আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এলোমেলো ও আবোলতাবোল সমগ্র

মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়| বেঁচে থাকলে বদলায়| কারণে অকারণে বদলায়........ ইদানিং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে একটু ব্যস্ত বলে অনলাইনে তেমন আসা হয় না। আজ ফেসবুকে লগিন করে পুরোনো কিছু স্ট্যাটাস পড়ছিলাম। ভাবলাম হাড়িয়ে যাওয়ার আগেই কিছু কিছু স্ট্যাটাস সংগ্রহে রাখি। এটা মুলত এক ধরণের স্ট্যাটাস সংকলন। খুবই গুরুত্বহীন পোস্ট।

জুন ১৪: চট্টগ্রামের এক প্রভাবশালী ছাত্রনেতার সাথে দেখা করার জন্য অনেকদিন ধরে ঘুরছিলাম। নেতা আজকে হবে কালকে হবে বলে বলে ঘুরাচ্ছিল। দেখা করাটা জরুরী হয়ে গেল একসময়। নেতাকে ফোন করে বললাম, -ভাই, আজকে দেখা না করলে কিন্তু আপনার পার্টি অফিসে চলে আসব! নেতা নিমরাজি হয়ে বলল, -ঠিকাসে, আপনে আসেন। -কই আসব? আপনি কোথায়? -আমি মেহেদীবাগে।

-মেহেদীবাগের কোন জায়গায়? -আপনি আমার বাসা চেনেন না? -হ্যা, চিনি! -বাসার পিছনের গলি দিয়ে এসে ডানে মোড় নিলেই সেক্সি মেনের দোকান দেখতে পাবেন। আমাকে ঐ দোকানে পাবেন। -জ্বী! কোন দোকান? -আরে কানে শোনেন না? সেক্সি মেন! সেক্সি মেন!! ফোনের রিসিভারটা হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল আরেকটু হলেই। সেক্সি মেন? Sexy Men? নেতা সেখানে কি করে? চিটাগাংয়ে এই ধরণের দোকানও আছে? নাউযুবিল্লাহ! যাই হোক, বুকে সাহস নিয়ে নেতার দেওয়া ঠিকানায় গেলাম। দেখি, নেতা প্যান্ট শার্ট পরে ফিটফাট হয়ে একটা দোকানের সামনে দাড়িয়ে আছে।

দোকানের উপরে লেখা- "শেখ সিমেন্ট; এখানে ভাল মানের মানের সিমেন্ট পাইকারী ও খুচরা মূল্যে বিক্রয় করা হয়। "চট্টগ্রামের এক প্রভাবশালী ছাত্রনেতার সাথে দেখা করার জন্য অনেকদিন ধরে ঘুরছিলাম। নেতা আজকে হবে কালকে হবে বলে বলে ঘুরাচ্ছিল। দেখা করাটা জরুরী হয়ে গেল একসময়। নেতাকে ফোন করে বললাম, -ভাই, আজকে দেখা না করলে কিন্তু আপনার পার্টি অফিসে চলে আসব! নেতা নিমরাজি হয়ে বলল, -ঠিকাসে, আপনে আসেন।

-কই আসব? আপনি কোথায়? -আমি মেহেদীবাগে। -মেহেদীবাগের কোন জায়গায়? -আপনি আমার বাসা চেনেন না? -হ্যা, চিনি! -বাসার পিছনের গলি দিয়ে এসে ডানে মোড় নিলেই সেক্সি মেনের দোকান দেখতে পাবেন। আমাকে ঐ দোকানে পাবেন। -জ্বী! কোন দোকান? -আরে কানে শোনেন না? সেক্সি মেন! সেক্সি মেন!! ফোনের রিসিভারটা হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল আরেকটু হলেই। সেক্সি মেন? Sexy Men? নেতা সেখানে কি করে? চিটাগাংয়ে এই ধরণের দোকানও আছে? নাউযুবিল্লাহ! যাই হোক, বুকে সাহস নিয়ে নেতার দেওয়া ঠিকানায় গেলাম।

