আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

বীরের মুখে যুদ্ধের গল্প

আপনার শৈশব-কৈশোর কোথায় কেটেছে।

আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে চাঁদপুর জেলায়। আমার জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানার মদনেরগাঁও গ্রামের চৌধুরী পরিবারে।

আমার আব্বা আবদুল আজিজ চৌধুরী ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। আমার মা মাজেদা খাতুন ছিলেন হাজীগঞ্জ থানার কাঁঠালি গ্রামের কাজী পরিবারের সন্তান।

অপূর্ব সুন্দরী ছিলেন আমার মা। ৯ বছর ঘরসংসারের পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে আমার মা অকালে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর সময় আমার বয়স ছিল মাত্র দুই বছর।

আমি আমাদের গ্রাম মদনেরগাঁওয়ের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা করি। ১৯৪৫ সালে পাশর্্ববর্তী গ্রাম মানিকরাজ জুনিয়র হাইস্কুলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী অধ্যয়ন করি।

১৯৪৭ সালে আবার আমার গ্রামের চান্দ্রা ইমাম আলী হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে ৪ বছর পর ১৯৫১ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি। এরপর ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি ভর্তি হই। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শারীরিক অসুস্থতা ও পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা চালানো সম্ভব হয়নি। ওই সময় আমি মারাত্দক কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলাম। আমি ১৯৫৪ সালে চাঁদপুর কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ১৯৫৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করি।

 

আপনি তো ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আমি কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়াইনি। তবে ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর 'উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা' ঘোষণা আমার তরুণ মনকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ন করেছিল। তাই মহান ভাষা আন্দোলনে যোগদানের বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল। তখন আমি ছিলাম ঢাকা কলেজের ছাত্র।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে আমিও একত্র হয়েছিলাম। ঐতিহাসিক সে সভায় সিদ্ধান্ত হলো, আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করব। শুরু হয় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মিছিল ও পদযাত্রা। আমাদের মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে শুরু হয় ব্রাশফায়ার।

গুলিবিদ্ধ হলেন রফিক। তার অবস্থান ছিল আমার থেকে মাত্র দু-তিন গজ দূরে। মুহূর্তের মধ্যে তার মাথার খুলি উড়ে গিয়ে মগজ মাটিতে পড়ে যায়। ওই দৃশ্য দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরে পেয়ে আমরা তিনজন রফিকের মৃতদেহ তুলে নিয়ে যাই ঢাকা মেডিকেল কলেজে।

এই মর্মান্তিক ঘটনা আমার মনে দারুণ রেখাপাত করে। রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত, শফিউরের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের মাতৃভাষা।

 

সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন কখন?

ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভের পরপরই ১৯৫৭ সালে আমি ঢাকা বিমানবন্দরে এয়ারপোর্ট অফিসার হিসেবে নিয়োগ পাই। এ পদের প্রশিক্ষণে থাকাকালীনই আমি সেনাবাহিনীতে পরীক্ষা দিই। পরে পরীক্ষায় পাস করায় আন্তঃবাহিনী নির্বাচন বোর্ডে উপস্থিত হওয়ার জন্য ডাক পাই।

সেটিও আমি সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করি। এরপর ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে আমি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটে অবস্থিত অফিসার্স ট্রেনিং স্কুলে [ওটিএস] যোগদান করি। সেখানে ৯ মাসের কঠিন প্রশিক্ষণের পর ১৯৫৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করি। পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করার পর ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে মেজর হিসেবে পদোন্নতি পাই। সে সময় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বাঙালিদের প্রতি অন্যায়-অত্যাচারের পরিধি দেখে হতাশ হয়ে পড়ি।

