আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ী আওয়ামীলীগের বিশেষ প্যাকেজে এবার মুক্তিযুদ্ধ না করেই চট্টগ্রামের ২৭ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ‘মুক্তিযোদ্ধা’।

বাধা পেলেই সৃষ্টি হয় গণজোয়ার। মুক্তিযুদ্ধ না করেই চট্টগ্রামের ২৭ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক গেজেটভুক্ত এসব ‘মুক্তিযোদ্ধা’র মধ্যে আছেন, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তা এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এমন কয়েকজন ব্যক্তি। এদের মধ্যে কয়েকজন নিয়মিত ভাতাও পাচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, চট্টগ্রাম জেলা কমান্ড গত ১৬ জুন ২৭ জনের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলে লিখিত অভিযোগ (স্মারক নং-মুক্তি/চ/৩৩/২০১১) পাঠিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চট্টগ্রাম জেলা কমান্ডার মো. সাহাব উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ২৭ জন গেজেটভুক্ত হওয়ার পর বিভিন্নভাবে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ায় তাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা স্থানীয় কমান্ডারদের মাধ্যমে তদন্ত করেছি। তদন্তে একজনেরও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। কিন্তু এরপরও তারা যাচাই-বাছাই না করে গেজেটভুক্ত করা অব্যাহত রেখেছেন। ’ তবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তদন্ত এবং তাদের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকজন।

বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা মনোনয়ন কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পারভিন মেহতাব বাংলানিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বেশ কয়েকজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যাপারে বৃহস্পতিবারের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। ’ গেজেটভুক্তদের মধ্যে আছেন, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় ওয়াহিদুন্নবী চৌধুরী, হাটহাজারীতে প্রফেসর মো.নূরুল হুদা, বাঁশখালী উপজেলায় সুলতান আহমেদ, সাতকানিয়া উপজেলায় নূরুল আলম ও হাফেজ আহমেদ, চন্দনাইশ উপজেলায় রীতা সেন, পটিয়ায় তাহের আহমেদ, সুজিত কুমার বড়ুয়া, নূরুল ইসলাম ও দয়াল হরি দে, বোয়ালখালীতে মোহাম্মদ বদিউজ্জামান, আনেয়ারা উপজেলায় আবুল কালাম, আবুল বশর, আবদুল ওহাব চৌধুরী, রেজাউল হক চৌধুরী, কৃষ্ণা চক্রবর্ত্তী, মোহাম্মদ শাহ আলম ও আবু তাহের মাসুদ। এছাড়াও আছেন নগরীর বন্দর থানার হারুনুর রশিদ, ইমাম শরীফ, শফিউল আলম, মোহাম্মদ ইলিয়াছ ও আব্দুস সোবহান পারভেজ, পাঁচলাইশ থানার আবু তাহের মিন্টু, কোতয়ালী থানার মোহাম্মদ শাহ আলম ও এম ওয়াহিদ উল্লাহ জামাল এবং ডবলমুরিং থানার দেওয়ান মাকসুদ আহমেদ (মাসুম)।

এদের মধ্যে হাটহাজারী উপজেলায় গেজেটভুক্ত প্রফেসর মো. নূরুল হুদা চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান। ২০১০ সালের ১১ আগস্ট তিনি মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত হন। গেজেটে তার ক্রমিক নম্বর ৬২০৩। তার পিতার নাম মৃত ছৈয়দুর রহমান। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চট্টগ্রাম জেলা কমান্ডার মো.সাহাব উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমরা হাটহাজারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখেছি নূরুল হুদা সাহেব মুক্তিযুদ্ধ করেননি।

এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় তার হাটহাজারীতে অবস্থানের ব্যাপারেও কোনও তথ্য পাইনি। ’ জবাবে প্রফেসর নূরুল হুদা বাংলানিউজকে বলেন, ‘নেতা-ক্যাথাকে (কাঁথা) তোয়াজ না করায় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমি ভারতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত সনদ আমার কাছে কাছে। ১৯৮৫ সালে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান গাজী সালাহউদ্দিনের স্বাক্ষরিত সনদও আমার কাছে আছে।

’ তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যেখানে আমাকে গেজেটভুক্ত করেছে সেখানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে তদন্ত করার এখতিয়ার কে দিয়েছে? পারলে তারা আদালতে যাক, আমি সেখানে লড়ব। ’ ‘কোন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন?’--বাংলানিউজের এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি মোবাইল সংযোগ কেটে দেন। প্রফেসর নূরুল হুদার সঙ্গে একই দিন বোয়ালখালী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের সহকারী হারবার মাস্টার হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ বদিউজ্জামান। গেজেটে তার ক্রমিক নম্বর ৬২০১। পিতার নাম মরহুম নূরুজ্জামান।

তার গ্রামের বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলার পশ্চিম কধুরখীল গ্রামে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বোয়ালখালীর কমান্ডার আবুল বশর বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে বদিউজ্জামানের বাড়ি এক কিলোমিটার দূরে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম বোয়ালখালীর কোম্পানি কমান্ডার। আমি তাকে মুক্তিযুদ্ধ করতে দেখিনি। ’ তিনি বলেন, ‘গত ৪০ বছরে বদিউজ্জামান কোনও দিন নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেননি।

এখন সরকার যখন মুক্তিযোদ্ধাদের চাকুরির বয়সসীমা দু’বছর বাড়িয়েছে তখন তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। ’ জবাবে বদিউজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, ‘বশর সাহেব ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। আমার কাছে আগের তিনজন কমান্ডারের দেওয়া সনদ আছে। ’ মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত ছিল এবং কোন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন- এ প্রশ্নের জবাবে বদিউজ্জামান বলেন, ‘আপনি টেলিফোনে কথা না বলে সামনাসামনি দেখা করেন। আপনাকে কনভিন্স করার জন্য যা যা দরকার সব করব।

’ গেজেটভুক্তদের মধ্যে পাঁচলাইশ থানার আবু তাহের মিন্টু (ক্রমিক নং-৬২৩২) এবং কোতোয়ালী থানার মোহাম্মদ শাহ আলম (ক্রমিক নং-৬১৮৯) সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতি মাসে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চট্টগ্রাম জেলা কমান্ডার মো. সাহাব উদ্দিন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আবু তাহের মিন্টুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে তাতে উল্লেখ করেছে, ‘২০১১ সালে সার্টিফিকেট এবং চট্টগ্রামের ঠিকানায় তার নাম গেজেটে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। পূর্বের যাচাই-বাছাইকালে প্রতিবারই তার নাম চট্টগ্রামে বাদ পড়েছিল। তার মতে, তিনি আগরতলায় বিএলএফ ট্রেনিং নিয়ে, ফেনীতে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, আগরতলায় কোনও বিএলএফ ট্রেনিং সেন্টারই ছিল না।

আমরা তথ্য সংগ্রহকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ’ শাহ আলমের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে তাতে উল্লেখ আছে, ‘প্রাথমিক যাচাইয়ে তিনি চট্টগ্রামের কোথাও স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন বলে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি নোয়াখালী জেলায় যুদ্ধ করেছেন মর্মে তথ্য দিয়েছেন। তিনি অতীতেও চট্টগ্রামে অনেকবার তালিকাভুক্ত হতে চেয়েছেন। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ের সময় বাদ পড়েছেন।

’ আবু তাহের মিন্টু ও শাহ আলমকে ভাতা দেয়া প্রসঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক পারভিন মেহতাব বাংলানিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা মনোনয়ন কমিটির সভায় সর্বসম্মতভাবে তাদের ভাতা প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দুটো পক্ষ সৃষ্টি হয়েছে। এরা ব্যক্তিগত ক্ষোভ, আক্রোশ থেকে অনেক কিছু করছে। ’ Click This Link  ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.