আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩। দ্রৌপদী। পর্ব ৭

ভাগ্যের ভাটিযাত্রায় সম্রাজ্ঞী দ্রৌপদী এখন স্বৈরিন্ধী ছদ্মনামে মৎস্যদেশের রাণী সুদেষ্ণার দাসী। বহু হিসাব নিকাশ কইরাই তেরো নম্বর বচ্ছরে অজ্ঞাতবাস করতে পাণ্ডবরা বাইছা নিছে মৎস্যদেশের রাজা বিরাটের প্রসাদ। পাশাখেলার শর্ত হিসাবে দুর্যোধন যদি এখন পাণ্ডবদের খুইজা বাইর করতে পারে তয় আরো বারো বচ্ছরের বনবাস আর এক বচ্ছর অজ্ঞাতবাস এবং সেই অজ্ঞাতবাসেরও শর্ত একই সেইম...
বিরাট রাজা পাশামশগুল আর শকুনির হাতে ধরা খাওয়ার পর গত বারো বচ্ছর প্র্যাকটিস কইরা যুধিষ্ঠির এখন পাশা এক্সপার্ট। কঙ্ক নাম নিয়া যুধিষ্ঠির দখল কইরা ফালায় বিরাট রাজার পাশাসঙ্গীর পদ। ভীম খায় যেমন বেশি রান্নাও করে ভালো; বল্লব ছদ্মনামের ভীম জায়গা পায় বিরাটের বাবুর্চিখানায়।

অর্জুনের পক্ষে ছদ্মবেশ নেওয়া কঠিন। কারণ ধনুকের ছিলার ঘষায় তার বাহুতে যে দাগ পড়ছে তা দেইখা যেকোনো আন্ধায়ও তারে তিরন্দাজ বইলা চিনা নিতে পারে। তাই বাজুবন্ধ জাতীয় অলংকার দিয়া বাহুর দাগ ঢাইকা কানে দুল- হাতে শাঁখা- চুলে বেণি কইরা ছাইয়া পোশাকে হিজড়া হইয়া সে গিয়া খাড়ায় বিরাটের কাছে- মোর নাম বৃহন্নলা। বাড়ির মাইয়াগো নাচ-গান-বাদ্য শিখাইবার চাকরি প্রার্থনা করি মহারাজ....
পাঁচ বচ্ছরের অস্ত্রসংগ্রহকালে গন্ধর্বরাজ চিত্রসেনের কাছে শিখা নাচ-গান-বাজনার বিদ্যায় বিরাটের পরীক্ষায় পাশ দিয়া মহিলামহলের ড্যান্স মাস্টারের পদ পায় বৃহন্নলা অর্জুন। গ্রন্থিক নামের নকুল চাকরি পায় বিরাটের ঘোড়াশালে- তান্তিপাল নামের সহদেব হয় বিরাটের গরুর রাখাল আর নিজেগো মধ্যে কথাবার্তার লাইগা আরো পাঁচটা গুপ্তনাম রাখে পাঁচ ভাই- জয়-জয়ন্ত-বিজয়-জয়সেন আর জয়দবল...
পাণ্ডবেরা জীবনে মানুষ খাটাইছে কিন্তু মাইনসের বাড়িতে খাটে নাই তাই আসার আগে পুরোহিত ধৌম্য তাগোরে শিখাইয়া দেন রাজার বাড়িতে থাকার কিছু নিয়ম কানুন- পয়লা কথা হইল রাজার বাড়ি থাকার সময় না শব্দটা এক্কেবারে ভুইলা গিয়া রাজার সকল কথায় হ্যাঁ জনাব- জ্বি জনাব বলাটা আয়ত্ব করতে হবে সবার।