তখন প্রতিকারের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় এলো সত্তরের সাধারণ নির্বাচন; আওয়ামী লীগ তথা বাঙালিদের অভূতপূর্ব সাফল্য। আমি তখন লাহোর সেনানিবাসে। নির্বাচনোত্তর পরিবেশ ও পরিস্থিতি দেখে বুঝতে আমাদের কষ্ট হয়নি, অচিরেই বাংলার ওপর নেমে আসবে বিরাট আঘাত। তাই রাওয়ালপিন্ডি সেনাসদরের দুজন বাঙালি অফিসারের সহায়তায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে বদলি নিয়ে সুদূর কলম্বো ঘুরে ঢাকায় এসে পেঁৗছলাম ১৯৭১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি।

পিলখানা থেকে আমাকে পাঠানো হয় চুয়াডাঙ্গা ৪ নম্বর উইংয়ের অধিনায়ক হিসেবে। এই উইংয়ের ইতিহাসে আমিই প্রথম বাঙালি অধিনায়ক। উইংয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করি ২৫ ফেব্রুয়ারি।

পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের অঙ্গনে পা রেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, রাইফেলসের প্রত্যেক বাঙালি সেনা ঘোরতরভাবে পাকিস্তানবিরোধী। ৪ নম্বর উইংয়ের সব কোম্পানি অধিনায়কই ছিলেন বাঙালি।

তবে ২০ শতাংশের মতো সেনা ছিল অবাঙালি, যার বেশির ভাগই থাকত উইং সদরে।

 

মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন কখন।

২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানিরা বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর ২৬ মার্চ চুয়াডাঙ্গায় আমার উইং সদরে এসে বুঝতে পারলাম, প্রত্যেক সৈনিক আমার হুকুমের অপেক্ষায়। শুধু তা-ই নয়, অবাঙালি সেনাদেরও নিরস্ত্র ও গৃহবন্দী করে রেখেছে। কালবিলম্ব না করে জরুরিভিত্তিতে স্থানীয় রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক নেতা, স্কুল-কলেজের প্রধান, ছাত্রনেতা, পুলিশ, আনসার ও বেসামরিক বিভিন্ন স্তরের অফিসারকে নিয়ে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করলাম।

বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে আমি বললাম, 'ভাইসব, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদেরই মাটিতে বসে আমাদের সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা শুরু করেছে। শাসনভার হস্তান্তরের দেনদরবার সব ভাঁওতাবাজি, বরং বুলেটের মাধ্যমে তারা বাঙালিদের ঠাণ্ডা করে চিরতরে গোলাম করে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে। টিক্কা খানের হাতে সেই নীলনকশা হস্তান্তর করে ইয়াহিয়া পালিয়ে গেছে তার দেশে। আপনারা শুনেছেন, ইতোমধ্যে তারা ইপিআর হেডকোয়ার্টার পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন গুড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মেরে দিয়েছে গণকবর।

সারা দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। আমরা জানি না, দেশের কোথাও কেউ তাদের এ গণহত্যার প্রতিবাদ করেছে কিনা। আমরা জানি না, কেউ তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে কিনা। এ অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করা আত্দহত্যারই নামান্তর, তবু আমরা জীবন দিয়ে হলেও এ জঘন্যতম গণহত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব; পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী মানুষ যেন বলতে না পারে, বাঙালি বুলেটের ভয়ে গোলামিকেই বেছে নিয়েছে। ' উপস্থিত সবাই আমার ঘোষণায় জয়-বাংলা বলে ওঠে এবং সর্বশক্তি দিয়ে আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার শপথ নেয়।

সবকিছু পর্যালোচনা করে বৈঠক শেষে বাইরে এসে দেখি, হাজার হাজার মানুষ আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ। জনতার মিছিল নিয়ে আমরা উইং সদরে কোয়ার্টার গার্ডের সামনে সমবেত হই। পাকিস্তানি পতাকা অপসারণ করে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি এবং 'রাষ্ট্রীয় অভিবাদন' জানাই। সে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তারপর অনেক রাত পর্যন্ত আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস করি।

বেতার বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সীমানায় অবস্থিত চার কোম্পানি সেনাকে আমার পরবর্তী নির্দেশের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলি। পদ্মা-মেঘনার পশ্চিমাঞ্চলকে 'দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন' নামকরণ করে আমি সর্বসম্মতিক্রমে এলাকার সর্বাধিনায়ক রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করি।

মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কিনা?

