আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ছাত্রলীগের বর্তমান কর্মকান্ড থামাতে না পারলে সরকারকে মূল্য দিতে হবে-অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

Only I know what is my goal, My heart is my temple.

কাজী সায়েমুজ্জামান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর এমিরিটাস এবং প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেছেন, ছাত্রলীগের বর্তমান কর্মকান্ড লাগাম টানতে না পারলে বর্তমান সরকারকে মূল্য দিতে হবে। এজন্যই আমরা ছাত্র লীগের সঙ্গে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পর্ক না রাখতে অনুরোধ করেছিলাম। বর্তমানে সাধারণ ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতিকে পছন্দ করেনা। রাজনীতিহীন ছাত্র রাজনীতিকে এখনই সঠিক পথে আনা দরকার। এরপরই শিক্ষক রাজনীতির পরিবর্তন আনতে হবে।

সম্প্রতি কলা ভবনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে আনিসুজ্জামান এসব কথা বলেন। এর কয়েকদিন আগে তিনি আরো কয়েকজন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগের সীমাহীন চাঁদাবাজি, দৌরাত্ম্য ও হত্যাকান্ডের ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সাক্ষাতকারে এছাড়াও শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান পরিবেশ, অন্ধকার ভবিষ্যৎ, খসড়া শিক্ষঅনীতি বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্ত্বশাসন আইন নিয়ে কথা বলেন। বলেছেন, কোন বুদ্ধিজীবী অন্ধভাবে দলীয় আনুগত্য করলে তিনি দলীয় মানুষ হয়ে যাবেন। নিচে তার পুরো সাক্ষাতকারটি উপস্থাপন করা হলো- কাজী সায়েমুজ্জামান: আপনারা কয়েকজন বুদ্ধিজীবী সম্প্রতি শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ দেখে শঙ্কা ও উদ্বেগ লক্ষ্য করছেন বলে জানিয়েছেন।

এর মাত্রাটা কি? অধ্যাপক আনিসুজ্জামান: আমরা উদ্বেগ অনুভব করছি; কারণ শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি অনেক বছর ধরেই খারাপ। গত নির্বাচনের পর আমরা যেমন আশা করেছিলাম জনগনের এত বড় সমর্থন পেয়ে যে সরকার এসেছে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ উন্নয়নে বড় রকমের ভূমিকা রাখবে। আমরা যখন দেখতে পাই যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বা যুব সংগঠন নানা রকম বিশৃংখলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে তখন আমাদের এ উদ্বেগ বাড়ে। আমরা যেসব কথা বলেছি তা কেবল বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন সম্পর্কে প্রযোজ্য তা নয়, বড় দুই দলেরই ছাত্র সংগঠন সেই সেই দলের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ ধরনের দুর্নীতিমূলক সন্ত্রাসমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থেকেছে। এর ফলে একদিকে জনসাধারণ আতংকিত হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্যবসা বাণিজ্য বা সাধারণ জীবনযাত্রায় তাদের হস্তক্ষেপ একটা ক্ষতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। আর ছাত্র রাজনীতিও কলুষিত করছে। লোকজনও ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিতে বলছে। এ অবস্থায় বর্তমান সরকার একটু বলার চেষ্টা করেছেন যে, ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আমরা সরাসরি সম্পর্ক রাখবোনা। আমরা বলছি আন্তরিকভাবে তারা এটা ছিন্ন করলে এদের অনাচারের মাত্রা কমে যাবে।

আমরা মনে করি এই যে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি হচ্ছে এগুলো কোনটাই ছাত্ররাজনীতির বিষয় নয়। ছাত্র রাজনীতির নাম করে কিছু লোক এ ধরনের অন্যায় কাজ করছে। একেই আমরা রোধ করতে চেয়েছিলাম। সায়েম: শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান পরিবেশ শিক্ষার জন্য উপযোগী নয় কেন? আনিসুজ্জামান: এর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবাসগুলোতে দেখতে পাচ্ছি যে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যারা সম্পর্কিত তারা এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা করে যাচ্ছে।

ছাত্রবাসের স্বাভাবিক পরিবেশ তারা নষ্ট করে ফেলছে। আমি বহুদিন ধরে বলে আসছি আমাদের কলাভবনের প্রাঙ্গনে মাইক্রোফোন লাগিয়ে সভা সমাবেশ হচ্ছে অনেকে বক্তৃতা দেন। আমাদের কাস বিঘিœত হয়। এখন শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ভালোর দিকেতো যাচ্ছেনা উপরোন্ত আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। এরা যেভাবে অত্যাচার করছে তাতে আমরা শঙ্কিত, বিভ্রান্ত।

