আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

অভিনব পরিকল্পনা

লিখতে ভাল লাগে, লিখে আনন্দ পাই, তাই লিখি। নতুন কিছু তৈরির আনন্দ পাই। কল্পনার আনন্দ। অভিনব পরিকল্পনা মোহাম্মদ ইসহাক খান বিয়ে নিয়ে তুমি কী ভাবো, তুলি? শুভ জিজ্ঞেস করে। তুলি বাসা থেকে মুখস্ত করে আসা পড়া বলে যাবার মতো বলল, বিয়ে? এটা আসলে অনেকেই মনে করে একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের সম্পর্ক, কিন্তু আমি মনে করি ব্যাপারটা আসলে আরও ব্যাপক।

এটা একটা ফ্যামিলির সাথে আরেকটা ফ্যামিলির সম্পর্ক। অনেকে ভাবে যে দুজনের একজন ডোমিনেট করবে, কিন্তু আমি এটা কখনোই মানবো না। দুজন সমান হতে হবে। আর? আর বলতে পারো একেবারে তৈরি না হয়ে কারো বিয়ে করা উচিৎ না। শুধু জীবন এনজয় করার জন্য, "বিবাহিত জীবনের স্বাদ পাওয়ার জন্য" বিয়ে করা নেহায়েৎ বোকামি।

একটা সত্যিকারের পরিবার গড়তে গেলে একশো একটা দায়িত্ব মাথায় নিতে হবে। এটা যারা মেনে নিতে পারবে, লাইফ পার্টনারের সাথে আন্ডারস্ট্যান্ডিং করে চলতে পারবে, তাদেরই বিয়ে করা উচিৎ। তুলি থামলো। আমারটা তো শুনলে, তুমি কী ভাবো, শুভ? আমি? শুভ গলা খাঁকারি দেয়। আমার চিন্তাভাবনা একটু অন্যরকম।

আমি একজন ব্যবসায়ীর মতো চিন্তা করি, কিন্তু যেটা ভাবি সেটা করা সম্ভব নয়। কী ভাব, শুনি? শুনলে তুমি রেগে যেতে পারো, তুলি। হয়তো আমাকে মেরেই বসবে। মারবো না। বলোই না।

আমার একটা প্ল্যান ছিল, দুটো বিয়ে করবো। কী? দুটো? হ্যাঁ। কেন? একটা বিয়েতে সমস্যা কী? বললাম তো, ব্যবসায়ী চিন্তাভাবনা। বিজনেস করতে গেলে তোমাকে ইম্প্রোভাইজ করতে হবে, নতুন নতুন আইডিয়া বের করতে হবে। প্রথমে হয়তো একটু অদ্ভুত আইডিয়া বলে মনে হবে, কিন্তু দেখা যায়, সব অদ্ভুত আইডিয়াই শেষে কেমন করে যেন পাবলিক "খেয়ে" ফেলে।

খুলে বল। আমি দুটো মেয়েকে বিয়ে করবো। একজন হবে কর্পোরেট, চাকরিজীবী, আরেকজন হবে একদম গৃহিণী। দুজন দুরকম কেন? একজন চাকরি করবে, মাস শেষে বেতন আমার হাতে তুলে দেবে। আরেকজন দেখবে ঘরের কাজ, রান্নাবান্না করে আমাকে খাওয়াবে।

ভেবে দেখো, এদের যেকোনো একজনকে বিয়ে করলে আমাকে অর্থাৎ হাজবেন্ডকে যেসব কাজ করতে হতো, সেগুলোর কোনটাই করতে হচ্ছে না। কীরকম? শুধু কর্পোরেট মেয়েটাকে বিয়ে করলে ঘরের কাজ আমাকে করতে হতো। আর শুধু গৃহিণী মেয়েটাকে বিয়ে করলে ইনকাম আমাকে করতে হতো। এখন দুজন মিলে দুই দিক দেখবে, আমি পায়ের ওপর পা তুলে সারাজীবন রিলাক্স করতে পারবো। একজনের ইনকাম খাচ্ছি, আরেকজনের রান্না খাচ্ছি, হা হা হা।

