আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বেঁচে থাকুক “কাকন বিবি”,বেঁচে থাকুক কাকন বিবি’র চেতনা আর বেঁচে থাকুক বাংলার নির্ভীক সন্তানেরা।

"জেগে উঠুক তারুন্য,জেগে উঠুক স্বপ্ন,জেগে উঠুক মনুষ্যত্ব.........." [এই পোস্টটি যবে থেকে লেখার কথা ভাবছিলাম তারপর থেকে এই পোস্টের বিষয়বস্তু অনেকটাদূর এগিয়ে গিয়েছে, হয়ত ইতিমধ্যে আমি এই পোস্ট লেখার যোগ্যতাও হারিয়েছি, তারপরেও ব্যক্তিগত ভালবাসা আর আবেগ প্রকাশ করার জন্যেই এই দুঃসাহস] ঘটনা প্রবাহ-১ রমযানের প্রথমদিকে তখন ১০ কি ১১ রোজা চলছে। আমার পরিচিত কিছু মানুষের সাথে একটা খুব গুরুত্বপূর্ন মিটিং ছিল ইফতারের সময়। টিএসসি তে মিটিং শুরু হয়ে সেটা শেষ হল আজিজ সুপার মার্কেটের দোতলায় একটা রেস্টুরেন্টে। ইফতার শেষে সেই সবাই যে যার মত বাড়ির পথ ধরল। আমার সেইদিনই পরীক্ষা শেষ হয়েছিল বলে তেমন একটা তাড়া ছিল না, তা দেখে সেই পরিচিত মানুষদের থেকে এক বড় ভাই বললেন “কাজ আছে নাকি?” আমি বললাম “তেমন কোন কাজ নাই”।

উনি বললেন “তাহলে চল আজিজ মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারি” সানন্দে রাজি হয়ে বইয়ের দোকানে প্রবেশ করলাম। সাথে আমার আর এক প্রিয় মানুষ ছিলেন। তো তিনজনে মিলে নিজের মত বই দেখছিলাম। যিনি বই খুঁজতে এসেছিলেন আমি তার সাথে হাঁটছিলাম। দেখলাম খুঁজে খুঁজে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেলফের দিকেই উনি গেলেন,সাথে আমিও।

উনি আসলে মুক্তিযুদ্ধের উপর বেশ কিছু বই কিনতে এসেছিলেন। উনার বই খোঁজার ধরন দেখেই বুঝে নিয়েছিলাম বেশ পড়ুয়া উনি, তাছাড়া একটা একটা করে বই দেখে সেটার উপর আনমনে করা মন্তব্যগুলোও বেশ ভাল লাগছিল। জিজ্ঞেস করার পর বললেন, উনি আসলে মুক্তিযুদ্ধের দিনভিত্তিক বর্ননার উপর বই খুঁজছেন। আমিও বেশ আগ্রহ নিয়ে খুঁজতে শুরু করলাম। শেষপর্যন্ত বেশ কয়েকটা বই পেলামও আমরা।

কিন্তু একটা খটকা থেকেই গেল। উনি কেন এভাবে বই খুঁজবেন? এত জরুরত কিসের ছিল? মাত্র গ্রাজুয়েশন শেষ করবেন করবেন এমন একজন মানুষ উদ্গ্রীব হয়ে চাকরী খুঁজবেন অথবা মেয়ে বন্ধু খুঁজবেন, এটাই বেশি স্বাভাবিক লাগত,অথচ উনি কেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এত ঘাটাঘাটি করবেন? একটু কৌতূহল দেখাতেই উনি নিজেই পরিষ্কার করলেন । এই গৌরবান্বিত অধ্যায়ে উনি অনেক আগে থেকেই উজ্জীবীত,কিন্তু এই চেতনা সবার মাঝে বিশেষ করে উনার সমসাময়িক মানে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য উনি প্রায়ই লেখালেখি করেন। আর, যেহেতু ফেসবুক নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর একটা বড় ও শক্তিশালী মাধ্যম তাই তিনি ফেইসবুকে একটা পেইজ খুলেছেন। দিনে দিনে তিনি আবিষ্কার করেন নতুন প্রজন্মের এ বিষয়ে বিশাল তৃষ্ণা, জানার অনেক আগ্রহ।

পেইজে দিন দিনই লাইকের সংখ্যা বেড়ে চলে। শ পেরিয়ে হাজার হয়, ১ হাজার...২ হাজার করে অনেক লাইক পড়তে থাকে পেইজে। অনেক নিয়মিত পাঠক তৈরি হয় পেইজের। আর আমার ঐ বড় ভাইয়েরও দায়িত্ব বেড়ে যায়। নিজের জ্ঞানটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন নি, সত্যিটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের উপর সকল প্রকাশনাই উনি পড়তে চান আর তা ঐ পেইজের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে চান।

