আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

কল্পনার করিডোর থেকে বাস্তবের বারান্দাঃ

সব কিছুর মধ্যেই সুন্দর খুঁজে পেতে চেষ্টা করি............

কল্পনার করিডোর থেকে বাস্তবের বারান্দাঃ কল্পনা। কি হতে পারে এর প্রতিশব্দ? ভাবনা। চিন্তা। ইংরেজিতে যাকে বলে ইমাজিনেশন। কে না ভালোবাসে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে।

প্রতিটি মানুষেরই অন্তরে ডানা মেলে কল্পনা নামের পাখিটি। কল্পনা অবশ্যই একটি গুণ। এটি ইতিবাচক। বড় বড় যে কোন সৃষ্টি, যে কোন অগ্রগতির পেছনে আছে কল্পনা। না, এটি কোন গল্প না।

মানুষ চাঁদে পা ফেলার আগে, এটি ছিল নিছক কল্পনা। পাখির মতো আকাশে ওড়ার কল্পনা একদিন ঠিকই সত্যি হয়েছে উড়োজাহাজ আবিষ্কারের মধ্যদিয়ে। কল্পনা তাই বাস্তবতারই প্রবেশপথ। শিল্প-সাহিত্য, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সবই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতো, যদি না মানুষ কল্পনা করতে পারতো। কল্পনা আছে বলেই আছে সৃষ্টি, আছে আবিষ্কার।

অথচ আমাদের সমাজে কল্পনা হচ্ছে পরিত্যাজ্য একটি বিষয়। শিক্ষিত আধুনিক দাবিদার অভিভাবককে তাই দেখা যায়, পড়তে পড়তে অন্যমনস্ক সন্তানকে ঝাড়ি দিতে। কে জানে, হয়তো এই কল্পনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে কোন বিরাট আবিষ্কার। তাই কল্পনাপ্রবণ সন্তানকে দূরদর্শী মন নিয়ে গাইড করা উচিত। মানুষ কত রকম চিন্তাই তো করে।

আর যে কোন চিন্তার পেছনেই কোন না কোন কনসেপ্ট বা ধারণা থাকে। অর্থাৎ আমরা চিন্তা বা কল্পনা করি কোন ধারণা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে। আর এ প্রক্রিয়ার মধ্যে কোন সমস্যা বা ইচ্ছা পূরণের বীজ থাকে নিশ্চয়ই। তাই এটিকে বলা চলে যুক্তিগ্রাহ্য বা বাস্তবচিন্তা। যে কোন বড় কাজের জন্যই চাই প্ল্যান বা পরিকল্পনা।

সুষ্ঠু, সুনির্দিষ্ট যুতসই পরিকল্পনা ছাড়া সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি অচল। যে কোন বড় পরিকল্পনার জন্যই করতে হয় ভাবনা-চিন্তা। অর্থাৎ কল্পনা বিষয়টিই এসে যাচ্ছে। বলা যেতে পারে, কল্পনার সাথে যখন পরিযুক্ত হয়ে সৌন্দর্যের মাত্রা দেয় বাড়িয়ে তখনই তা হয়ে ওঠে পরিকল্পনা। কল্পনা বরাবরই বড় রোমান্টিক।

প্রেম পর্বে নারী ও পুরুষ কত না ভাবনার রাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। কারো পছন্দ সমুদ্র, কেউ দেখছে পাহাড়। দক্ষিণের জানালা। প্রতিদিন ফুলের সুবাস। কত রকম স্বপ্নই না আচ্ছন্ন করে রাখে প্রেমিক-প্রেমিকাকে।