দেখি, নেতা প্যান্ট শার্ট পরে ফিটফাট হয়ে একটা দোকানের সামনে দাড়িয়ে আছে। দোকানের উপরে লেখা- "শেখ সিমেন্ট; এখানে ভাল মানের মানের সিমেন্ট পাইকারী ও খুচরা মূল্যে বিক্রয় করা হয়। " জুন ১: টিভিতে কি যেন একটা ইংলিশ মুভি হচ্ছিল, আমি পডার টেবিলে বসে বসে শব্দগুলো অন্যমনস্ক হয়ে শুনছিলাম। মুভিতে কতগুলো ছোট ছোট বাচ্চা নামতা পড়ছিল। এভাবে- "থ্রী এন্ড থ্রী, দা সান অফ বিচ ইজ সিক্স....ফোর এন্ড ফোর, দা সান অফ বিচ ইজ এইট।

" শুনে তব্দা খেয়ে গেলাম। গালিগালাজ করতে করতে ছেলেমেয়েরা নামতা শিখছে? টিভির সামনে গিয়ে ভাল করে দেখলাম। বাচ্চারা নামতা পড়ছে- 3 and 3, the sum of which is 6. 4 and 4, the sum of which is 8. নাহ, মস্তিস্ক নেগেটিভ জিনিসে বড্ড অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে... ভাল লক্ষণ নয়। জুন৮: টমেটোর পাশেই ঢেড়স ক্ষেত। আলসে ঢেড়স সকালে একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠে।

একদিন ঘুম থেকে উঠেই সে দেখে, এক লাল টুকটুকে টমেটো তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ঢেড়স মেজাজ খারাপ করে রাগী সুরে বলে, "এই মেয়ে, হাসো কেন? সমস্যা কি?" টমেটোর লাল টুকটুকে চেহারা আরও লাল হয়ে যায়। "না মানে ইয়ে ভাইয়া, আপনি না অনেক হ্যান্ডসাম। " ঢেড়স চোখ কপাল তুলে বলে, "এই মেয়ে তুমি কি বলো? বয়স কত তোমার?" "ভাইয়া, ৪৫ দিন ৭ ঘন্টা। " "আমার বয়স কত জানো? ৬৯ দিন ৯ ঘন্টা।

তোমার চেয়ে কত বড় আমি? এসব কি বলো আমাকে?" "সরি ভাইয়া, আর বলব না। " "মনে থাকে যেন। " "আচ্ছা ভাইয়া, মনে থাকবে!" কিন্তু টমেটোর কিছুই মনে থাকে না। সে সারাক্ষণ ঢেড়সের দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। দিন কেটে যায়, মাস কেটে যায়।

একদিন ক্ষেতের মালিক এসে ঢেড়সকে নিয়ে হাটে যায়। টমেটোর মন খারাপ হয় ভীষণ। টমেটোরও পালা আসে। তাকেও হাটে নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন বাপ্পী এসে দুই কেজি ঢেড়স আর আধাকেজি টমেটো কিনে আনে বাজার থেকে।

টমেটো তখন সেই ঢেড়সকে দেখেই চিৎকার করে বলে, "ঢেড়স ভাই, ঢেড়স ভাই, আমি এখানে। " ঢেড় চোখ পাকিয়ে বলে, "তুই এখানেও চলে এসেছিস?" "অমন করো কেন? আমি কি করেছি?" "কি চাস তুই?" "ঢেড়স ভাই, আই লাভ ইউ। " "তো?" "একটা হাগ দেও না প্লীজ!" "পারব না!" বাপ্পী রেগে গিয়ে বলে, "ঐ এতো চিল্লাচিল্লি কিসের? অফ যা!" "বাপ্পী ভাই, আমরা বিয়ে করব। প্লীজ বিয়ে করিয়ে দাও আমাদের। " "আচ্ছা ঠিকাছে, এখন অফ যা!" বাসায় এসে ওদের বিয়ে দিয়ে দিলাম।