২৬ মার্চ আমি আমার বাহিনী নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করি। তখন আমার অবস্থান ছিল কুষ্টিয়া জেলার চুয়াডাঙ্গা সদরে। ২৭ মার্চ যশোর থেকে আগত একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন ও তিনজন সৈনিক আমার এলাকায় ছোট একটি সংঘর্ষে নিহত হওয়ার পর আমি আন্তর্জাতিক সীমানায় অবস্থিত ৪ কোম্পানি সৈন্যকে অগ্রগামী করে স্থানীয় জনগণের সহায়তা নিয়ে ৩০ মার্চ কুষ্টিয়া আক্রমণ করেছিলাম।

সেখানে অবস্থানরত চারজন অফিসার ও ২০০ পাকিস্তানি সৈন্যের এক বিরাট বাহিনীকে সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন করে কুষ্টিয়া জেলা শত্রুমুক্ত করেছিলাম।

 

১৭ এপ্রিল আমার নিয়ন্ত্রণাধীন মেহেরপুরের অন্তর্গত বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আমবাগানে বিশ্বের ৩৯টি দেশের শতাধিক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ প্রকাশ্যে বাংলার মাটিতে শপথ গ্রহণ করার পর আমার এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে মন্ত্রিপরিষদকে গার্ড অব অনার প্রদান করি। সেই অনুষ্ঠানে আমার স্ত্রী বেগম নাজিয়া ওসমান সারা বাংলার নারী জাতিরই প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তখন যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি বুঝতে পারি যশোরকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে প্রথমে কুষ্টিয়াকে মুক্ত করতে হবে।

কারণ পেছনে শত্রু রেখে সামনের শত্রুকে মোকাবিলা করা যায় না। তাই সঙ্গে সঙ্গে ডা. আসহাবুল হক, অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী ও ব্যারিস্টার বাদল রশীদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ ডেকে তাদের সঙ্গে আক্রমণের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেই পরিকল্পনা তৈরি করেছিলাম। ২৮ মার্চ কোম্পানিগুলো সমবেত হওয়ার পর ক্যাপ্টেন এ আর আজম চৌধুরীকে কুষ্টিয়ার রণাঙ্গনের সার্বিক সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

৩০ মার্চ ভোর ৪টায় আক্রমণের সময় নির্ধারণপূর্বক কুষ্টিয়া আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলাম। আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক সুবেদার মেজর মোজাফফরের কোম্পানি কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনস, ক্যাপ্টেন আজমের বাহিনী কুষ্টিয়া জেলা স্কুল এবং নায়েব সুবেদার মুনিরুজ্জামানের কোম্পানি মোহিনী মিল ও ওয়ারলেস স্টেশন একযোগে আক্রমণ করে।

১৫ মে থেকে নিয়মিতভাবে প্রত্যেক কোম্পানিকে সাপ্তাহিক অপারেশনাল টাস্ক দিতে থাকি। ১৯৭১ সালের ২৭ মে ভোর ৪টায় পাকিস্তানিরা দুই কোম্পানি সৈন্য নিয়ে সাতক্ষীরার ডোমরায় অবস্থানরত আমার বাহিনীর ওপর আক্রমণ করে। শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ। আমরা তাদের প্রতিহত করতে সমর্থ হই। ১৭ ঘণ্টা স্থায়ী ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রায় ৩০০ সৈন্য হতাহত হয়।

এদিকে পাকিস্তানি ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় কমান্ডার, একজন ক্যাপ্টেন ও কয়েকজন জওয়ানও ওই হামলায় নিহত হন। এক হিসাবে দেখা গেছে, এই সেক্টরে গড়ে প্রতি মাসে ৭০০ শত্রুসেনা নিধন হয়েছে।

১১ আগস্ট বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। স্থলাভিষিক্ত হন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর এম এ মঞ্জুর। আমাকে মুক্তিবাহিনীর সদর দফতর মুজিবনগরে অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব স্টাফ [লজিস্টিকস] এর দায়িত্ব পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

যৌথবাহিনী শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে একের পর এক এলাকা জয় করতে থাকে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশ মুক্ত হয়। স্বাধীন হওয়ার পর জনমনে বয়ে যায় আনন্দের বন্যা। জয়-বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস।

 

সেনাবাহিনী থেকে দ্রুত অবসরে গেলেন কেন?