এসব আকাঙক্ষার সাথে যদি যোগ হয় বাস্তব বোধ, তাহলে নিশ্চয়ই ফলটাও মেলে ইতিবাচক। আর কল্পনা যখন বাস্তববোধকে ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ যে ভাবনা বাস্তবায়নের যুক্তিগ্রাহ্য সম্ভাবনা নেই, তাকে আমরা বলি ফ্যান্টাসি বা আকাশ-কুসম। অবশ্য কল্পনা আর অলীক কল্পনার ফারাক নির্ণয় করা অত সহজ নয়। আদিম মানুষের কাছে আধুনিক পৃথিবীর ধারণা এক সময় ছিলো ফ্যান্টাসি, এখন যা কিনা রিয়ালিটি।

কল্পনা যখন একেবারেই অবাস্তব এবং ভুল ধারণাভিত্তিক তখন সেটি ডেলিউশন বা বিভ্রান্তির পর্যায়ে যায়। আর বিভ্রান্তি হচ্ছে ফ্যান্টাসির চরম রূপ। তাই তো ধর্ম নিয়ে, রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে সমাজে উন্মাদনা দেখা যায়। এসবের ভিত্তি অন্ধবিশ্বাস বা ফ্যান্টাসি। অর্থাৎ বিভ্রান্তি।

কল্পনার সামাজিক মূল্যও যথেষ্ট। সমাজের রীতি-নীতি মেনে চলতে মানুষকে কত ইচ্ছা আর তাড়নারইতো কবর দিতে হচ্ছে। বাস্তবে এমন ইচ্ছাপূরণে যখন অসম্ভব তখন স্বভাবতই মানুষ কল্পনার শরণাপন্ন হয়ে সান্ত¡না কুড়ায়। কল্পনা বা মনের ছবি তৈরির ক্ষমতা একেক জনের একেক রকম। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাই বলেন, জ্ঞানের চাইতে কল্পনা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দৃশ্যকল্প বা ভিজ্যুয়ালাইজ করার সামর্থ্য সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রেরই জন্য জরুরী। মনোবিজ্ঞানীরা ভিজ্যুয়ালাইজ করার শক্তিকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন। (১) স্পষ্টতা অর্থাৎ ইমেজ কতটা উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত এবং (২) স্থিরতা। অর্থাৎ ইমেজ কতটা স্থির ও নিশ্চিত। কবি, কথাশিল্পী, চারুশিল্পী, বিজ্ঞানী, স্থপতি, খেলোয়াড়-সবার জন্য কল্পচিত্র বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

এমনকি এ গুণের অধিকারী সার্জন রোগীকে অপারেশন করার আগেই দেখে নিতে পারেন দৃশ্যটা। তাই ডা. কার্ল গুস্তব ইয়াং বলেন, কল্পনার কাছে আমাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। বিশ্বাস ও প্রত্যাশাকে যুক্ত করে কল্পনা। আর কল্পনার জোর এতটাই ইচ্ছাশক্তির সাথে এর বিরোধ হলে জয় হয় কল্পনারই। কোন কাজ করার জন্য এগিয়ে কেউ যদি ভাবতে থাকে কাজটি হবে না, তাহলে তিনি কাজ করতে অসমর্থ হবেন।

অর্থাৎ হেরে যাবে তার ইচ্ছা শক্তি। রাস্তার চার ফুট ভাঙ্গা অংশ আমরা অনেকেই লাফিয়ে পার হতে পারি অনায়াসে। কিন্তু আট-দশ তলা একটি ভবন থেকে চারফুট দূরের আরেক ভবন লাফিয়ে পেরুতে পারি ক'জনা? ইচ্ছা হয়তো আছে। কিন্তু যখনই কল্পনা করবো-নিচে পড়ে গেলে কি পরিণতি হবে। পারবো কি লাফ দিতে? না, চিন্তা বা কল্পনার কাছে বার বার এভাবেই হেরে যায় মানুষের ইচ্ছাশক্তি।

