আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

দাদুর কান্ডঃ ************************************ ছোট গল্প


পল্টুর দাদু সকাল দুপুর লাফালাফি করেন- কারন ডাইবেটিস। কিন্তু এক শিপুলের দাদুর মত ভাল দাদু কেউ নেই। রায়টা নিজেই দিয়ে ফেলল বন্ধুদের আড্ডায়-বন্ধুদের সাথে আড্ডায় নিজের দাদুকে নিয়ে প্রায়ই এভাবে গর্বের সাথে দাদুর গুণগান করতে ভালবাসে সে। আজকে দাদু শহরে গেছেন-প্রতিদিনের মত বিকেল বেলা একগাদা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে গল্প করতে আসেননি। এই জন্য সবার মন খারাপ।

সবাই মন খারাপ করে বসে ছিল- এমন সময় কার যেন মাথায় এল চল- ডাংগুলি খেলি। যেই কথা সেই কাজ। কিন্তু এই খেলা কেউ তেমন ভালভাবে জানেনা কেউ। একবার দাদু গল্পচ্ছলে শিখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে খেলতে হয়। সেই শোনা জ্ঞান নিয়ে সবাই বসে গেল ডাংগুলি খেলার যুদ্ধে- পল্টু বানাল লাঠি।

আর অরিত্র বানাল গলা-দুই দিকে বেলনের মত ছুড়ি দিয়ে ছিলতে ছিলতে হাত কেটে ফেলল সে। তবুও খেলা থামানো যাবেনা- এই পন করে সবাই মিলে খেলা শুরু করে দিল শিপুলদের বাগানেই। সবাই মিলে দুই ভাগ হয়ে গেল- প্রথম মুসা পেল ডাংগুলি মারার দায়িত্ব- বেচারা এমন ভাবে গোলাটা ছুড়ে দিল-যে সেটা গিয়ে সোজা পৌছুল শিপুলের দাদুর ঘরের জানালার দিকে- আর সাথে সাথে ঠুং করে ওদের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ঢুকে গেল দাদুর ঘরের একদম ভেতরে। সবাই তাকিয়ে আছে এবার শিপুলের দিকে-কিন্তু শিপুল নিরাশ ভঙ্গিতে জানাল- দাদুর ঘরের চাবি শুধু মাত্র দাদুর কাছেই থাকে- কেউ সেখানে প্রবেশের অধিকার পায়না শুধু শিপুলের মা ছাড়া- তিনি প্রতিদিন একবার করে ঘরটা ঝাড় দিয়ে আসেন সকালে। এছাড়া দাদু সারাদিন ঘরে বসে থাকে- কি কি সব বই পড়েন- আর কি কি সব পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন।

সেদিনের মত খেলাটা ইস্তফা দিতে হল- কারন একটু পরেই শিপুলের দাদু ফিরে এলেন- বিরাট এক পিকাপ ভ্যান নিয়ে। হাতে কালো ইস্পাতের ছড়ি দিয়ে ভর দিয়ে সেডান থেকে নেমে পিকাপ টাকে বাড়ির আঙ্গিনায় ঢোকানোর জন্য নিজেই তদারকি করলেন। তারপর গাড়ি থেকে নামিয়ে আনলেন একটা কাপড়ে মোড়ানো প্যাকেট আর একটা ধবধবে সাদা গ্রান্ড পিয়ানো। জিনিসগুলো গাড়ি ওয়ালা লোকেরা দোতলায় দাদুর ঘরে পৌছে দিতেই দাদু শিপুলকে ডেকে একটা চকলেট খেতে দিলেন। দাদুর বাম হাতে কড়ে আঙ্গুল ধরে দাদুর সাথে দোতলায় উঠে এল শিপুল।

গালের একপাশে সুপুরির মত চকলেট টা নিয়ে এসে-দাদুকে বলল- “ এগুলো কি এনেছ দাদু?” দাদু বলল- শিপু সোনা- এটা আমার নতুন একটা পরীক্ষার জন্য এনেছি দাদু” বিশেষ কিছু শিপুলকে জানালেন না শিপুলের দাদু- কিন্তু তিনি জানেন এগুলো তিনি কেন এনেছেন-কিছুদিন আগে একটা একটা বিদেশী বইয়ে তিনি পড়েছেন- একাটানা পনেরদিন সাদা রঙ্গের একটা পিয়ানো বাজাতে পারলে যে কোন বস্তুর মাঝে প্রাণ সঞ্চার করা সম্ভব। এজন্য তিনি বিদেশ থেকে অর্ডার দিয়ে একটা পিয়ানো আর একটা মেয়ে পুতুল আনিয়েছেন। এর মাঝে তিনি বেশ কয়েকদিন বই ঘেটে ঘেটে বের করে ফেলেছেন কিভাবে পিয়ানো বাজাতে হয়। এই কথাটা খাবার টেবিলে শিপুলের বাবাকে জানালেন দাদু- শিপুলের বাবা প্রতিবারের মত এবার ও না করলো না। শিপুলের দুই চাচা ও কোন প্রকার উচ্চবাচ্য করেনা- কারন শিপুলের দুই চাচা ভয় পান শিপুলের বাবাকে- আর শিপুলের বাবা বাঘের মত ভয় পান শিপুলের দাদুকে- তাই সবাই প্রতিবারের মত এবারের এক্সপেরিমেন্ট টাতে ও সায় দিয়ে দিলেন- সবাই জানে- শিপুলের দাদু দুই দিন পরপর কি সব নিয়ে যেন এক্সপেরিমেন্ট করেন।