রাজা যদি মিথ্যাকথা কন; তয় তারে সত্য বইলা মাইনা নিতে হবে না হয় ধইরা নিতে হবে তোমার কান তা শোনে নাই। রাজা যেখানে বসেন; তা আসন হোক আর হাতিঘোড়াই হোক তাতে বসলে যেমন বেয়াদবি হয় তেমনি রাজার মুখামুখি বসাও মারাত্মক বেয়াদবি। রাজার পেছনদিকে থাকে বডিগার্ড তাই রাজার ডানে কিংবা বামেই বসা লাগে মুখে তালা দিয়া। রাজারে কোনোভাবেই কোনো উপদেশ যেমন দেয়া যাবে না তেমনি রাজার সামনে নিজের বুদ্ধি কিংবা বীরত্বেরও বড়াই করা যাবে না। কিছু কইতে হইলে কওয়ার আগে রাজারে কিছু তেলমারা যেমন নিয়ম তেমনি কথার উপসংহার যেন রাজার পক্ষেই যায় সেইটাও চিরস্মরণীয় বিধান।

কথাবার্তা যা কওয়ার কইতে হইব আস্তে এবং বিনয়ের সাথে অনুমতি নিয়া। হাহা কইরা হাসা যাইব না- রাজার কথায় খুশিতে ডগমগ হওয়া যাইব না আবার দুঃখে কাঁদুকাঁদুভাবও দেখান যাইব না। হাঁটাচলা করতে হইব নিঃশব্দে। আর ফাইনাল কথা হইল রাজবাড়ির মেয়েদের সাথে পিরিতি- শত্রুগো লগে খাতির আর রাজার সামনে হাঁচি-কাশি-থুতু-পাদ-ঢেকুর এক্কেবারে নিষিদ্ধ জিনিস...
পাণ্ডবগো অজ্ঞাতবাসের মন্ত্রণা জানল শুধু ধৌম্য আর কৃষ্ণ। দ্রৌপদীর সকল দাসদাসী- বাবুর্চি- রথের সারথি আর বাকিসব কর্মচারিগো সাথে যুধিষ্ঠিরের অগ্নিহোত্র নিয়া ধৌম্য চইলা গেলো পাঞ্চাল দেশে।

ঘোড়া-রথ-গরুবাছুর গেলো দ্বারকায় কৃষ্ণের জিম্মায়... আর অস্ত্রগুলা লুকানো থাকল মৎস্যদেশে ঢোকার মুখে বিশাল একটা গাছের ডালে বান্ধা অবস্থায়...
বিরাটের ঘরে দশমাস ভালোই গেলো সকলের। খালি দ্রৌপদীর রূপ নিয়া একটু দুশ্চিন্তায় থাকলেন বিরাটের রাণী সুদেষ্ণা; যদি রাজার চোখে এই রূপ পড়ে তো নির্ঘাত তার কপালটা পুইড়া যাইতে পারে। এর মধ্যে একদিন মৎস্যদেশে আইসা উপস্থিত সুদেষ্ণার ভাই আর বিরাটের সেনাপতি কীচক। দ্রৌপদীরে দেইখা তার চক্ষু ছানাবড়া...
রাজবাড়ীর দাসীর কাছে ঘুরাইন্যা পেচাইন্যার কিছু নাই তাই কীচক সরাসরি যায় দ্রৌপদীর কাছে- বহুত টেকাপয়সা আর বৌয়ের সম্মান দিমু দাসী; তুই মোর কাছে আয়...
দ্রৌপদী বিনয়ের মধ্যেই থাকে- আমি মহাশয় একজন বিবাহিতা নারী; তার উপ্রে আমার স্বামীর সংখ্যা পাঁচ; তার উপ্রে তারা আবার একটু জাউরা কিসিমের। ...এইসব করতে গেলে আমার ডর লাগে তাগোর হাতে না আমার লগে আপনারও জান যায়...
বিরাটের সেনাপতি সে।

দাসীর স্বামীরে ডরানোর কী কাম তার। সোজা আঙুলে যখন ঘি উঠে না তখন সে তার বইনের কাছে যায়- তোমার দাসীরে আমার ঘরে বন্দোবস্ত করো বইন...
সুদেষ্ণা দেখেন ভালৈতো। এই স্বৈরিন্ধীরে যদি স্বামীর চোখ থাইকা সরাইতে হয় তবে তারে ভাইয়ের ঘরে ঠেইলা দেওয়াটাই ভালো। তিনি কন- তুই ঘরে যা। আমি মদ আনার লাইগা তারে তোর ঘরে পাঠামু আইজ।

