আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

তুমি ছিলে নিরবে নিভৃতে হৃদয়ে, তুমি থাকবে তোমার আদর্শের আলোতে হৃদয়ের গহীনে।

হরবোলা ক্ষমতা ও দূর্নীতি যেন বিদ্যুত ও চুম্বক, একটা আরকেটার সাথে আষ্টপিষ্ঠে জড়িত। পরম ক্ষমতা চরম দূর্নীতির জন্ম দেয়। এমন উদাহরণ ভুরিভুরি। কোনটা রেখে কোনটা বলি। চিলির আগস্তা পিনোচেট থেকে শুরু করে মিশরের হোসনে মুবারক, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফী ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আবার ক্ষমতার মোহ মানুষকে অন্ধ করে। ক্ষমতার জন্য মানুষ সম্পর্ক বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করে না। ক্ষমতার এমন সম্মোহনী ক্ষমতা আছে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতায় আরহোণ ও ক্ষমতা ধরে রাখার নিমত্তে যুগেযুগে রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে।

প্রাণ গেছে কত ঊলু খগড়ার। সম্রাট আশোকা থেকে হালের গাদ্দাফী। বাদশা আলমগীর দিল্লির মসনদের জন্য পিতৃ ও ভ্রাতৃ হন্তারক হয়েছিলেন। ক্ষমতার জন্য যুগেযুগে হয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। তেমনী এক ঘটনায় অতি সাম্প্রতি নেপালের রাজপরিবারে নেমে এল বিপর্যয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির সমালোচনা আমরা হরহামেশাই করে থাকি। ভারতে জহরলাল নেহেরু-ইন্ধিরা গান্ধী-রাজীব গান্ধী-সোনিয়া গান্ধী-রাহুল গান্ধী। পাকিস্থানে জুলফিকার আলী ভুট্টো-বেনজীর ভুট্টো-আসিফ আলী জারদারী-বিলাওয়াল ভুট্টো। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-শেখ হাসিনা(মাননীয় প্রধানমন্ত্রী)-সজীব ওয়াজেদ জয় (মনে করা হয়), কিন্তু অদ্যবধি তিনি বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি হতে নিজকে সযতনে নিরাপদ দূরত্বে রেখেছেন। তাছাড়া জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়া(মাননীয় বিরুধীদলীয় নেত্রী)-তারেক জিয়া (সম্ভাব্য), ইতোমধ্যে তিনি নিজকে বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি ও দূর্ণীতিতে আষ্টপিষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছেন।

কারণ ক্ষমাতাসীন পরিবারে জন্মে নিজকে ক্ষমতার স্বাদ ও মোহ থেকে দূরে রাখা অতীব কঠিন কাজ। এইসব গল্পের শেষ নেই। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকে নিজকে ক্ষমতার অনেক দূরে রাখতে পারেন এমন একজন মানুষের নাম করতে পারেন কি? কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারের একজন হয়েও যিনি সারাটা জীবন নিজকে ক্ষমতার মোহমুক্ত রেখেছিলেন তিনি আর কেউ নন-তিনি একজন প্রথিতযশা পদার্থবিজ্ঞানী, একজন স্বপ্নবান বিজ্ঞানী, একজন স্বাপ্নিক মানুষ, নির্মোহ, নির্লোভ, নিষ্ঠাবান, নিরলস, নিরহঙ্কার একজন মানুষ। তিনি আমাদের ওয়াজেদ মিয়া। তিনি পরমাণু বিজ্ঞানী ডঃ ওয়াজেদ মিয়া।

১৯৪২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী রংপুর, পীরগঞ্জ, ফতেহপুরের মিয়া বাড়িতে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন ওয়াজেদ মিয়া। সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। তিনি ১৯৫৬ সালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন(এসএসসি) পরীক্ষায় ডিস্টিংশনসহ প্রথমশ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী সরকারী কলেজ হতে ইন্টারমেডিয়েট অব সাইন্স এক্সামিনেশন অব রাজশাহী ইউনিভার্সিটি(পরে এইচএসসি) প্রথমশ্রেণীতে পাস করে ভর্তি হন ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে। সে সময়ে একমাত্র অদম্য মেধাবীরাই পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত।

১৯৬১ সালে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে প্রথমশ্রেণীতে ২য় হয়ে স্নাতক সম্মান লাভ করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানে প্রথমশ্রেণীতে ১ম স্থান লাভ করে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৩-৬৪ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন হতে ডিপ্লোমা অব ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। তাঁহার পিএইচডি এর বিষয় ছিল, “বুটস্ট্রেপ হাইপোথেসিস ইন থিওরেটিক্যাল পার্টিকল ফিজিক্স(হাই এনার্জি নিউক্লিয়ার ফিজিক্স)।

” ১৯৬১-৬২ সালে তিনি ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ ফজলুল হক হল শাখার ভিপি ছিলেন। ১৯৬২ সালে শিক্ষাকমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারাবরণ করেন। লক্ষ্যণীয় যে, শেখ হাসিনাকে বিয়ে করার পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অফিসিয়ালী অংশগ্রহণ না করলেও আন্তঃরালে তিনি ছিলেন সর্বদা। গ্রহণ করেন নি কোন পদ-পদবী। এখানেই তাঁর মহত্ব।

