আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হজ্বের সেই দিনগুলো - ৫ম পর্ব

বৃষ্টিতে হাঁটতে ভাল লাগে আমার কারন কেউ দেখেনা দুচোখের জল ধুয়ে যায় বৃষ্টিধারায়
অবশেষে সমস্ত অপেক্ষার পালা শেষ করে আমরা অধীর আগ্রহে রওয়ানা হলাম আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ)এর প্রিয় মসজিদ "মসজিদে নব্বী" কে প্রথমাবারের মত দেখবার জন্য। প্রতিটি পদক্ষেপে যতই এগিয়ে চলছিলাম ততই মনের ফ্রেমে কল্পনায় ভেসে উঠছিলো নবীজির এক একটি ঘটনা। আজ থেকে হাজার বছর আগে এই মদীনার দিগন্তে মরুভূমির তপ্ত লু হাওয়ায় ধূলো উড়িয়ে ছোট্ট এক কাফেলা এগিয়ে চলছে । ধীরে ধীরে তাদের ক্লান্ত মলিন চেহারায় ভেসে উঠছে নতুন এক দিনের স্বপ্ন। পেছনে ফেলে আসা জীবনের সেই চরম লান্ছনার আর বন্চনার ইতিহাস কে পেছনে ফেলে তারা এগিয়ে চললো দৃপ্ত পদক্ষেপে মদীনা সেদিনকার ইয়াসরিব শহরের প্রবেশ দ্বারের দিকে।

সবার আগে এগিয়ে চলছেন আল্লাহর অশেষ রহমতের ধারায় সিক্ত আমাদের প্রিয় নবীজি (সাঃ) । ধূলায় ধূসরিত রিক্ত হস্তে সেদিন আমাদের প্রিয় নবীজি শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশে হিজরত করে চলে এসেছিলেন সেদিনকার ইয়াসরিব অর্থাৎ আজকের মদীনায়। যখন তিনি চলে আসছিলেন বারবার ফিরে দেখছিলেন তার প্রিয় শহর মক্কার দিকে। নিজ বংশধর কোরায়েশদের চরম অত্যাচারের পরও মাটি কামড়ে আকঁড়ে ধরে রেখেছিলেন এই মক্কাকে বুকের সাথে। আজ সেই মক্কাকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে আল্লাহর আদেশে ।

উটের পিঠে উঠার আগে তিনি মক্কার দিকে তাকালেন। শহরের সবকিছু তার দৃষ্টিতে ভাস্বর হয়ে উঠলো । স্মৃতির পাতায় জমে থাকা সব হাসিকান্নার স্মৃতিগুলো একে একে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠলো। নীরবে তিনি একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন করুন কন্ঠে " এ পৃথিবীর সব জায়গার চেয়ে তুমি আমার কাছে সুন্দর মনে হলেও তোমাকে আমার ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। তোমার লোকগুলো যদি আমাকে তাড়িয়ে না দিতো আমি তোমাকে কখোনই ছেড়ে যেতাম না।

পাহাড় ত‌্যাগ করার পূর্বে নবিজী (সাঃ) শেষবারের মত মক্কার দিকে তাকালেন। তিনি বললেন " হে আল্লাহ! পৃথিবীর সব শহরের মধ্যে যে শহরটিকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসি, সেই মক্কা থেকে আপনি আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন । আপনি আমাকে এমন একটি শহরের নিয়ে যান যে শহরটি আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। " মক্কার মাটির ঘ্রান যেনে নবীজির বুকের সাথে মিশে আছে । আজো যেন সেই নবীজির প্রিয় পা মোবারকের পদচিন্হ মিশে আছে এই মরুভূমির বুকে ।

ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কায় ফিরে আসলাম বাস্তবতায় । প্রায় ৫ মিনিট হতে চললো হোটেল থেকে রওয়ানা দিয়েছি সদলবলে। দূর থেকে ভেসে আসলো সুমুধূর আযানের ধ্বনি । এখানে ফজরের আযানের আগে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য আলাদা আযান হয় আমরা সেই আযান তখন শুনছছিলাম । ভোরের আলো ফুটতে তখন অনেক বাকী ,দেখলাম প্রসস্ত রাস্তার দুপাশের ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলছে সবাই মসজিদে নব্বীতে ফজরের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে ।

দূর থেকে চোখে পড়লো মসজিদে নব্বীর উঁচু মিনার । ধীরে ধীরে মানসপটে ভেসে উঠলো প্রিয় মসজিদে নব্বীর পূর্ন আবয়ব । আমাদের প্রিয় নবীজি (সাঃ) ঘুমিয়ে আছেন এই মসজিদের কোন এক প্রান্তে পবিত্র রওজা মোবারকে তার প্রিয় সাহাবী হজরত আবু বকর (রঃ) এবং হজরত উমর (রাঃ) সাথে। আর কিছুক্ষনের মধ্যে পা রাখতে যাচ্ছি এমন এক পবিত্র স্থানে ,যেই স্বপ্ন এতদিন লালন করে আসছিলাম মনের কোনে । অবশেষে আল্লাহ পাক আমাকে নিয়ে আসলেন তার মেহমান হিসেবে তার প্রিয় হাবীবের প্রিয় মসজিদে নব্বীতে ।

