আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

ক্যানভাসে আঁধার

আমরা এমন একটা পরিবেশ চাই, যেখানে শিশুরা তাদের পছন্দ-অপছন্দের ধাপগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিয়ে বড় হবে।

ফয়সল সাইফের ধারাবাহিক উপন্যাস-১ম পর্ব প্রথম অধ্যায় ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকাল। ভোরের আলো ফুটছে। শীতকাল সবে বিদায় নিতে চলেছে। বসন্ত আসি আসি করছে।

চারপাশে পাখির কুজন শুরু হয়েছে। পুবাকাশের অদৃশ্য জানালা ভেদ করে উঁকি দিয়েছে লাল একটা প্রদীপ। এরপর ক্রমেই সেটা উজ্জ্বলথেকে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছে, যার মোলায়েম আলো জানালাগুলোর কাচ আড়াল করা পর্দা ভেদ করে বিছানায় এসে পড়েছে। ষড়ঋতুর বাংলাদেশের এই সময়টা সিলেটবাসীর কাছে অত্যন্ত প্রিয় এমনই এক নতুন দিনে; সকালের সূর্যালোকের মিষ্টি আঁচ পাওয়া মাত্রই জেগে উঠে একটি মেয়ে। নাম মেহজাবিন।

পুরো নাম মেহজাবিন সুরি। গায়ের শাড়িটা ঠিক করতে করতে উঠে বসে, সে ডানে তাকায়। তখনো তাঁর স্বামী অপু পাশেই শুয়ে আছে। যার সাথে তাঁর বয়সের পার্থক্য অল্প। অপুর বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি হবে না।

তাঁর চেহারা মায়াবী। গোলাপি মুখে-অতি অল্প, মানে সাত-আট দিন শেভ না করলে যেমন হয় তেমনই পাতলা দাড়ি। তাঁর গাল দুটো ভরাট। দেহ সুঠাম। তার পরও তাঁকে কৃশকায় দেখায়।

মাথার ঘন চুলগুলো কালো, তবে ছোট করে ছাঁটা। উচ্চতায় সে মাঝারি অপেক্ষা কিছুটা লম্বা। কালো রঙের ট্রাউজার আর টি-শার্ট পরে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। বিছানা ছাড়ার আগে মেহজাবিন অপুর কপালে ভালোবাসার একটা চুম্বন এঁকে দেয়। গভীর ঘুমে অচেতন জীবন সঙ্গীটি এর কিছুই টের পায় না।

দুজনের ছোট্ট এই পরিবারে মেহজাবিনই একমাত্র উপার্জনক্ষম। সে ব্র্যাক ব্যাংকের পুড়োপাড়া শাখায় চাকরি করে। বয়স বাইশ-তেইশ হবে। সে যখন উঠে দাঁড়ায়, তখন লতানো পুষ্ট শরীরটা তাঁর মাঝারী উচ্চতার সাথে বেশ মানিয়ে যায়। তাঁর চোখ দুটো ভারি সুন্দর।

চোখের মণিগুলো নীল। মুখে প্রতিনিয়তই খেলা করে গোলাপি আভার হাসি। মাথায় ঢেউখেলানো অসম্ভব সুন্দর চুলগুলো জীবনানন্দের অন্ধকার বিদিশার নিশা। মেহজাবিনের পরনে সাদা রঙের একটা শাড়ি। এর দুদিকে কালো রঙের প্রশস্ত দুটো বর্ডার।

তার মাঝখান জুড়ে কালো সুতোয় বোনা ছোট ছোট জবা ফুলের কারুকাজ। এই সাজ আজকের সুন্দর প্রভাতে, অপুর কাছে তাঁকে নিশ্চয়ই আকর্ষণীয় করে তুলত। কিন্তু বেচারীর মন্দ কপাল। কারণ, অপু ইদানিং সেই বোধটাই হারিয়ে ফেলেছে। সে অত্যধিক মাদকাসক্ত।

