আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

জার্ণী টু চায়নাঃ(হংকং)-১০

সব কিছুর মধ্যেই সুন্দর খুঁজে পেতে চেষ্টা করি............

জার্ণী টু চায়নাঃ(হংকং)-১০ সারা দিন কাউলুনের সব দর্শনীয় যায়গায় ছেলেকে নিয়ে ঘুরেছি। কাউলুন থেকে মেট্রো রেলে আমরা হংকং ফিরি। কাউলুনের সাথে হংকং'র বিস্তর ফারাক। সেই ফারাক প্রতিটা ক্ষেত্রে-যা লিখে বোঝানো যায়না। যেমন-কাউলুন অতীত ঐতিহ্য আর বর্তমান আধুনিকতার সমন্বয়ে এক অপুর্ব নান্দনিকতার মুর্ত প্রতিক।

তুলনামুলক শান্ত নিরিবিলি পরিস্কার পরিচ্ছন্ন একটি সিটি। অন্যদিকে হংকং জৌলুশ আর আধুনিকতার উজ্জ্বল উদাহরন। হংকং অত্যন্ত ঘনবসতিপুর্ণ এলাকা। ১০৬০ বর্গ কিঃমিঃ যায়গার হংকং'র প্রতি এক বর্গ কিঃমিঃ জায়গায় প্রায় আট হাজার লোকের বসতি। মুল শহর এলাকায় তা ১৫ হাজারের কম হবার কথা নয়! এতোটুকুন হংকং এ প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষের বাস।

এই বিশাল জনসংখ্যার আবাসনের জন্য গড়ে তুলেছে আকাশ ছোঁয়া দালান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসাগুলো এতোই ছোট যেনো মনে হয়-কবুতরের বাসা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বাসস্থান বলতে গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে থাকা এক রুমের, বড়জোর দুই রুমের একটা এপার্ট্মেন্ট। এখানকার এপার্ট্মেন্টগুলো মাল্টিপারপাস ইউজ হয়। অর্থাৎ একই রুম পড়ার জন্য, ডাইনিং রুম, ড্রইং/লিভিং রুম হিসেবে আবার সেই রুমই ঘুমানোর জন্য ব্যাবরুত হয়।

ছোট্ট শহর, মানুষ গিজগিজ করছে সত্য। তাই বলে কিন্তু রাস্তাঘাটে আমাদের দেশের মত অসয্য ট্রাফিক জ্যাম নেই। কারন এখানকার রাস্তাগুলো খুব পরিকল্পিত ভাবে বানানো হয়েছে। পাতাল রেলতো আছেই। আছে ফ্লাই ওভারের ওপর ফ্লাই ওভার! কিছু যায়গায় আছে মনোরেল।

মাটির উপড় বাস স্টেশন, বিশাল বিশাল মার্কেট। আবার সেই বাস স্টেশন কিম্বা মার্কেটের নীচে রয়েছে আন্ডার গ্রাউন্ড রেল স্টেশন। অপরিসর যায়গার অপুর্ব সুন্দর বিকল্প সুসম ব্যাবহার! সবকিছু খুব সুন্দর ভাবে পরিকল্পিত ভাবে তৈরী করা হয়েছে-যা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একটা দেশের উন্নয়নে সবার আগে প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যাবস্থার উন্নতি। কিন্তু আমাদের দেশের কোন সরকারেরই এবং বিরোধী দলেরই দেশের উন্নয়নের চাইতে নিজের উন্নয়নে বেশী মনোযোগী বলে আমরা শুধু পিছিয়েই পরছি! আমি হলপ করে বলতে পারি-আমাদের দেশে এমন পরিকল্পিত ভাবে কোন কিছুই কোন দিনই হবেনা।

কারন, আমাদের রয়েছে হরতালের রাজনীতি, আমাদের আছে একটি দেশের অর্থনীতির প্রান সমুদ্র বন্দর কথায় কথায় বন্ধ করার রাজনীতি। আমাদের দেশের উন্নয়ন কি করে হবে? যারা সরকারে থাকে-তারা সব সময় মনে করে জনগন দেশটাকে পাঁচ বছরের জন্য তাদের কাছে ইজারা দিয়েছেন। এই পাঁচ বছর তারা শুধু লুটেপুটে খাবে। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা করে মিডিয়া গড়ম রাখবে। সরকারে থাকা পার্টি শুধু "বিগত সরকার"র দোষ দিতে ব্যাস্ত থাকে।