আর চুপচাপ কি যেন ভাবতে থাকেন। সন্ধ্যায় অবশ্য এই ভাব কোথায় যেন উড়ে যায়। তিনি হয়ে যান বাচ্চা- পাড়ার সমস্থ বাচ্চা কাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করেন রীতিমত। এর আগে ও বেশ কয়েকবার শিপুল দেখেছে দাদুকে পাগলামি করতে। একবার উনি মাটিতে গর্ত করে তাতে নিজের শরীর ঢুকিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখার জন্য গিয়েছিলেন বুড়িগঙ্গার পাড়ে- সেখানে মাঝরাতে সারা শরীরে রক্ত বন্ধ হয়ে গিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে।

এছাড়া ও পানিতে জলচিকিত্তসা, উলটো হয়ে ধ্যান করা- পরীক্ষাগারে নানারকম যন্ত্রপাতি বসিয়ে নানা রকম বিপদজনক বিক্রিয়া করা- আর মাঝে মাঝে আগুন লাগিয়ে দেয়া-আর কত কি! দাদুর সর্বশেষ সংস্করণ এই পুতুল আর পিয়ানো। পিয়ানো আনার পরে পনের দিন দাদু বিটোভেন এর সেভেনথ অর্কেস্ট্রা বাজানো শিখলেন। সারাদিন টুংটাং করে বাজালেন অনেক দিন একটানা। এ সময় শুধু বিকেল বেলা আগের মত বাচ্চাদের সাথে খেলা ছাড়া উনাকে বাইরে দেখা যায়নি। এরপর পূর্ণিমা আসার ঠিক পনের দিন আগে দাদ্যু পিয়ানো বাজাতে বসলেন।

দাদুর রুমে সবার ঢোকা বারন হয়ে গেল। উনি এই পনেরদিন কিছু খাবেন না- প্রস্রাব পায়খানা ও করবেন না- বইটাতে এমন ই লেখা আছে। একটানা পিয়ানো বাজিয়ে যেতে হবে। একটানা পিয়ানো বাজানো মুখের কথা না- দাদুর বয়স হয়েছে-উনি দিন দুয়েক বাজিয়ে খান্ত দেবেন বলে সবাই ধরে নিল- তাই যেদিন উনি শুরু করলেন- সেদিন এর পর উনার কথা প্রায় সবাই ভুলে গেল- এক শিপুল ছাড়া- সে প্রতি এক ঘণ্টা পর পর গিয়ে দাদুর ঘরের একটা ফুটো দিয়ে দাদুকে দেখে আসল। এই ব্যাপারটা অবশ্য কেউ জানলো না।

কিন্তু চতুর্থ দিন যেতে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল-সবার আশখা ভুল প্রমান করে দাদু বাজিয়েই যেতে থাকলেন। শেষে শিপুলের কাছে সবাই জেনে স্বস্তি পেলেন- যে দাদু বেশ ভাল আছেন। দিব্যি বাজিয়ে চলেছেন পিয়ানো। রিতিমত বিটভেন ঝড় বইয়ে দিচ্ছেন পিয়ানোর উপর। এক সপ্তাহ পর সবাই প্রায় চিন্তায় পাগল হবার দশা- কেউ ভয়ে দরজায় বাড়ি মারতে পারছেনা- আবার বাড়ি না মেরে ও থাকতে পারছেনা- বাড়ির কাজের লোক সহ সবাই দরজার ফুটো দিয়ে দেখেছে- দাদু ক্লান্তিতে নুইয়ে পড়েছেন প্রায়- কিন্তু একটানা বাজিয়েই চলেছেন।

