আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

হুজুগ, গুজব ও বাঙালি জ্বালানি.।.।.।।

পৃথিবীর সবচেয়ে অমানবিক শব্দ মানবতা, মানবতা কথায় থাকে না , কাজে থাকে।

ভুমিকা না করে সরাসরি প্রসঙ্গে আসি। যদি ও মনের ভাব জানাতে গিয়ে এই লাইন সহ দুই লাইন ভুমিকা দিতেই হল অনিচ্ছাকৃত। প্রথমেই একটা গল্প বলি, একবার কিছু লোক এক গ্রামে গিয়ে বলল, তারা স্টিলের হাড়ি পাতিল বানানোর জন্য এক টাকা আর পাঁচ টাকার কয়েন কিনতে চায়। কারন হিসেবে বলল, কয়েন গলিয়ে হাড়ি পাতিল বানাতে খরচ কম।

লোক গুলো পাঁচ টাকা দরে এক টাকার কয়েন, আর দশ টাকা দরে পাঁচ টাকার কয়েন কিনতে চাইল। গ্রামের মানুষেরা মাটির ব্যাংকে কয়েন জমাত। তারা ভাবল, এটা তো লাভ জনক অফার তাদের জন্য। তারা কয়েন গলালে দেশের ক্ষতি না কার ক্ষতি তা নিয়ে মাথা ঘামাল না। নিজের লাভের কথা ভেবে তারা দলে দলে ঐ স্টিল বেবসায়িদের কাছে সব রকম কয়েন বিক্রি করতে লাগল।

এক কান দুই কান করে, আশে পাশের সব গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল, এ কয়েন কেনার ঘটনা। স্টিল বেবসায়িরা যদি ও এত বেশি কয়েন কেনার জন্য আসেন নি। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের কয়েন বিক্রির আগ্রহ দেখে তাদের মাথায় একটা বুদ্ধি আসল, যা স্টিল বেবসার চেয়ে লাভ জনক। স্টিল বেবসায়িরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা মানুষের থেকে মোটামুটি চার পাঁচ লাখ কয়েন কিনে ফেলল। যদি ও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে কয়েন বিক্রির ঘটনা বিকৃত ঘটনা রুপে ছড়িয়ে পড়ল, কেউ বলতে লাগল কয়েন দিয়ে বোমা বানাবে, কেও বলতে লাগল সোনা বানাতে কয়েন লাগে- আর ও নানা কথা।

স্টিল বেবসায়িরা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের প্লান অনুযায়ী গুজব ছড়িয়ে দিল যে, সরকার দেশ থেকে পুরাতন কয়েন উঠিয়ে দেবে , তাই যত দামেই হোক, পুরাতন কয়েন কিনে নিচ্ছে। গ্রামে শহরে এ খবর ছড়িয়ে গেল। গ্রামের ঐ মানুষ গুলো যারা ইতি মধ্যে কয়েন বিক্রি করে দিয়েছে, তারা লোকসান হয়েছে বলে হায় হায় করতে লাগল। গ্রামের শহরের অনেক মানুষ কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির আশায় যে যে দামে পারে, কয়েন কিনতে শুরু করল। এক টাকার কয়েন তিন- চারশো টাকা আর পাঁচ টাকার কয়েন ছয়- সাতশ টাকায় পর্যন্ত কেনাবেচা চলতে লাগল।

অনেকেই কয়েন কিনছে, কিন্তু শেষে কোথায় বিক্রি করতে হবে জানে না। শুধু জানে অনেক বেশি দামে তারা পরে কয়েন বিক্রি করতে পারবে, সব মানুষ ই বলাবলি করছে। আর এত মানুষ কখন ও ভুল বলতে পারে না। এই সময় টাতে ঐ স্টিল বেবসায়িরা বিভিন্ন ভাবে তাদের কেনা চার – পাঁচ লাখ কয়েন বিক্রি করে প্রায় দুই কোটি টাকার বেশি কামিয়ে ফেলল। যদি ও স্টিল বেবসার উদ্দেশে আসলে ও স্টিল বেবসায়িরা সাধারণ মানুষের অসচেতনতা আর বিচক্ষনতার অভাব কে পুজি করে গুজব ছড়িয়ে কম সময়ে মাত্র আট- দশ লাখ টাকা ইনভেস্ত করে দুই কোটি টাকার বেশি কামিয়ে ফেলল।