কাজকর্মের প্রতি হাল ছেড়ে দেওয়া এক মানুষ। এমবিএ’টা শেষ করেও একটুর জন্য শেষ করল না। মেহজাবিনকে বিয়ে করার পর হুট করে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। তাঁর মনে এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই। অলস, অকর্মণ্য, অকেজো।

মাতাল হওয়ার পর মাতলামির ঘোর ছেড়ে গেলে, বাকি সময়টুকু পরেরবার নেশার টাকা জোগাড় করার নানা উপায় বের করাসহ শুয়ে, বসে, আবার শুয়ে, টিভি দেখে, এর-ওর সমালোচনা করে কাটায়। এসব নিয়ে মেহজাবিনের দুশ্চিন্তার যেমন শেষ নেই, তেমনি শেষ নেই অশান্তিরও। তবু সে অপুকে পাগলের মতো ভালোবাসে। যে ভালোবাসার কোনো সীমা নেই। আসলে সে নিজেও জানে না; তাতে কত বিশালতা, কত গভীরতা।

পালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা থাকার পরও দিনের পর দিন একজন নেশাগ্রস্ত মানুষের সাথে বসবাস করছে। এটা হয়তো নিতান্তই একটা পাগলামি। কিন্তু ভিন্ন ধাঁচের এ পাগলামির কোনো সংজ্ঞাও তো কোথাও নেই। অপুও যখন মেহজাবিনকে ভালোবাসত, তখন এসব পাগলামি তাঁর কাছে পাত্তা পেত না। বিবিএ পড়ার সময় তাঁর জীবনটা অনেক সুস্থ এবং সুখের ছিল; তখন মনে কত যে ভালোবাসা ছিল! এখনো অনেক ভালোবাসে, কিন্তু এই পর্যায়ে এসে তাঁর কাছে ভালোবাসার অর্থটাই হয়তো ‘অজানা’ হয়ে গেছে।

মাতলামি অপুকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, সেটার ভালো কোনো ব্যাখ্যাও নেই। দিনের পর দিন নেশার জগতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ায়, অপু যে কতটা অমানুষ হয়ে উঠেছে, সেটা ভাবার ক্ষমতাই সে হারিয়ে ফেলেছে। দরকারি কোনো কাজকর্মের প্রতিই আর, তাঁর মনোযোগ নেই। তাই দুজনের সংসারের বোঝাটা টানতে হচ্ছে মেহজাবিনকে একা। প্রতিদিন কর্মস্থলে গিয়ে কাজ করা।

প্রতি মাসে বাসা ভাড়া পরিশোধ করা, বাজার খরচ মেটানো, আর সেই সাথে প্রতিনিয়ত পরোক্ষভাবে অপুর নেশার টাকা জোগানোর উৎপাত সহ্য করতে করতে মেয়েটা যেন পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু মেহজাবিন শুরুতেই এসব চাপ সামলাতে সামলাতে, এখন আর এসব নিয়ে ভেবে মস্তিষ্ক বিব্রত করতে চায় না। কিন্তু অপু? সে নেশায় মত্ত। তাঁর এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। সে পুরোপুরি নির্বিকার।

সকালের প্রয়োজনীয় কাজগুলোর যা না করলেই নয়, যেমন: নাশতা তৈরি করা, সেসব করতে মেহজাবিন রুম ছেড়ে চলে যাওয়ার, আরও প্রায় ঘণ্টা খানিক পর নবাবের মতো তাঁর ঘুম ভাঙে। গত রাতেও সে ছিল নেশাগ্রস্ত। মাতাল বন্ধুদের সাথে বসে দুই গ্লাস পান করার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নেশার ক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। এরপর হাত-পাগুলো ক্রমেই ভারি হয়ে আসছিল। সেই সাথে ভীষণ ঘুমও পাচ্ছিল।