রাতে ডিপ ফ্রীজে ওদের বাসর হবে। এই গরমে ডিপ ফ্রীজ, আহ শান্তি! মে ১৬: স্টিভেন স্পিলসবার্গকে আমরা সবাই চিনি, তিনি একজন বিখ্যাত মুভি ডিরেক্টর। একদিন স্পিলসবার্গ একটা কফিশপে গেলেন। কফির ধোঁয়া উঠা গরম কাপে চুমুক দিচ্ছেন, এমন সময় একজন চাইনিজ লোক ছুটে এল তাকে দেখে। খুব উৎসাহিত হয়ে তাকে বলল, "স্যার, আপনি কি স্টিভেন স্পিলসবার্গ? আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান! ছোটবেলা থেকে আপনার মুভি দেখতে দেখতে বড় হয়েছি।

" শুনে স্পিলসবার্গ তার গালে কষে একটা থাপ্পর মারল। সে তো হতবাক! "স্যার, আপনি আমাকে থাপ্পর মারলেন?" "তুমি শালা হারামীর জাতি! তোমরাই তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমাদের পার্ল-হারবারে বোমা ফেলেছিলে! তোমাদের ধরে সকাল বিকাল থাবড়ানো দরকার!!" "স্যার, পার্ল হারবারে তো জাপানিজরা বোমা ফেলেছিল, কিন্তু আমি তো চাইনিজ! জাপানিজ নই!" "তোমরা জাপনিজ, চাইনিজ, তাইওয়ানিজ সব একই!" এই কথা শুনে চাইনিজ লোকটা আরেকটা পাল্টা-থাপ্পর মারল স্পিলসবার্গকে। স্পিলসবার্গ অবাক হয়ে বলল, "তুমি আমাকে থাপ্পর মারলে?" "তুমি শালা হারামীর বংশ, ১৯১২ সালে তুমিই তো টাইটানিক ডুবিয়ে দিয়েছিলে! তুমি জানো, টাইটানিকে আমার দাদী ভ্রমণ করছিলেন?" স্পিলসবার্গ অবাক হয়ে বললেন, "আমি টাইটানিক ডুবিয়েছি? টাইটানিক তো ডুবিয়েছিল একটা অতিকায় বরফখন্ড! একটা আইসবার্গ!" "তোমরা আইসবার্গ, গুটেনবার্গ, জোহ্যান্সবার্গ, স্পিলসবার্গ সব একই! সবগুলারে ধরে সকাল বিকাল থাবড়ানো উচিত!" মে ৭: আমার বেশ কিছু ইউরোপিয়ান বন্ধু-বান্ধব আছে| অনলাইন চ্যাটের হাই হ্যালো টাইপের বন্ধু নয়, বেশ ঘণিষ্ঠ বন্ধু| সবার সাথেই কোথাও দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে| মাঝে মাঝে ওরা আমাকে বেশ অদ্ভূত অদ্ভূত প্রশ্ন করে| এই যেমন- "তোমরা কি এরাবিক পিপল? তোমরা এরাবিক পড়ো কিভাবে?" "তোমরা কি কখনোই পাংকচুয়াল হতে পারো না?" "তোমাদের বেশিরভাগ লোকই তো ম্যালনিউট্রিশানে ভুগছে, তোমরা চিকিৎসা নাও না?" সবচেয়ে মজার লেগেছিল নেদারল্যান্ডের এক মেয়ের প্রশ্ন| এই মেয়েটাকে আমি চিনতাম না| নেলসন নামের একটা ছেলে আমার সাথে একটা ছবি তুলে সেটা তার গুগল আইডিতে দিয়েছিল| সেই ছবিতে মেয়েটা কমেন্ট করে, "ইজ দা পিক ফ্রম বাংলাদেশ?" ছেলেটার ইতিবাচক উত্তর শুনে মেয়েটা বলে, "বাংলাদেশে বিল্ডিংও আছে?"