আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

এমপি ব্যবসা! ঝুঁকিহীন এবং লাভজনক একমাত্র ব্যবসা!

লড়াই করে জিততে চাই

এমপি ব্যবসা বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং ঝুঁকিহীন ব্যবসা এটা সর্বজনবিদিত। প্রচুর অবৈধ টাকা আছে, তো দেরি কেনো? এমপি টিকিট কিনুন সরাসরি জোট বা মহাজোটের শীর্ষ কোন দল থেকে। আর হয়ে যান এমপি! যথেষ্ট দুরদৃষ্টিসম্পন্ন হলে,অধিক সম্ভাবনাময় দলের টিকিট কিনুন, যাতে আপনার দল ক্ষমতায় যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার বিনিয়োগ শতগুণ বা হাজারগুণ হয়ে ফেরত আসবে। আর মাঝখান থেকে ক্ষমতা, নিরাপত্তা, সম্মান ইত্যাদি বিষয়গুলো পাবেন ফাউ।

কপাল একটু চওড়া হলে মন্ত্রীর টিকিটও জুটে যেতে পারে। তবে হ্যা, কোন একজন নেতার আদর্শ প্রতিষ্ঠার বুলি গলাফাটিয়ে আওড়াতে হবে মাঝে মধ্যে। সবাইকে বুঝিয়ে দিতে হবে আপনি ঐ দলের জন্য কত উপযোগি। যদি আপনার দল ক্ষমতায় না যায় তাহলেও খুব টেনশনের কিছু নেই। আপনার বিনিয়োগ হয়তো শত বা হাজারগুণ হয়ে ফেরত আসবে না।

কিন্তু নিশ্চয়ই বিশ-ত্রিশ-পঞ্চাশগুণ হয়ে ফেরত আসবে। সরকারী দল যতই মাইকে বিরোধীদলের বিরুদ্ধে গলাবাজি করুক না কেন, খাওন-দাওনে আপনার ভাগ ঠিকই পাবেন। অবশ্যই আপনার ভাগ সরকারী দলের খাদকদের চেয়ে অনেক ছোট হবে। বিরোধী দলে থাকার আর একটা সমস্যা হচ্ছে, আপনার রাজনৈতিক ব্যায় কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আপনাকে মিটিং, মিছিলে লোক আনতে টাকা ঢালতে হবে।

ককটেল, বোমা ইত্যাদি বানানো এবং সেগুলো পরিকল্পনামাফিক ফুটানোর জন্যও যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হবে। ভাড়াকরা লোকদেরও আরও বেশকিছু দায়দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশ বা সরকারী দলের সন্ত্রাসী দ্বারা কেউ আহত হলে তার চিকিতসা, জেলে গেলে ছাড়ানোর ব্যবস্থা ইত্যাদির দায় কিছুটা হলেও আপনার উপরে বর্তাবে। তবে এগুলো অপশনাল। আহত বা জেলের ঘানি টানা সাগরেত বা ভাড়াটেদের পিছনে টাকা না ঢাললেও বড় কোন প্রশ্ন নেই।

আর যদি ভোটে ফেল করেই বসেন, তাহলে কষ্টটা আরো একটু বাড়বে। তবে বিনিয়োগ মার যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে ফেল করা এমপি প্রার্থীকে দলীয় বড় নেতাদের আগে-পিছে থাকার ট্রেনিংটা ভালো করে নিতে হবে। সুযোগ পেলেই ফটোসেশনে কোন একজন বড় নেতার পাশ দিয়ে নিজের গলাটা বাড়িয়ে দিতে হবে। আর চ্যালাদের দিয়ে নিজের নাম, নেতাদের নাম ও দলের নাম বিকানোর পরিকল্পনাটা ভালোভাবে করতে হবে।

