আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ডব্লিউ টি ও-তে দিল্লির আত্মসমর্পণ

সাংবাদিক

ডব্লিউ টি ও-তে দিল্লির আত্মসমর্পণ শান্তনু দে ইঙ্গিতটা সেদিনই ছিল স্পষ্ট, যেদিন ওয়াশিংটন এবং বিশ্ব বানিজ্য সংস্থা (ডব্লিউ টি ও)-র চাপে শিল্প ও বানিজ্য মন্ত্রক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল কমলনাথকে। সেদিন, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল জেনিভা। উজ্জ্বল হয়েছিল প্রায় ভেস্তে যাওয়া দোহা পর্বের আলোচনা থেকে রফাসূত্রের আশা। আর নিঃসন্দেহে এজন্য প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার প্রধান পাসক্যাল ল্যামি। ভারত কোন্‌ পথে, সেদিনই তার লক্ষণ ছিল স্ফটিকস্বচ্ছ।

কূটনীতির কূটকাচালি বুঝে ওঠার আগেই নিতান্ত অবিবেচকের মতো নতুন বানিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মা ফাঁস করে দেন সবকিছু। ওয়াশিংটন সফরের আগেই সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে শর্মা জানিয়ে দেন, ‘কৃষি বানিজ্য নিয়ে ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা কেটে গিয়েছে। ’ এবং ওয়াশিংটনে গিয়ে আনন্দ শর্মা সেকথাই আরও স্পষ্ট করে জানান। একসময় নিজেদের জোরালো বিরোধিতার কারণে থেমে থাকা ডব্লিউ টি ও’র দোহা পর্বের আলোচনায় ‘নতুন জীবন’ দিতে উদ্যোগী হওয়ার কথা জানিয়ে শর্মা বলেন, ‘নতুন করে আলোচনা নয়, বরং ভেস্তে যাওয়া আলোচনাই নতুন করে শুরু করা উচিত। ’ সঙ্গে এও বলেন, ‘আর এজন্য আমাদের আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করা উচিত নয়।

এখনই একাজ আমাদের শুরু করে দেওয়া উচিত। ’ আনন্দ শর্মা ঠিক ততটাই বলেন, যতটা তাঁকে করতে বলা হয়েছিল। অকপটে জানানও সেকথা। বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং চান দোহা পর্বের সাম্প্রতিক পর্বের আলোচনা সাফল্যের সঙ্গে শেষ হোক। ’ প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছে দিয়ে মার্কিন বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিন্টনকে একধাপ বাড়িয়ে শর্মা আরও জানান, ‘ভারত কখনও বলেনি, বানিজ্য আলোচনা মুখ থুবড়ে পড়া উচিত।

হ্যাঁ, একথা ঠিক এই আলোচনায় অবরোধ তৈরি হয়েছে। তবে তা এখন ইতিহাস। ’ ‘ইতিহাস’-ই বটে! ডব্লিউ টি ও’র দোহা পর্বের আলোচনার প্রশ্নে ১৮০ডিগ্রি ভোল বদলে ভারত এখন নতুন অবস্থানে। থেমে থাকা দোহা পর্বের আলোচনা শেষ করতে হবে ২০১০এর মধ্যে — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ শিল্পোন্নত দেশগুলির সময়সীমা এই প্রথম মেনে নিয়েছে দিল্লি। আজ যে ‘অচলাবস্থা কেটে গিয়েছে’ বলে দিল্লি জাঁক দাবি করছে, একবছর আগে এই ‘অচলাবস্থাকেই’ সেসময়ের বাণিজ্যমন্ত্রীর ‘জোরালো কৃষকমুখী অবস্থানের প্রমাণ’ বলে সশব্দে দাবি করা হয়েছিল।