যাই হোক, আজকে একজন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান আমাকে বলল,"বাপ্পী, তোমার নামের 'মোহাইমিনুল' অংশটার অর্থ কি?" আমি বললাম, "এর অর্থ নিয়ন্ত্রণকারী| দা কান্ট্রোলার|" "এটা কোন ভাষার শব্দ?" "আরবী|" "আচ্ছা, তোমরা বাঙালী, কিন্তু বাংলায় নাম রাখোনা কেন? দেখো, ইংরেজরা ইংরেজিতে নাম রাখে| চাইনিজরা চাইনিজে নাম রাখে| স্ক্যানডিনেভিয়ানরা ড্যানিশ ভাষায় নাম রাখে, এরাবিকরা এরাবিতে নাম রাখে, কিন্তু তোমরা বাঙালীরা নাম রাখো আরবী, ফারসি কিংবা ইংরেজিতে| যে ভাষার জন্য তোমরা এত বড় ত্যাগ স্বীকার করলে, সেই ভাষায় নিজের নামটা রেখে জাতীয়তার স্বকীয়তাটা ধরে রাখতে পারো না?" বলাই বাহুল্য, আমার কাছে তার প্রশ্নের উত্তর ছিল না| তবে আমি আজকে আমার ফ্রেন্ড লিস্টটা চেক করলাম| দুঃখের বিষয়, খুব হাতে গোণা কয়েকটা নামপেলাম যাদের নামবাংলায়| যেমন- সাগর, ধ্রুব, সজীব, সোহাগ ইত্যাদি ইত্যাদি| প্রায়ই একটা প্রশ্ন করা হয় যে, ছেলেমেয়েরা ফেসবুকে এসে নাম চেঞ্জ করছে কেন? মজার ব্যাপার, নাম চেঞ্জ করে কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই নাম রাখছে বাংলায়| এ থেকে কি প্রমাণ হয়? আমার মায়ের একটা সুন্দর বাংলা নাম ছিল- ঝর্ণা| বিয়ের পর বাবার সাথে মিল রেখে সেটা হয়েছে- আফরোজা নূর| মামণির নাম ছিল কণা| বিয়ের পর খালুর সাথে মিল রেখে হয়ে গেছে- আসমা মাসুদ| এই যে বাংলা নামগুলো হাড়িয়ে যাচ্ছে দিন দিন, এটা কি জাতির জন্য ভাল? অন্য কারো কথা জানি না, তবে আমি আমার পরবর্তী প্রজন্মের নাম অবশ্যই এবং অবশ্যই বাংলায় রাখব| এই ভাষা আমার গর্ব| পাশ্চাত্য কিংবা মধ্যপ্রাচ্য সংস্কৃতিতে আমি এই ভাষাকে কলুষিত হতে দেব না| সেই গানটা দিয়ে শেষ করতে চাই- "আমি বাংলায় গান গাই| আমি বাংলায় গান গাই| আমি বাংলায় হাসি, বাংলায় ভাসি, বাংলায় জেগে রই| আমি বাংলাতে দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর| আমি এই বাংলার মেঠো পথ ধরে হেঁটে গেছি বহুদূর| বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, দৃপ্ত শেষ চুমুক| আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ....|" মার্চ ২৮: "Darkness মানে জানো না? Darkness মানে হল অন্ধকার|" ইংরেজি পড়াচ্ছিলাম ক্লাস নাইনে পড়ুয়া এক ছাত্রকে| ছেলেটা বেশ চটপটে, চপল-চঞ্চল| এক লাইন পড়ালে তিন লাইন বোঝে| একে পড়াতে আসার আগে আমি রবার্ট ব্রুসের মাকড়সা-কাহিনী পড়ে নিতাম ভাল ভাবে আর সারাক্ষণ মনে মনে উচ্চারণ করতাম-পেইশেন্স ইজ আ গ্রেট ভার্চু| ধৈর্য্য মহৎ গুণ| একদিন পড়াতে গিয়ে বইয়ের Darkness শব্দটার অর্থ জানতে চাইল সে| তখনই উপরের কথাটা বললাম| "Darkness মানে জানো না? Darkness মানে হল অন্ধকার|" শুনে সে কি যেন বিরবির করে উচ্চারণ করল| শেষের শব্দ দু'টো কানে ভেসে আসল| "....of Darkness." আমি খুশী হয়ে বললাম, "তুমি কি