আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অস্কারে অবৈধ ইরাক যুদ্ধের পুনর্বাসন!

অন্যায়ভাবে সংঘটিত সকল বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাই । ।
অস্কার পুরস্কারের বাজারমূল্য দুনিয়াজুড়েই কমবেশি আছে। তাই অস্কার, যা আমেরিকায় বা হলিউডে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস নামেই খ্যাত, তার দিকে নজর থাকেই আন্তর্জাতিক সিনেমা বিশ্বের। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

কিন্তু শেষফল সুখকর মনে হয়নি অনেকেরই। অস্কার ও হলিউড ভাষ্যকার বলে পরিচিত ডেভিড ওয়ালশ তো এবারের অস্কার নিয়ে দারুণ সমালোচনামুখরই হয়েছেন তার কলমে। ‘এ বছরের একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের অনুষ্ঠানে চমক ও চটক বরাবরের মতো থাকলেও তাৎপর্যে একে মূল্যহীন ও এক ধরনের কাপুরুষতা মনে হয়েছে,’ লিখেছেন ওয়ালশ। একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস ২০১০-এর জন্য তিনটি ছবি ‘দি হার্ট লকার, প্রেশাস এবং দি ইনগ্লুরিয়সে বাস্টারডস যেন মিলিতভাবেই হলিউডের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির এক ধরনের পশ্চাদপদতা ও ভেলকিবাজি তুলে ধরেছে এবং ৩ ছবিই অসত্য ৩টি পতাকার নিচে উড়ছে। সেরা ছবি হিসেবে অস্কারে সম্মানিত দি হার্ট লকার-এর কথাই ধরা যাক।

এর পরিচালক একজন নারী, ক্যাথরিন বিজেলো। সেরা ছবির মজবুত আরেক দাবিদার ছিল টাইটানিকখ্যাত পরিচালক জেমস ক্যামেরনের দি এ্যাভাটার। কিন্তু বক্স অফিসে সাড়া জাগানো দি এ্যাডাটারকে টপকেই অনেক জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েও দি হার্ট লকার সেরার শিরোপা জুটিয়ে নিল। এই ছবির বাহ্য দাবি হচ্ছে এটি ‘মতবাদ নিরপেক্ষ’ কিংবা ‘রাজনীতি ওড়ানো’। কিন্তু এই ছবিকে কিছু সমালোচক অপ্রীতিকরভাবে যুদ্ধ ও আধিপত্যবাদের পক্ষের ছবি বলেছেন।

অন্য ছবি প্রেশাসে আমেরিকার নগর হৃদয়ে আফ্রো-আমেরিকান জীবনের সংবেদনশীল চিত্র ফুটিয়ে তোলার বদলে সামাজিক পশ্চাদপদতার জন্য পিছিয়ে থাকা শোষিতদেরই দায়ী করা হয়েছে। কুয়েনটিন টারানটিনোর বীভৎস দি ইনগ্লুরিয়াস বাস্টারডস ‘নাজি-বিরোধী’ ছবি হিসেবে ভান করলেও এতে কঠিন বিচারে এই ছবি দর্শককে দিচ্ছে পর্নো ঢঙের নিপীড়নবাদ এবং ফ্যাসিজমের পক্ষের বাকচাতুরিও আছে। বাহ, ৩টি ছবিই কত সুচারুভাবে আতঙ্ক জাগানিয়া সিনেমাকর্ম! মার্চ ২০০৩ সালে ৭ বছর আগে সার্বভৌমত্ব হরণ করে আমেরিকার অবৈধ ইরাক হামলার অল্প কিছুদিন পরেই খ্যাতিমান সিনেমা নির্মাতা মাইকেল মুর তার ব্লোয়িং ফর কলাম্বাইন নামের ডকুমেন্টারি সিনেমার জন্য একটি অস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে জর্জ ডব্লিউ বুশকে এক কল্পলোকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ধিক্কার জানিয়ে বলেছিলেন : ‘আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন আমাদের এমন এক ব্যক্তি আছেন যিনি অলীক কিছু কারণ দর্শিয়ে একটি অন্যায্য যুদ্ধে আমাদের পাঠাচ্ছেন। আমরা এই যুদ্ধের বিপক্ষে, মি. বুশ, ধিক্ তোমাকে। ’ মুর-এর এমন শাণিত উচ্চারণের ৭ বছর পরে এমন নৈতিকতাকে হলিউডের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যেন ভারি তোয়ালেতে মুড়িয়ে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার উপনিবেশবাদী ঢঙের যুদ্ধ নিয়ে নীরবই থেকে গেল।