উদ্দেশ্য নিমিষেই পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি নিজেও অনেকটা এধরনের কাজে আগ্রহ বোধ করি। ব্লগে আসার পর থেকে অনেক তর্ক বিতর্ক দেখেছি, কিন্তু এরকম শ্রমসাধ্য বিষয়ে কারো এত একনিষ্ঠ একাত্মতা খুব কম দেখেছি। পরে বাসায় এসে ফেইসবুকে বসেই সেই পেইজটা খুঁজে বের দেখলাম। আর প্রতিটি পোস্ট দেখলাম বেশ ঘেঁটেঘুঁটে লেখা।

অনেক রেফারেন্স দিয়ে আর অনেক বেশি আবেগছোঁয়া লেখা। অনিয়মিত ফেইসবুক ইউজার হিসেবে আমার সেই একাউন্ট থেকে প্রথম কোন ফেইসবুক পেইজকে মন থেকে লাইক দেয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলাম। এইখানে সেই পেইজটির লিঙ্ক দিলাম – "মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোন (A Page totally based on liberation war'71) ( পোস্টটা যেদিন থেকে লিখব ভাবছি,সেদিন লিখলে হয়ত এটুকুই লিখতাম) কিন্তু, পেইজটার ব্যপ্তি আরো একটু বেশি বেড়ে গেছে ইতিমধ্যে। পেইজ থেকে একটা পোস্ট দেয়া হয়েছিল মুক্তি যুদ্ধের এক নির্ভীক সৈনিক কে নিয়ে, যিনি নিভৃতেই আছেন মুক্তির পর থেকে। তাঁর নাম “কাকন বিবি” ।

খাসিয়া সম্প্রদায়ের এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সময় “মুক্তির বেটি” নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে কেন জানি কিছুটা নিভৃতেই ছিলেন এই “বীরাঙ্গনা”। ১৯৯৬ সালের পর কিছুটা হঠাত করে করেই এই “বীরাঙ্গনা”র যুদ্ধের সাহসিকতার বর্ননা ফাঁস হয়। তারপর সেই সময়কার সরকার উনাকে “বীরপ্রতীক” খেতাবে ভূষিত করার অঙ্গীকার করে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সেই “বীরপ্রতীক” এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আজো মেলেনি গেজেট আকারে, অথচ মিডিয়াতে প্রায়ই উনাকে এই খেতাবে উল্লেখ করা হয়,যা আসলে ভুল।

ইতিমধ্যে অনেক সময় গড়িয়েছে,কাকন বিবির চামড়াতেও ভাঁজগুলো আরো গভীর হয়েছি। আর মানুষও ভুলেছে কাকন বিবির বীরত্বগাথা। সিলেট অঞ্চলে তিনি এখন কেবলই এক ৮৫ বছরের বৃদ্ধা। তাঁর বীরত্বগাঁথা অনেকেই জানে না খোদ সেই অঞ্চলেই, কিছুটা ধুঁকে ধুঁকেই বার্ধ্যকে উপনীত হয়ে এখন হয়ত অজানার উদ্দেশ্যে আমাদের এই শ্রেষ্ঠ সন্তান। ভুলে যাওয়া এই বীরাঙ্গনাকে তরুন প্রজন্ম এর পক্ষ থেকে সম্মান দেখাতে এই পেইজ থেকে কয়েকজন আজ সুনামগঞ্জ যাচ্ছেন “কাকন বিবি”কে দেখতে ও তাঁর প্রকৃত অবস্থা জানতে।

অনানুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রিহীত অল্প কিছু সম্মানী নিয়ে যাচ্ছেন এই উদ্যোক্তারা। পরবর্তীতে হয়ত কাকন বিবির অবস্থা দেখে আরো ব্যপক আকারে সম্মানী সংগ্রহ করে তাঁর জন্যে নিয়ে যাওয়া যাবে। এই উদ্যোগটিও বেশ নাড়া দিয়েছে আমাকে। পারিবারিক সমস্যা না থাকলে আমারো যাওয়ার সৌভাগ্য হত আমার এই দলটির সাথে। আর কাকন বিবি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ও তাঁর বীরত্বগাথা জানতে এখানে দেখুন – এই লিঙ্কটি এই লিঙ্কটিও দেখতে পারেন কেউ যদি তাঁর সাথে যোগাযোগ করতে চান তবে তাঁর সহযোদ্ধা এডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (পিপি) এর মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন।

এডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু (পিপি) ষোলঘর, সুনামগঞ্জ মোবাইল: ০১৭১২১৬৩৪৬৬ ঘটনা প্রবাহ-২ সেই মিটিং এর রেশ ধরেই, আবার এক আপুর বাসায় গেলাম সেই বইয়ের দোকানে আমাদের সাথে থাকা আর এক ভাইকে নিয়ে। উনার এক বান্ধবীর বাসায় গেলাম। উনারা চার বোন থাকেন সেই বাসায় (প্রায় সবাইই গ্রাজুয়েশনের শেষ পর্যায়ে), বসার ঘরে প্রবেশের পর মনে হল, এই রুমে সাদা পাঞ্জাবি পরে কোন এক শিল্পপতি প্রায়ই তার সমপর্যায়ের লোকদের সাথে আলোচনা করেন। বেশ পরিপাটি করে সাজানো বসার ঘরটি। কিছুক্ষন কথা বলার পর, বুঝলাম আমি আসলে কোন বড়লোকের আহ্লাদী মেয়ের বাসায় আসিনি, তাদের কথা-বার্তার মাঝে একটা বেশ ভাল কিছু করার প্রত্যয় পাচ্ছিলাম।

আসলে সেই দিনের আগের দিন, বাংলাদেশের দুইজন অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন আর সেই দুইজনের একজন “মুনীর মিশুক” এর বাসা ছিল ঐ বাসার খুব কাছে। এত কাছে থেকে এত একজন গুনী মানুষকে চিনতে না পারার দুখবোধের একটা ছাপ পেলাম ঐ আপুদের কথায়। আর এটাও বেশ বুঝতে পারছিলাম যে উনাদেরকে নিয়ে কিছু একটা করার খুব দৃঢ় প্রত্যয় আছে। আমার ঐ বড় ভাই আর উনার বান্ধবীরা আসলে চট্টগ্রামের অধিবাসী। ছোটবেলা থেকেই সেখানে বড় হয়েছেন।

উনারা নিহত দুই গুনী মানুষকে নিয়ে সেখানে কিছু একটা করার পরিকল্পনাও করছিলেন। উনাদের সেখানে সম্ভবত একটি সংঘটন আছে,সেটার ব্যানারে কি করা যায় সেটা নিয়ে উনারা কথা বলছিলেন। আমি বেশ চুপচাপ হয়ে শুনছিলাম। হঠাত করে উনারা ঠিক করলেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে উনারা তারেক মাসুদ এর চলচ্চিত্র দেখাবেন প্রজেক্টরের মাধ্যমে। সাথে পিক্সেলের কিছু এনিমেশন।

সমাজের সব শ্রেনীতে এই দুই গুনী ব্যক্তির সৃষ্টিকর্মের আলো ছড়িয়ে দেবার একটা তাগিদ দেখলাম। উনারা যখন কথা বলছিলেন তখন একপক্ষ বলছিলেন যে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা কি এই সৃষ্টির মর্যাদা বুঝবে? বাদ দেই? অপর পক্ষ বলছিলেন “তারপরেও উনাদের নিয়ে কিছু একটা করার দরকার। প্রয়োজনে আমরা ঐ চলচ্চিত্রের ঘটনা তাদেরকে বুঝিয়ে দিব। তাদেরকে চিনিয়ে দিব যে বাংলাদেশে দুইজন আলো ছিলেন। আমি ঠিক তন্ময় হয়ে শুনছিলাম, যেহেতু সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ ছিল না,তাই কথা বলিনি তেমন একটা।

একটা স্বাক্ষর প্রয়োজন ছিল,সেটা নিয়ে এসে চলে এসেছিলাম। তবে পরে জেনেছিলাম, রাত জেগে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র দেখেছে;প্রজেক্টরের আলোতে এক মহান মানুষকে চিনেছে তারা। এটা অনুভব করেছিলাম যে, বাংলাদেশের তরুন সমাজ আজো জাগ্রত আছে, এদেশের গৌরব,সাহিত্য,সংস্কৃতি সব কিছুর এই অতন্দ্র প্রহরীদের প্রতি কেমন যেন শ্রদ্ধা অনুভব করছিলাম। এই তরুন সমাজই বাংলাদেশকে জাগিয়ে রাখবে বিশ্বের দরবারে সে ব্যাপারে আর একবার নিশ্চিত হলাম। বেশ আগ্রহ আর স্পৃহা বোধ করেছিলাম এই দুটি ঘটনা থেকে তাই সবার সাথে শেয়ার করলাম।

আসুন সবাই মিলে দেশটাকে নিয়ে ভাবি, নিজের কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি একজন দুইজনকে লোকদেখানো সাহায্য না করে সত্যিকার অর্থে দেশকে নিয়ে ভাবি। দেশকে ভালবাসি,এত সুন্দর আর এত ঐতিহ্যের দেশের নাগরিক হয়ে এই দেশকে নিয়ে এভাবে অবহেলা করাটা রীতিমত অন্যায়। বেঁচে থাকুক “কাকন বিবি”,বেঁচে থাকুক কাকন বিবি’র চেতনা আর বেঁচে থাকুক বাংলার নির্ভীক সন্তানেরা। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.