Heart of Darkness কথাটা বলেছ?" Heart of Darkness হল জোসেফ কনরাডের একটা বিখ্যাত গ্রন্থ| এই বয়সেই সে এই বইটা সম্পর্কে জানে ভেবে আনন্দিত হলাম| সে বলল, "না ভাইয়া, আমি তো Soul of Darkness কথাটা বলেছি|" আমি তব্দা খেয়ে গেলাম| সোল অফ ডার্কনেস হচ্ছে একটা কম্পিউটার গেইম| আর আমি কি না কি ভেবেছিলাম| যাই হোক, আমি তাকে হার্ট অব ডার্কনেস বইটা সম্পর্কে হালকা ধারণা দিলাম| আরেকদিনের কথা| ভূত, প্রেত, কুসংস্কার ইত্যাদি নিয়ে কথা হচ্ছিল|সে হঠাৎ প্রশ্ন করল, "ভাইয়া, ভ্যাম্পায়ার বলতে কি কিছু আছে?" "না, নেই|" "তাহলে ভ্যাম্পায়ারের ধারণাটা কিভাবে আসল?" "ভ্যাম্পায়ারের ধারণা কিছুটা প্রাচীন হলেও মূলত 'দা ভ্যাম্পায়ার' বইটা বের হওয়ার পর ধারণাটা জনপ্রিয়তা পায়| মেরি শেলি নামের এক লেখিকা তার স্বামীর বন্ধুর সাথে বাজি ধরেছিল ভৌতিক উপন্যাস লেখা নিয়ে| তারপর তারা দু'জন দু'টো উপন্যাস লিখেছিল| একটার নাম The Vampire, আরেকটার নাম Frakenstein....|" সে আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, "ভাইয়া ফ্রাঙ্কেনস্টাইন? জানেন , আমার ফ্রেন্ড মেহজাবিনের টি-শার্টে লেখা, Stay away from Frakenstein, ফ্রাঙ্কেনস্টাইন থেকে দূরে থাকো|" আমি আবারও তব্দা খেলাম| কি গুরুগম্ভীর একটা ভাব নিয়ে জ্ঞান দিতে যাচ্ছিলাম আর সে মাঝপথে এমন একটা তুচ্ছ রসিকতা করল! আরেকদিন পদার্থবিজ্ঞান পড়াচ্ছিলাম| ইলেক্ট্রিসিটি, বর্তনী, ফিলামেন্ট ইত্যাদি আলোচনা করতে গিয়ে থমাস এডিসনের নাম চলে আসল| বললাম, "তুমি কি জানো, বাল্ব কে আবিস্কার করেছেন? বাল্ব আবিস্কার করেছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসন...|" সে এটা শুনে উত্তেজিত হয়ে বলল, "ভাইয়া, আমার ফ্রেন্ড রওনকের ফেসবুক আইডির নাম-Thomas Alva Edison |" আমি এবার সিরিয়াস চিন্তায় পড়ে গেলাম| নেক্সট জেনারেশনকে বিখ্যাত ব্যক্তিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে কি তাদের নামে ফেসবুক আইডি খুলে দিতে হবে? নাকি কম্পিউটার গেমস বানাতে হবে? নজরুল এন্ড দা কল অফ ডিউটি? ব্যাটল অব রবীন্দ্রনাথ? নাকি এনএফএস-নিড ফর শরৎচন্দ্র? নাকি বান্ধবীর টি শার্টে লিখে রাখতে হবে, "আইনস্টাইন, ওয়ন্টস টু হাগ ইউ" ??? মার্চ ১০: খুব ছোটবেলার কথা| আমরা তখন হালিশহরের বি-ব্লকে থাকি| রাকিব, নওশাদ আর আমি, থ্রী মাস্কেটিয়ার্সের ­ মত তিন বন্ধু ছিলাম| আমাদের এলাকায় প্রতিদিন একটা দৈত্যাকার, কঠিন চেহারার বুড়ো আসতো একটা ভ্যান নিয়ে| ভ্যানে থাকতো তেলের ড্রাম| বাড়ি বাড়ি গিয়ে তেল বিক্রি করত সে| এই লোকটাকে দেখে কেন যেন আমরা ছোটরা অনেক ভয় পেতাম| কে