আশেপাশের লোকজনের কৌতূহলী দৃষ্টি এদিকে ফিরিয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো শুভ। হাসি থামিয়ে সে একটু গম্ভীর হয়ে বলে, কিন্তু এই প্ল্যানে একটু সমস্যা আছে, সব আইডিয়াতেই যেমন ছোটখাটো flaw থাকে। কী সমস্যা? তুমি তো দু দুটো বউ নিয়ে ভারী আরামে থাকবে। কোন কাজের দায়িত্ব নেই। ওপর থেকে দেখলে তাই মনে হবে।

কিন্তু ভেবে দেখো, এই দুই পক্ষের সন্তান নিয়ে হবে ঝামেলা। দেখা যাবে দুই পক্ষের ছেলেপুলেগুলো মারামারি করছে। তখন আমি কোন পক্ষ নেবো? একজনের রান্না খাই, আরেকজনের ইনকাম খাই, কাজেই যেদিকেই যাই না কেন, ফেঁসে যাবো। গৃহিণীর পক্ষ নিলে ইনকাম বন্ধ, কর্পোরেটের পক্ষ নিলে খাওয়াদাওয়া বন্ধ। তাছাড়া আজকাল সময় বড় খারাপ, দুটো বিয়েকে মানুষজন কেন যেন বেশ খারাপ দৃষ্টিতে দেখে।

আফসোস। কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভ। তুলি খানিকটা রাগের স্বরে বলে, তাহলে এটাই তোমার প্ল্যান? এখানেই শেষ নয়। এটা ছিল প্ল্যান "এ"। প্ল্যান "বি"-ও রেডি আছে।

বল শুনি তোমার প্ল্যান "বি", কড়া স্বরে বলল তুলি। বোঝাই যাচ্ছে সে রেগে যাচ্ছে। শুভ তার দু নম্বর প্ল্যানটা বলতে শুরু করে। আমি খুঁজে বের করবো এমন একটা মেয়েকে, যার গায়ের রং কালো, অন্তত আমার চেয়ে তিন পরত কালো, যাতে তার বাবা-মা তাকে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলেও চালাতে না পারে। তার চোখ দুটো হবে ছোট ছোট, নাক হবে বোঁচা, যাতে চিমটা দিয়ে টেনেও নাক খাড়া না করা যায়।

আর আমার চেয়ে অন্তত এক হাত বেঁটে হবে, যাতে হাইহিল পড়লেও আমার ঘাড়ের নিচে পড়ে। লেখাপড়া থাকবে "আন্ডারমেট্রিক"। তুলি ফোঁসফোঁস করে বলল, সে কী? আমাদের দেশে তো বেকুবমার্কা ছেলেগুলোও বিয়ের সময় সুন্দরী মেয়ে খোঁজে। যার মাথায় টাক, বয়স চল্লিশের ওপরে, সেও। আরে সে তো বিয়ের জন্য।

আমি তো "বিজনেস প্ল্যান" বলছি। মেয়েটার সবদিকই নেগেটিভ হবে তা তো নয়। তাকে হতে হবে বিরাট বড়লোক পিতার একমাত্র মেয়ে। তাতে তোমার কী লাভ? লাভ মানে? এরকম একটা মেয়ে, তার বাপ যদি ধনী হয়, তাহলে চিন্তা করেছ আমি বিয়ের সময় কত কিছু দাবী করতে পারবো? চেয়ার-টেবিল, খাট পালঙ্ক, টিভি, গয়নাগাটি, নগদ টাকা মিলিয়ে হুলুস্থুল করে ফেলতে পারবো। একমাত্র মেয়ে, তার সুখের জন্য বাপ তো সবই করবে।

বলবো, খাটে তো আপনার মেয়েই শোবে, টিভি তো আপনার মেয়েই দেখবে, গয়নাগাটিও তো আমি পড়বো না, আপনার মেয়েই পড়বে। সে তো যেকোন মেয়ের বাবাই করবে। কালো মেয়ে বিয়ে করতে হবে কেন? আজকালকার মেয়েগুলোর যা ঠাটবাট, একটা ফর্সা মেয়ে তো আমার মতো চেহারার একটা ছেলেকে পাত্তাই দেবে না। কাজেই এই ব্যবস্থা। এই কোয়ালিটির মেয়ে, যার গায়ের রং কালো, আবার লেখাপড়াও নেই, সেই মেয়েকে একেবারে হাতের মুঠোয় রাখা যাবে।

