আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

শূন্যতার হাহাকার

ঘরদোর সব অন্ধকার কেন? আমার পাগলি বউটাতো অন্ধকার ভয় পায়! এতবড় হয়ে গেল, তবু ভূতের ভয়টা গেল না। কোথা থেকে যে এই ভূতের ভয় পাওয়া রোগটা ধরিয়েছে, কে জানে! চারিদিক এমন সুনসান, নীরবই বা কেন? আমার বাবুটাতো এখনো এত লক্ষ্মী হয়ে যায় নি! কিছুক্ষণ পরপরই তো তার চিৎকার করে ওঠা চাই! উফ! কি দস্যি ছেলে হয়েছে রে বাবা! কই, আমি তো ছেলেবেলায় এমন ছিলাম না। হি হি হি! আমি তো ওর থেকেও বেশি দস্যিপনা করতাম! তাই তো ওকে কিছু বলতে পারি না! দেড় বছরের একটা দেবশিশুকে কি-ই বা আর বলা যায়? না না, ভুল বললাম। এখন তো ও আর দেড় বৎসরের নয়। এপ্রিল মাসে যখন ঘর ছেড়েছিলাম, তখন ছিল ওর দেড় বৎসর।

কিন্তু গত সাতমাসে তো ওর বয়স দুই বৎসর পার হয়ে গেছে। এই পৃথিবীতে এসে তার দু দুটি শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত পেরোনো হয়ে গেছে! কিন্তু এত কথা যাদের নিয়ে ভাবছি, যাদের একপলকের জন্য দেখব বলে দেশের এই পরিস্থিতিতেও প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে বর্ডার থেকে এই এতদূরে ঢাকা পর্যন্ত ছুটে এসেছি, তারা গেল কোথায়? দেশের এমন অবস্থা, আমি দেশ স্বাধীনের মহান ব্রত নিয়ে লড়াই করে চলেছি, আর আমার সাথে কি এখন তারা লুকোচুরি খেলা খেলছে? এটা কি লুকোচুরি খেলবার সময়? কিন্তু এ কথা এই অবুঝ মা-ছেলেকে কে বোঝাবে? এর থেকে তো দেশ থেকে হানাদার, রাজাকারদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা কম ঝক্কির কাজ! 'বাবুসোনা! মায়া! বাবুসোনা!', হাঁক ছাড়লাম আমি। কিন্তু এবারও কোন সাড়াশব্দ পেলাম না। বুকের ভেতর কেমন খালি খালি লাগতে লাগলো। কি হাস্যকর ব্যাপার, আমার যখন বউ-বাচ্চাকে নিয়ে ভাববার কথা, আমি তখন গলা ছেড়ে, হেঁড়ে গলায় কবিতার পঙক্তিমালা আউড়াতে লাগলাম, "লক্ষ্মী বউটিকে আমি আজ আর কোথাও দেখিনা, হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে কোথাও দেখিনা, কতগুলি রাজহাঁস দেখি নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি, কতগুলি মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখিনা শিশুটিকে কোথাও দেখিনা !" আমার কবিতা শুনেও তারা আমার সামনে এল না।

তবে চোখের সামনে কোন রাজহাঁসও দেখতে পেলাম না। তার বদলে চোখে পড়ল একটা বিড়াল, মেনি বিড়াল। ওমা! একে তো আমি আগে দেখি নি! তারচেয়ে অবাক কাণ্ড, এটা বেরিয়ে আসল আমাদের শোবার ঘর থেকে। আমার সামনে এসে কর্কশ স্বরে 'মিউমিউ' করতে লাগলো। আর বারেবারে চোখ দিয়ে ইশারা করতে লাগল আমাদের ঘরের দিকে।