ব্যাস! আপনার বিনিয়োগ তো কয়েকগুণ হয়ে ফিরে আসবেই, বাড়তী আসবে আগামী নির্বাচনে টিকিট কেনার টাকা এবং সেই সাথে দলের পরিচালনা পরিষদের কাছে নিজের পজেটিভ ইমেজ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য। নিজের ও পরিবারের সম্পদের তথ্য সেই ব্যক্তিগত তথ্যেরই অংশ। আগে এই নিয়ম ছিলো না। দেশবাসীর কাছে এমপিদের জবাবদিহিতার দিকে তাকিয়ে এই নিয়মের প্রচলন করেছেন ফকরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অনেক নিয়ম বাতিল করলেও এমপি-মন্ত্রীরা চোর নয়, এটা প্রমাণের স্বার্থে এ নিয়মটা রেখে দিয়েছেন। তাই এবারের একতরফা নির্বাচনেও একান্ত নিয়ম রক্ষার জন্য হলেও এমপি প্রার্থীদের নিজের ও পরিবারের সম্পদের তথ্য দিতে হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। সংবাদমাধ্যমে এমপি-মন্ত্রীদের সেই ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে হাক-ডাক হয়েছে অনেক। বারবার দেখানো হয়েছে, কার সম্পদ গত ৫ বছরে ফুলে-ফেঁপে কতবড় হয়েছে। মন্ত্রী-এমপিদের যে সমস্ত সম্পদ পাকলিকের চোখের সামনে রয়েছে, যেটার কথা উল্লেখ না করলে এলাকার জনগণই মূখে থুথু দেবে, নৌকার বা লাঙ্গলের টিকিট পাওয়া এমপি-মন্ত্রীরা শুধু সেই সম্পদটুকুরই হিসাব দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনে।

আর তাতেই সবার চক্ষু চড়কগাছ!
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমানের ২০ একর কৃষি জমি থেকে পাঁচ বছরেই আন্ডা-বাচ্চায় তা হয়েছে ২৮৪৫ একর। ব্যাংকে টাকা বেড়েছে ৫৮৬ গুণ এবং বার্ষিক আয় বেড়েছে ৭৯ গুণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মখা আলমগীরের নিজের নগদ টাকা ছিলো মাত্র ৫ লাখ। আর পাঁচ বছর পরে তার নিজের ও স্ত্রীর নগদ টাকাই আছে ৫ কোটির উপরে। ফজলে নূর তাপস সহ অনেক নেতারা ট্যাক্স ফাঁকি দিতে নিজেকে মৎস্যজীবী বা মাছ ব্যবসায়ী হিসাবে প্রমাণ করেছেন।

আর আহসানুল্লা মাষ্টারের ছেলে এমপি জাহিদ আহসানকে দেশের অনেক পাবলিক শুধু স্বর্ণই উপহার দিয়েছেন। তাতে তার স্বর্ণ ১০ ভরি থেকে বেড়ে গত পাঁচ বছরে হয়েছে ৮৭০ ভরি। এয়ারপোর্টের কাছে বাড়ী, তাই স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের উপহারের ছিটেফোঁটা টঙ্গির দিকে যাওয়াটাও অমূলক নয়।
কিন্তু সম্পদের এই ফিরিস্তি এতবড় বিষয় হয়ে সামনে আসতো না, যদি ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের সম্পদ সম্পর্কে জানা যেতো। তারা যেহেতু নির্বাচনে নেই তাই পাবলিকের চোখ এখন মহাজোটের এমপি-মন্ত্রীদের হাজারো থলের মধ্যে বেরিয়ে পড়া ছোট থলেটার দিকেই।

তারেক জিয়া সম্পর্কে যেমন গল্প প্রচলিত ছিলো, রাজনৈতিক কাজের চাঁপে তারেক জিয়ার টাকা গোনার কোন সময় নাই। তাই তিনি টাকা গোনার ঝামেলা এড়াতে দেয়ালে দাগ কেটে দিয়েছিলেন। পাঁচশত টাকার নোট সাজিয়ে লাল দাগ পর্যন্ত উঠলে এক কোটি, নীল দাগ পর্যন্ত সাজালে দুই কোটি ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে,এক হাজার টাকার নোট তখনও বের হয় নি। সেই সব টাকার খবর এখন আর কারো মনে নেই।