তাঁর মনে হচ্ছিল, পাগুলো থেকে যেন শেকড় গজিয়ে সেগুলো মাটির গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। মনে পড়ে, শেষ পর্যন্ত কোনো মতে একাই বাসায় ফিরতে পেরেছিল। তারপর আর কিছুই মনে নেই। এমনকি মনে করার দরকারও মনে করে না। শেষবারের নেশার ঘোর এখনো কাটেনি তাঁর।

কেটে যাওয়ার কথাও নয়। সকাল অবধি সে তন্দ্রাচ্ছন্ন। কয়েকবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে এবং ঠিক কি কারণে তা মাথায় না রেখেই অপু বিছানায় উঠে বসে। তারপর একটু সময় থেমে ভাবতে চেষ্টা করে, কাল রাতে কী ঘটেছিল। কোনো কিছুই মনে করতে পারে না।

বাধ্য হয়ে স্মৃতি টানা রেখে, সে খোলা দরজা দিয়ে বাম পাশে তাকায়। তখন পাশের রুমে একটু সময়ের জন্য মেহজাবিনকে দেখতে পায়। তরুণী স্ত্রী তাঁর দিকে তাকিয়ে, একবার মিষ্টি হেসেই, আবার চোখের আড়াল হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই অপু বিছানায় বসে ঝিমোচ্ছে। মাঝে একটুখানি বিরতি নিয়ে এখন আবারও মনে করার চেষ্টা করছে, গত রাতের ঘটনাগুলো।

এবার একটু একটু করে, সবকিছুই তাঁর মনে পড়তে থাকে। এরপর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, চলার মতো পকেটে একটা টাকাও নেই। পরেরবারে নেশার টাকা আসবে কোত্থেকে? কিন্তু মাথাটা এমন ঝিম ঝিম করছে, যে এ নিয়ে সে চিন্তা করতে চায় না। ওসবে খুবই ক্লান্তি, বিরক্তি লাগে তাঁর। আর এত চিন্তারই বা কী আছে।

তাঁর একজন মেহজাবিন আছে না! মানুষ হিসেবে অপু কখনোই এমনটি ছিল না। একজন বিবেকবান মানুষ ছিল। হয়তো তাঁর আত্নসম্মানবোধের সবটুকু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। নেশা তাঁর ভেতরের সবকিছু কেড়ে নিলেও; এখনো সে মেহজাবিনের চোখের দিকে তাকিয়ে, তাঁকে কিছুতেই বিব্রত করার কথা ভাবে না। আর স্বামী হিসেবে তাঁর যা যা দায়িত্ব, সেসবের মধ্যে সে শুধু এটুকুই ঠিকমতো পালন করে চলছে।

হয়তো বা এ কারণেই তাঁদের সম্পর্কটাও এখনো টিকে আছে। অপু অলস হয়ে বিছানায় আরও কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর মন-মেজাজ হালকা হতে শুরু করে। মাথার মধ্যে যেন কোনো কিছুরই চাপ নেই। মনে হয়, যেন সব নতুন করে শুরু হয়েছে।

ঠিক শুরুও বলা যায় না। তবুও যেন কিছু ছিল না আগে। এ পর্যন্ত জীবনে কিছুই ঘটেনি। যদিও সে এটুকু জানে, আরেকবার নেশা করতে হলে অবশ্যই টাকা জোগাড় করা চাই। কিন্তু সে জন্য মনের ভেতর কোনো তাড়া অনুভব করছে না।

মেহজাবিনের কাছে টাকা চাওয়া যাবে না। সরাসরি কখনো চায়ও না। তাহলে টাকা আসবে কোত্থেকে? এ নিয়েও কোনো দুশ্চিন্তা নেই। আসলে এত দিন ধরে যেভাবে আসছে, ঠিক সেভাবেই আসবে। ঘর থেকে কিছু একটা চুরি করতে হবে আর কি।