অতি কল্পনা প্রবণতাকে কখনোই ভালো অর্থে দেখবার সুযোগ নেই। যা কখনোই হবার নয় অর্থাৎ বাস্তব বিমুখ ভাবনা চিন্তার ফল সবসময়ই শূন্য। উল্টো ব্যক্তির মানসিক ক্রিয়ায় নানান নেতিবাচক ছাপ পড়ে এতে। অলীক কল্পনাপ্রবণ মানুষ কখনোই স্বাভাবিক-সুস্থ পদবাচ্য নয়। এমনিতেই সমাজে ইঁদুর দৌড়ে সামিল মানুষেরা মানসিকভাবে বড় পরিশ্রান্ত।

চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্বে ব্যক্তির মন হয়ে ওঠে জটিল। হতাশা থেকে দেখা দেয় মানসিক সংকট। শেষতক আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে উঠতে পারেন অতি কল্পনাপ্রবণ মানুষ। ভাবাবেগজনিত কল্পনা প্রবণতাও হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের জটিলতা, এমনকি দুর্ঘটনার কারণ। ব্যস্ত জীবনযাত্রার অতি আবেগ প্রবণতার জায়গা কোথায়? বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় জড়িতদের কথাই ভাবুন না।

একজন প্লেন চালকের ভাবাবেগে আচ্ছন্ন হবার সুযোগ কোথায়? নিছক কার ড্রাইভিং-এর সময় আপনি যদি অতি কল্পনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, ফল নির্ঘাৎ দুর্ঘটনা। তাছাড়া যে ধরনের কল্পনা প্রবণতার কোন ফল নেই, বরং ডেকে আনতে পারে চরম পরিণতি, তার প্রয়োজন কি? কেউ বলতে পারেন, চেষ্টা করেও এড়াতে পারছেন না কল্পনা-প্রবণতা। সেক্ষেত্রে অবশ্যই এটি একটি সমস্যা। আর যেখানে মুস্কিল আসানের পথও নিশ্চয়ই থাকে সেখানে। নিজের ব্যক্তিত্ব দৃঢ় করার মাধ্যমে নিষ্কৃতি পাওয়া যেতে পারে এ সংকট থেকে।

আর সমস্যা গুরুতর হয়ে থাকলে পরামর্শ কিংবা থেরাপি নেয়া যেতে পারে মনো চিকিৎসকের। কল্পনা আর বাস্তবের ফারাক ধরতে না পারলে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে জীবনে। মনো চিকিৎসকরা বলেন, অলীক কল্পনা যে কোন মানুষের মধ্যেই থাকে। সে হতে পারে নর্মাল বা স্বাভাবিক, নিউরটিক বা কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্ত অথবা সাইকটিক বা গুরুতর বিকারগ্রস্ত। সুস্থ-স্বাভাবিক-সৃজনশীল মানুষ সে-ই "যার হৃদয় জুড়ে ভালোবাসা, নয়ন জুড়ে কল্পনা"।

তার অন্তর্দৃষ্টি বাস্তব-অবাস্তব ফারাক ঠিকই ঠাহর করবে। আর যিনি মনোরাজ্যের কল্পনা বা ফ্যান্টাসি নামের ঘোড়াটার লাগাম টানতে ব্যর্থ, তার পরিণতিও হয় সেরকমই। হয়ে উঠতে পারেন তিনি অস্বাভাবিক-বিক্ষিপ্ত-বিভ্রান্ত। সৃষ্টিশীল কল্পনাপ্রবণ মানুষেরা সমাজের সম্পদ। অন্যদিকে বল্গাহীন কল্পনার স্রোতে ভাসা মানুষেরা অনেকক্ষেত্রেই বোঝা, এমনকি বিপজ্জনক।

ফ্যান্টাসি সবসময়ই মাত্রাহীন। একে নিয়ন্ত্রণে চাই ব্যক্তিত্বের প্রভা। ফ্যান্টাসি আর বাস্তবকে যারা গুলিয়ে ফেলেন, তারা হয়ে থাকেন অপরিণত মনের মানুষ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।