সমালোচক ও বিশ্লেষকরা তাই বলছেন, দি হার্ট লকার কে ২০১০-এর সেরা সিনেমা হিসেবে বেছে নেয়ার অন্তর্নিহিত অর্থই হলো, উদারবাদী রাজনৈতিক ও মিডিয়া সন্ত্রাসে ইরাক যুদ্ধকে কায়েম করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া। হলিউডের সুরক্ষিত ‘যুদ্ধ-বিরোধী’ উদারতাবাদীরা বুশের রাজত্বকালে ইরাক যুদ্ধবিরোধী স্লোগান তোলাকে এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ বলে প্রচার করলেও বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তারা তাদের আকাক্ষার বাস্তবায়ন দেখতে পেয়েছেন। সেরা পরিচালকের ভাষণে দি হার্ট লকার-এর পরিচালক ক্যামরিন বিজেলো মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত নারী-পুরুষদের শ্রদ্ধা নিবেদন করার মওকাটি তাই হাতছাড়া করেননি। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিনের ভিত্তিতে ইরাক, আফগানিস্তান এবং দুনিয়ার অন্যত্র যারা তাদের জীবন-ঝুঁকি নিয়ে লড়ছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমি সেরা পরিচালকের পুরস্কারটি উৎসর্গ করছি। ’ এরপর সেরা ছবির পুরস্কারও হস্তগত করে সারা দুনিয়ার উর্দি পরিহিত আমেরিকানদের এটি উৎসর্গ করে বলেন, ‘তারা বিভিন্ন দেশে আছেন আমাদের জন্য, আমরাও সেখানে আছি তাদের জন্য।

’ কিন্তু ক্যাথরিন বিজেলো যে কথা অনুক্ত রেখেছেন তা হলো তারা আসলে বিদেশে ‘আমাদের অর্থাৎ আমেরিকান জনগণের জন্য নাই। মার্কিন বাহিনী সর্ব অর্থেই একটি পেশাদার বাহিনী, যারা আমেরিকান অর্থনৈতিক এলিটদের স্বার্থের ষোলোআনা দেখভাল করার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র কাজ করে যাচ্ছেন। একটি মজবুত ঘরানার বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকার সব ধরনের সাবেক বামেরা এবং উদারতাবাদীরা এখন আধিপত্যবাদী যুদ্ধ প্রচেষ্টার ছাতার নিচে জড়ো হয়েছেন এবং মার্কিন সেনাদলকে সমর্থনের নানা ফর্মুলায়ও শামিল হয়েছেন। এর প্রকৃত অর্থ হলো বীভৎস লড়াই ও দ্বন্দ্বের নৃশংস দিকটির সমালোচনাকে দমন বা নিরুৎসাহিত করা। দি হার্ট লকার-এর পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য প্রচারাভিযান চালাবার অর্থই হলো পশ্চিমী সমালোচক ও হলিউডি সিনেমা এলিটদের দেউলিয়াপনা।

