আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

আমাদের মিঠুন রায়

মিঠুন রায় জাতে ক্ষত্রিয়, কর্মে বৈদ্য। বর্ণে গৌর, আর্যদের মতো উন্নত নাসা কিন্তু চোখে অনার্য। অনেকটা চৈনিকদের মতো। মিঠুনদের পূর্বপুরুষ সম্ভবত মঙ্গল দস্যু ছিল। তাই উত্তরপুরুষ রায় পদবিধারী।

কিন্তু কর্মে মিঠুন রায় পুরোপুরি নির্বিষ। রক্তারক্তি তাকে করতে হয় বটে, কিন্তু সেটা রোগীর প্রয়োজনে। বৈদ্য হবার পর ক্ষত্রিয় মিঠুন রায় বিশেষজ্ঞ সার্জন হতে মনস্থির করেছে। এটা কি জিনের কোন খেলা? রক্ত দেখার বাসনাই কি তাকে সার্জারির প্রতি আগ্রহী করে তুলল? তবে আমাদের দূর্ভাগ্য যে, যেটাতে আমাদের প্রকৃত আগ্রহ সেটা আমরা সবসময় করে উঠতে পারি না। যার হয়তো ম্যাথমেটিক্সের প্রফেসর হবার কথা, তিনি হয়তো হয়ে ওঠেন অ্যাকাউন্ট্যান্ট।

পরিবারের চাপ, চাকরির অভাব, কতো কারণ! বাংলাদেশ আমেরিকা না, এইখানে কেউ ঝুড়িভর্তি সুযোগ পায় না। এই মিঠুনের কথাই ধরুন। হয়তো তার আদৌ ডাক্তার হবার বাসনা ছিল না, কিন্তু এখন সে বিশেষজ্ঞ হতে যাচ্ছে! তবে মিঠুন যে আসলে কী হয়ে উঠতে চায়, সেটা ও নিজে জানে কি না বলা মুশকিল। পাঠ্যপুস্তকে তার মনোযোগ কম, ওদিকে বিবিধ বিষয়ে উৎসাহ। তার চাহিদা অল্প, সুখে থাকার মূলমন্ত্র তো তাই! রায়বাবুকে আমার সুখী লোকদের একজনই মনে হয়।

মাঝে মাঝে চাহিদার অভাব থাকাটা কিন্তু বৈদ্যগিরির ভাষায় 'প্যাথলজিক'। মিঠুন ঐ কন্ডিশনে কখনো কখনো যায়। যার উচ্চতর টেনিং নেবার ইচ্ছে আছে, তার ঢাকামুখী হওয়া দরকার। মিঠুন রায়কে এই ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহী মনে হচ্ছে না। হতে পারে এটা পরিশ্রমের ধকল নেবার সাময়িক অনাগ্রহ।

তা হলে আমাদের দু'তরফেরই মঙ্গল! মিঠুন আমার অনেকদিনের বন্ধু। প্রথম দিনের আলাপ আমার স্পষ্ট মনে আছে, যদিও রায় এটা ভুলে গেছে। এমবিবিএস-এ সদ্য ভর্তি হওয়া আমাদের ব্যাচমেট ছেলেদের তালিকার একটা নাম আমাকে খুব উৎসাহী করলো- এস. মিঠুন রায়। আমি মিশনারি প্রতিষ্ঠান থেকে আসা, আমি ছেলেটাকে খ্রিষ্টান ভেবে নিলাম (এস ফর স্ট্যাটিসলান অর সামথিং)। ছেলেটার চেহারায় চৈনিক ভাব প্রবল।

অতএব আমি তাকে 'অন্ত্যজ হিন্দু সমাজ থেকে মিশনারিজ কর্তৃক ধর্মান্তরিত' কিন্তু 'আদিবাসি নয় বাঙ্গালি' একজন ভেবে তার 'শ্রেণী অবস্থান' আর 'মানস গঠন' বুঝতে চাইলাম। এটা আরো সহজ হলো যখন নুরুন্নবী হোস্টেল (আমরা এটাকে মেইন হোস্টেল বলেই জানতাম। এই নামকরণ ও নতুন নামকরণ নিয়ে অন্যত্র আলোচনা হবে। ) থেকে মাইক্রোবাসে করে লেপ-তোষক-কম্বল সমেত কিছু ছাত্রকে মাত্র 'শ-দুই গজ দূরের পিংকু হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে গেলো। এদের মধ্যে এসো (!) মিঠুন রায়-ও ছিল।

এস ফর শ্রী! কিন্তু সে হিন্দু এবং সে আমার বন্ধু হোল। তো হিন্দু হিশেবে কেমন সে? তার জাতি হিন্দু হতে পারে কিন্তু ধর্ম নয়! গরু খায়নি শুধু সে কিন্তু হিন্দু ধর্মের জাত মেরেছে। মিঠুন অবশ্য তার পারিবারিক সূত্রেও কিছুটা উদার আবহাওয়া পেয়েছে। মিঠুন এবং তার পরিবার নিয়ে অনেক গল্প বলা যাবে কারণ সে তো আমার বন্ধু! বন্ধু বন্ধুকে জানবে না? আর বন্ধু হিশেবে কেমন সে? ফার্স্ট ক্লাস! মিঠুন রায়ের বন্ধুত্ব পাওয়া আপনার সৌভাগ্য। সে হয়তো এফসিপিএস ডিজার্ভ করে না, কিন্তু সে ফেলোশিপ অফ কলেজ অফ ফ্রেন্ডশিপ নিয়ে জন্মেছে! হি ইজ দ্যা 'ফ্রেন্ড'।

মিঠুন রায়ের রাজশাহী ছাড়ার সময় আশা রাখবো বন্ধু মিঠুন যেন ডক্টর মিঠুন না হয়ে যায়। সে যেন তার নামের মতোই অনবদ্য থাকে। হ্যাভ এ গুড স্টার্ট, ফ্রেন্ড! রাজশাহী ।

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।