আর যেসব সাধারণ মানুষ হুজুগে পরে অনেক টাকা দিয়ে কয়েন কিনেছিল, তারা যখন শেষে বুঝতে পারল যে কয়েন কেনার কেও নেই, তখন মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। তবে যারা কয়েন কিনেই হোক বা নিজের কয়েন অন্য কাওকে বিক্রি করতে পেরেছিলেন, তাদের শুধু লাভ হল। গুজবে এক শ্রেণির মানুষ কিছুটা লাভবান হলে ও আরেক শ্রেণির মানুষ ব্যাপক ভাবে খতিগ্রস্থ হল। যদি ও যারা লাভ করেছে, তাদের লাভ টা মোটেই নৈতিক নয়। গুজব এমন একটা বিষয়, যা কখন ও কোন কারন ছাড়াই ছড়ায়।

আবার কখন ও কোন স্বার্থ নিয়ে কোন বিশেষ মহল গুজব ছড়ায়। আমাদের বাঙালি দের হুজুগে জাতি বলা হয়। কেন বলা হয়, আমি নিশ্চিত না। তবে আমরা বাঙ্গালিরা হুজুগে গুজব ছড়িয়ে মজা পাই- একারণেই হয়ত হুজুগে জাতি বলা হয়। যদি ও অনেক কালে কালে আমাদের অসচেতনতার কারনেই হোক, বা অতি উৎসাহের কারনেই হোক- আমরা নিজের অজান্তেই গুজব ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে বেবহিত হয়েছি।

আমার পোস্ট এর উদ্দেশ্য মুলত উদ্দেশ্য মুলক গুজবের এবং আমাদের অন্ধত্তের কিছু দিক তুলে ধরা। বর্তমানে ইন্টারনেটের বহুল প্রচলনের যুগে উদ্দেশ্য মুলক গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবনতা এবং সম্ভাবনা দুটোই বেশি- যার জ্বালানি আমারাই হচ্ছি নিজেদের সৎ নিতি আদর্শের কারনে। সৎ নিতির কারনে আমরা গুজবের জ্বালানি হচ্ছি, কথা টা একটু কেমন যেন হয়ে গেল , তাই না? আমি আমার দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। প্রথমে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের “ একাত্তরের দিন গুলি “ বইএর ১২৪ পৃষ্ঠার প্রথম প্যারা টা তুলে ধরছি, “ পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ লোকেরা নাকি জানে না যে পূর্ব পাকিস্তানে মিলিটারিরা এত খুন –খারাপি করছে। সরকারি প্রচার মাধ্যমের চমৎকার বেবস্থাপনার ফলে তারা জানে যে পূর্ব পাকিস্তানের ভারতিয়রা হামলা করছে, দেশের ভেতরের কিছু ‘ গাদ্দার বাঙালি’ তাদেরকে সাহায্য করছে, সেই জন্য পাকিস্তান আর্মি ভারতিয় দমন আর হিন্দু মারা কাজে বেস্ত রয়েছে।

বুবু। জানেন তো পশ্চিম পাকিস্তানিরা কি ভয়ানক রকম অ্যান্টি –ইন্ডিয়ান। এটা আরো বেড়েছে ’৬৫ সালের ইন্ডিয়া- পাকিস্তানের যুদ্ধের পর থেকে। ইয়াহিয়া সরকার এই সেন্তিমেন্তের সুযোগ নিয়ে এমন নির্লজ্জের মতো মিথ্যে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে যে কি বলব ! তাছাড়া ওদিককার জন সাধারণ ও এমন কট্টর পাকিস্তান প্রেমিক যে, সরকার যা বোঝাচ্ছে, নির্বিচারে তাই বুঝে নিশ্চিন্তে দিন- গুজরান করছে। “ ওদিকের লোকেরা কি বি বি সি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া এসব শোনে না? “ “ শোনে, কিন্তু বিশ্বাস করে না।

