনিতেই কৃতজ্ঞ। তাহার অন্তরঙ্গতা ও স্নেহের পরশ ভুলবার মতো নয় কোনভাবেই। সেই তিনিই আবার আমাকে বললেন, নাতি এখন থেকে ছয় মাস পরে আবার আসব, তুমিই আমাকে নিয়ে আসবে। বললাম ইনশাআল্লাহ, মনে তখন বল পেলাম এই ভেবে যে আরো ছয় মাস অন্তত বেঁচে থাকবো।

নতুবা কি ভরসা কার, কখন কি হয় কে জানে। আসবো বলে বিদায় নিচ্ছি, সাথী হয়ে গেলেন এয়াপোর্ট পর্যন্ত সেই হাসিমুখি মানুষ সালেহ উদ্দিন ভাই। মনে মনে খোলা ও পরিষ্কার আকাশের পানে চেয়ে বললাম, হে আল্লাহ তুমিই আমার মালিক, তুমিই আমার অন্ন দাতা। ভাগ্য ছিল বলে দেশে বিদেশে তুমিই রিজিক দিচ্ছ, এইভাবে তোমার করুণা ভিক্ষা চাই শেষ দম পর্যন্ত। এই ভাবনায় যখন তখনি জনাব আব্দুল আহাদ সাহেব হাত বাড়িয়ে দিলেন পানের খিলি।

আমি সহাস্যে নিয়ে বললাম এই কি শেষ? তিনিও রসিকতা কম জানেন না। স্মি হেসে জবাব দিলেন আর পাবা ৬ মাস পরে। সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম। সুখ সয়না বেশীক্ষণ। আমাদের টেক্সি চালক এয়ারপোর্টের নিধারিত স্থানে এসে দাড়ালো।

আমরা নেমে ভিতরে প্রবেশ করলাম। কিছু টুকটাক উপহার সামগ্রী কিনলাম কর্জ করে এবং কিছুটা নিলাম বিশেষ কায়দায়। সময় এলো বিমানে আরোহনের ,জানাচ্ছিল আবহাওয়া বার্তা বৃটেনের। মধ্যম গরমে গা ঝিন করে উঠল ঠান্ডার কথা শ্রবনে। শুধু ঠান্ডা নয় সাথে বৃষ্টি দমকা হাওয়া।

মনে হল আমি কি আসলেই স্পেনে এসেছিলাম না ঘুমের মধ্যে কোন স্বপ্ন দেখছি। নাহ আসলেই আমি এসেছি বাস্তবে বুঝিয়ে দিল রানওয়েতে ইজি জেটের ঝাকুনি ও দৌড়। নামিয়ে দিল আবারো সেই একই জায়গায়। বিষন্ন আবহাওয়া বিষন্ন অর্থনীতিতে জর্জরিত চরম উদ্বিগ্ন এক দেশ বলব বলে ভেবে রেখেছিলাম 'আস্তালায়গও ইসপানীয়' কিন্তু আর বলা হয়ান। আশা যেন আর বলতে না হয় কখনো সেই পন্থা-ই খুঁজছি।

এক নজরে স্পেন- নাম- কিংভূম অফ স্পেইন দেশের প্রধান- রাজা রানী সরকার প্রধান- প্রধান মন্ত্রী রাজধানী- মাদ্রীদ ভাষা- কাষ্টিলিয়ান, স্পানিশ ধর্ম- আরিলিজিয়ন, খৃষ্টান, মুসলিম মুদ্রা- ইউরো জনসংখ্যা- ৪৫,৩২/০০০ (২০০৭) আয়তন- ১৯৪৮৪৫ আবহাওয়া- শুষ্ক ও সহায়ক আয়ের উৎস- পর্যটক, মৎস, কৃষিপন্য (সূত্র ইন্টারনেট) ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.