বিস্মিত হলাম আমি। এই নির্বোধ প্রাণীটি এমন আচরণ করছে কেন? কি আছে আমাদের শোবার ঘরটায়? ভাবলাম, এতশত চিন্তা করে কি লাভ? গিয়ে দেখলেই তো হয়। মা ছেলে হয়ত ঐ ঘরে গিয়েই লুকিয়ে আছে! তবে কি সত্যিই ওরা আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে? উফ! ওরা পারেও বটে! ##### এই ঘরটা যেন আরও বেশি অন্ধকার। কেমন একটা কটু গন্ধও কি নাকে এসে ঝাপটা মারছে? কিছুই তো দেখছি না। চারপাশ হাতড়াতে হাতড়াতে এগুতে লাগলাম।

কিন্তু হঠাৎ কিসে যেন পা বেঁধে ধপাস করে পড়ে গেলাম। হায় খোদা! এ দৃশ্য আমার বাবুটা আবার দেখে ফেলল নাকি? খুব মজা পেত নিজের বাবাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে! কিন্তু মায়ার সামনে তো আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারতাম না! আচ্ছা, আমি কিসে পা বেঁধে পড়ে গেলাম? সেটা তো এখনো আমার পায়ে লেগে আছে। উঠে বসে অন্ধকারে সেটার ওপর হাত বুলাতে লাগলাম। একি! এটা তো মায়ার শাড়ি! হাত দিয়েই বুঝে গেছি আমি! গতবছরই তো কিনে দিয়েছিলাম। কিন্তু শাড়িটা ছেঁড়া কেন? মায়া একটা ছেঁড়া শাড়ি কেনই বা ঘরের মাঝখানে ফেলে রাখল? নাহ! মেয়েটা এক ছেলের মা হয়ে গেল, তবু বুদ্ধিশুদ্ধি হল না।

মা মরা মেয়ে, ছোটবেলায় মায়ের সান্নিধ্য পায়নি তো, এজন্যই বোধ হয়। আচ্ছা ঠিক আছে। দেশের অবস্থা ভাল হোক, তারপর ওর কোলে একটা মা এনে দেব। তবে যদি সেই মায়ের শাসনে একটু বুদ্ধি খোলে তার! আমি এসব ভাবছি আর হাসছি। মনে মনে হাসা নয়।

একদম সত্যিকারের মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসতে লাগলাম। তারপর আবার উঠে দাঁড়ালাম। আজ বোধ হয় পুর্ণিমা। আচমকাই চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় চারপাশের অন্ধকার কেটে গেল। ঘর আলোকিত হল।

ব্যাপারটা কি? আজ যদি সত্যি পুর্নিমা হয়, তবে এতক্ষণ চারিদিক অন্ধকার ছিল কেন? চাঁদও কি আমার বউ আর সন্তানের মত লুকোচুরি খেলছিল? মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল? তা-ই বোধ হয়। কিন্তু এখন তো সে বেরিয়ে এসেছে। আমার মায়া আর বাবুসোনা কি তার অনুকরণে বেরিয়ে আসবে না? হ্যাঁ। তারাও এলো। ঘর আলোকিত হওয়ায় এখন আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার।

ঐ তো মায়া পড়ে আছে বিছানার ওপর। শতচ্ছিন্ন, অর্ধনগ্ন। পড়ে থাকার ভঙ্গিমাতেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, কি অমানবিক ঝড় বয়ে গেছে তার ওপর দিয়ে। আমার কোমল মায়া সামলাতে পারে নি তা। এই তো দেখা যাচ্ছে, মায়ার রক্তে রাঙা গোটা বিছানা।

আর নিষ্পাপ মায়া ঘুমিয়ে আছে। অতল গভীর সেই ঘুম। ভাঙবে না আর কোনদিন। আর আমার বাবুসোনা? ঐ তো! মায়ের পাশে সেও গুটিসুটি মেরে পড়ে আছে। সেও কি তবে চিরনিদ্রায় শায়িত? হ্যাঁ।

