আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

টেলিভিশন সাংবাদিকতা ও ব্রডকাস্ট ল’।

মিডিয়া

১০ এপ্রিল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আই একটি সংবাদ প্রচার করেছে । সিলেটের ওসমানী নগরের ৭ বছরের কিশোরীর উপর পাশবিক নির্যাতনের পর মেয়েটিকে সেফ হোমে আককে রাখার করুণ কাহিনী নিয়ে প্রচারিত ঐ রিপোর্টটি করেছেন চ্যানেলটির সিনিয়র রিপোর্টার তারিকুল ইসলম মাসুম। দ্বিতীয় দিন রিপোর্টের সাফল্য হিসাবে ফলো আপ রিপোর্টে দেখানো হয়েছে- মেয়েটিকে সেফ হোম থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ধর্ষণ কিংবা পাশবিক নির্যাতনের রিপোর্ট প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম কর্মীদের যে বিষয়গুলো মেনে চলতে হয় ঐ রিপোর্টটিতে সেই বিষয়গুলো অনুষরণ করা হয়নি বলে রিপোর্টটি হয়ে উঠেছে পাশবিক ! পাঁচ মিনিট দীর্ঘ ঐ রিপোর্টে চিলড্রেন্স এ্যাক্ট ১৯৩৩ লংঘন করা হয়েছে। প্রথমত : অভিযুক্ত বা অপরাধের শিকার শিশুর বয়স যদি ১৩ বছরের নীচে হয় তাহলে সেই শিশু অপরাধী হলেও তার ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবেনা ।

দ্বিতীয়ত : অপরাধী কিংবা নির্যাতনের শিকার শিশুটির নাম ও তার পরিবারের পরিচয় প্রকাশ করা যাবেনা। তৃতীয়ত : ধর্ষণ কিংবা পাশবিক নির্যাতনের রিপোর্টের ক্ষেত্রে ; নির্যাতনের স্বীকার মেয়েটির ছবি কিংবা তার ঠিকানা কোন ভাবেই গনমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবেনা। যদি মেয়েটির বয়স ১৬ বছরের বেশী হয় তাহলে তার লিখিত অনুমতি নিয়ে তার ছবি বা ভিডিও প্রচার করা যাবে। তবে, যদি মেয়েটি তার ছবি প্রকাশ করতে অনুমতি না দেয় তাহলে আদালত ও ছবি কিংবা ঠিকানা প্রকাশের জন্য নির্দেশ দিতে পারবেনা। এই বিষয়গুলো যথেষ্ট স্পর্শকাতর, তাই গণমাধ্যম কর্মীকে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে।

কিন্তু ঐ রিপোর্টে পাশবিক নির্যাতনের শিকার মেয়েটিকে দেখানো হয়েছে, প্রচার হয়েছে তার মায়ের সাক্ষাতকার , প্রকাশ করা হয়েছে মেয়েটির বাড়ীর ঠিকানা। সংশিষ্ট চ্যানেলের বার্তা বিভাগ এত স্পর্শকাতর একটি বিষয় বিবেচনা না করে কিকরে প্রচারের অনুমতি দিয়ে দিলেন সেটি বোধগম্য নয় ! এই রিপোর্টের কারনে মেয়েটি সামাজিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ভবিষ্যতে মেয়েিিটর পরিবারের সদস্যরাও সামাজিকভাবে নানা প্রশ্নের মূখোমুখি হবার সম্ভবনা রয়েছে যা কোনভাবেই কাম্য ছিলোনা। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া এখন একটা স্বর্নযুগ এসেছে। ১৩ টেলিভিশন চ্যানেল কাজ করছে বাংলাদেশে । কিন্তু এই নীতিমালাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধশীল না হলে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ রুপ নেবে আমাদের টেলিভিশন সাংবাদিকতা।