যুদ্ধ-উত্তরকালে একপর্যায়ে আমাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

তখন প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে যথোচিত অনুসন্ধানের পর আমাকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি দিয়ে কোরের [এএসসি] পরিচালক পদে নিযুক্ত করেন। ওই পদে তিন বছর আসীন থাকার পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি বিদ্রোহে গুলশানের বাড়িতে আমাকে না পেয়ে সিপাহিরা আমার স্ত্রীকে হত্যা করে। তারপর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক নিয়োজিত তৎকালীন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ আমাকে অন্যায়ভাবে অকালীন অবসর প্রদান করে।

 

যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আপনারা বেশ সোচ্চার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত 'গণআদালত' এর অন্যতম বিচারক হিসেবেও আমি কাজ করেছি। অন্যদিকে 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি'-এর অন্যতম সংগঠক ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অধীনে নিরলস রাতদিন কাজ করছি। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই, এ আমার পবিত্র অঙ্গীকার।

আপনি তো লেখালেখিও করেন।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

যুদ্ধের সময় চোখের সামনে নানা ঘটনা দেখেছি। আমার জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর স্বাধীনতায় উত্তরণের ধারাবাহিক ইতিহাস বিষয়ে 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' বইটি লিখেছি। এ ছাড়া আমার লেখা 'সময়ের অভিব্যক্তি', 'সোনালী ভোরের প্রত্যাশা', 'এক নজরে ফরিদগঞ্জ', 'বঙ্গবন্ধু : শতাব্দীর মহানায়ক' ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' বইখানি ১৯৯৩ সালে অন্যতম শ্রষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক পুরস্কৃত হয় এবং আলাওল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করে।

 

আপনি তো অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন।

মানুষের জন্য সেবামূলক কাজ করতে কেমন লাগে।

আমি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আমার নিজ জেলা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ-শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেছি। ঢাকাস্থ ফরিদগঞ্জ থানা সমিতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। চন্দ্রা ইমাম আলী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছি। অন্যদিকে ফরিদগঞ্জের শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে নিয়োজিত আছি।

এ ছাড়া সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের একজন কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমানে চাঁদপুর জেলা পরিষদের চেয়াম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। মানুষের জন্য কাজ করতে আমার ভালো লাগে।

 

আপনারা যে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তা কতখানি পূরণ হয়েছে?

মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন আমাদের স্বাধীন ভূখণ্ড ও এ দেশের লাল সবুজের পতাকা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ ছিল সমষ্টিগত মুক্তি।

সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ। স্বাধীনতার চার দশক পর যদি মূল্যায়ন করতে যাই, তাহলে সাফল্য-ব্যর্থতা দুই-ই লক্ষ্য করব। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছি তার মধ্যে রাজনৈতিক ব্যাপারটা মোটামুটি সফল হয়েছে। আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি। আমাদের নিজস্ব মানচিত্র আছে।

আছে সংবিধান। আমরা স্বশাসিত জাতি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এ জাতির কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের এ দেশটাকে এগিয়ে নিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে।

কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের যদি সুযোগ করে দেওয়া হয় তাহলে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নে পেঁৗছতে পারবে না। ইতোপূর্বে যেমনটি হয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি না আসার অন্যতম কারণ স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র। অথচ আমি এমন এক বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে থাকবে না দারিদ্র্য, দেশটা হবে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, রাজাকারমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ।

 

 



অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।