আমি ডানে যেতে বললে ডানে যাবে, বাঁয়ে যেতে বললে বাঁয়ে। এবার বল প্ল্যানগুলো কেমন লেগেছে? তুলি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। তোমার তাহলে এই অবস্থা? সবকিছু তোমার কাছে ব্যবসা? আমি আর তোমার সাথে নেই। তোমার সাথে আর কোন কথা বলবো না। চোখে প্রায় পানি এসে গেছে তুলির, শুভর কাছ থেকে দূরে গিয়ে লেকের বাঁধানো ঘাটটাতে বসলো।

মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে ওর। শুভ এক মিনিট অপেক্ষা করলো। তারপর কাউন্টার থেকে দুটো চকলেটের বার নিলো। ধীর পায়ে এসে বসে পড়লো তুলির পাশে। তুলি ওকে দেখে অন্যদিকে ঘুরে বসলো।

মুখ ভার করে রেখেছে। শুভ ডাকল, এই তুলি। তুলি সাড়া দিলো না। সে বলেছে যে শুভর সাথে আর কোন কথা নেই। শুভ বলল, তোমার কি ধারণা এতক্ষণ যে কথাগুলো বলেছি সেগুলো সত্যিসত্যি বলেছি? ওগুলো ছিল ঠাট্টা।

তুমি ঠাট্টাও বোঝো না? আমি তো ভেবেছিলাম তুমি এমন একটা মেয়ে, যার খানিকটা সেন্স অফ হিউমার আছে। যে মেয়ে রসিকতা বোঝে না, সে কেমন মেয়ে? তুলি চোখ মুছে এদিকে ফিরে বসলো। তাহলে তুমি ঠাট্টা করেছ? হুঁ। তোমার কী মনে হয়? দুটো বিয়ে করা সম্ভব? একজনের ইনকাম খাবো আর আরেকজনের রান্না খাবো, আর তারা হাসিমুখে এগুলো করে যাবে, আমাকে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দেবে না? ঘরে বসা স্বামীকে তো কোন বউই দুই চোখে দেখতে পারেনা। আর কালো মেয়ে? শুভ বলল, আমি ব্যবসায়ী হতে পারি, কিন্তু আজকালকার মেয়েগুলো আর তাদের বাপগুলো খুব চালাক, তারা আমার প্ল্যান বুঝতে পারবে না এমন কোন কারণ নেই।

তুলি বলল, আমার নাকটা যদি বোঁচা হতো, আর আমি যদি বেঁটে হতাম, তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসতে? শুভ একটা নিঃশ্বাস ফেলল। বলল, তুলি, তোমাকে একটা কথা বলি। মানুষ ভাবে যে সবকিছুই তার হাতে। কিন্তু মানুষের ক্ষমতা খুব কম, তার হাতে খুব কম জিনিসের সুতো ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। যেগুলো দেয়া হয়নি, তার মধ্যে একটা হল সম্পর্ক।

তোমার সাথে যদি আমার সম্পর্ক লেখা থাকে, তাহলে আমি আমেরিকায় পালিয়ে গেলেও তুমি আমাকে খুঁজে বের করবেই। আমি এটা বিশ্বাস করি। গায়ের রং, হাইট, পিতামাতার সম্পত্তি, এগুলো সবাই ফ্যাক্টর মনে করে, কিন্তু এগুলো আসলে কোন সত্যিকারের ফ্যাক্টর নয়। তুলি একটু হাসল। শুভ বলে, গুড।

এই তো মুখে হাসি ফুটেছে। একটা চকলেটের বার তুলির দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল, নাও, চকলেট খাও। ডিসকভারি চ্যানেলে একটা প্রোগ্রাম হয়, সেখানে বলেছে যে চকলেট খেলে মন ভাল হয়ে যায়। চকলেট খেয়ে মন ভাল করো। কথায় কথায় মন খারাপ করা মেয়েকে আমি বিয়ে করবো না।

তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আর তুলি নামের মেয়েটি চকলেটের বারে কামড় বসিয়ে মন ভাল করছে। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।