এভাবে দিনের পর দিন যাচ্ছে- দাদুর বাজানোর গতি প্রায় থেমে গেছে- কিন্তু দাদুকে বাজাতে শোনা যাচ্ছে- খুব ধীরে ধীরে- ঠিক পনের দিন পর- দাদুর বাজনা প্রায় বাজেনা বাজেনা অবস্থা- সবাই সারা দিন অপেক্ষা করেছে দাদু না বুঝি এই বেরিয়ে আসেন- একটা জ্যান্ত মেয়ে মানুষ নিয়ে- কিন্তু দাদু বের হলেন না। শিপুলের বাবার প্রেশার বেড়ে ১৭০ এ দাঁড়ালো- মেঝ চাচার চুল পেকে পনের দিনেই প্রায় সাদা হয়ে গেছে- ছোট চাচা মনে হয় কেঁদেছেন- কান্নার জল গড়িয়ে গালে দাগ পড়ে গেছে- কিন্তু দাদু কোনভাবেই দরজা খুলে বেরিয়ে আসেননি। সেদিন রাতে- ভরা পূর্ণিমা- সবাই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়েছে- দাদু তখনো বাজিয়ে চলেছেন- খুব আস্তে আস্তে- শিপুল আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে দাদুর ঘরের সামনে গিয়ে ঊকি মারতে যেতেই দরজার পাল্লা খনিকটা এমনিতেই খুলে গেল-একটু ফাঁক হতেই শিপুল ভেতরে ঊকি দিয়ে দেখল- দাদুর মাথাটা পিয়ানোর উপর মুখ দিয়ে জিহবা বিচ্ছিরি ভাবে বেরিয়ে আছে- দাদু পিয়ানো বাজাচ্ছেন না- কিন্তু পিয়ানো বেজে চলেছে। হটাত ঘরে কিছু একটা নড়ে উঠল- ভয় পেয়ে গেল শিপুল- এর পর যা দেখল তা দেখে তার চোখদুটো গোল হয়ে গেল- শিপুল দেখল- পুতুলটার একটা চোখের পাতা নড়ে উঠল- আস্তে আস্তে জেগে উঠল পুরো পুতুল্টা-নড়ে চড়ে প্রথমে নিজেকে দেখে নিল- সে- তারপর আস্তে আস্তে পিয়ানোর তালে তালে নেচে নেচে সারা ঘর ঘুরল- বার কয়েক দাদুর শরীরটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দিল সে- রিনরিনে সেই হাসি শুনে ভয়ের একটা শীতল ধারা নেমে গেল শিপুলের শরীর বেয়ে। এরপর পুতুলটা আস্তে করে বন্ধ জানালার খিরকি খুলে দিল- সাথে সাথে সারা ঘর ভেসে গেল পূর্ণিমার আলোয়- তারপর সেই অপূর্ব চাঁদের আলোয় পিয়ানোর বাজনার তালে তালে নেচে চলল পুতুলটা- তারপর এক সময় নাচতে নাচতে জানলে গলে চলে গেল বাইরে- তারপর আর দেখা গেলনা পুতুলটাকে- এদিকে ভয়ে দুমদুম করে বাজনা বাজছে শিপুলের বুকের ভেতর।

আস্তে আস্তে ঘরে ঢুকল সে- দাদুকে একটা ধাক্কা দিতেই দাদুর শরীর টা পড়েগেল নিচে মাটিতে-শিপুল সাথে সাথে দৌড় লাগাল বাইরে- পুতুলটাকে ধরবে- কিন্তু বাইরে অনেক খুঁজে ও পুতুলটাকে পেলনা-ঘরে ফিরে আসতেই দেখল বাবা আর মাঝ কাকা দাদুর শরীর টা কে ধরে কান্না করছে। এর পরদিন-ঘরে পুলিশ এল-ডাক্তার এল- এবং বলল- দাদু নাকি দিন দুই আগেই মারা গেছেন- কিন্তু বাইরে থেকে যারা পিয়ানোর বাজনা শুনেছিল তাদের কোন সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। পুতুলটাকেও অনেক খোঁজা হল- পাওয়া গেলনা। শিপুল সব জেনেও কাঊকেই বললনা কিছুই। এরপর প্রায় ছয়মাস পর- শিপুল বসে আছে-ওর নতুন টিঊটরের সামনে- উনার দিকে তাকাতে ও সে ভয় পাচ্ছে- কারণ টিউটরের চেহারাটা ঠিক সেই পুতুলটার মত- এই টিচারের কাছে কোন ভাবেই শিপুল পড়বেনা- মাকে কান্না কাটি করে বলেও লাভ হয়নি- উলটো ফল হয়েছে- মা বাইরে থেকে দরজা তালা লাগিয়ে দিয়েছেন- শিপুল আস্তে আস্তে তাকাল নতুন টিউটরের দিকে- দেখল- হাসছেন তিনি কিন্তু সেই হাসির মাঝে লুকিয়ে আছে যেন অন্য কোন মানে...... (লেখাটা এর পূর্বে চট্টগ্রাম মঞ্ছ পত্রিকায় প্রকাশিত) ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।