তারপর যা করার কইরা নিবি তুই...
দ্রৌপদী মদ আনতে কীচকের ঘরে যাইতে গাঁইগুই করে- আপনের ভাইরে আমার কেমন জানি লাগে। আপনে মদ আনতে অন্য কাউরে পাঠান...
সুদেষ্ণা কয়- আমি পাঠাইছি জানলে কীচক তোমারে কিছুই করব না। যাও...
কীচকের ঘরে পৌঁছাইলে কথা দিয়া দ্রৌপদীরে পটাইতে না পাইরা কীচক তার কাপড় ধইরা টানে। দ্রৌপদী কাপড় টাইনা নিলে কীচক ধরে হাত। এইবার দ্রৌপদী তারে ধাক্কা দিয়া দৌড় লাগায় রাজসভার দিকে আর পিছন পিছন গিয়া সকলের সামনে চুলের মুঠায় ধইরা কীচক দ্রৌপদীরে লাগায় কয়খান লাথি...
যখন সে সম্রাজ্ঞী আছিল তখন পাঁচ স্বামীর সামনে তার লাঞ্ছনার সময় ভীম আগাইতে গেলে আটকাইছে অর্জুন আর আইজ দাসী অবস্থায় ভীমেরে আটকায় যুধিষ্ঠির।

তাই দ্রৌপদী কাইন্দা বিচার চায় বিরাটের কাছে। কিন্তু এক দাসীর লাইগা নিজের শালার আর কী বিচার করব বিরাট...
দ্রৌপদী কান্দে আর যুধিষ্ঠির কয়- ভিত্রে যাও। এইখানে কান্নাকাটি করলে সভাসদের পাশা খেলায় ডিস্টাব হয়...
রাইতে সে যায় বল্লব ভীমের ঘরে- যুধিষ্ঠির যার স্বামী তার কপালে দুঃখ ছাড়া আর কিছু থাকব না সেইটা আমি জানি কিন্তু শুইনা রাখো ভীম। আগামীকাল সূর্য উঠা পর্যন্ত যদি কীচক বাইচা থাকে তবে বিষ খাওয়া দ্রৌপদীর মরামুখ দেখবা তুমি কাইল...
ভীম তারে থামায়- প্রকাশ্যে করা যাবে না কিছু। তুমি তারে কাইল সন্ধ্যায় অন্ধকার নাচঘরে আসার লোভ দেখাও..
পরেরদিন কীচক আবার দ্রৌপদীরে আটকায়- দেখলাতো; আমারে কিছু কওয়ার সাহস রাজারও নাই।

তাই তোমারে কই; এখনো সময় আছে লাইনে আসো; টেকাপয়সা যা চাও তা দিমুনে...
দ্রৌপদী হাইসা কয়- জানো তো আমি পরের বৌ। যদি কথা দেও যে তোমার আমার মোলাকাতের কথা কেউ জানব না আর আসার সময় একলাই আসবা তাইলে তোমার প্রস্তাবে আমি রাজি...
সন্ধ্যা-রাত্তিরে একলা অন্ধকার নাচঘরে হাতড়াইয়া দ্রৌপদীরে পাইতে গিয়া কীচক সাক্ষাত পায় ভীমের। তারপর দ্রৌপদী গিয়া সকলরে ডাকে- নাচঘরে গিয়া দেখো আমার লগে বেয়াদবি করতে গিয়া আমার স্বামীগো হাতে কী দশা হইছে কীচকের...
সক্কলে গিয়া দেখে নাচঘরে পইড়া আছে কীচকের ভর্তা। কীচকের লাশ নিতে গিয়া দ্রৌপদীরে খাড়াইয়া হাসতে দেইখা কীচকের চ্যালারা কয়- তোর লাইগা সেনাপতি মরছে তাই তোরেও তুইলা দিমু সেনাপতির চিতায়...
কীচকের ]‌চ্যালারা দ্রৌপদীরে বাইন্ধা রওনা দেয় আর দ্রৌপদী লাগায় এক চিক্কুর- জয় জয়ন্ত বিজয় জয়সেন জয়দবল...
চিৎকারটা যে শোনার সে ঠিকই শোনে। কাপড় দিয়া মুখ বাইন্ধা ঘুরপথে গিয়া একটা গাছ উপড়াইয়া উপকীচকগো সামনে খাড়ায় ভীম আর সবগুলারে চ্যাপ্টা করার পর দ্রৌপদী একপথে আর ভীম ঘুরপথে যখন রাজবাড়ি যায় তখন মৎস্যদেশের লোকজন দ্রৌপদীরে দেইখা ডরে কাঁপে আর ছাইয়া বেশি অর্জুন আইসা জিগায়- হুনলাম কি জানি গিয়াঞ্জাম হইছে? কওতো কেমনে কী হইল পরে?
দ্রৌপদী কয়- মাইয়ালোকের মাঝখানে তো আরামেই আছো।