আওয়ামী লীগ সরকারও চোর-টোর বলে অনেক গালি দিয়ে শেষ পর্যন্ত মাফ করে দিয়েছেন। সাথে একখান সার্টিফিকেটও ধরিয়ে দিয়েছেন। ক্ষমার চেয়ে বড় ধর্ম আর কি আছে বলুন? আর টাকা তো মহাজোটের কোন নেতার বাপের টাকা না! সবই তো আম পাবলিকের!অতএব ক্ষমা করতে কোন কষ্ট পাওয়ারও কথা নয়।
মহাজোটের এমপি-মন্ত্রীদের সম্পদের এই ফিরিস্তির কি আদৌ কোন সত্যতা আছে?? নিশ্চয়ই না! আগেই বলেছি, সম্পদের হিসাবটা নিতান্ত নিয়ম রক্ষার জন্য দেয়া হয়েছে। উদাহরণ চান? ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর স্ত্রীর নামে গুলশানের একটি ছয়তলা ভবনের মূল্য বলা হয়েছে ৫৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।

ঢাকার গুলশানের যে নাম শুনেছে,সে কি এটা বিশ্বাস করবে? যেখানে এক কাঠা জমির দাম কয়েক কোটি টাকা? কিন্তু বেচারা নির্বাচন কমিশন তাতেই সন্তুষ্ট। তবুও তো ৫৮ লাখ বলেছে? যদি ৮ লাখ বলতো তাহলেই বা কি করার ছিলো জি হুজুর নির্বাচন কমিশনের?
আর গুলশান লেকের পাড়ে এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর নির্মাণাধীন দশতলা ভবনের কোন উল্লেখই নেই নির্বাচন কমিশনে দেয়া তথ্যে। একজন সাংবাদিক এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ফজলে করিম চৌধুরী বলেন,“বাড়িটির নির্মাণকাজ যখন শেষ হবে, তখন হিসাব দেওয়া হবে। আগে দেওয়ার কী আছে”?
এরকম হাজারো বাড়ী, গাড়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প্র-কারখানার কোন হিসাব এমপি প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে দেন না। যা ছিটেফোঁটা দেন তাও দাম দেখান নামকাওয়াস্তে।

আর আমাদের ঠুটো নির্বাচন কমিশন তাতেই আহল্লাদে গদগদ। তারাও আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সাথে সুর মিলান, ‘দল ক্ষমতায়! সম্পদ তো একটু আধটু বাড়তেই পারে’!
বাংলাদেশের এমপি-মন্ত্রীদের নিরাপত্তা জগৎবিখ্যাত। আগে-পিছে পুলিশ, সাদা পোশাকের পুলিশের বিশেষ নজরদারী, আর নিজের বাহিনী তো রয়েছেই। এরপরেও প্রায় প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর নিজস্ব আগ্নেয়াস্ত্র আছে। অনেকের বউ-ছেলে-মেয়ের নামেও আছে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারের নিজস্ব অস্ত্রাগারে রয়েছে নাইন এমএম পিস্তল, ২২ বোর রাইফেল, দোনালা বন্দুক, রিভলবার ও একটি শটগান। এগুলোর কথা তিনি নির্বাচন কমিশনের তথ্যে উল্লেখ করেছেন। রুহুল আমিনের মতো জোট-মহাজোটের অনেক মন্ত্রী-এমপিদের রয়েছে নিজস্ব অস্ত্রভান্ডার। সেই ভান্ডারে একে-৪৭,গ্রেনেড, মেশিনগান সহ অন্যান্য অস্ত্রের আধিক্য থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনেক ক্ষেত্রে এমপি-মন্ত্রীদের নিজস্ব অস্ত্রভান্ডার একটি থানার অস্ত্রভান্ডারের চেয়েও অনেক সমৃদ্ধ।