যেন আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে এই লোকটা একটা ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক লোক| বাচ্চা দেখলেই ড্রামের তেলের মধ্যে চুবিয়ে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয়| লোকটার চেহারার সাথে গল্পটা মানিয়েও যেত| কারণ, লোকটার মাথায় ছিল বিশাল টাক, আর মুখের কাঁচা-পাকা দাড়ি লম্বা হতে হতে বুক ছুঁয়েছে| পাথরে খোদাই করা ভাবলেশহীন মুখে যেন জমা হয়েছে রাজ্যের কঠোরতা| রূপকথার যে দৈত্যটা ছেলে-মেয়েদের বাগানে ঢুকতে দিত না, সেই দৈত্যটার কথা মনে পড়তো এই ভ্যানওয়ালাকে দেখে| যতবারই লোকটাকে দেখেছি,ততবারই রাকিব আর নওশাদ চিৎকার করে বলেছে,"বাপ্পী, পালা! ধরতে পারলে খবর আছে!" জান হাতে নিয়ে উসাইন বোল্টের গতিতে দৌড়াতাম আমরা| এই লোকটার আরেকটা ব্যবসা ছিল পুরনো বই-পত্র কেজি দরে ক্রয়-বিক্রয় করা| মাঝে মাঝে সে যখন আমাদের বাসায় পুরনো বই-খাতা কিনতে আসতো, আমি ঘাপটি মেরে বারান্দায় লুকিয়ে বসে থাকতাম| যেদিন আমরা বি-ব্লক ছেড়ে শিফট করে শহরের দিকে নতুন বাসায় যাচ্ছিলাম, সে দিন লোকটা এল আমাদের বাসায়| অসম্ভব ভয়ংকর চেহারা থেকে অসম্ভব রকম মিনমিনে কন্ঠে বলে উঠল, "ভাইজান,আপনারা কি আইজকাই যাইবেন গা?" আমি ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়লাম| লোকটাকে একটু দুঃখী দুঃখী দেখাল| সেইপ্রথম বোধহয় তার চেহারায় কোন ইম্প্রেশন দেখলাম| লোকটা আবার বলল, "ভাইজান, দোয়া করি অনেক ভাল থাকবেন| আর আপনের জইন্য একটা বই আনছিলাম|" সে একটা জরাজীর্ণ মলিন বই বাড়িয়ে দিল| আমি অবাক হলাম| বইটা ছিল টমাস হার্ডির, "ফার ফ্রম দি ম্যাডিং ক্রাউড"| সম্ভবত পেঙ্গুইন ক্ল্যাসিকের এডিশন| একটা কুলি-মজুর শ্রেণীর লোক, যে কিনা ঠিকমত পড়তেই পারে না, সে আমাকে এত মূল্যবান একটা বই উপহার দিয়েছে, সেটা আজকে আমার কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে| হয়তো পুরনো বই-টই বেচাকেনা করতে গিয়ে সে বইটা পেয়েছে| তারপরও, কাউকে বই উপহার দেওয়ার মতো সুন্দর মানসিকতা ক'জনের আছে? যাই হোক, ইংরেজী বই পড়ার মত জ্ঞান তখন আমার ছিল না| বইটাও কালের খেয়ায় কোথায় যে হাড়িয়ে গেছে বলতে পারব না| বড় হয়ে অনেক ইংরেজী বই পড়েছি| কিন্তু ঐ বইটা আর পড়া হয়নি| সেই বইটা আজকে, নিউ মার্কেটের মোড় থেকে কিনলাম| সে জন্যই বোধহয় নস্টালজিয়া আজ আমাকে মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরেছে চারিদিক থেকে| বুড়ো আঙ্কেল, আপনাকে অযথাই আমরা ভয় পেতাম| সরি| যেখানেই থাকুন আপনি, ভাল থাকুন| আর বইয়ের আলোয় ভুবন আলোকিত করে যান| "আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবন ভরা, আলো আমার হৃদয় ছোঁয়া....