সেদিন বলা হয়েছিল, উন্নত দেশগুলির বিপুল ভরতুকি পাওয়া সস্তা পণ্যের অবাধ আমদানির রুখতে দেশীয় কৃষকের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত করতে বাণিজ্যমন্ত্রী যে ন্যূনতম রক্ষাকবচের ওপর জোর দিয়েছিলেন, উন্নত দেশগুলি, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে না নেওয়ার কারণেই এই ‘অচলাবস্থা’। আজ, হটাৎ এই মহার্ঘ ‘অচলাবস্থা কাটার’ পিছনে কারণ কী? আনন্দ শর্মার বক্তব্যে বিশ্বের শিল্প ও বানিজ্য মহলে হিল্লোলেই তা স্পষ্ট। জেনিভায় ডব্লিউ টি ও’তে নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ওয়াকার বলেন, ‘আমি কানে এখন সঙ্গীত শুনছি। ’ কমলনাথ বিরাট প্রতিবাদী, বিদ্রোহী ছিলেন এমন নয়। কিন্তু, আন্তর্জাতিক বানিজ্যের দর কষাকষির টেবিলে তাঁর ছিল জোরালো নিয়ন্ত্রন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভাষায়, তাঁর ‘জোরালো, সংরক্ষণবাদী অবস্থান মার্কিনীদের পক্ষে যায়নি। ’ এমনকি প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নির্দেশ পর্যন্ত তিনি অন্ধভাবে অনুসরণ করতেন না। সেকারণে প্রধানমন্ত্রীও কোনওদিন তাঁর ওপর তেমন সন্তুষ্ট ছিলেন না। দিল্লি বহুবারই তাঁকে চুক্তি মেনে নেওয়ার কথা বলে। কিন্তু কমলনাথ শোনেননি।

২০০৮এর জুলাইয়ের শেষে বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার আলোচনার কথা মনে করুন। কমলনাথ বিলক্ষণ জানতেন, মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ তিন-তিনবার ফোনে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবু তিনি চাপের কাছে মাথা নত করবেন না এমন একটা ভাবমূর্তি রেখে চলেন। যদিও ঘটনা হলো, ২০০৭এর মার্চ থেকেই ভারত তার অবস্থান বদলাতে শুরু করে। হাঁটতে শুরু করে বিপরীত দিকে।

খুঁজতে থাকে মুখরক্ষার পথ। গত দু’বছর কমলনাথ বস্তুত যা করেছেন, তা হলো একে আটকে রাখা, আর ‘কোনও চাপের কাছে ভারত মাথা নত করেনি’, এমন একটা ভাবমূর্তি রেখে দেওয়া। এবং তিনি এটা করেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। যেমন গত বছর আগস্টে জেনিভায় ডব্লিউ টি ও’র শেষ বৈঠকের পরেও কমলনাথ বলেন, ‘আমি ডব্লিউ টি ও’র ডিরেক্টর জেনারেলকে জানিয়ে দিয়েছি, আমরা আলোচনায় রাজি। তবে কখনোই নিজেদের স্বার্থকে জলাজঞ্জালি দিয়ে নয়।

৬৫কোটি ভারতীয় কৃষকের জীবন-জীবিকার বিনিময়ে নয়। ’ তাই গত ইউ পি এ সরকার যেমন ওয়াশিংটনের নির্দেশে মনিশঙ্কর আয়ারের বদলে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকে নিয়ে এসেছিল মুরলি দেওরাকে, এবারে তেমনই কমলনাথের পরিবর্তে আনন্দ শর্মাকে। মনিশঙ্করকে সরানোর কথা পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মালফোর্ড ফাঁস করে দিয়েছিলেন। কমলনাথের ‘স্টোরি’ জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশকিছু দিন। এদিকে আজ থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন করে দোহা পর্বের আলোচনা।

এবং তা এই ভারতে, দিল্লির আয়োজনে। দোহা পর্বের আলোচনা সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে ৩৬টি দেশের বৈঠক ডেকেছে ভারত। খরা, বন্যা আসে-যায়। ডব্লিউ টি ও আসলে ‌আর যাবে না। দেশের কৃষকের চিরস্থায়ী সর্বনাশ।