হানাদাররা কি আর কখনো আধাখেঁচড়া কাজ করে! আমার কেমন যেন মাথায় একটা সূক্ষ্ম ব্যথা করতে লাগলো। মন বলে যদি কোন জায়গা থাকে এই ক্ষুদ্র শরীরে, তবে নিশ্চিত এই ব্যথার উৎস সেটা! কিন্তু না। আর কিছুই না। আমি দিব্যি স্বাভাবিক! বাবুসোনাকে কোলে আঁকড়ে ধরে, মায়ার মাথার উষ্কখুষ্ক চুলে হাত বোলাতে বোলাতে পুরনো সব সুখস্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলাম। আবার মনে মনে হাসলাম! ভাগ্যিস বাবা-মা আগেই মারা গিয়েছিল! মরে গিয়ে বেচেছে তারা।

নইলে তাদেরও এই নৃশংসতার শিকার হতে হত। শুধু কি তাই? তাহলে তো তাদের অভাগা ছেলের বুকের যন্ত্রণা আরও বেড়ে যেত! যাক বাবা, সে অনর্থ হয় নি! ##### আজ আমায় কবিতা আবৃত্তিতে পেয়েছে। মায়াকে বললাম, মায়া, একটা কবিতা শুনবে? মায়া উত্তর দিল না। বাবুসোনাকেও বললাম, কিরে ব্যাটা! শুনবি নাকি বাপের মুখে পদ্য? ও-ও নিশ্চুপ। এখন বোধ হয় দুজনের কারোরই কবিতা শোনায় মন নেই।

তবু আমি আপনমনে বলতে লাগলাম, "আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্য মারা যাবো ছোট ঘাসফুলের জন্যে একটি টলোমলো শিশিরবিন্দুর জন্যে আমি হয়তো মারা যাবো চৈত্রের বাতাসে উড়ে যাওয়া একটি পাঁপড়ির জন্যে একফোঁটা বৃষ্টির জন্যে আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্যে খুব ছোট দুঃখের জন্যে আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে একটি ছোটো দীর্ঘশ্বাসের জন্যে একফোঁটা সৌন্দর্যের জন্যে। " যাহ! কিসব হাবিজাবি ভাবছি আমি! আজ তো আমি আমার জীবনের সবই হারালাম। ছোটবড় কিছুই কি অবশিষ্ট আছে যার জন্যে জীবন দেব? না না। আছে, আমার আছে। আমি তো সবকিছু হারাই নি।

আমার দেশ তো এখনো আছে। এই দেশ এখনো শিকলের নিগড়ে বন্দি। একে তো স্বাধীন করতে হবে। আমি নাহয় তার জন্যই এই জীবন উৎসর্গ করব! কিন্তু এই যে আমার এ দেশ, সেটা কি খুব ছোট্টকিছু? নাহ! সেটা মনের খুব কাছের। তাই বোধ হয় কবি তাকে আদর করে 'ছোট্ট' বলে সম্বোধন করেছেন! কিন্তু আবার মাথায় অন্যচিন্তা এলো।

"আমি জানি সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে। রবীন্দ্রনাথের সব জ্যোৎস্না আর রবিশংকরের সমস্ত আলাপ হৃদয়স্পন্দন গাথা ঠোঁটের আঙুর ঘাইহরিণীর মাংসের চিৎকার মাঠের রাখাল কাশবন একদিন নষ্টদের অধিকারে যাবে। চলে যাবে সেই সব উপকথাঃ সৌন্দর্য-প্রতিভা- মেধা; -এমনকি উন্মাদ ও নির্বোধদের প্রিয় অমরতা নির্বোধ আর উন্মাদদের ভয়ানক কষ্ট দিয়ে অত্যন্ত উল্লাসভরে নষ্টদের অধিকারে যাবে। " তাতে আমার কিছু যায় আসে না।

স্বাধীন নাগরিকরা স্বাধীনতাকে উপভোগ করবে। যে যেভাবে পারে। আমি শুধু চেষ্টা করে যাব সেই স্বাধীনতাকে তাদের হাতের মুঠোয় এনে দেবার। পারব তো আমি? ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।