বিষয়টি ভেবেই অপু মুচকি হাসে। নিজের অতীত চরিত্রের সঙ্গে অত্যন্ত বেমানান সে হাসি। এরপর বাম পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে মেহজাবিনের সোনালি রঙের মনট্রেক্স হাতঘড়িটার দিকে তাকায়। ভাবলেশহীন চাহনি। কোনো অনুভূতি নেই।

এক-দুইবার চোখের পাতা নড়ে তাঁর। বাদামি রঙের চোখের মণি আর বিশেষ ধরনের মুখায়বের জন্য অনেকেই অপুকে বিশ্বাস করে। কিন্তু মেহজাবিনের তাঁতে এক বিন্দুও বিশ্বাস নেই। অপু মনে মনে ভাবে, মেহজাবিনের ঘড়িটা বাইরে বিক্রি করে দিলেই, কয়েকটা দিন তাঁর বেশ নিশ্চিন্তে যাবে। এর আগে তো এটা নেওয়া চাই।

তাঁর ভেতরে এ কাজের জন্য কোনো তাড়া বোধ হয় না। কাজকর্ম না করতে করতে দিনে দিনে অলসতা তাঁকে এমনভাবে গিলে খেয়েছে, যে হাতটা বাড়িয়ে ঘড়িটা লুকিয়ে ফেলতেও শরীর-মন সায় দিতে চাইছে না। অপু ভুলেই গেছে যে ভালোবাসার শুরুর দিনগুলোর কোনো এক সময়, মেহজাবিনকে এই দামী ঘড়িটা সে-ই কিনে দিয়েছিল। এসবের জন্য বন্ধুদের সাথে অনেক মিথ্যাও বলতে হতো। যেটা ছিল সেই সময়ে তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ।

কিন্তু সেজন্য তাঁর মধ্যে কোনো অনুশোচনা ছিল না। এখনো অবশ্য নেই। তবে সম্পূর্ণটাই বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে। অপু ঘড়িটা পকেটে চালান করে দেয়। ঘরের প্রয়োজনীয় অথবা শৌখিন জিনিসগুলো, অপু দিনে দিনে বিক্রি করে ফেলছে।

ঘর প্রায় শূন্য। ঘরে এখন মেহজাবিনের প্রিয় তেমন কিছুই আর রাখা সম্ভব হয় না। মেহজাবিনও সে আগ্রহ হারিয়েছে। বেডরুমের একেবারে উত্তর-পশ্চিম কোণে সাদামাটা একটা খাট। অবশ্য আরামদায়ক।

সবুজ ক্যানভাসে গাঁদা ফুল আঁকা বিছানার চাদর। খাটের বাম পাশে দেয়াল ঘেঁষা একটা ড্রেসিং টেবিল। পায়ের দিকে দক্ষিণ দেয়ালে একটা ওয়ার্ডরোব। এই ওয়ার্ডরোবের ওপরে শেষ প্রান্তে একটা টেলিভিশন। পূর্ব দেয়ালে বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুমের প্রবেশের দরজার ডান পাশে পাশাপাশি বসানো দুটো বেতের সোফা।

এক সেট সোফার বাকিটা ড্রয়িংরুমে। তা ছাড়া সেখানে আরও আছে একটা টি টেবিল, চারটি চেয়ারসহ একটা ডাইনিং টেবিল এবং কিছু বইসহ একটা বইয়ের শেলফ। এসবও হয়তো থাকত না। কিন্তু এসব তো আর চুরি করে, বাইরে নিয়ে বিক্রি করা যায় না। তাই রক্ষা।

বাসায় যা কিছু আছে, তা প্রায় সবই অপুর টাকায় কেনা হয়েছিল। বিয়ের মাস ছয়েক আগ পর্যন্ত সে আউটসোর্সিং এর কাজ করতো। ওডেক্সে কাজ করে প্রতি মাসে অনেক টাকা আয় করত। বাবার পরিবারের সচ্ছলতার কারণে সব টাকা তাঁর নিজের কাছেই থাকত। কিন্তু আজ অনেক দিন হয়ে গেছে, সেই কাজে আর হাত দেয় না সে।