|" মে ১: পথের সাথে আমার আজন্ম বন্ধুত্ব| কারণে অকারণে পথে পথে হেঁটে বেড়ানোর অভ্যেসটা তৈরি হয়েছিল অনেক ছোটবেলায়| রিকশা-টিকশায় আমি কমই উঠি| শুধু হাটি আর হাটি| সময় পেলেই হাটি| আমি বড় হয়েছি চট্টগ্রাম শহরে| আমার হাটার পথগুলোও ছিল চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ত সডক এবং অখ্যাত গলি-ঘুঁপচি| একটা কথা শুনেছিলাম-"যদি নির্জনতা চাও, ভীড়ের মধ্যে যাও|" আমি নির্জনতা পছন্দ করতাম| তাই বেশিরভাগ সময়ই ব্যস্ত সডকগুলো বেছে নিতাম হাটার জন্য| স্কুল-কলেজের অন্য বন্ধুরা যখন বসে বসে আড্ডা মারত, আমি তখন ইবনে বতুতার মতো পথে পথে হেটে বেড়াতাম| নিউমার্কেট, কোতোয়ালী, আন্দরকিল্লা, সিরাজউদ্দৌলা রোড, টাইগার পাস, কাজীর দেউড়ী, জামালখান রোড, কলেজ রোড এগুলো ছিল আমার প্রিয় বিচরণস্থল| আমি হাটতাম আর দেখতাম| দেখতাম আর হাটতাম| সবকিছুই লক্ষ্য করতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে| আইডিয়াল স্কুলের সামনে দামী দামী গাড়িগুলোও দেখতাম, আবার ষ্টেশন রোডের ফুঁটপাথে বাস্তহীন জনতার জীবন যাপনও দেখতাম| মাঝে মাঝে উপলব্ধি করেছি, পথের আসলে কোন শেষ নেই| এক একটা কানাগলির মধ্যেও কত কিছুই না দেখার আছে! বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী উপন্যাসের সেই লাইনগুলো আমার ভীষণ মনে পড়তো- "পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন- মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যঙারে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়! তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেছে সামনে, সামনে, শুধুই সামনে| দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্য্যোদয় ছেড়ে সূর্য্যাস্তের দিকে, জানার গন্ডী এড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে| দিন রাত্রী পার হয়ে, জন্ম-মরণ পার হয়ে, মাস বর্ষ মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চ'লে যায়, তোমাদের মর্ম্মর জীবন-স্বপ্ন শেওলা ছাতার দলে ভরে আসে, পথ আমার তখনো ফুরোয় না| চলে, চলে, এগিয়েই চলে...." একদিন ছিল জ্যোৎস্নাত রাত| সময় আটটা-ন'টা হবে| ঘরে ফিরছিলাম| ভাবলাম রিকশা না নিয়ে হেটে হেটেই বাসস্ট্যান্ডে যাই| (সড়কটার নাম বলছি না|) পাহাড়ঘেরা রাস্তা| চাঁদের আলো আর সোডিয়াম লাইটের মিথস্ক্রিয়ায় অদ্ভূত একটা রং তৈরি হয়েছে| সিদ্ধার্থের মতো বৈরাগী হতে ইচ্ছে করে এমন রাত পেলে, এমন জোছনা পেলে| বেশ নির্জন পথ| একটা বুড়ো ভিক্ষুক, একটা নেড়ী কুকুর আর মাঝে মধ্যে একটা দু'টো গাড়ির যাওয়া আসা| দূরে কোথাও রিকশার টুংটাং শব্দ| আমি হাটছি| "এই শোনো, এই দিকে, শোনো...