মন্দ লোকে বলে,অস্ত্র ভাড়ায় খাটানোর কাজও কেউ কেউ করে থাকেন। আর এত যে অস্ত্রের ঝনঝনানি তা কিন্তু পাবলিকের ওই এমপি সার্টিফিকেটের জোরেই।
এমপি হলে আপনি পদাধিকার বলেই রাতারাতি হয়ে যাবেন এলাকার সবচেয়ে সম্মানিত লোক। পূর্বে সন্ত্রাস, খুন, লুটতরাজ,দুর্নীতি যাই করেন, সবই মাটির নিচে চাঁপা পড়ে যাবে। আপনি হয়ে যাবেন এলাকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।

তাছাড়া অন্যান্য অনুষ্ঠানেও আপনাকে প্রধান অতিথি হিসাবে আমন্ত্রণ জানাবে সবাই। বেয়াড়া কোন আয়োজক আপনাকে বড় চেয়ারটা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের দু’চার জনের ঠ্যাং ভেঙে দেয়ার মতো ক্ষমতা আপনার হাতে থাকছে। তাই আপনি আপনার এলাকার রাজা হতে চাইলে এমপি হওয়ার কোন বিকল্প নেই।
প্রশ্ন আসতে পারে, আচ্ছা সবই তো বুঝলাম? কিন্তু এমপি টিকিট কেনার টাকা জোগাড় করবো ক্যামনে? এই প্রশ্নটা অনেকটা ‘মুরগী আগে, না কি ডিম আগে’র মতো!এমপি টিকিট কিনতে যেমন কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন, তেমনি শত শত কোটি টাকা কামাতে এমপি হওয়াটাও প্রয়োজন। তাইতো রাজনীতিবিদরা এখন আর এমপি হতে পারেন না (কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া)!বর্তমান এমপি-মন্ত্রীদের ইতিহাস ঘাটলে নিশ্চয়ই দেখবেন, রাজনীতি করার বয়স তার খুব বেশি দিনের নয়।

রাজনীতিতে আসার আগে সে হয়তো কোন সন্ত্রাসী,চোরাচালানী,লুটেরা ব্যবসায়ী,রক্তচোষা শিল্পপতি বা দুর্নীতিবাজ আমলা ছিলো। কারো কারো ইতিহাস একেবারেই অন্ধকার, জঘন্য। কিন্তু এখন তারাই দেশের মাথা! পাবলিকের মাথার দাম না থাকলেও তা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা নেই।
এমপি হলে পুলিশও আপনাকে গ্রেফতার করতে পারবে না উপরের বিশেষ নির্দেশ ছাড়া। আর যদি কপালের ফেরে জেলে যেতেই হয়, তাতেও খুব সমস্যা নেই।

জেলে আপনার জন্য আছে ভিআইপি কোটা। থাকবেন জামাই আদরে!
পানির চেয়েও কম মূল্যে যদি ভিআইপি এলাকায় আবাসিক প্লট পেতে চান,বিনা শুল্কে যদি পেতেচান বিশ্বসেরা ব্রান্ডের গাড়ী-তাহলে এমপি হওয়াটাই একমাত্র পথ। আর টাকা কামানো যদি আপনার জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, আপনার সামনে এর চেয়ে ভাল সুযোগ দ্বিতীয়টি নেই! তাই,এমপি ব্যবসায় বিনিয়োগ করুন। রাজনীতির ‘র’ জানারও কোন প্রয়োজন নেই!আপনি হয়ে যাবেন দেশের মাথা! আর টাকা? সে তো আসবে বস্তায় বস্তায়!

পাঠক লাল গোলদার
০১ ডিসেম্বর ২০১৪

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।

প্রাসঙ্গিক আরো কথা
Related contents feature is in beta version.