খামাখা এক দাসীর দুঃখ শুইনা তোমার কী কাম? অর্জুন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে- হ। সকলেরই দুঃখ আছে খালি আমার কিছু নাই...
এক দাসীর লাইগা এক সন্ধ্যায় মারা গেছে সেনাপতি আর ভোরবেলা একশো পাঁচজন সৈনিক। রাজা বিরাট গিয়া রাণী সুদেষ্ণারে কয়- তোমার দাসীরে যেখানে ইচ্ছা সেইখানে যাইতে কও। তার স্বামীরা কোনদিন জানি আমারেও মাইরা ফালায়...
রাণী সুদেষ্ণার কথায় দ্রৌপদী কয়- অতদিন যখন রাখছেন আর তেরোটা দিন আমারে থাকতে দেন...
পুরা একটা বচ্ছর পাণ্ডবগো গরু খোঁজা খুঁজছে দুর্যোধন কিন্তু কোথাও কোনো সংবাদ পায় নাই। একেকবার মনে হইত মনে হয় বাঘে ভাল্লুকের পেটে গিয়া মইরা গেছে সব; কিন্তু আবার মনে হয় অতটুকু আশা করা চূড়ান্ত বেকুবি ছাড়া কিছু না।

অবশেষে কীচকের মরণবর্ণনা আর গাছের বাড়িতে একশোপাঁচ উপকীচকের চ্যাপ্টা হওয়ার সংবাদে লাফ দিয়া উঠে দুর্যোধন- পাইছি। এমন মাইর ভীম ছাড়া মারতে পারে না কেউ। আমি নিশ্চিত ওই সবগুলা মৎস্যদেশেই ঘাপটি মাইরা আছে... এখন গিয়া যদি তাগোরে ধরা যায় তবে নির্ঘাত আরো বারো বচ্ছরের বনবাস...
সাজাও সৈন্য লাগাও যুদ্ধ...
দুর্যোধনের বন্ধু ত্রিগর্তরাজ সুশর্মা মৎস্যদেশের দক্ষিণ দিকে আক্রমণ কইরা বিরাটের বহু গরুবাছুর দখল কইরা নেয়। সংবাদ পাইয়া সৈন্যদের লগে যুধিষ্ঠির ভীম নকুল সহদেবরে নিয়া দক্ষিণ সামলাইতে আইসা সুশর্মার হাতে বিরাট রাজা ধরা খাইলে যুধিষ্ঠির কয়- অতদিন যার ভাত খাইলাম তার বিপদে তো সাহায্য করতে হয় ভীম। একটু আউগাও দেখি...
ভীম থাবা দিয়া গাছ উপড়াইতে গেলে যুধিষ্ঠির দাবড়ানি দেয়- হালা বেকুব।