শুধু চ্যানেল আইয়ের ঐ সংবাদটি নয়, সাম্প্রপ্রতিক সময়ে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা কিংবা সাইক্লোন সিডর ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া বেশ কয়েকটি জায়গায় সংযত আচরণ প্রদর্শণ করতে ব্যর্থ হয়েছে । বিকৃত ও গলিত লাশের ছবি প্রতিনিয়তই প্রদর্শিত হচ্ছে যা ব্রডকাষ্ট ল’ এর সম্পূর্ণ বিরোধী। বিদ্রোহের শিকার নিহত সেণা কর্মকতার বিকৃত লাশ তো দেখানো হয়েছেই সেই সাথে বিডিআর বিদ্রোহের নিহতের পরিবার যখন প্রাণ ভয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল টিভি সাংবাদিকরা সেই সময় তাদের পথ রুদ্ধ করে সাক্ষাতকার গ্রহনের চেষ্টা করেছেন, ইচ্ছের বিরুদ্ধে তাদেরকে কথা বলতে বাধ্য করেছেন। বাংলাদেশের ব্রডকাস্ট ল’ কিংবা গণমাধ্যম কর্মীদের এই নিয়ম ভঙ্গ নিয়ে আমার আলোচনার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় সবকয়টি শীর্ষ স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল ইংল্যান্ড ও আমেরিকা সহ বিশ্বব্যপী প্রদর্শিত হচ্ছে । বাংলাদেশে নিয়ম ভঙ্গ করলে জরিমানা গুনতে হয়না অথবা নিয়ম ভাঙ্গা হলো কি হলো না এই বিষয়গুলো তদারকি করবার কেউ নেই ।

কিন্তু ইংল্যান্ডে গণমাধ্যমগুলোকে অফিস অব কমিউনিকেশ বা সংক্ষেপে অফ কমের নিয়ম গুলো গণমাধ্যম কর্মীদের অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। ১০ ডিসেম্বর ২০০৮ এ ’অফ কম’ চ্যানেল এস , এটিএন বাংলা এবং চ্যানেল এস এনটিভিকে ( যে ইপিজিতে এখন চ্যানেল আই চলছে ) ৪০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছে। চ্যানেল গুলোর অপরাধ তাদের চ্যানেলে ১ মে’০৮ তারিখে লন্ডন মেয়র ও এসেম্বলী নির্বাচনের সময় একজন প্রার্থীর পক্ষে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিলো যা অফ কমের নিয়মের সুস্পষ্ট লংঘন। আরেকটি উদাহরণ দেই: ২০০৮ সনে ২২ সেপ্টেম্বর নেপালী টিভিকে ( যে ইপিজিতে ইউকেতে বাংলাদেশের এনটিভি পরিচালিত হচ্ছে) অফিস অব কমিউনিকেশন নোটিশ দিয়েছে, তারা যেন তাদের হরলিক্স এর টিভি বিজ্ঞাপনটি ইউকে তে প্রদর্শণ বন্ধ করে দেয়, কারণ ঐ টিভি বিজ্ঞাপন ইউকের নিয়মকে লঙ্ঘন করেছে। হরলিক্সএর বিজ্ঞাপনটির ভাষা এমন ছিলো যে,হরলিক্স খেলে শিশু কিশোর দের শরীরের শক্তি বৃদ্ধি পাবে, হাড় শক্ত হবে..মেধা বাড়বে ইত্যাদি.... এনটিভি ঐ বিজ্ঞাপন বন্ধ করেছে ।

শুথু হরলিক্স নয় দেশে এমন রং ফর্সা করার বিজ্ঞাপন প্রচার হয় যে ক্রিম ব্যবহার করলে রমণীরা ছ’ থেকে আট সপ্তাহে হয়ে উঠবেন নজর কারা সুন্দরী ! ইউকের অফিস অব কমিউনিকেশনের নিয়ম অনুযায়ী কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনে এধরণের ভাষা ব্যবহার করা যাবেনা । আরো কিছু ভুল আমাদের গণমাধ্যম গুলো প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে যা ব্রডকাষ্ট ল’কে লঙ্ঘন করে। ব্রডকাষ্ট ল’ অনুযায়ী সংবাদ কখনও স্পন্সর করা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল গুলো প্রতিনিয়তই সংবাদ স্পন্সর করে যাচ্ছে, ওমুক ব্যাংক সংবাদ শিরোনাম , তমুক ব্যাংক বানিজ্য সংবাদ নাম দিয়ে টিভি চ্যানেল গুলো সংবাদ প্রচার করছে। এখানেই শেষ নয় , দর্শক খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, টিভি স্ক্রিনের নীচে বাম দিকে সংবাদ চলাকালীন সময়ে কখনও গোলাকার, কখনও ডিম্বাকার আকৃতির কিছু বিজ্ঞাপন টিভি পর্দায় মাঝে মাঝে আসা যাওয়া করে ভিডিও এডিটিংএর ভাষায় যাকে টিকার (ঞওঈকঊজ) বলা হয়, সংবাদ চলাকালে টিকার ব্যবহার করা অফিস অব কমিউনিকেশনের নিয়ম বর্হিভূত।