********** অপু আমার অফিসে যাওয়ার সময় হয়েছে। তাড়াতাড়ি ডাইনিংয়ে এসো। মেহজাবিন ডাইনিং টেবিলে নাশতা সাজিয়ে জোর গলায় অপুকে ডাকে। এই ডাকাডাকি অপুর ভালো লাগে না। ভাবে, এখন নাস্তার টেবিলে যাওয়ার কোনো মানেই হয় না।

বিছানা থেকে নামতেই মন চাইছে না। এ ছাড়া দাঁত ব্রাশ করা, হাত-মুখ ধুয়ে সতেজ হওয়া, যত সব অকাজ করতে হবে। সবকিছু এড়ানোর জন্য সে সোজা বিছানায় উল্টে পড়ে। ঘুমের ভান ধরে। কিন্তু কীসের কী? মেহজাবিন দ্বিতীয়বারের মতো ডেকেও যখন সাড়া পায় না, তখন অপুকে জাগানোর জন্য বেডরুমে চলে আসে।

আবারো ঘুমুতে যাচ্ছ? অপুকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে সে বিরক্তি প্রকাশ করে। কী ঘুমই ঘুমাচ্ছে রে বাব্বা। শুধু ঘুমোয়। তোমাকে উঠতেই হবে। সে নিজের শাড়ির আঁচল অপুর কানের ভেতর ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দিতে থাকে।

অপু জোর করে একবার মেহজাবিনের দিকে তাকায়। দ্রুতই আবার চোখ বুজে নেয়। আস্তে করে বলে- যাও একটু পরে উঠবো। মেহজাবিন কথাটা শুনে একটু পিছিয়ে আসে। আমার অফিসে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।

একটু পরে তোমাকে খাওয়াবে কে শুনি? অসুবিধা নেই। আমি খেয়ে নিতে পারব। বুঝেছি, তোমাকে মাতলামি পেয়ে বসেছে। বিড়বিড় করতে করতে, মেহজাবিন প্রচণ্ড বিরক্তির সাথে মাথা নাড়ে। কিছুক্ষণ কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবে, এতে গুরুত্ব দেয়ার কোনো মানেই হয় না।

তাই এভাবে সে এখান থেকে চলে যাবে না। পরক্ষণেই অপুর ওপরের হাতটা শক্ত করে ধরে। তারপর টানতে টানতে চেঁচিয়ে বলেÑ সেই সুযোগ তুমি আর পাবে না। সময়মতো না খেতে খেতে ইতিমধ্যে নিজের বারোটা বাজিয়েছ। তোমাকে উঠতে বলছি।

তুমি কি উঠবে? শুনছ আমার কথা? অপুর কাছে, এই টানাটানিও অসহ্য লাগছে। জোরাজুরিতে না পেরে, সে উঠে বসতে বাধ্য হয়। কিন্তু সহসাই কিছু বলে না। আনমনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর তাঁর কিছু একটা বলার আগেই মেহজাবিন বলে উঠে- তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে টেবিলে এসো।

অপু আরও কিছুক্ষণ মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কিছু বলার শক্তিটুকু যেন শরীরের কোথাও খুঁজে পায় না। মেহজাবিন চলে গেলে একটু পরই সে বিছানা থেকে নেমে আসে। মনট্রেক্সের হাতঘড়িটা তখনো ট্রাউজারের পকেটে। মিনিট কয়েকের মধ্যে তড়িঘড়ি দাঁত ব্রাশ করে, হাত-মুখ ধুয়ে, পুরো সতেজ অবস্থায় ড্রয়িংরুমে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে।

সাথে সাথে রান্নাঘর থেকে মেহজাবিনও এসে সামনাসামনি বসে। তখন একজনের মধ্যে তাড়াহুড়ো, আর আরেকজন শামুকের গতিতে নাশতা নাড়াচাড়া করছে। গুড মর্নিং সুরি। অপু হঠাৎ করেই কথাটি বলে উঠে। কীসের যে কী? মুখে বোকা বনে যাওয়া বেমানান একটা হাসি।