বিশ্ব বানিজ্য সংস্থার দোহা পর্বের আলোচনা শেষ হলে ভারতের ঠিক কতটা লাভ হবে, নিশ্চিতভাবেই আনন্দ শর্মার কাছে দেশবাসী তা জানতে চাইবেন। তবে শুধু বিস্মিত হওয়া নয়, হতবাক করে দেওয়ার মতো ঘটনা হলো, ভারত আক্ষরিক অর্থেই জানে না, কৃষি চুক্তি থেকে দিল্লির আদৌ কতটা লাভ, কতটা লোকসান হবে? বিদেশী পণ্যের জন্য দেশের বাজারকে আরও উন্মুক্ত করতে পারে ভারত। সংবাদ সংস্থা পি টি আই একথা জানিয়ে বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র ওয়াশিংটনে দাঁড়িয়ে এপ্রশ্নে নিজেদের অবস্থানকে শিথিল করার ইঙ্গিত দিয়েছে দিল্লি। কিন্তু ওয়াশিংটনে দাঁড়িয়ে আনন্দ শর্মা যখন বলছেন, তিনি ভারতের বাজারকে আরও হাট করে খুলে দিতে চান, তখন দেশের ‘নিরক্ষর’ কৃষক বুঝে উঠতে পারেননি, ‘আর ঠিক কতটা উন্মুক্ত করার’ কথা শর্মা বলতে চাইছেন? কারণ, ইতোমধ্যেই ভারত চলেছে স্বশাসিত উদারীকরণের পথে। এবং হাট করে খুলে দিয়েছে তার বাজারকে।

২০০৮এর মার্চে যখন রাষ্ট্রপতি বুশ ভারতের বাজারকে আরও উন্মুক্ত করার কথা বলেন, তখন থেকেই। সেদিন বুশ বলেছিলেন, ভারতের এটা করা উচিত, যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা করতে পারে। তার পর থেকে এই সময়ে অধিকাংশ কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক ‘শূন্যে’ নামিয়ে আনা হয়েছে। গম আমদানি শুল্ক এখন শূন্য, চাল শূন্য, ভুট্টা শূন্য, ডাল শূন্য, ভোজ্য তেল শূন্য (অথবা কিছু বিশেষ ক্ষেত্র ৭.৫শতাশ)। ‘শূন্যের’ চেয়ে আর কতটা নামানো যেতে পারে? ভারত কথা রেখেছে।

সে তার বাজারকে খুলে দিয়েছে। কিন্তু পালটা আমেরিকা তা করেনি। ওয়াশিংটন কথা রাখেনি। বস্তুত, এই সময়ে আমরিকা অনুমোদন করেছে তার ইউ এস ফার্ম বিল ২০০৮, যাতে রয়েছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য অতিরিক্ত ৩০হাজার ৭০০কোটি ডলার কৃষি ভরতুকি দেওয়ার সুযোগ। শুনতে অবাক লাগলেও, শিল্পোন্নত দেশগুলির গোষ্ঠী ও ই সি ডি ব্লক তাদের কৃষকদের বছরে ভরতুকি দেয় ৩৭হাজার ৪০০কোটি ডলার।

আর এদের শীর্ষে রয়েছে আমেরিকা। গত বছর জুলাইয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পিছনে রয়েছে নানা কারণ। যেমন প্রবল বিতর্ক রয়েছে অকৃষি পণ্যের বাজারের সুযোগ (নন এগ্রিকালচারাল মার্কেট অ্যাক্সেস, এন এ এম এ) নিয়ে। সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কৃষি বিষয় নিয়ে। তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে মূল বিতর্কের বিষয় ছিল দেশীয় সহায়তা ও রপ্তানি ভরতুকি।