আমরা মনে করি এটা থামানো না গেলে বর্তমান সরকারকেই তার মূল্য দিতে হবে। আর এই দলের মূল্য দেয়া মানে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পে তাদের সবাইকেই মূল্য দিতে হবে। এজন্য আমরা বলেছি সময় থাকতে সাবধান হয়ে এগুলো বন্ধ করতে হবে। সায়েম: এ পরিস্থিতির জন্য কি বা কারা দায়ী? আনিসুজ্জামান: এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির সীমাহীন লোভ আর দুর্নীতি। তারা মনে করছে ছাত্র রাজনীতির নাম করে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এক ধরনের ত্রাসের রাজত্ব চালাবে।

এটি হচ্ছে শোচনীয় ব্যাপার। এর ফলে আমাদের দেশে ছাত্র রাজনীতিতে ভাল ছাত্ররা যেতে চায়না। কারণ ছাত্র রাজনীতির মানেই হচ্ছে মারামারি, কোন্দল ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা আশা করি মেধাবী ছাত্ররা এগিয়ে আসবে। দেশ পরিচালনায় তাদের কি মতামত তা জানাবে।

ছাত্র রাজনীতির বড় উদ্দেশ্য হলো জনমত গঠন করা, সরকারকে একটা ভালো কিছু করতে বলা। বর্তমানে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এদের কারণেই সাধারণ ছাত্ররা রাজনীতির নাম শুনতে চায়না। এরা ছাত্র রাজনীতির নামে এমন সন্ত্রাস চালিয়েছে যে, ভালো ছাত্ররা মনে করছে ছাত্র রাজনীতির মানে আমাকে গুন্ডা হতে হবে। না হলে আমি তো কিছুই করতে পারবোনা।

এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। সায়েম: দেশে রাজনীতিহীন ছাত্ররাজনীতি চলছে। একে কিভাবে দেখছেন? আনিসুজ্জামান: ছাত্র রাজনীতির ল্য হচ্ছে দেশের সমস্যা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা। সরকারকে এ সমস্যা সমাধানে এক ধরনের চাপ দেয়া। কিন্তু আসলে যেটা হচ্ছে তা হলো এরা নিজেদের লাভ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করা জন্য ছাত্ররাজনীতি ব্যবহার করছে।

তারা ছাত্র রাজনীতির দুর্ণাম করেছে। এটা বন্ধ করতে হবে। ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের মতো দেশে যেখানে শিক্ষিতের হার সীমাবদ্ধ, যেখানে ছাত্র সমাজ শিক্ষিত হওয়ায় সচেতন হন। তারা জনসাধারনের কাছে একটি বিষয়ের ভালো মন্দ তুলে ধরতে পারে।

আগে মানুষ ছাত্রদের কথায় বিশ্বাস করতো। কারণ ছাত্ররা নি:স্বার্থভাবে তাদেরকে রাজনীতির কথা বলতো। এখনতো মানুষ ছাত্র নেতাদের বিশ্বাস করেনা। কারণ তাদের কাজের মধ্যে কোন স্বার্থহীনতার ছায়া দেখতে পাননা। তারা যা করছেন নিজেদের স্বার্থেই করছেন।

সায়েম: প্রধানমন্ত্রী বারবার ছাত্রলীগের প্রতি হুশিয়ারী দিচ্ছেন। কিন্তু এর কোন ফল হচ্ছেনা। সরকার আসলেই কঠোরতা দেখাতে আন্তরিক কিনা? আনিসুজ্জামান: প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন তা ঠিক আছে। এর সঙ্গে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপকে কাজ করতে হবে।

তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুনগুলো বলবৎ করার চেষ্টা করবেন। যারা দোষী সাব্যস্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। এটা যে হচ্ছেনা সেটা নয়; কোথাও হয়তো হচ্ছে। তবে সেটা খুবই কম। প্রধানমন্ত্রী এব্যাপারে যতই বলুননা কেন আমাদের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী চিরকাল দেখে আসছে যে সরকারী দলের ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যায়না।

ফলে তারা ভয় পাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তারাও কোন ব্যবস্থা নেন না। এরা ব্যবস্থা নিতে শুরু করলেই দুর্বৃত্তরা কোনঠাসা থাকতে বাধ্য হবে। সায়েম: আপনারা বলছেন, ছাত্রলীগের সঙ্গে মতাসীন আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ ছিন্ন করলে ছাত্র রাজনীতির গৌরব ফিরে আসবে। এটা কিভাবে সম্ভব? আনিসুজ্জামান: আমরা বলেছি এ কারণে যে যারা ছাত্র রাজনীতি করছে তারা ক্ষমতাসীন দলের ছায়ায় নানা রকম দুর্নীতি ও সন্ত্রাস করছে।