বিরোধী দল শুধু সরকারের যেকোন কাজের বিরোধীতায় ব্যাস্ত। আমাদের সরকার দলীয়রা সব সময় ব্যাস্ত থাকি বিরোধী দলকে জব্দ করতে, সংসদে মিথ্যা এবং কুতসিত কথা বলতে, সন্ত্রাস লালন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলের রাজনীতি, খাস জমি-মার্কেট-ভবন দখলের মতলবে, টেন্ডারবাজীর রাজনীতি, গলাবাজীর রাজনীতি আর নিজেদের ব্যাক্তি উন্নয়নের রাজনীতি করার পর জনগনের উন্নয়ন করার সময় কোথায়! যেকোন সরকার উন্নয়নের নামে যে পরিকল্পনা করে-পরবর্তী সরকার এসে যেকোন ভালো কাজকেও স্বৈরাচারী, দেশ বিরোধী আখ্যায়িত করে সেই সব পরিকল্পনাগুলো পর্যন্ত ডাস্টবিনে ফেলে দেয়! শুরু করে আবার নতুন পরিকল্পনা, কমিশন খাবার পরিকল্পনা। হংকং এ শুধু আবাসন সমস্যাই প্রকট নয়। এখানে সুপেয় পানির সমস্যা ভয়াবহ রকম বেশী। হংকং বাসীদের জন্য সমস্ত খাবার পানি দীর্ঘ পাইপ লাইনের মাধ্যমে নিয়ে আসাহয় মুল ভুখন্ড চীন থেকে।

এখানকার জনগন তেল ব্যাবহারে যতটানা সতর্ক তারথেকে অনেক বেশী সতর্ক সুপেয় পানি ব্যবহারে। অনেক বিশাল সাইজের আবাসিক/ অফিস বিল্ডিংএ আছে নিজস্ব ওয়াটার পিউরিফিকেশান ট্রিট্মেন্ট সিস্টেম। অর্থাত ব্যবরুত পানি রিসাইক্লিনিং করে সেই পানি আবার ব্যাবহার উপযোগী করা হয়। এখানে পানির অপ্রযোজনীয় এবং অসতর্ক ব্যবহারের জন্য অর্থ দন্ড এমনকি কারাদন্ডের সু-ব্যবস্থা আছে! তারপরও এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও এখানকার মানুষগুলো খুবই প্রাণচঞ্চল হাসিখুশি। এরা জানে কিভাবে জীবনেকে সহজ ভাবে, সুন্দর করে গোছাতে হয়।

বিভিন্ন ধর্মের, বর্ণের মানুষ একসাথে অবস্থান করেও পরিবেশকে একটা গ্লোবাল সিটিতে পরিণত করতে পেরেছে এবং দেশটাকে উন্নয়নের শীর্ষে নিয়ে যেতে পেরেছে। হংকং এর কিছু কিছু অফিসের একটা বৈশিষ্ঠ লক্ষ করার মত। তা হচ্ছে-একটা ছোট্ট রুমের ভিতর একটা কম্পুটার, প্রিন্টার, কালার ফটোস্ট্যাট মেশিন, ফোন-ফ্যাক্স এবং বাড়তি একজন মানুষ নিয়েই একটা অফিস! এই ধরনের অফিস সাধারনত দুনম্বরি ব্যাবসায় জড়িত। এরা প্রকৃত ব্যাবসায়ী নয়। এরা বিভিন্ন ট্রেডিং হাউজ, ম্যানুফ্যাচারিং কোম্পানীর দালাল।