সে মেহজাবিন সুরির ‘সুরি’ অংশটা দিয়েই স্ত্রীকে ডাকে। কিন্তু সচরাচর যা কখনোই বলে না, মাতলামির ঘোরের কারণেই হয়তো এমন কথা বলে ফেলেছে। গুড মর্নিং। কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা লাজুক হেসে একবার মাথাটা নিচু করে মেহজাবিন প্রতি-উত্তর দেয়। এরপর তাঁদের মধ্যে আর কোনো কথা হয় না।

অপু আবারও অনেকক্ষণের জন্য মেহজাবিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। তার পরই একটা রুটি তুলে খেতে শুরু করে। একটু পর খাওয়ার ফাঁকেই হাসে। ভেতরে ভেতরে রহস্যময় সে হাসি। তা দেখে মেহজাবিন এর কারণ জিগ্যেস করে।

অপু বলে- কাল না পরশু জানি। পলাশ আমাকে নিয়ে ড্রাইভ করছিল। রাস্তায় গাড়ির সামনে কিছু পড়লে, বারবার ও হর্ন দেওয়ার বদলে, সরার জন্য চিৎকার শুরু করে। ফুল লোড ছিল। মাথা নষ্ট।

মেহজাবিন বিরক্তি নিয়ে বলে- তাইতো হওয়ার কথা। তারপর সে আরও বলে- ঠিক আছে, এতটুকুই। রাখ। আমি তোমার এসব মাতলামীর গল্প শুনতে চাই না। তাই? তুমিই না জানতে চাইলে।

ভেবেছিলাম অন্য কিছু। থাক। অপু আর কিছু বলে না। নীরব খেতে থাকে। খিদেও নেই।

একটু পরই মেহজাবিন নীরবতা ভেঙে জিগ্যেস করে- তুমি শেভ করছ না কেন? কীসের জন্য? কিছুটা হাসি এবং কিছুটা কৌতূহল নিয়ে অপু পাল্টা প্রশ্ন করে। মেহজাবিন দ্রুত বলে- কীসের জন্য আবার? এ অবস্থায় মুখে তো মুখই নেয়া যায় না। তুমি আজই শেভ করে বাসায় ফিরবে। শেভ করতে তো টাকা লাগে। টাকা পাব কোথায়? আমি দিয়ে যাব।

বলে মেহজাবিন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হঠাৎ করে কী যেন ভেবেই সিদ্ধান্ত বদলে, হাত তুলে তালু দেখিয়ে ইশারা করে- না, ঠিক আছে। বাসায় ফেরার পথে আমিই একটা রেজর কিনে নিয়ে আসব। শুনে অপু মুচকি হাসে। তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা কমে গেছে সেটা দেখে নয়।

বরং এই হাসির কারণটাই বড্ড হাসির। হাসিটা যে অকারণেই এলো। কিন্তু মেহজাবিন নিশ্চয়ই ভেবেছে, অপুকে শেভ করার টাকাটা দেয়া মানেই, বাজে খরচ হবে। এই টাকাটাও সে শেভ না করে নেশার পেছনে দিয়ে বাসায় ফিরবে। সুতরাং, দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নেওয়াই ভালো।

এভাবে দিনে দিনে সব ক্ষেত্রে নিজের গুরুত্ব কমে যাওয়া, সবার কাছে নিতান্তই হাসির পাত্র বনে যাওয়া, সবার করুণা-ভালোবাসা হারিয়ে ফেলা, মাতালদের এসবে কিছুই যায়-আসে না। তাঁরা তাঁদের মা-বাবাকে জ্বালিয়ে মারে, ভালবাসাকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে, কিন্তু কোনো কাজে আসতে চায় না। অপুর নাশতা খাওয়া শেষ পর্যায়ে। পেটে খিদে নেই, তাই অল্পতেই খাওয়া শেষ। চায়ের শেষ চুমুকটা দিতেই পাশের রুম থেকে মেহজাবিনের কণ্ঠ ভেসে আসে- অপু, আমার ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছি না।