ছবিটি জনগণের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য না হলেও ব্রিটেনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় সমালোচক জেরেমি কে লিখেছেন, ‘এই ফ্রিলার সিনেমাটি সমালোচক প্রিয় ছবি হয়ে উঠেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত এযাবৎকালের সেরা ইরাক যুদ্ধভিত্তিক ছবির মর্যাদা পাচ্ছে এবং পর্দায় যুদ্ধচিত্রের একটি তাজা টুকরো হয়ে উঠেছে অনেক বছরে এই প্রথম। ’ ডেভিড ওয়ালশ এ প্রসঙ্গে বলছেন, দি হার্ট লকারের চেয়ে অনেকগুণে, অনেক দিকে উৎকৃষ্ট সিনেমা হলো ব্যাটল ফর হাদিজা এবং ইন দ্য ভ্যালি অব ইলাহসহ আরও কিছু সিনেমা। কিন্তু আমেরিকান মিডিয়া এইসব ছবিকে একঘরে করে রেখেছে ইচ্ছাকৃতভাবেই। ‘দি হার্ট লকারকে নিয়ে একটা সাড়া তুলে দেয়ার জন্য যে জনসংযোগ ফার্মকে ভাড়া করা হয় তারা বিজেলোকে ‘অস্কারের জন্য প্রথম নারী চলচ্চিত্রকার’ হিসেবে প্রমোট করে। প্রশাসনের এই চাতুর্য নাকি খুব কাজে আসে।

তাই মেরেমি কে ‘গার্ডিয়ান’-এ আরও লিখেছেন, ‘প্রচারের এই কৌশলটা ছিল নেশা ধরানোর মতো। বিষয়টা হলিউডের রক্তপ্রবাহকেই যেন একলহমায় গরম করে দিল। তাই ফেব্রুয়ারির ২ তারিখে মনোনয়ন ঘোষণার একদিনের মধ্যেই, বিজেলোর ছবি বাদে, আর কিছুই আলোচিত হলো না। অন্যভাবে বলা যায়, পরিচালকের নিজ পরিচয়ই সব কিছু ছাপিয়ে উপরে উঠে গেল। অবশ্য দি হার্ট লকার-এর কপাল জোরের জন্য এটাই মূল কাহিনী নয়।

একাডেমি অ্যাডওয়ার্ডস পুরস্কারের ভোটাররা ছবিটি ইরাক যুদ্ধভিত্তিক হওয়ার প্রচারণায় এদিকেই ছুটলো। সমালোচকরা বলছেন, বস্তুনিষ্ঠতা ও বাস্তবতার প্রতিফলনের ছদ্মাবরণে দি হার্ট লকারকে বোমা বিশেষজ্ঞ আমেরিকান সার্জেন্ট উইলিয়াম জেমস নামের এক বন্যস্বভাবের ব্যক্তির দৃষ্টিকোণে সুবিধাজনকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ছবির বড় ‘অপরাধ’ হলো এখানে আমেরিকান দখলদার বাহিনী নিয়ে কোনোই প্রশ্ন তোলা হয়নি এবং ওই ভয়শূন্য সার্জেন্টের কর্মকান্ডকে বীরত্বপূর্ণ কাজের নমুনা হিসেবে পেশ করা হয়েছে। সমালোচক ডেভিড ওয়ালশ তার তীক্ষ পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘ক্যাথরিন বিজেলোর কোনো ধারণাই নাই সেনানীর মানুষেরা কেমন – এ সম্পর্কে। কিংবা এও তিনি বোঝেন না মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের স্বরূপটা কেমন।

বিজেলোর আগের ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, দি লাভলেস, নিয়ার ডার্ক, ব্লু স্টিল, পয়েন্ট ব্রেক, স্টেইনু ডেইজ জাতীয় ছবিগুলোতেও জীবন থেকে নেয়া বিষয় ছিলই না প্রায়। ক্যাথরিন বিজেলোর প্রথম ছবি দি সেট আপ ১৯৭৮ সালের নির্মাণ। তখন থেকে শুরু করে সর্বশেষ দি হার্ট লকার পর্যন্ত তার সবগুলো ছবি বিশ্লেষণ করে প্রগতিশীল চিন্তাধারার পশ্চিমী বিশ্লেষকরা বলেছেন, ক্যাথরিনের একটা আকর্ষণ আছে শুরু থেকেই সহিংসতা, ক্ষমতা এবং যুদ্ধের প্রতি। যুদ্ধকে তিনি আকর্ষণীয় এবং নাটকীয় বিষয় বলে মনে করেন। ডেভিড ওয়ালশ-এর তত্ত্ব হলো, বিজেলো সম্ভবত এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী যে বিরোধ দ্বন্দ্বের একটা মৌলিক প্রয়োজনীয়তা আছে মানব সমাজে।