সমস্ত প্রসংশা আল্লাহ পাকের যিনি আমাকে এই সৌভাগ্য দান করলেন জানিনা কবে কোথায় কোন ভাল কাজের প্রতিদান হিসেবে এই সুযোগ আমার ভাগ্যে জুটলো। মনে এক অদ্ভুত ভাল লাগা নিয়ে পা রাখলাম মসজিদে নব্বীর আঙিনায়। দেখলাম একটি সবুজ গালিচা পাতা সামনের প্রবেশ দ্বারের থেকে মসজিদের ভেতরের দরজা বরাবর। পাশের আরো অনেকগুলো গেইট দিয়ে লোকজন আসা যাওয়া করছে । একটি গেইট দিয়ে শুধুমাত্র মহিলারা প্রবেশ করছে ।

মসজিদের প্রায় ২০০ গজ আঙিনা পেরিয়ে অবশেষে হাজারো মানুষের ভীড় ঠেলে পা রাখলাম মসজিদের অভ্যন্তরে মন জুড়িয়ে গেলো শীতল পরশে । সারা মসজিদ জুড়ে চলছে কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা । ঢোকার মুখে প্রবেশ দ্বারে ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল এক ঝাড়বাতি স্বর্নের প্রলেপে মাখা । মসজিদের অভ্যন্তরে ঢোকার মুখে দেয়ালের দুদিকে বিশাল দুটো কাঠের তাক জুতা রাখার জন্য । অবশ‌্য অনেকে জুতা রাখার জন্য সাথে কাপরের ব্যাগ সাথে করে নিয়ে আসে ।

আমরাও এরকম জুতার ব্যাগ বাংলাদেশ থেকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম। কারন এই কাঠের তাকে জুতা রাখলে একটি সমস্যা হয় সেটা হল অনেক সময় জুতা ভুলে বেহাত হয়ে যায় অথবা জুতা বদলের ঘটনা ঘটে । মসজিদে নব্বী ইসলামের মর্যাদাপূর্ন স্থান হিসেবে মক্কার মসজিদ আল হারেমের পরই এর স্থান। এবং তৃতীয় স্থান হিসেবে এর পর প্যালাইস্টাইনের মসজিদ আল আকসা মসজিদটি। রাসুলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন একজন মুসলমান এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র তিনটি ধর্মীয় স্থানে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমন করতে পারে ।

এগুলো হল মক্কার মাসজিদ আল হেরেম যেখানে কাবা ঘর অবস্থিত,এরপর মদীনার মসজিদে নব্বী এবং সবশেষে প্যালাইস্টাইনের মসজিদ আল আকসা । নবীজি (সাঃ) মদীনায় মসজিদে নব্বী সর্বপ্রথম নির্মান করেন । পরবর্তীতে খলিফাদের সময়ে এটা পরিবর্তিত এবং পরিবর্ধিত হয়ে বর্তমানের রুপ ধারন করেছে। সর্বপ্রথম হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ)এই মসজিদটি নির্মান করেন খেঁজুরগাছের খুঁটি আর কাদামাটির দেয়াল তৈরীর মাধ্যমে । প্রথমদিকে এই মসজিদে ৩টি প্রবেশপথ ছিলো দক্ষিনে বাবে রাহমাত ,পশ্চিমে বাবে জীবরীল এবং বাবে আল নিসা পূর্বে ।

প্রথমদিকে এই মসজিদের কিবলা নির্ধারিত ছিলো উত্তরে জেরুসসালেমের আল আকসা মসজিদের দিকে পরবর্তীতে কিবলা পরিবর্তন হয়ে নতুন দিক দক্ষিনে মক্কা মুখী করা হয়। (এই কিবলা পরিবর্তনের ঘটনাটি যে মসজিদে সংঘটিত হয়েছিলো সেটি পরের কোন এক পর্বে মসজিদের ছবি সহ বর্ননা থাকবে। ) মসজিদে নব্বী তে রওজা মুবারকের গেট থেকে বের হলে সামনে দৃষ্টি প্রসারিত করলে চোখে পড়ে অদূরে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানের প্রবেশ দ্বার । আর ঠিক বাম দিকে এগুলে কিছুদূর পরেই বাবে জিবরীলের প্রবেশদ্বার । এই দ্বারের নাম আল্লাহর বার্তা বাহক ফেরেসতা জিবরীল (আঃ) এর নামে নামকরন করা হয় কারন নবিজী (সাঃ) জীবদ্দশায় তিনি বহুবার মানুষের বেশে এই দ্বারের সামনে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)এর সাথে দেখা করেন ওহী নিয়ে ।

আসুন এই ফাঁকে একটি গান শুনি । গানটি আমার মেয়ে প্রায় শুনে সাথে আমিও। আশা করি আপনাদেরও ভাল লাগবে ।
 

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।