আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

স্বস্তির পাশাপাশি অস্বস্তিও আছে

যেকোনো বাজেটের একদিকে থাকে বরাদ্দ-প্রক্রিয়া, অন্যদিকে থাকে বাস্তবায়ন-প্রক্রিয়া। আমাদের দেশে আলোচনার ঝড় ওঠে বাজেট প্রণয়নকালীন বরাদ্দ নিয়ে। বছরব্যাপী বাস্তবায়নকালে ধারাবাহিক আলোচনা-বিশ্লেষণে তেমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তার জন্য নিবিড় তদারকি যেমন প্রয়োজন, তেমনি আলোচনাও জরুরি।
২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটের বরাদ্দ সার্বিকভাবে সন্তোষজনক, তবে অস্বস্তিও কম নয়।

এই বাজেটে সব শ্রেণীর মানুষকেই সন্তুষ্ট করার চেষ্টা রয়েছে। সব কটি খাতেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক আশার সঙ্গে সংগতি রেখে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আর অস্বস্তিটা রয়ে গেছে আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীনতায়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ব্যয় বরাদ্দ দুই লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। প্রাক্কলিত আয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা।

সম্ভাব্য উপকারভোগীরা তাতে সন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু বিরাট ঘাটতি মোকাবিলার অস্বস্তিটা সরকারেরই।
আমরা মনে করি, বাজেটে ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে শিক্ষা খাতে ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে চলমানতা রক্ষা করবে আশা করা যায়। কৃষি খাতের সর্বমোট বরাদ্দ গত বছরের ১২ হাজার কোটি টাকা মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকছে ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা কমলেও।

তবে কৃষিঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার প্রয়াস থাকছে। অনুদান-নির্ভরতা থেকে ঋণ সহায়তায় উত্তরণে এটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এর পাশাপাশি অসচ্ছল জনগোষ্ঠীর প্রতি নজর রেখেছে এবারের বাজেট। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে বাজেটের ৬ শতাংশের মতো বরাদ্দ থাকছে। টাকার অঙ্কে তা ১২ হাজার কোটি টাকা।

এই খাতের উপকারভোগীর সংখ্যা কমবেশি ১০ শতাংশ সম্প্রসারিত হবে। কল্যাণ অর্থনীতির দিকে বর্তমান সরকার যে যাত্রা শুরু করেছিল, শেষ বছরেও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক। লক্ষণীয় যে, উচ্চবিত্তের মানুষের কাছ থেকে অধিক কর আহরণের প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। যোগাযোগ খাতে ১৮ হাজার কোটি টাকার বিরাট বরাদ্দ রয়েছে।

রেলওয়ে বাজেটে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়ে কথা নেই। পদ্মা সেতুতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার আগে এ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থনীতির সার্বিক চিত্র ফুটে ওঠে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিতে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

রাজনীতিতে সহিংসতা না থাকলে, পরিবেশ সহায়ক হলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। উল্লেখ্য, এশিয়ার এ অঞ্চলে সর্বাধিক প্রবৃদ্ধির দেশ ছিল ভারত। এ বছর ভারতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। এই অর্জনকে গতিশীলতা দিতে পারলে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব নয়।


মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে জনগণের স্বস্তি-অস্বস্তি রয়েছে। মুদ্রানীতি ৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বাজেট-বক্তৃতায় বলা হয়েছে। কিন্তু ৫০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে যে ধরনের অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য দেখা দেবে, তাতে করে মুদ্রাস্ফীতির পাগলা ঘোড়াকে আটকে রাখা দুঃসাধ্য কাজ হবে। তবে স্বস্তির কথা, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি কিন্তু গতবারের প্রাক্কলিত হারের কাছাকাছি রয়েছে।
আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে ৫০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি, তা জোগানের ব্যাপারে বাজেটে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই বাজেট বাস্তবায়ন করবে তিনটি সরকার। বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছে, এরপর অন্তর্বর্তী বা নির্বাচনকালীন সরকার এবং নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে। সে ক্ষেত্রে অর্থবছরের প্রথমার্ধে হয়তো তেমন সমস্যা হবে না, কিন্তু পরবর্তী সরকারকে ঘাটতি পূরণ করতে হবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে কিংবা বৈদেশিক সাহায্যের মাধ্যমে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিলে একদিকে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ পেতে সমস্যা হবে। তবে ব্যবসায়ী মহলের কেউ কেউ বলেছেন, তাঁরা স্বল্প সুদে বিদেশ থেকে ঋণ আনতে পারবেন।

সে ক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপটা কমতে পারে।
শেয়ারবাজার চাঙা করতে সরকারের কিছু প্রণোদনার পাশাপাশি ডিমিউচুয়ালাইজেশনের প্রস্তাব ভালো উদ্যোগ। শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনেও আমরা সে রকম সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু শেয়ারবাজারের মূল সমস্যা হলো গ্রাহকদের আস্থাহীনতা। শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা আনতে আমরা যেসব সুপারিশ করেছিলাম, গত তিন বছরে তার খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে।

হলে গ্রাহকদের আস্থা ফিরে পাওয়া যেত। আরেকটি বিষয় হলো, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ। গত তিন বছরের মতো এবারও এই খাতে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত তিন বছরে বরাদ্দ সত্ত্বেও কেন বাস্তবায়িত হলো না, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় তার ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিদেশি একাধিক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এটি কার্যকর হলে বিনিয়োগ বাড়বে।
বাজেটে সম্পদ কর প্রবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ের ওপর এবং বর্গমিটার প্রতি কর ধার্যের প্রস্তাব রয়েছে। আবার আবাসন খাতে বিনিয়োগের জন্য সরকার কালোটাকা সাদা করারও সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে ফ্ল্যাট ও জমির দাম অনেক বেড়ে যাবে।

এমনিতেই ফ্ল্যাট বাড়ি ক্রয় সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। কালোটাকা সাদা করা হলে এর দাম আরও বাড়বে। দ্বিতীয়ত গত তিন বছরের কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিলেও উল্লেখযোগ্য অর্থ বিনিয়োগ হয়নি। আর যদি কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিতেই হয়, তা হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া যেত। তাতে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো।


আরেকটি বিষয় হলো, পদ্মা সেতুতে বাজেটে সরকার সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখলেও সেতু নির্মাণের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নেই। এটি হয়েছে অনেকটা থোক বরাদ্দ। পদ্মা সেতু যদি নিজস্ব অর্থায়নেই করতে হয়, তারও পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা দরকার, যা অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় অনুপস্থিত।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর। ।

সোর্স: http://www.prothom-alo.com     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।