এছায়া মাথার ওপর দিয়ে সরে গেলে অন্যায় করার আগে তারা দশবার ভাববে। একটা অন্যায় কাজ করলে পুলিশ ধরে নেবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিস্কার করে দেবে এটা জানলে তারা অবশ্যই ভাববে। এখন মনে করছে আমরা সরকারী দলের ছাত্র আমাদের কিছুই হবেনা। সায়েম: আপানাদের বিবৃতির পর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবাই কেবল ছাত্রলীগের দোষত্র“টিই দেখে কেন? সরকার প্রধানের এ ধরনের বক্তব্যের ফল কি হতে পারে? আনিসুজ্জামান: আমরা এখন ছাত্রলীগের কথা এজন্য বলছি যে, বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন। একই কথা ছাত্রদল সম্পর্কেও খাটে।

কিন্তু এ মুহুর্তে বিএনপি ক্ষমতায় নেই। আর ছাত্রদলও ওই রকম দুর্নীতি করার সাহস পাচ্ছেনা। সেই জন্যই আমরা আওয়ামী লীগের ছাত্রদের কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রীর স্বভাবতই খারাপ লেগেছে। তার সরকার, দল এবং ছাত্র সম্পর্কে বলা হয়েছে।

আমি তাকে কোন দোষ দেবোনা। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলবো আমরা কোন প্রকার পক্ষপাত করে কথাটা বলিনি। তার দল এখন ক্ষমতায় রয়েছে বলেই আমরা আমাদের মত দিয়েছি। অন্যরা ক্ষমতায় থাকলেও একই রকমের বক্তব্য দেয়া হতো। সায়েম: ছাত্র রাজনীতি কেমন হওয়া উচিত? আনিসুজ্জামান: আমরাও ছাত্র রাজনীতি করেছি।

আমাদের দলের সঙ্গে যে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক ছিলনা তা নয়। ছাত্র লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ছিল। ছাত্র ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি, গণতন্ত্রী দল বা ন্যাপের সম্পর্ক ছিল। তবে ওই সময় কোন ছাত্র সংগঠনই লেজুড়বৃত্তি করতোনা। আমরা আমাদের দলের নেতা নির্বাচিত করতাম।

আমরা আমাদের নেতাদের পরিচালিত করতাম। রাজনৈতিক দলের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতাম। এখনতো সেটা নেই। কাজেই ছাত্র রাজনীতির গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে ছাত্র সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি আগে ছাড়তে হবে। এটা একটা বড় কাজ।

জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলের অধ্যাদেশ করলেন। সেই অধ্যাদেশে বলা হলো একটি রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন থাকতে হবে, শ্রমিক সংগঠন থাকতে হবে। এর আগে এই বাধ্যবাধকতা ছিলনা। সায়েম: কিন্তু গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের সংশোধনীতে এগুলোকে মুল দলের অংগ সংগঠন থেকে বাদ দেয়ার পরওতো পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। কারণ কি? আনিসুজ্জামান: সম্পর্কটা আগের মতোই রয়ে গেছে।

ফল হচ্চেনা কারণ যে সংশোধনীটি আনা হয়েছে তার অন্তবর্তী যে ভাব তা আমরা অনুসরণ করছিনা। এটা নিশ্চিত করলে আমার মনে হয় কাজ হবে। সায়েম: অনেকে ছাত্র রাজনীতির এ দুরাবস্থার জন্য শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি ও লেজুড়বৃত্তিকে দায়ী করেন। আপনার মত কি? আনিসুজ্জামান: শিক্ষকদের রাজনীতিও খুব কলুষিত। এই যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছেন।

এটাতো আমাদের জন্য লজ্জার ব্যাপার। এখন যা দেখছি তাতে শিক্ষক রাজনীতিও এটা লেজুড়বৃত্তির পর্যায়ে চলে গেছে। আমরা দেশের মানুষকে কোন পথ দেখাচ্ছিনা। নিশ্চয়ই শিক্ষক রাজনীতির মধ্যেও পার্থক্য আসা দরকার। আমাদেরও প্রশ্ন করতে হবে আমরা যা করছি তাতে দেশের ভালো হচ্ছে কিনা।