ওরা সরকারের ছেলে ভুলানো ছড়া শুনেই সন্তুষ্ট । ’’ এই প্যারা টুকু দিয়ে মুলত একাত্তরে পশ্চিম পাকিস্তানিদের অ্যান্টি ইন্ডিয়ান সেন্তিমেন্ত ব্যাবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানি সরকারের অন্যায় গুজব ছড়ানোর কথা টা তুলে ধরা হয়েছে। এবার আমার মুল প্রসঙ্গে আসি। বর্তমানে প্রায় পুরো দেশ আমরা যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে বিভক্ত। একদিকে স্বাধীনতা পক্ষের শক্তি, যারা প্রচণ্ড রাজাকার বিদ্বেষী, কিন্তু ইসলাম বিরোধী নয়, যদি ও এ দলে কিছু নাস্তিক আছেন।

আর অন্য দিকে আছেন ইসলাম প্রিয় গোষ্ঠী, কিন্তু তাদের মতে তারা স্বাধীনতা বিদ্বেষী নন। আমরা সাধারণ মানুষ রা মুলত এই দুই ধারার সেন্তিমেন্তে বিভক্ত হয়ে গেছি। এক শ্রেণী দেশ প্রেমের ভিতর দিয়ে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কে দেখছি। আর এক শ্রেণী ইসলামের ভিতর দিয়ে দেশ প্রেম কে মূল্যায়ন করছেন। বেক্তিগত ভাবে আমি কোন শ্রেণির দৃষ্টি ভঙ্গিকে খারাপ চোখে দেখি না।

রাজনীতির একটা বড় অস্ত্র সেন্তিমেন্তের ব্যাবহার। তাই আমাদের দুই ধরনের সেন্তিমেন্ত কে রাজনৈতিক দল রা ব্যাবহার করতে চাইছেন স্বভাবতই তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে। তাই এক শ্রেণির রাজনৈতিক দলের যেমন আমাদের রাজাকার বিরোধী সেন্তিমেন্ত কে ব্যাবহার করে, তাদের যে কোন অন্যায় কে ঢাকার চেষ্টা করা এবং তাদের বিরোধী সমর্থক দের বিরুদ্ধে ক্ষেপীয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। তেমনি আর এক শ্রেণির দলের ইসলাম প্রিয় গোষ্ঠীর সেন্তিমেন্ত কে কাজে লাগিয়ে যে কোন গুজব ছড়িয়ে সেই গোষ্ঠী কে নিজেদের দলের বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপীয়ে দেয়ার সুযোগ রয়েছে। আমাদের নিজেদের সৎ সেন্তিমেন্ত কে কাজে লাগিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ লাগিয়ে দেয়া হলে ও আমারাই মরি, আমাদের পরিবারের ক্ষতি হয়।

কিন্তু আমরা আমাদের সেন্তি মেন্তের মোহে এত টাই বিভ্রান্ত যে বিপরীত সেন্তিমেন্তের ক্ষতি দেখলে আমরাই আনন্দ পাই, অন্য কে শত্রু মনে করি। কিন্তু আমরা কি এত টাই নির্বোধ যে সেন্তিমেন্তের ওপরে আমাদের বিচক্ষনতা টাকে কাজে লাগাতে পারছি না। এটা আমাদের কেমন দেশ প্রেম যেখানে আমার দেশের মানুষ কে তাদের অনুভুতি ব্যাবহার করে আমাদের সামনে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা আঘাত পেলে আমরা খুশি হই। আবার এটা আমাদের কেমন ইসলাম প্রেম যেখানে লাখো মুসলিম সহ লাখো নিরপরাধ মানুষ কে কষ্ট দিয়ে আমরা খুশি হই, যারা ও মুলত তাদের অনুভিতি দ্বারা বেবহিত হয়ে আমাদের সামনে শত্রু হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। আমাদের অন্ধ সেন্তিমেন্তের মোহ কে সম্মান দেখানোর অভিনয় করে দুটি পক্ষ আমাদের কে সংঘর্ষে লিপ্ত করাচ্ছে, আর আমরা অন্য কে মেরে আনন্দ পাচ্ছি, আমাদের প্রভাবিত করা অভিনেতাদের ভক্ত হয়ে যাচ্ছি।