গাছ উপড়াইয়া লড়াই করতে গেলে পাব্লিকে যে তোরে চিনা ফালাইব সেই খেয়াল আছে তোর? গাছ বাদ দিয়া অন্যকিছু নে...
বিরাটরে মুক্ত কইরা সুশর্মারে চটকনা দিয়া গরুবাছুর উদ্ধার কইরা গদাই লস্করি চালে রাজা বিরাটের লগে চার পাণ্ডব বিজয় উদযাপন করে মৎস্যদেশের দক্ষিণ সীমানায় আর ঠিক তখনই দেশের উত্তর সীমানায় ভীষ্ম-কৃপ-দ্রোণ-কর্ণ-অশ্বত্থামারে নিয়া আক্রমণ শানায় দুর্যোধন...
রাজধানীতে যখন উত্তর সীমান্তের সংবাদ আসে তখন বাড়িতে একলা বেটামানুষ বিরাটের পোলা উত্তর। সংবাদ শুইনা মহিলামহলে গিয়া উত্তর লাফায়- ভীষ্ম-কৃপ-দ্রোণ-কর্ণ-অশ্বত্থামা-দুর্যোধনরে আমি একলাই প্যাদানি দিয়া চ্যাপ্টা কইরা দিতে পারি কিন্তু আমার রথের সারথি তো মইরা গেছে কিছুদিন আগে। যুদ্ধের লাইগা আমি তো যথেষ্ট কিন্তু আমার ঘোড়া চালাইব কেডায়?
উত্তরের ভড়ং দেইখা দ্রৌপদী কয়- যুবরাজ। তোমার বইন উত্তরার হিজড়া ডান্স মাস্টার কিন্তু খুব ভালো রথ চালাইতে জানে। দ্রৌপদীর কথা শুইনা উত্তরা দৌড়াইয়া যাইয়া অর্জুনরে ধরে- খালি সারথির অভাবে আমার ভাই আইজ ভীষ্ম-কৃপ-দ্রোণ-কর্ণ-অশ্বত্থামা-দুর্যোধনরে মারতে পারতাছে না।

তুমি নাকি রথ চালাইতে জানো? তয় যাও না আমার ভাইটার লগে...
উত্তরের তাফালিং দেইখা অর্জুন হাসে আর উল্টাপাল্টা কইরা বর্ম-কবচ পরতে গিয়া উত্তরারে হাসায়। বীর পুরুষের বেশে রথে উইঠা বৃহন্নলার ঘোড়া দাবড়ান দেইখা টাসকি খায় উত্তর যুবরাজ আর কাছে গিয়া দুর্যোধন বাহিনীর আওয়াজ শুইনা মিনতি শুরু করে অর্জুনের কাছে- ও খালাম্মা গো। বাজানে সকল আর্মি নিয়া গেছে। আমি একলা একটা ছুটু মানুষ; অতগুলা মাইনসের লগে আমি কেমনে কী করি তুমি কও। তোমার পায়ে ধরি গো খালাম্মা তুমি রথ ফিরাও... যুদ্ধ করব না আমি...
লাফ দিয়া রথ ছাইড়া উল্টা দিকে দৌড় লাগায় উত্তর আর চুড়ি বাজাইয়া বেণি দুলাইয়া গিয়া তারে চুলের মুঠায় ধইরা আটকায় অর্জুন আর তা দেইখা হাসে দুর্যোধনের সৈন্য-সেপাই- হালার একটা কাপুরুষ আর একটা আধাপুরুষের লগে মারামারি করতে নি অতবড়ো বাহিনী আনছে দুর্যোধন?
উত্তররে রথে তুইলা অর্জুন কয়- যুদ্ধ করা লাগবো না তোর।

তুই রথ চালা...
উত্তররে নিয়া অর্জুন সেই অস্ত্রলুকানো গাছের কাছে গিয়া তারে ডালটা দেখায়- গাছে উঠ...
গাছ থিকা নাইমা উত্তরের হার্টএটাক হইবার জোগাড়- এইগুলা কার হাতিয়ার? অর্জুন কয়- পাণ্ডবগো। উত্তর কয়- তারা তবে কই? অর্জুন কয়- তোমার বাপের লগে যে পাশা খেলে সে যুধিষ্ঠির। যে লোকটা তোমাদের রান্না পাকায় সে ভীম; তোমার সামনে খাড়া অর্জুন- ঘোড়ার পাহারাদার নকুল আর গরুর রাখালটা হইল সহদেব....
উত্তর কয়- তোমার কাণ্ডে তাব্দা খাইলেও বিশ্বাস যাইতে কষ্ট হয় তোমরাই পাণ্ডব। তয় তুমি যদি অর্জুনের দশটা নাম কইতে পারো তবে তোমার সকল কথা মাইনা নিমু আমি...
- ধনঞ্জয়-বিজয়-শ্বেতবাহন-ফালগুন-কিরীটি-বিভৎসু-সব্যসাচী-অর্জুন-জিষ্ণু আর কাইলা বইলা ছুডুকালে বাজানে ডাকত কৃষ্ণ... হইছেনি দশটা নাম?
ধনুকের টংকার শুইনাই দ্রোণ কয়- নিশ্চিত অর্জুন। দুর্যোধন কয়- তাইলেতো সোনায় সোহাগা।