এই সমস্ত টিকার বিজ্ঞাপন ঢাকতে ইংল্যান্ডের সম্প্রচার কতৃপক্ষকে টিভি পর্দায় পট্টি ব্যবহার করতে হয়, যেন ঐ বিজ্ঞাপন দেখা না যায়। ঐ পট্রি দিয়ে যখন বিজ্ঞাপন ঢাকা হয় ,তখন সংবাদ প্রচারের সময় রিপোর্টে যদি আস্টন সহ কারো সাক্ষাতকার প্রচার হয় তখন ঐ পট্টির কারণে দর্শক সংশিষ্ট ব্যক্তির নাম (অঝঞঙঘ) পড়তে পারেন না। প্রতিদিন ইউকের চ্যানেল আইয়ের অফিসে দর্শকরা ফোন করে অভিযোগ করেন ভাই আপনারা পট্টি সরান, আমরা সংবাদে প্রচারিরত সাক্ষাতকার প্রদানকারীর নাম দেখতে পাইনা। এই কারণে প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে টেলিফোনে অফকমের নিয়মের কারণে পট্টি সরানো যাচ্ছেনা বলে বুঝাতে হয়। কিন্ত ঢাকার টিভির কর্তাব্যক্তিরা যদি অফকমের এই নিয়ম মেনে টিভি না চালান তবে অদুর ভবিষ্যতে ছোট্ট ভুলের জন্য অনেক বড় অংকের জরিমানা গুনতে হবে।

ইউকের ব্রজকাস্ট ল’ ভঙ্গকারীর জরিমানার অংকটা যে কত বড় সেগুলোর কয়েকটা নমুনা দিলে অফকম নামের আতংকের প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে মিডিয়া কর্মীদের কিছুটা ধারণা হবে। প্রিমিয়াম রেটের ফোন লাইন অপব্যবহারের জন্য ৮ মে, ২০০৮ এ ইংল্যান্ডের স্যাটেলাইট চ্যানেল আইটিভিকে ৫.৬৮ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিলো। ভুয়া ড্রাগ ডকুমেন্টারী প্রচারের অভিযোগে কার্লটন টেলিভিশনকে ২ মিলিয়ন পাউন্ড জরিমান দিতে হয়েছে ২০০৭ সনে। এছাড়া ভুয়া বিজয়ী দেখিয়ে দর্শকদের বিভ্রান্ত করার দায়ে বিবিসিকে ৪০০ হাজার পাউন্ড জারিমানা গুনতে হয়েছে। এরকম বহু উদাহরণ আছে, আগ্রহী পাঠকরা জানতে চাইলে ৩ এপ্রিল ২০০৯ এ প্রকাশিত ব্রিটেনের শীর্ষ দৈনিক গার্ডিয়ান’র অনলাইন আর্কাইভ এ বিস্তারিত পড়ে নিতে পারবেন।

ব্রিটেনের ক্ষমতাধর গণমাধ্যম গুলোও এসব নিয়ম নীতির বাইরে নয়। আর এই নীতিমালা কার্যকরের অন্যতম কারণ হচ্ছে অফিস অব কমিউনিকেশনের শক্ত অবস্থান। বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রনালয়ের ইউকে ভার্সনটাই হলো অফিস অব কমিউনিকেশন। আর সাধারণ মানুষ যেখানে তাদের প্রতিবাদ জানাবে সেটি হলো প্রেস কাউন্সিল । আমাদের দেশে তথ্য মন্ত্রনালয় ও প্রেস কাউন্সিল নামে যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে তার কার্যকারিতা কতটুকু গতিশীল সেই প্রশ্নটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে প্রেস কাউন্সিল ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সম্পর্কে কতটুকু সচেতন ও কার্যকরী ভুমিকা পালন করছে সে বিষয়গুলো তথ্য মন্ত্রনালয়কে বিবেচনায় আনতে হবে। আর ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলো মনিটরিং করার জন্য মন্ত্রনালয়ের উপযুক্ত লোকবল ও যন্তপাতি রয়েছে কিনা সেগুলোও বিবেচনা করতে হবে। সেই সাথে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোকেও বিশ্বব্যপি সংবাদ ও অনুষ্ঠানমালা স¤প্র্রচার করতে হলে বাংলাদেশের গণমাধ্যম নীতিমালার পাশাপাশি আন্তজাতিক নীতিমালা গুলোর প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। লেখক : তানভীর আহমেদ।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।