তুমি কোথাও দেখেছ? অপু কিছু বলে না। নীরবে বসে থাকে। মেহজাবিন পাশের রুম থেকে ড্রয়িংরুমে এসে তাঁর কাছে দাঁড়ায়। আবারও জিগ্যেস করে- আমার হাতঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছি না। তুমি কোথাও দেখেছ? অপু এবারও কিছু বলে না।

নিশ্চুপ বসে থাকে। মেহজাবিন অধৈর্য হয়ে উঠে- তুমি কথা বলছ না কেন? হ্যাঁ অথবা না, কিছু একটা তো বলবে। বলো। না দেখলে না করে দাও। তোমার কাছে সময় নষ্ট না করে আমি অন্য কোথাও খুঁজে দেখতে পারি।

না, দেখিনি। অপু অকপটেই কথাটি বলে ফেলে। তারপর আরো বলে- না দেখলে মুখ বন্ধ করে রাখা ছাড়া কোনো উপায় আছে? কথার শেষ দিকে এসে অপু একেবারেই শক্তি হারিয়ে ফেলে। তাই কথাগুলোর মাঝে মেহজাবিন অবিশ্বাসের সুর শুনতে পায়। সে কিছুক্ষণ অপুর দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

তারপর মাথাটা কয়েকবার নাড়ায়- আমার বিশ্বাস হয় না। তুমি নিশ্চয়ই ঘড়িটা দেখেছ এবং জানো, সেটা কোথায়। বাহ রে, তুমি দেখি অনেক কথা বলছ। আমি অনেক কথা বলছি? নয়তো কী? একবার বলছ না জানলে যেন না করে দিই। এখন না করলাম তো আবার বলছ তোমার বিশ্বাস হয় না।

শুনি, কী করে বিশ্বাস করব? তুমি কি দিনের পর দিন, এসব করছ না? করছি তো কী হয়েছে? তার মানে, তুমি কী বলতে চাইছ? মেজাজের ওপর সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, মেহজাবিন এগিয়ে যায়। অপুকে টি-শার্ট ধরে চেয়ার থেকে টেনে তুলে। তারপর প্রচণ্ড রেগেমেগে তাঁকে যতটা পারে ঝাকাতে ঝাকাতে বলে- এটা আমাকে আমার ভালোবাসার মানুষ দিয়েছিল। বুঝলে অমানুষ, তুমি নও। ঘড়িটা দিয়ে দাও বলছি।

দিয়ে দাও। কেন জানি কোনো অনুভূতি ছাড়াই, অপু মেহজাবিনের রাগের কোনো জবাব দেয় না। মনে হয়, যেন তাঁর জয়গায় তুচ্ছ একটা জড়বস্তু দাঁড়িয়ে আছে। পাতলা, কোনো ওজন নেই। যেদিকে টানা হয়, সেদিকেই হেলে পড়ে।

মেহজাবিনের এই টানাটানির মাত্রা একটু কমে এলে, সে সুন্দর করে হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। তারপর সুবোধ বালকের মতো প্যান্টের পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে দেয়। ঘড়িটা হাতে পেয়ে মেহজাবিন ক্রোধে, আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে অপুর দিকে তাকায়। চোখের কোণে তাঁর, জল চিক চিক করছে। হঠাৎ করেই সেই নদীর বাঁধ যেন আরো বেশি ভেঙে পড়ে।

হয়তো সেটা আড়াল করতেই, তড়িঘড়ি করে ছোট্ট ব্যাগটা হাতে সে পা বাড়ায় কর্মস্থলের উদ্দেশে। (((((চলবে...।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.