অজ্ঞাতবাসের এক বচ্ছর পূর্ণ হইবার আগেই ধরছি তারে। এখন নিশ্চিত আরো বারো বচ্ছর বনবাস। দ্রোণ কয়- তার তীর সামলাইতে হাগা বাইরাইব এখন; বনবাসতো পরে। দুর্যোধন কয়- এই বুড়া খালি অর্জুন অর্জুন করে। এরে পিছনে যাইতে কও...
কর্ণ সর্বদাই দুর্যোধনের পক্ষ আর অর্জুনের বিপক্ষে থাকে।

বাপের অপমানে অশ্বত্থামা দুর্যোধনরে কিছু কইতে না পাইরা কর্ণের লগে কাইজা বাধায়। ভীষ্ম কাইজা থামাইয়া দুর্যোধনরে দিয়া গুরু দ্রোণের কাছে মাপ চাওয়ায় আর কৃপ-দ্রোণ-কর্ণ-ভীষ্মের তেলানিতে দ্রোণ তারে মাপ কইরা দিলে জ্যোতিষ-টুতিশ নক্ষত্র গণনা কইরা ভীষ্ম কয়- হ। তেরো বচ্ছর তো পুরা হইয়া গেছে তাগো...
দুর্যোধন কয়- আমার হিসাবে এখনো তিন দিন বাকি। ভীষ্ম কয়- তোমার হিসাব ভুল। তেরো বচ্ছর পুরা না হইলে অর্জুন দেখা দিতো না তোমারে।

দুর্যোধন কয়- আপনে বরাবরই পাণ্ডবগো সাপোট করেন; এখনো করতাছেন আর ভবিষ্যতেও করবেন। কিন্তু জাইনা রাখেন; বচ্ছর পুরা হউক আর না হউক। পাণ্ডবগোরে একমুঠা মাটিও ফিরাইয়া দিমু না আমি। আপনে যুদ্ধের আয়োজন করেন...
যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হইলে চাইর ভাগের একভাগ সৈনিক নিয়া দুর্যোধন রওয়ানা দেয় হস্তিনাপুরের দিকে। একভাগ সৈনিক সামলায় দখল করা ষাট হাজার গরু আর বাকি দুইভাগ তৈয়ারি হয় অর্জুনের মোকাবেলায়..
অর্জুন উত্তররে কয়- রথ ঘোরাও।

আগে গরু আর দুর্যোধনরে ধরি...
দ্রোণ বুইঝা ফালান অর্জুনের প্লান। তিনি সবাইরে নিয়া রওয়ানা দেন অর্জুনের পিছে। কিন্তু পৌছাইবার আগেই গরু উদ্ধার কইরা দুর্যোধনরে ধাওয়া করে অর্জুন। এমন সময় কুরুবাহিনী দেইখা অর্জুন কয়- মুরব্বিরা থাউক। তুমি ঘুরুন্টি দিয়া কর্ণের কাছে যাও...
অর্জুনের হঠাৎ আক্রমণে কর্ণ পিছাইলে কৃপাচার্য আগাইতে আইসা রথের ঘোড়া খোয়াইয়া ভাগল দিলে অর্জুন মুখামুখি হয় দ্রোণের- আপনে আমার গুরু।