|" দু'টো পাহাড়ের মাঝে এক চিলতে জায়গা| দেখা যায় কি যায় না, এমন একটা চিপায় মেয়েটা বসে আছে| ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করি না| করলে ঠিক পেত্মী ভেবে ছুট দিতাম| "আমাকে বলছেন?" "হ্যা, তোমারে বলতেছি| লাগবে আমাকে?" কোথায় যেন পড়েছি যে বারবনিতাদের দেখলেই চেনা যায়| চোখের দৃষ্টিতেই লেখা থাকে যে তারা বারবনিতা| কিন্তু আমার কাছে সেটা মনে হয়নি| মেয়েটার চেহারা স্বাভাবিক ছিল খুব| পরনে মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের মতো সেলোয়ার কামিজ| খুব শান্তশিষ্ট চেহারা| কিন্তু যে সুরে সে আমাকে প্রশ্নটা করল, সেটা ছিল খুব অশ্লীল| কুৎসিত একটা আমন্ত্রণ ছিল সুরটাতে| এই সুরটাই আমাকে বুঝিয়ে দিল যে মেয়েটা দেহাপসারিণী| একটা পতিতা| A pros | আমি নরম গলায় প্রশ্ন করলাম, "কত দিতে হবে?" "এক ঘন্টা তিনশো টাকা|" "তোমার টাকার খুব দরকার তাই না?" মেয়েটা এই প্রশ্নের জবাব দিল না| আমি ছাত্র মানুষ| আমার কাছে কখনোই তেমন টাকা পয়সা থাকে না| কিন্তু সেদিন সৌভাগ্যবশত ছিল| কিছু জমানো টাকা ছিল| হাজারখানেক হবে| "আমি যদি এমনি এমনি টাকাটা দিই, তাহলে তুমি কিছু মনে করবে?" "মনে করুম ক্যান? মনে করলে কি আর এই ব্যবসায় নামতাম?" সুন্দর যুক্তি| আমি টাকাটা তার হাতে দিলাম| আমার এই অনুকম্পায় মেয়েটার মধ্যে তেমন ভাবান্তর হল না| হাটা হাটি বাদ দিয়ে একটা রিকশা ডেকে বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেলাম| এই ঘটনাটা আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বলিনি| আমার মা একবার শুনেছিল যে আমি এক ব্যাগ রক্ত ডোনেট করেছি রেড ক্রিসেন্টের ক্যাম্পে| এটা শুনে সে আমাকে ভীষণ বকেছিল| যদি এই ঘটনাটা শোনে তাহলে তার প্রতিক্রিয়াটা কি হবে, ভাবতেও ভয় লাগে| আজ মে দিবস| কত শত শ্রমিকদের নিয়ে মিটিং মিছিল হবে! শ্রমের মূল্য নিয়ে অনেক ফাঁকা বুলি কপচাবেন নেতারা| সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে বিশাল বক্তৃতা তৈরি করে দিতে নেতাদের পার্সোনাল সেক্রেটারীরা গলদঘর্ম হবে| কিন্তু শ্রমের এই কালো সেক্টরটা অগোচরেই থেকে যাবে| আ প্রস হ্যাজ নাথিং টু বি রিকগনাইজড! নাথিং টু বি এপ্রিশিয়েইটেড| সেই গানটা দিয়ে শেষ করতে চাই| "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য| একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না....|" ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।