আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আটকে গেছে ফ্রি ট্রানজিটের ট্রেইলার : বাংলাদেশের বুকচিরে বিনাশুল্কে ট্রানজিট কার্যকর করল সরকার

নাজমুল ইসলাম মকবুল

আটকে গেছে ফ্রি ট্রানজিটের ট্রেইলার : বাংলাদেশের বুকচিরে বিনাশুল্কে ট্রানজিট কার্যকর করল সরকার বাংলাদেশের বুকচিরে সড়কপথে ভারতের জন্য ফ্রি ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর করা হয়েছে। রোববার মধ্যরাতের পর ভারতীয় বিদ্যুেকন্দ্রের সরঞ্জামবাহী ৩২৬ টন ভারী ৪টি ট্রেইলার আশুগঞ্জ থেকে সড়কপথে ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা দিয়ে কিছুদূর গিয়েই ঘটে বিপত্তি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণ করে রাস্তায়ই একটি ভাসমান বিকল্প সেতুর ওপর আটকে যায় বিদ্যুেকন্দ্রের ভারী সরঞ্জামবাহী বৃহদাকার প্রথম ট্রেইলারটি। আটকা পড়ে বাকি ৩টি ট্রেইলারও। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কাউতলী এলাকায় তিতাসের শাখা নদী কুরুলিয়া বা এন্ডারসন খাল পার হওয়ার সময় সোমবার ভোর রাত ৪টার দিকে ঘটে এ বিপত্তি।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ট্রেইলারগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে পারেনি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রকৌশলীরা জানান, সড়ক মেরামত সম্পন্ন হলে মধ্যরাতে ট্রেইলারগুলোর আবার রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রেইলারগুলো রাস্তায় আটকে পড়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভারী পণ্য বোঝাই এসব ট্রেইলার সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্টগুলোর স্থায়িত্ব নষ্ট করে দেবে। ট্রেইলারগুলো যাওয়ার সময় আরও ব্রিজ-কালভার্ট ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাশাপাশি বিঘ্নিত হবে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আশুগঞ্জ নৌবন্দরের ডিপো থেকে পলাটানা বিদ্যুেকন্দ্রের মালামাল নিয়ে রোববার দিবাগত রাত সোয়া ১২টায় ট্রেইলারগুলো ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা হয়। রাত ৪টার দিকে ট্রেইলারগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কাউতলী এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে তিতাসের শাখা নদী এন্ডারসন খাল যা স্থানীয়ভাবে কুরুলিয়া খাল নামে পরিচিত ও ৮০ মিটার চওড়া নদীর ওপর থাকা ব্রিজটি দুর্বল হওয়ায় আগেই ব্রিজের পাশে বাইপাস হিসেবে বার্জ (থেমে থাকা ফেরি) স্থাপন করা হয়। ভোর চারটার দিকে প্রথম ট্রেইলারটি (নম্বর এইচ আর-৫৫ এল-২৭৯৬) ওপরে ওঠামাত্রই বার্জটি কাত হয়ে পড়ে।

ট্রেইলারের সহযোগী চালক রাজ কুমার শর্মা জানান, নদীর ওপর বসানো ভাসমান ফেরি বা বার্জের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সামনের অংশ পার হওয়ার পরই সড়কের মাটি দেবে যাচ্ছিল। বিষয়টি বুঝতে পেরে তাত্ক্ষণিকভাবে ট্রেইলারটি পেছনে নেয়া হয়েছে। গতকাল সারাদিনই প্রথম ট্রেইলারটি বার্জের ওপর ছিল। আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, আশুগঞ্জ নৌবন্দরের অদূরে সোনারামপুর ডিপো থেকে ট্রেইলার ৪টি রাজস্ব বিভাগের ছাড়পত্র নিয়ে সোমবার রাত ১২টা ১৫ মিনিটে একযোগে ত্রিপুরার উদ্দেশে রওনা হয়। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ার সময় ত্রিপুরা পাওয়ার কোম্পানির পরিচালক আর কে মোদন, এবিসি ইন্ডিয়া লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী বি কে ধর, সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জাফর ও কাস্টমসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মালবাহী ট্রেইলার ৪টি ডিপো থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ওঠার পর পেছনের দিক থেকে প্রায় ৩ ঘণ্টা সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী কোনো যানবাহন সেগুলো অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে ট্রেইলারগুলোর পেছনে আশুগঞ্জ থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত পণ্য বোঝাই ট্রাকসহ কয়েকশ’ যানবাহন আটকা পড়ে। মালামাল পরিবহনের ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবিসি কোম্পানির কর্মী আলী হায়দার সাংবাদিকদের বলেন, খালের পানি কমে যাওয়ায় বার্জের সঙ্গে স্থাপিত পন্টুন সড়কের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে। তাই ট্রেইলারগুলো চলাচল করতে পারছে না। তিনি আরও জানান, নদীর ওপর থাকা সেতুর ধারণক্ষমতা কম হওয়ায় পন্টুন বসিয়ে তার সঙ্গে সংযোগ সড়ক তৈরি করে ট্রেইলারগুলোর চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জোয়ারে পানি বাড়লে গত রাত ১২টার দিকে ট্রেইলারগুলো ছাড়ার কথা জানান তিনি। সড়ক ও জনপথ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জোয়ার-ভাটার কারণে ফেরিটি সমন্বয় হচ্ছিল না। সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কোম্পানির লোকজন সংস্কার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তার দাবি, ভারতীয় ট্রেইলার চলাচলের সময় বাংলাদেশী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সওজের বি-বাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী যানবাহন চালাচল স্বাভাবিকের দাবি করলেও তার প্রতিষ্ঠানই বলছে ভিন্নকথা।

রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ভারী যন্ত্রাংশ বোঝাই কার্গো (ট্রেইলার) চলাচলকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়ার সেনারবাদী পর্যন্ত সড়কে বিভিন্ন যানবাহন চলাচল সীমিত অথবা বন্ধ থাকবে। উল্লেখ্য, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানায় বিদ্যুত্-কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ‘ওভার ডাইমেনশনাল কার্গো’ বা ওডিসির আওতায় (শুল্ক ছাড়া) কমপক্ষে ৮৬ জাহাজ পণ্য আসছে। এর মধ্যে ৫টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত ৯ মার্চ ভারতীয় এবিসি কোম্পানির একটি জাহাজ ১৪০ টন ওজনের বিশাল ২টি ‘টারবাইন’ নিয়ে কলকাতা থেকে আশুগঞ্জে আসে। এমভি সাইকা নামের জাহাজটি গত ২২ ফেব্রুয়ারি কলকাতার খিদিরপুর নৌবন্দর ছেড়ে আসে।

পরবর্তীতে ১২ মার্চ এমভি মোস্তাদির-২ ও এমভি সোনালী ১৬ মার্চ, এমভি হেংগিং-২ নামের অপর একটি জাহাজ ২০ মার্চ ও আরও একটি জাহাজ ২৪ মার্চ আশুগঞ্জ নৌবন্দরে পণ্য খালাস করে। গত বছরের ৩১ মে আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে কলকাতা থেকে আগরতলায় পণ্য পরিবহনের চুক্তি করে বাংলাদেশ। গত বছরের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের যৌথ ইশতেহারের আলোকে বাংলাদেশ সরকার মে মাসে আশুগঞ্জকে পঞ্চম বন্দর ঘোষণা করে। আশুগঞ্জে আন্তঃমহাদেশীয় ট্রানশিপমেন্ট কেন্দ্র চালুর ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সরকার ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (আইডব্লিউটিটি) চুক্তিতে এক সংযোজনীর মাধ্যমে আশুগঞ্জ দিয়ে ত্রিপুরায় ভারতীয় কার্গো ট্রান্সশিপমেন্টের অনুমোদন দিয়ে আশুগঞ্জকে দ্বিতীয় ট্রানশিপমেন্ট পয়েন্ট ঘোষণা করে।

ভারতীয় পণ্যবোঝাই ট্রেইলার চলাচলকে সড়ক অবকাঠামোর ক্ষতি ও স্বাধীনতা-সার্বভৌত্বকে উপেক্ষার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও বড় ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেজ্ঞরা। ভারতের এই পণ্য পরিবহনকে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ববিরোধী আখ্যা দিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. তালুকদার মনিরুজ্জামান বলেন, সড়ক অবকাঠামোর ভয়াবহ ক্ষতির পাশাপাশি বিষয়টি আমাদের নিরাপত্তার জন্য যে বড় হুমকি, সেটা বার বার বলার পরও সরকার কানে নিচ্ছে না। এই ট্রানজিট কার্যকর করার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে চাইছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাহবুব উল্লাহ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমরা বহুদিন থেকেই বলে আসছি, বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো এ ধরনের ট্রেইলার চলাচলের উপযোগী নয়। এ ধরনের বড় বড় ট্রেইলার চলার উপযোগী সড়ক অবকাঠামো তৈরিতে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।

যার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। ভারী সরঞ্জাম বোঝাই এসব ট্রেইলার চলাচল আমাদের সড়ক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে। সরকার ভারতের প্রতি এতটাই নতজানু যে, ন্যূনতম শুল্ক আদায় না করেই ট্রান্সশিপমেন্টের নামে ভারতকে ট্রানজিট দিয়েছে। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সবকিছু উপেক্ষা করে ভারতকে এই ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে সরকার। এটা দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এর বিপরীতে আমরা ভারত থেকে যেসব কঠিন শর্তে ঋণ নিয়েছি সেটা তুলনা করলেই নতজানু নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। সুত্র: আমার দেশ Click This Link

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।