আপনেরে মারব না আমি...
দ্রোণ কয়- আমি দুর্যোধনের ভাত খাই। তুমি না মারলেও তোমারে যে আমার মারতে হবে বাপ... অর্জুন কয়- ঠিকাছে তয় তীর চালান...
দুইজনেই দুইজনের আশপাশ দিয়া কতক্ষণ তীরাতিরি করে আর বাপেরে অর্জুনের লগে যুদ্ধ করতে দেইখা অশ্বত্থামা আগাইয়া আসলে চামে কাইটা পড়ে দ্রোণ। অশ্বত্থামার তীর শেষ হইলে তারে ছাইড়া কর্ণের শরীরে একটা তীর বিধাইয়া অর্জুন গিয়া তীরাতিরি শুরু করে ভীষ্মের সাথে। এর মাঝে দুর্যোধন আইসা পড়লে ভীষ্মের দেহে একটা তীর ঢুকাইয়া অর্জুন সরাসরি তীর চালায় দুর্যোধনের দিকে...
তীর খাইয়া দুর্যোধন রক্তবমি করতে করতে দৌড়ান দিলে অর্জুন রওয়ানা দেয় রাজধানীর দিকে। ফিরতে ফিরতে উত্তররে কয়- খবরদার।

বাড়ি গিয়া আমার পরিচয় দিবা না কলাম। বলবা যা কিছু ঘটছে তার সবই ঘটাইছ তুমি...
বাড়ি ফিরা বিরাট রাজা আছড়ায় কপাল- ভীষ্ম-কৃপ-দ্রোণ-কর্ণ-অশ্বত্থামা-দুর্যোধনের লগে যুদ্ধ করতে গেছে তার নাদান পোলা এক হিজড়ারে নিয়া। সে বুক থাবড়ায় আর কয়- তোমরা আউগাইয়া দেখো আমার পোলায় অতক্ষণ বাইচা আছে কি নাই...
কিন্তু উত্তরের সন্ধানে নামার আগেই লোকজন শোনে জয়জয় ধ্বনি। সবাইরে ডিফিট দিয়া গরু নিয়া ফিরতাছে উত্তর। পোলার কীর্তি দেইখা বিরাট লাফ দিয়া উঠলে উত্তর কয়- আমি কিছু করি নাই।

একজন দেবতা আইসা যা কিছু করার কইরা দিয়া চইলা গেছেন আবার...
তিনদিন পর অজ্ঞাতবাসের এক বচ্ছর পূর্ণ হইলে পাণ্ডবেরা বিরাটের কাছে নিজেগো পরিচয় দেয়। বিরাট তাব্দা খাইয়া কয়- অতবড়ো মানুষগুলা যখন অতদিন আমার বাড়িতে ছিলেন তখন এই চিনপরিচয়ের সূত্রটারে আমি আত্মীয়তায় স্থায়ী কইরা নিতে চাই অর্জুনের লগে আমার মাইয়া উত্তরার বিবাহ দিয়া...
অর্জুন কয়- আপনের কইন্যা আমাগের ঘরে যাবে। তয় সেটা হবে আমার পুত্রবধূ হিসাবে। আমার পোলা আর কৃষ্ণের ভাগিনা অভিমন্যুর সাথে বিবাহ হইব তার...
অর্জুনের প্রস্তাবে দ্রৌপদী মুখটিপা হাসে। এমন বিবাহের প্রস্তাব অর্জুন কেন ফিরাইয়া দিছে আর কেউ না জানুক; দ্রৌপদী তো জানে...
২০১৩.১১.১৫ শুক্রবার
মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী।

৩। দ্রৌপদী। পর্ব ৬ মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩। দ্রৌপদী।

পর্ব ৫ [ঘটোৎকচ ৩] মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩। দ্রৌপদী। [পর্ব ৪: ঘটোৎকচ ২] মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩।

দ্রৌপদী। [পর্ব ৩: ঘটোৎকচ] মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ৩। দ্রৌপদী। পর্ব ২ মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী।

৩। দ্রৌপদী। পর্ব ১ মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ২। কুন্তী [পর্ব ৩] মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী।

২। কুন্তী [পর্ব ২] মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ২। কুন্তী [পর্ব ১] মহাভারতে তিন রাজনৈতিক নারী। ১।

সত্যবতী

সোর্স: http://www.sachalayatan.com/     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।