কোথায় আমাদের শিক্ষা? এই আমাদের ইসলাম প্রেম? এই আমাদের দেশ প্রেম? এই আমাদের মূল্যবোধ? দরকার নাই আমার এমন সেন্টিমেনটের । আঠার কোটি বাঙালি নিজেরা নিজেরা মারামারি করে মরবে, আর সামান্য কয় জন মানুষ তা থেকে লাভ করবে- এটা কখইনই মানতে পারি না। হেফাজতের সাধারণ কর্মী রা কোরআন এ আগুন দিয়েছে- এটা ও যেমন বিশ্বাস করি না, আবার হেফাজতের ৩০০০ কর্মী মারা গেছে – এটা ও বিশ্বাস করি। এই গুজব গুলো ও প্রচার পায়- কারন আমাদের সেন্টিমেন্ত। বর্তমানে ফেসবুক পেজ, ব্লগ, নানা অন লাইন পত্রিকায় প্রতিদিন কত খবর বের হচ্ছে।

একটা কথা মনে রাখবেন, এসব মিডিয়ার পেছনে কিন্তু কে আছে আপনি জানেন না, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, মানসিকতা, আদর্শ – কিছুই জানেন না। তারা কেউ নির্বাচিত নয়। হ্যাঁ অনেক কিছুই সত্যি কিন্তু তাই বলে কাও কে অন্ধের মত বিশ্বাস করা বোকামি। যে কোন নিউজ কাওকে বলা বা শেয়ার করার আগে দয়া করে আরেক বার ভাবুন, ভালভাবে বুঝুন । নয়ত আপনি নিজেই গুজবের জ্বালানি হয়ে যাবেন, ওপরের প্রথম গল্পের মত গুজবে লাভ হবে যে গুজব সৃষ্টি করেছে তার।

নতুন কোন গুজবে প্লিজ আমাদের নিজেদের মধ্যে মন মালিন্য বাড়াবেন না। আমরা আর সংঘাত চাই না। সবাই কে একটা অনুরধ, ফেসবুকে কোন পেজে কোন কনফার্ম ভুল নিউজ থাকলে রিপোর্ট করুন। কিন্তু কনফার্ম নিজের বিচক্ষনতায় হন, অন্নের কথায় নয়। আর ফেসবুকে এখন এত নোংরা পেজে ছেয়ে গেছে যে মেয়েদের নানা অশালীন ছবি প্রচার করে।

এমন পেজ সামনে পেলেই প্লিজ রিপোর্ট করুন পেজের বিরুদ্ধে। বেশি হলে ১৫-২০ সেকেন্ড লাগবে। এই সামান্য সময় বেয় না করে তো আমরা আমাদের মা বোন এর সম্মান নষ্ট করার সুযোগ রাখতে পারি না, পারি কি?? আমার কাছে একজন খুনির চেয়ে একজন অপবেক্ষা কারি বেশি ভয়ংকর, কারন সে চাইলে হাজার হাজার খুনি সৃষ্টি করতে পারে। আমার বেক্তিগত দৃষ্টি ভঙ্গি তে ভুল থাকলে দয়া করে তা ধরিয়ে দেবেন। আমি নিজে ও শিখতে চাই, জানতে চাই।

আমি আমার দেশের মাটিতে রাজাকারের বিচার চাই, আমি আমার দেশের ইসলামের অবমাননাকারিদের বিচার চাই, আমি আমার দেশের অন্যান্য ধর্মের ভাই দের নিরাপত্তা চাই। আমি আমার দেশের ১৮ কোটি বাঙালি কে এক দেখতে চাই। আমি আমার সেই স্বপ্নের বাংলা দেশ চাই। আমি সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।


অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.