যেকোন দুইনম্বর কাগজ পত্র তৈরীতে এরা ওস্তাদ। এরা শুধু বড় বড় কোম্পানীর মিডিয়া/এজেন্ট হিসেবে কাজ করে-যা সরকারী ভাবেই স্বীকৃত। আমাদের শাহাবাগ আজিজ সুপার মার্কেট, ফকিরের পুল কিম্বা ইনকিলাব-ইত্তেফাক ভবনের আশে পাশে গড়ে ওঠা কতিপয় টাউট ব্যাবসায়ীদের মত। এরা পারেনা এমন কোন কাজ তাদের নেই। একবার কোন কাজের ক্লু পেলেই হলো-তারা তা বাগিয়ে নিবেই।

দেখা যায়-অনেক সময় মুল ব্যাবসায়ীদের থেকেও এই সব ফটকা ব্যাবসায়ীরাই বহুগুণ বেশী প্রফিট করে মুল বিক্রেতা-ক্রেতাদের ঠকাচ্ছে। দিনের হংকং থেকে রাতের হংকং সম্পুর্ণ ভিন্ন। রাতের হংকং যেনো রুপবতী রাজকণ্যার সাজে স্বজ্জিত। অনেকটা মোঘল সম্রাট আকবরের যোধা বাঁঈর মত অলংকারে সু-স্বজ্জিত! যার পা থেকে মাথা পর্যন্ত বর্ণীল অলংকারে শোভিত। রাতের হংকং এর সাথে তুলনা করা চলে আমেরিকার ম্যানহাটান এর।

এখানকার আর একটা বিশয় বিশেষ ভাবে উল্ল্যেখ করার মত-তাহলো হংকং শহরে নিয়ন সাইনের আধিক্য! অনেক দেশ ঘুড়েছি-কিন্তু হংকং সিটির মত এতো নিয়ন সাইন আমি অন্য কোথাও দেখিনি। তাই হংকংকে যদি নিয়ন সাইনের শহর বলা হয়-তাও বোধ করি ভুল বলা হবেনা। এখানকার আকাশ ছোঁয়া দালানগুলো চোখ ধাঁধানো রকমের সুন্দর। হংকং এ আমরা অনেক কিছু দেখেছি। যার মধ্যে উল্লেখযগ্য হলো-ল্যান্ডমার্ক, ভিক্টোরিয়া হারবর, সেন্ট্রাল প্লাজা, ব্যাঙ্ক অব চায়না, আই এফ সি বিল্ডিং, স্টাচু স্কোয়ার ইত্যাদি।

হোটেলে ফিরে দেখি মিজ মিতসুইয়া লবীতে অপেক্ষা করছেন আমাদের জন্য। মিজ মিতসুইয়া "কু ফেং কুন" (মাউথ অর্গান) বাজাতে পছন্দ করেন। আমার ছেলের জন্য তিনি বিভিন্ন রকমের ৪ টা মাউথ অর্গান নিয়ে এসেছেন। ছেলেকে বাঁজানোর কৌশল শিখিয়ে দিইয়েছেন। আমরা অনেকক্ষণ কথা বলে একসাথে ডিনার করার জন্য অনুরোধ করি।

তিনি জানালেন-তিনি সন্ধ্যা সাতটার পুর্বেই ডিনার করেন। আমরা দুজন ডিনার করলাম-তাঁকে পাশে বসিয়ে। তবে তিনি আমাদের সাথে সংগ দেবার জন্য শুধু মাত্র একটা "তেং চুক"(মিক্সড ভেজিটেবল) খেলেন। এই তেং চুক(মিক্সড ভেজি) সম্পর্কে কিছুটা ধারনা দিচ্ছি-অনেক প্রকার শাক-সব্জি সামাণ্য কিছু সাদা মশলার সাথে মিক্সড করে একটা ঝু জি(বাঁশের) চোংগাতে ভরে বাঁশটাকে পোড়ানো হয়। তারপর বাঁশ ভেঙ্গে সবুজ সব্জিগুলো বের করে সামাণ্য শস লাগিয়ে খেতে হয়।

এই তেং চুক এর কিন্তু কল্পনাতীত অনেক বেশী দাম(১০ ডলার)! এই তেং চুক জিনিশটা আমি চায়নাতে আগে খেয়ে ছিলাম-খেতে খুব মজা! পরের কিস্তি বেইজিং থেকেঃ

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।