আমাদের কথা খুঁজে নিন

   

উন্নত মমশির আজ মরুভুমির পথে লুটায়।

সবুজের বুকে লাল, সেতো উড়বেই চিরকাল ৭০০ খ্রীষ্টাব্দের শুরু দিকে ভারতবর্ষে আরবরা ব্যাবসা বাণিজ্য শুরু করেছিল। তেলের কারণে তৈলাক্ত হবার আগ পর্যন্ত সেটি চালু ছিল। হাজার অত্যাচার নির্যাতনের পরেও সোনার বাংলা সোনার না থাকলেও, এই বাংলাদেশেই হজ্জ্বযাত্রি যোগাড় এবং ধর্মিয় সাম্রগি( টুপি, খেজুর, তসবিহ, জায়নামাজ) ইত্যাদি বেচাকেনা করাটাই ছিল আরবদের উপর্যানের একটি প্রধান উৎস। সেটা ভারত ভাগ হবার বেস কিছুদিন আগেরকার কথা। যতদুর শুনেছি, এমন কি সিরাজুদ্দৌলার আমল পর্যন্তও নাকি শাহি খাজানার পয়সায় আরবে লঙ্গরখানা চলতো।

গরিব আরবরা খেয়ে বাঁচতো। ক্ষমতার হাত বদলের ধারাবাহিকতায় আরব, তুর্কি সামাজ্য থেকে বৃটিশদের হাতে পড়লেও ভাগ্য পরিবর্তন হতে অনেক অনেকদিন সময় লেগেছিল। আরবে তেলের আবিস্কার ছিল ইউরোপীয় যান্ত্রিক সভ্যতার সাথে মণিকাঞ্চন যোগ। বর্তমান সময়ে বসে আগামি কয়েশ বছরের ছক কাটার সামর্থ্য থেকেই বৃটিশরা দিব্যি বুঝতে পেরেছিল, আরব এক সময় তাদের ক্ষমতা এবং সামর্থ্যের প্রাণভোমরা। তাই সুকৌশলে একে এমনভাবে ভাগ ভাগ করে দিয়েছিল, যাতে আরবরা কোনদিন একতাবদ্ধ না হতে পারে।

চাই কি নিজেদের মধ্যেও যেঁ সবসময় ঝগড়া বিবাদে মত্ত থাকে। আধুনিক সময়ের ইরাক কুয়েত যুদ্ধ নতুন কিছু ছিল না। বরং শত বছরের আগে বোনা বৈষম্যের যে বীজ বৃটিশরা বুনেছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ। আজ আরবে যে রাজতন্ত্রের উদ্ভব (স্বৈরশাসকও যোগ করতে পারেন) তার সৃস্টিকর্তা আর কেউ নয়, বৃটিশরা। এই স্বঘোষিত রাজতন্ত্রে কর্তারা তাদের দেশ এমনভাবে পরিচালনা করে, যেখানে ইঙ্গ মার্কিন সামাজ্যবাদিদের স্বার্থ ১০০ ভাগ সমুন্নত থাকে।

এবং শাসন পরিচালনায় এমন আইন কানুন বলবত করা, যা বাহ্যত "ইসলামি" আইন হলেও এর প্রয়োগ করার ব্যাপারে সাংঘাতিক বৈষম্য করে থাকে। ধরুণ রাজ পরিবারের সদস্যরা কিংবা সরকারের মধ্যে থাকা প্রভাবশালিরা এই আইনের প্রয়োগের বাইরে থাকে। (উদাহারণ, রাজ পরিবারের সদস্যদের শুধু ব্যাভিচারের হিসাব করলে এমনকি অনেক প্রাক্তন সৌদি বাদশাও ইসলামি আইনে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে পারতেন। বাকি সব অনিসলামি কার্যকলাপের কথা বাদই দিলাম। ) তাছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোন রকম প্রতিবাদ কিংবা বিরোধীতাকে ইনারা ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে অত্যন্ত কঠোরভাবে দমন করে থাকে।

এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছিল মনে হয় ৮০ এর দশকে, যেখানে মার্কিন বাহিনীর সমর্থন নিয়ে শত শত বিদ্রোহির কল্লা কাটা হয়েছিল। তাছাড়া সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেখানে আসলে কি ঘটছে, সেটি বাইরে প্রকাশ হবার জো নেই। অবশ্য অঢেল সম্পদ আর খুব স্বল্প জনসংখ্যার কারণে সেখানে অন্তত অর্থনৈতিক সম্বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তেমন উচ্চবাচ্য করে না। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিদ্রোহি কবি কাজী নজরল ইসলামের উন্নত মম শিরের মন্ত্রে উদ্বেলিত এক সময় যে বাঙ্গালিরা বৃটিশ থেকে শুরু করে পাকিস্থানিদের ঝেটিয়ে বিদায় করেছিল, স্বাধীনতার পর যতই সময় যাচ্ছে, তাদের শৌর্য বীর্য ততই লোপ পাচ্ছে। স্বাধীনত্তোর বাংলাদেশে যেখানে দুর্ণীতিমুক্ত একটি সরকার পারতো দেশের অর্থনীতিকে একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাড় করিয়ে দিতে পারতো, সেখানে বিপরীত স্রোতে চলে আজ এমন অবস্থা হয়েছে যে, শৌর্যবীর্যের সাথে সাথে আত্মসম্মানবোধটুকুও জাতিয়ভাবে হারিয়ে গিয়েছে।

নইলে যেখানে আমরা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিতে পেরেছি, সেখানে স্বাধীনতার পর একই ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারি বিশাল জনগোষ্ঠি সেখানে রাজনৈতিক আদর্শের নামে শতভাগে ভাগ হয়ে রয়েছি। ফলে অসৎ রা প্রভাবশালি হয়েছে। ফলাফল? স্বার্থপরতা, বিশাল সম্পদের অসম বন্টন, সন্ত্রাসিদের উত্থান, কয়েক পরিবারের মাধ্যমে প্রিয় দেশের ধর্ষন ইত্যাদি কারণে সোনার বাংলাদেশ শশ্মানে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতেই, শিক্ষাবঞ্চিত, অভাবের তাড়নায় নুজ্বপ্রায় দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠিকে প্রবাসি হতে বাধ্য করেছে। না।

সেই দেশত্যাগ ছিল কাঁটা বিছানো পথে পা রক্তাক্ত করা। বেচে থাকার সব সম্বল বিক্রি করে আদম ব্যাপারিদের হাতে তুলে দিয়ে শ্যামল বাংলার আলো হাওয়া ছেড়ে মরুভিমির পথে মানবেতর পরিবেশে মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্য হাজার হাজার বঙ্গ সন্তান আজ মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসি। যাদের রক্ত ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় আজ আমাদের অর্থনীতি খানিকটা সুস্থতার মুখ দেখছে, তাদের জন্য আমি কি করছি? এয়ারপোর্টে কুকুর বিড়ালের মত ব্যাবহার আর সমাজে মফিজ ইত্যাদি কুবিশেষনে বিশেষিত করে "যোগ্য" প্রতিদানই দিচ্ছি। দস্যুতা এবং হত্যার অভিযোগে ৮ জন বাংলাদেশির শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। এ নিয়ে ব্লগে পক্ষ্যে বিপক্ষ্যে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে।

এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপি কর্মি হিসাবে বাংলাদেশিরা প্রচুর সুনাম অর্জন করেছে। সেই সুনামের অধিকারিরা কেন দস্যুতা এবং হত্যার মত জঘণ্য কর্মে নিয়োজিত হলো সেই প্রশ্নটি কেউ করেছেন কি? দেশ থেকে অনেক দূরে বিশেষ করে যেখানে চুরি করলে হাত কাটার বিধান রয়েছে, এবং অপরাধ করে পার পাবার উপায় নেই, সেখানে কোন দুঃসাহসে এতগুলি বাংলাদেশি এই অপরাধে জড়িয়ে পড়লো? প্রথম প্রথম যখন সৌদি আরবে লোক নেয়া শুরু হয়েছিল তখন তাদের বেতন অনেক বেশি ছিল। দিন দিন আরবরা সেই বেতন একদিকে যেমন কমিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে অত্যচার আর নিপীড়নের মাত্রাটাও বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেন হঠাৎ এই মানসিকতার বদল? উত্তরটা পেয়েছি সৌদি আরবে এক সময় প্রবাসি আমার এক ঘনিষ্ট আত্মিয়র সুবাদে। তার ভাষ্য মতে আমাদের দেশের আদম ব্যাপারিরা নিজেদের ব্যাবসার খাতিরে, শ্রমিকের বেতন নিয়ে প্রতিযোগিতা করতো।

একজন শ্রমিক প্রতি একজন বেপারি যদি ১০০ টাকা বলতো, আরেক আদম বেপারি সেখানে দর বলতো ৮০ টাকা। এভাবেই নিজেদের কামড়া কামড়িতে সৌদিদের কাছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের মুল্যমানের সাথে সাথে মর্যাদাটাও ভুলন্ঠনিত হয়েছে। যে দেশের মানুষরাই এই শ্রমিকদের দুই পয়সা দাম দেয় না, সেখানে সৌদি বা অন্যদের কি দায় পড়েছে বলুন? সহায় সম্বল বিক্রি করে অল্প বেতনে এই শ্রমিকরা যখন আরবে গিয়ে আশাভঙ্গ, নির্যাতন নিপীড়ন আর বৈষম্যের শিকার হয়, তখন তার ভেতরে কি ক্রোধ জন্ম নেয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়। আর সেই ক্রোধের আগুণে স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি লোপ পাওয়ার কারণেই তারা এই বিপদজনক বিপথে পা বাড়িয়েছিলেন, সন্দেহ কি? যে দেশের যা আইন সেটাকে মেনে নেয়া ছাড়া আমাদের দেশের মত গরিব দেশের উপায় কি? আজ যদি আমেরিকা বা ইউরোপীয় কোন দেশের নাগরিকের বিরুদ্ধে একই ধরণের অভিযোগ আসতো, আমি নিশ্চিত এই আইনের ফাক ফোকর গলিয়ে ঠিকই তারা বের হয়ে যেতো। আমাদের না আছে অর্থ শক্তি, না প্রভাব না অন্যকিছু।

এহেন দুর্বল শক্তির একটি দেশের নাগরিক অন্য দেশের আইন ভঙ্গ করে পার পেয়ে যাবে, সেটি ভাবাটা অবিবেচনার কাজ হবে। আজ আমরা ৮ জন উন্নত মমশিরের মরু ধুলায় ভুলন্ঠনে ক্রোধান্বিত, দুঃখিত, বিষাদগ্রস্থ। অনেকে ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া খাওয়া নিয়োজিত। তখন আমরা কেন এই ক্রোধ আর শোককে শক্তিকে পরিণত করে নিজেদের আগে অর্থনীতিতে শক্তিশালি করি না কেন? বিশ্ব শক্তিশালিদের নমস্য জ্ঞান করে, দুর্বলকে নয়। আর এই শক্তি বাক শক্তি না, কর্মের শক্তি হওয়াই কাম্য।

সেই শক্তি অর্জন না করা পর্যন্ত এক সময় আমাদের দান খয়রাতের পয়সায় প্রাণে বেচে থাকা আরবেরা তেলের পয়সার গরমে আমাদেরকে দাসানুদাসই গণ্য করে থাকবে।  ।

সোর্স: http://www.somewhereinblog.net     দেখা হয়েছে বার

অনলাইনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কথা গুলোকেই সহজে জানবার সুবিধার জন্য একত্রিত করে আমাদের কথা । এখানে সংগৃহিত কথা গুলোর সত্ব (copyright) সম্পূর্ণভাবে সোর্স সাইটের লেখকের এবং আমাদের কথাতে প্রতিটা কথাতেই সোর্স সাইটের রেফারেন্স লিংক উধৃত আছে ।