ক্যাথরিন বিজেলোর প্রশংসাকারীরা বলেছেন, তিনি যুদ্ধ ভাবনা নিয়ে খুবই পীড়িত; কিন্তু তার সমালোচকদের মতে, দি হার্ট লকার সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে ঝলমলেভাবে উপস্থাপন করেছে। বুশের ইরাক যুদ্ধে ‘এমবেডেড সংবাদদাতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করা রিপোর্টার মার্ক বোএলের একটি স্ক্রিপ্ট থেকে ক্যাথরিন তার এই ছবি তুলেছেন, তাই এই চিত্রনাট্য দেখাচ্ছে যে ইরাকি বিদ্রোহী এবং নাগরিকদের হত্যাকান্ডে আমেরিকান সৈন্যরা কত ত্যাগই না স্বীকার করছে। হলিউডে অস্কার ভোটারদের কাছে দি হার্ট লকার-এর আনুকূল্য পাওয়ার কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক বক্তব্য অতি ডান পেন্টাগন এবং ওবামা প্রশাসনের চলতি চিন্তা-দর্শনের সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। এসব প্রেক্ষিত বিচারেই নিরপেক্ষ ও বিশ্বদরদী বিশ্লেষকরা বলেছেন, ‘অস্কার পুরস্কার বিতরণীর রাতটি সর্ব অর্থেই হিসাব কষা রাত, যে রাতে চিত্রনাট্যের হিসাবের বাইরে যেন কিছুই ঘটতে পারবে না। অস্কার রজনীর সোনালি যুগ হয়তো অতীতেও কমই গেছে কিন্তু অতীতে এমন অনেকবার দেখা গেছে, যখন অস্কারে বিরোধী মতবাদের প্রতি মনোযোগ এমনকি শ্রদ্ধাও দেখানো হয়েছে।

’ ২০০৩-এ মুরের সমালোচনামুখর প্রামাণ্য ছবি স্বীকৃতি পেলেও এবার এই ক্ষেত্রটিও দারুণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ‘দি মোস্ট ডেঞ্জারার্স ম্যান ইন অ্যামেরিকা : ড্যানিয়েল এলমবার্গ এ্যান্ড দি পেন্টাগন পেপারস’ নামের ডকুমেন্টারি ছবিটি ছিল এবারের অস্কারে। জুডিথ এরলিচ এবং রিক গোল্ডসমিথ পরিচালিত ছবিটি আলোচিত ছবির সারিতে অস্কারের জন্য মনোনীত ছিল। ১৯৭১-এ ভিয়েতনাম যুদ্ধে, পেন্টাগনের গোপন ইতিহাস এলসবার্গ জনসমক্ষে নিয়ে এসে যুদ্ধের সরকারি ভাষ্যের সমান্তরালে আরেক ভাষ্য উপস্থাপন করেন। তাই এবারকার অস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন।

কিন্তু স্বাধীন ভাষ্যকাররা বলেছেন, ‘যখন দুর্নীতি ও আতঙ্কের উৎসব চলছে চারধারে তখন এলসবার্গের মতো অগ্নিবর্ষী মানুষের দিকে কেইবা তাকাবে! আগামীতে অস্কারের ভবিষ্যৎ শঙ্কাযুক্তই হয়ে থাকলো। লেখক: আহমদ জামান চৌধুরী সূত্র/সংগ্রহ: সাপ্তাহিক বুধবার(সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ) -২৭তম সংখ্যা;১৭ মার্চ ২০১০
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.