১৯৬৭ সালের ১৭ই নভেম্বর ডঃ ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জৈষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে(বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী) বিয়ে করেন। সে সময়ে বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারা অন্তরীণ ছিলেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ছিল ডঃ ওয়াজেদ মিয়ার। তিনি ১৯৬৩ সালে পাকিস্থান পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী ডঃ আব্দুস সালাম কতৃক প্রতিষ্ঠিত ইন্টারনেশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স এর রিসার্চ ফেলো হিসাবে যোগদান করেন ও একটা প্রজেক্ট পরিচালনা করেন।

অতঃপর দেশে ফিরে আবার পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সংঘটিত হয় ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ তথা শেষরাতের ধ্বংসযজ্ঞ (লেট নাইট মেসাকার)। জাতির জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিসা। সে সময়ে ওয়াজেদ মিয়া শেখ হাসিনাসহ ছিলেন জার্মানীতে ও সাথে ছিলেন শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ওয়াজেদ মিয়া ১৯৭৫-৮২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে ভারতে নির্বাসিত ছিলেন।

নিউ দিল্লীর ইন্ডিয়ান পরমাণু শক্তি কমিশনে চাকুরী নিয়ে জীবনের ৮টি বছর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটান। নির্বাসিত জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে তিনি আবার পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান থেকে তিনি অবসরে যান। উল্লেখ্য যে সে সময়ে শেখ হাসিনা ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। চাইলে তিনি হতে পারতেন দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান।

কিন্তু তিনি চান নি। কারণ তিনি ছিলেন নির্লোভ ব্যক্তিত্ব। একবার কল্পনা করুনতো। আজ যেখানে আমরা পদবীর জন্য কামড়া-কামড়ি করছি। পদ-পদবী পাওয়ার জন্য হেন কর্ম নেই যে, আমরা করছি না।

একজন ওয়াজেদ আলী যদি আমাদের আইডল হত, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সংকট, এমনকি আমদের বর্তমান রাষ্ট্রীয় সংকট তিরোহিত হত। ক্ষমতায় না থেকেও মানুষের হৃদয়ে থাকা যায় এই বিশ্বাস আমাদের মাঝে জন্ম নিত। কর্মজীবনে বহু গবেষণাপত্র ছাড়াও তিনি সাতটি বই লিখেন। তার মাঝে পদার্থবিজ্ঞানের দু’টি টেক্সট বই ছাত্রদের মাঝে খুব জনপ্রিয়। বই দু’টি হলঃ ১।

ফান্ডামেন্টালস অব থার্মোডাইনামিক্স (ইউনিভার্সিটি প্রেস, ঢাকা ১৯৮৮) ২। ফান্ডামেন্টালস অব ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্স (টাটা ম্যাকগ্র হিল, ১৯৮২) পদার্থবিজ্ঞানের বই ছাড়াও তিনি আরো কিছু বই লিখেন যার মধ্যে নিম্নলিখিত বই দু’টি উল্লেখ না করলেই নয়; ১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ ২। বাংলাদেশের রাজনীতও সরকারের চালচিত্র। ২০০৯ সালের ৯ই মে খ্যাতনামা এই পদার্থবিজ্ঞানী ইহধাম ত্যাগ করেন।

আজ তাঁর তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। তুমি ছিলে নিরবে নিভৃতে হৃদয়ে, তুমি থাকবে তোমার আদর্শের আলোতে হৃদয়ের গহীনে। তোমাকে সালাম। আমরা এখানে শেষ করতে চাই বলে শেষ হয়ে যায়। এইখান থেকেও যে শুরু করা যায় বাঙ্গালী তা শিখেনি।

তাই ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দুঃখ করে বলেছিলেন, “যে দেশে জ্ঞানীর কদর নাই সে দেশে জ্ঞানী জম্মায় না। ” ডঃ ওয়াজেদ মিয়া ও ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আপনারা দু’জনই বড় ভুল জায়াগায় জন্মেছিলেন। এই দেশে ঘি আর তৈলের দাম সমান। এই দেশে বিচার নাই। আদর্শের স্থান নাই।

গল্প নয় বাস্তব একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে পুর্বরাজা বাজারে ওঠলাম এক বাড়িওয়ালার ভাড়াটিয়া হিসাবে। বাড়িওয়ালার চার ছেলে। এক ছেলে ডাক্তার, একছেলে ব্যাংকার, একছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সবার ছোট ছেলেটি গলির মাস্তান। ছেলেটি অত্র এলাকায় গলাকাটা হালিম নামে বেশ পরিচিত।

আমি যখন বলতাম গলাকাটা হালিমদের বাড়িতে থাকি তখন সবাই নড়েচড়ে বসতো। আমিও ব্যাপারটা উপভোগ করতাম। তখন মাঝে মাঝে মনে হতো আমরা পদার্থবিজ্ঞানের ডিগ্রীটা গলাকাটা হালিমের ডিগ্রীর তুলনায় নস্যি। আরো মজার ব্যাপার হল, আমার বাড়িওয়ালা সারাদিন পান চিবাতেন আর বাসার বাহিরে আড্ডা দিতেন। কোন কিছুতে ঘড়বড় হলে তিনি মাথা ঝাকিয়ে, পানের ফিক ফেলে ফোঁকলা দাঁত কেলিয়ে বলতেন, “আমি গলাকাটা হালিমের বাবা।

” তার কিন্তু আরো তিনটি ছেলে ছিল। যাক। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যদি কালা ফারুক বা সুইডেন আসলাম হতে চায় খুব আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বাবা হিসাবে আমরা খুব গর্ব করতে পারব। ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।