আমরা আমদের বিবৃতিতে শিক্ষকদের কথা বলিনি। কারণ ছাত্র রাজনীতি এমন পর্যায়ে গেছে যা মানুষকে পিড়িত করছে। শিক্ষক রাজনীতি এখনো মানুষকে সেভাবে পিড়িত করছেনা। লোকজন এদের রাজনীতি কতটা পছন্দ করছে তা বলা মুশকিল। আমার নিজের মনে হয় ছাত্র রাজনীতির পর শিক্ষক রাজনীতিরও পরিবর্তন খুবই দরকার।

সায়েম: তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? আনিসুজ্জামান: আমরা যেদিকে যাচ্ছি সেটা আশাব্যঞ্জক নয়। আমাদের বুঝতে হবে যত দিন যাচ্ছে স্কুল কলেজ, ছাত্র শিক্ষক বাড়ছে। আমরা সব সময় উপযুক্ত ও নিবেদিত শিক্ষক পাচ্ছিনা। নিচের দিকে ভালো করে না শিখতে পারলে উপরে এসে সামাল দিতে পারেনা। আমরা দেখছি ইংরেজী বাংলা দুটি মাধ্যমের শিার্থীরাই দূর্বল।

আমাদের আশা অনুযায়ী শিক্ষার কাজটা হচ্ছেনা। এজন্য এক যোগে কাজ করা দরকার। এ থেকে উত্তোরনের একমাত্র পথ হচ্ছে শিক্ষা ক্ষেত্রে বাঞ্ছিত সংস্কার কাজগুলো করা। এটাই সরকারের কাছে আশা করছি। সায়েম: খসড়া শিক্ষানীতির কোথায় আপনি একমত নন? আনিসুজ্জামান: যেমন কখন ধর্ম শিক্ষা দেয়া হবে।

আদৌ দেয়া হবে কিনা- এ বিষয়ে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। সেটাকে বড় করে দেখছিনা। শিক্ষানীতির ব্যাপারে আমরা মনে করছি যে, এর কতগুলো ইতিবাচক দিক রয়েছে। সেগুলো সরকার মেনে নিয়ে প্রয়োগ করতে শুরু করলে ভালো হয়। সরকারের আর সাড়ে তিন বছর রয়েছে।

আরেক সরকার আসলে তো কাজ হবেনা। আমরা যতটুকু শুনেছি আমাদের দেশের এক শ্রেনীর ধর্ম ব্যবসায়ীরা এ শিক্ষানীতির বিরোধিতা করছে। ফলে সরকার সময় নিচ্ছে। সরকার ভাবছে আপত্তি বা প্রতিবাদ ওঠে এমন একটি ব্যাপারের মধ্যে কেন যাবো ? কিন্তু সরকারকে বুঝতে হবে আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক লোক ধর্মকে পুঁিজ করে রাজনীতিতে বিভেদ সৃষ্টি করেছেন। শিক্ষার ব্যাপারেও তাদের একই রকম নেতিবাচক মনোভাব।

ফলে যেকোন পরিবর্তন করতে গেলেই তারা চেচামেচি করেন- এটা ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তারা বলছেন, মাদ্রসা শিক্ষা সংস্কার হলে ইসলাম ডুবে যাবে। ১৯৭১ সালেও তারা একথা বলেছিলো, পাকিস্থান না থাকলে ইসলাম থাকবেনা। তাদের তো কথায় কথায় ইসলাম চলে যায়। তাদের কাছে ইসলাম এত ভঙ্গুর একটা জিনিস যে যেকোন সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

আমরা মনে করি যেটা দেশের জন্য ভালো শিক্ষা কমিটি তা করতে চেয়েছেন। তবে এর ভালো দিকগুলো যেমন আট বছরের প্রাথমকি শিক্ষা বাস্তবায়ন শুরু করলে আমরা এগিয়ে যাবো। সায়েম: অতীতের অভিজ্ঞতায় এ শিক্ষানীতির ভবিষ্যৎ কি হতে পারে? আনিসুজ্জামান: সরকার আরো বেশি সময় নিলে শিক্ষানীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটবে। আমি এখনো আশাবাদি শিক্ষানীতি কার্যকর হবে। সরকার ভাবছে এর বাস্তবায়নে যে পরিমাণ আর্থিক সংগতি দরকার তার সংস্থান সম্ভব কিনা? আমার বক্তব্য হলো- যেটা পাঁচবছরে করার দরকার সেটা প্রয়োজনে দশ বছরে করুন।

আমরা মনে করি কিছু সংস্কারের ক্ষেত্রে বাইরের টাকা পয়সাও পাবো। সেটাও সরকার বিবেচনা করে দেখতে পারেন এক্ষেত্রে বাইরের সাহায্য নেবেন কিনা? না নিতে পারলে ভালো। কিন্তু বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তির শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি টাকা নিয়ে বসে রয়েছে। এরা টাকা দেবে। এ ক্ষেত্রে তাদের অর্থ নিলে যে ক্ষতি হবে তা মনে করিনা।