কৃষির জন্য ‘বিশেষ রক্ষাকবচ’ নিয়ে এই বিতর্কই তুঙ্গে ওঠে। পোশাকী নাম স্পেশাল সেফগার্ড মেকানিজম। বিশেষ রক্ষাকবচ প্রক্রিয়া। আসলে অবাধ আমদানির বিপর্যয়কর পরিণতি রুখতে উন্নয়নশীল দেশগুলির গরিব কৃষককে সুরক্ষিত রাখতে নিরাপত্তা বলয়। কে বলবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ও ই সি ডি দেশগুলি চড়া হারে ভরতুকি বন্ধ না করলে কোনও সুরক্ষা বলয়-ই ঢালাও আমদানির বন্যা রোখার জন্য যথেষ্ট নয়।

চল্লিশ বছর আগে, উন্নয়নশীল দেশগুলি বস্তুত খাদ্য রপ্তানি করত, এবং খাদ্য বানিজ্যে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৭০০কোটি ডলার। আর এখন, উদ্বৃত্ত তো নয়ই, বরং খাদ্য বাণিজ্যে ঘাটটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১০০কোটি ডলার। এবং স্পেশাল সেফগার্ড মেকানিজম আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি এই বিশেষ রক্ষাকবচ নিয়ে ঠিক ঠিক বোঝাপড়া না হয়, তবে দেশের কৃষির সর্বনাশ। চড়া ভরতুকি পাওয়া উন্নত বিশ্বের কৃষি পণ্যের জোয়ারে ভেসে যাবে আমাদের কৃষকের ফসল।

প্রকৃত অর্থেই দেশের কৃষি ক্ষেত্রকে বাঁচাতে থাকবে না কার্যত কোনও রক্ষাকবচ। কার্যত ‘নিধিরাম সর্দার’ করে দেবে আমাদের কৃষককে। এখনও পর্যন্ত উদার নীতি থেকে মুখ ফেরানোর কোনও লক্ষণ নেই দিল্লির। বরং খাদ্য, জ্বালানি, সারের ওপর থেকে ভরতুকি কমানোর কথা শোনানো হচ্ছে। পরিহাস হলো, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দোহা পর্বের আলোচনা থেমে থাকার কারণ আমেরিকা ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন তাদের কৃষিক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ ভরতুকি কমাতে অস্বীকার করা।

সম্প্রতি চীনের মতো উন্নয়নশীল দেশও তাদের কৃষিক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভরতুকি বাড়াচ্ছে। বিপরীতে ভারত সরকার কৃষিতে ভরতুকি-বিরোধী এক অযৌক্তিক অবস্থান আঁকড়ে ধরে আছে। এবছর জুনের গোড়ায়, কেয়ার্নস গ্রুপের (১৯টি দেশের গোষ্ঠী, বিশ্ব কৃষিপণ্যের রপ্তানিতে যাদের অংশ ২৫শতাংশের ওপরে) বৈঠক বসে, ২০০১এ শুরু হওয়া ডব্লিউ টি ও’র দোহা পর্বের আলোচনা নিস্পত্তির লক্ষ্যে। বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত দু’দেশের বাণিজ্য মন্ত্রীকেই উপস্থিত থকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওই বৈঠকেই ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে বৈঠক করেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রন ক্রিকের সঙ্গে।

এবং দিল্লি তার এতদিনের অবস্থান রাতারাতি বদলে বহুপাক্ষিক আলোচনা ‘নতুন করে শুরু করার’ ব্যাপারে সহমত হয়। অথচ, ভারত এর আগে দেশের কৃষকদের জন্য অপর্যাপ্ত রক্ষাকবচগুলি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। সমর্থন জানিয়েছিল উন্নয়নশীল দেশগুলি। এখান থেকেই অচলাবস্থার শুরু। আর এখন সেই অচলাবস্থা ভাঙতেই মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনের আয়োজন করছে ভারত।

এবং সংসদে কোনওরকম আলোচনা ছাড়াই। এক কাপুরোষচিত আত্মসমর্পণ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.