বিভিন্ন সরকার শিক্ষা কমিশন করে। কিন্তু তাদের সুপারিশ কার্যকর করতে পারেনা। কারণ তরা শিক্ষার দিক থেকে চিন্তা করেন সেসব প্রস্তাব রাজনৈতিক দিক থেকে গ্রহণ করা সম্ভব হয়না। সায়েম: বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপচার্য নিয়োগে নির্বাচনস প্রক্রিয়াকে আপনি সমর্থন করেন কিনা? আনিসুজ্জামান: আমি যে প্রক্রিয়া কাগজে কলমে দেখি তা অবলম্বিত হয়না। কেননা শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে উপাচার্যকে আগে সরকার নিযুক্ত করে।

পরে তিনি নির্বাচিত হন। লোকে যে বলছে নির্বাচন করে খারাপ করে ফেলছি সেটাওতো বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। সায়েম: বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্বশাসন আইনের সবলতা ও দূর্বলতা কোথায়? আনিসুজ্জামান: এর আইনের আসল কথা হচ্ছে- আমি কি পড়াবো তার স্বাধীনতা। কিন্তু বাস্তবে আমরা কি পড়াবো তা নিয়ে ভাবি কম। অন্য বিষয় নিয়েই চিন্তা করি বেশি।

আমার মনে হয় আমরা সেই স্বাধীনতা পেয়েছি। আর ত্র“টির দিক বলতে গেলে নির্বাচন বেশি হয়ে গেছে। এগুলো কমানো দরকার। নির্বাচন করতে গেলে আমরা প্রত্যেকেই অভিযান করতে বের হই। এতে পড়াশুনার ক্ষতি তো হবেই।

ছাত্ররা যখন দেখবে ক্লাস না নিয়ে আমরা দল বেধে করিডোরে ঘুরে বেড়াচ্ছি তাদের কাছেও এটা ভালো লাগার কথা নয়। সায়েম: বুদ্ধিজীবীদের ষ্পষ্ট দলীয় আনুগত্য দেশের জন্য কতটা বিপজ্জনক? আনিসুজ্জামান: দেখো, আমার মনে হয় আমাদের আসল আনুগত্য হওয়া উচিত দেশের কাছে। এখন নিশ্চয়ই আমাদের একটি রাজনৈতিক মতামত রয়েছে। এদিক থেকে হয়তো দলীয় আনুগত্য রয়েছে। আমি কোন দলের সদস্য নই।

কিন্তু একটি দলকে ভোট দেই। ষ্পষ্ট করে বললে আমি যেহেতু ধর্ম নিরপেতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আমি সেহেতু আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করি। তবে অন্ধ সমর্থক নই। তেমনি আরেকজন হয়তো তার বিবেচনায় বিএনপির সমর্থক।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজেদের সরকারী ও বিরোধী দলে রুপান্তরিত করেছি- এটা স্বায়ত্বশাসনের সঙ্গে মেলেনা। আমরা বলেছিলাম, স্বায়ত্ত্বশাসন ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসন চাই। তখন ঠিক এ ব্যাপারটি আমাদের মনে ছিলনা। কিন্তু কালে কালে হয়ে গেছে। আমরা সব সময়ই আইনের ভাবটাকে নিতে পারিনি।

কেউ যদি মনে করেন আমার দল যত ভুল করুক সমর্থন দিয়ে যাবো- এটা বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিভংগি হওয়া উচিত নয়। যে দলই হোক তাদের কথা বলা উচিত। যদি কেউ অন্ধভাবে এ আনুগত্য স্বীকার করে নেন তবে তিনি দলীয় মানুষ হয়ে গেলেন । বুদ্ধিজীবী হিসেবে তার ভূমিকা বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। সায়েম: আপনি সংবিধানের বাংলার রূপকার।

বলা হয়েছে ইংরেজী ভাষায় সঙ্গে বাংলার কোন দ্বন্দ্ব হলে বাংলা প্রাধান্য পাবে? এ ধরনের কোন সমস্যা হয়েছিল কিনা? আনিসুজ্জামান: এ নিয়ে তিনটি মামলা হয়েছিল। তবে সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, তারা যেসবস্থানের কথা বলেছেন তাতে কোন দ্বন্দ্ব নেই। ফলে এ বিষয়টির মিমাংসা হয়ে গেছে। কোন মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে বাংলা ও ইংরেজীর দ্বন্দ্ব হয়নি। সায়েম: আপনাকে ধন্যবাদ।

Click This Link

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.